চীনের দ্রুত নগরায়ন ও রিয়েল এস্টেট খাতের বিস্ফোরক প্রবৃদ্ধির সময় অসংখ্য বিলাসবহুল আবাসন প্রকল্প গড়ে ওঠে। কিন্তু এসব প্রকল্পের একটি বড় অংশ প্রত্যাশিত ক্রেতা না পাওয়া, অতিরিক্ত ঋণনির্ভর বিনিয়োগ এবং বাজারের মন্দার কারণে অসমাপ্ত থেকে যায়।
বলছি সাংহাই-ভিত্তিক গ্রীনল্যান্ড গ্রুপ নির্মিত ”স্টেট গেস্ট ম্যানসর” প্রকল্পের কথা। উত্তর-পূর্ব চীনের শেনইয়াং শহরের উপকণ্ঠে অবস্থিত এই প্রকল্পটি বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম আলোচিত “ভূতের শহর” বা “Ghost City” হিসেবে পরিচিত।
একসময়ের রিয়েল এস্টেট জায়ান্ট
গ্রীনল্যান্ড গ্রুপ চীনের বৃহৎ রাষ্ট্র-সমর্থিত রিয়েল এস্টেট ডেভেলপারদের অন্যতম। ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানটি আবাসন, বাণিজ্যিক ভবন, অবকাঠামো এবং আন্তর্জাতিক প্রকল্পে বিপুল বিনিয়োগ করে দ্রুত সম্প্রসারিত হয়। একসময় প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শত শত বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প পরিচালনা করছিলো।

২০১০ সালের দিকে চীনের আবাসন বাজার তুঙ্গে থাকায় গ্রীনল্যান্ড শেনইয়াংয়ে একটি উচ্চাভিলাষী বিলাসবহুল আবাসন প্রকল্প হাতে নেয়।
স্টেট গেস্ট ম্যানসন প্রকল্প
প্রকল্পটির লক্ষ্য ছিলো ধনী ব্যবসায়ী, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং অভিজাত শ্রেণির জন্য ইউরোপীয় স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত একটি প্রিমিয়াম আবাসিক এলাকা তৈরি করা। শুরুতে এটি উত্তর-পূর্ব চীনের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ আবাসিক এলাকা হওয়ার কথা ছিল।
প্রকল্পের বৈশিষ্ট্য ছিলো—
- প্রায় ২৬০টি বিলাসবহুল ইউরোপীয় ধাঁচের ভিলা।
- প্রশস্ত বাগান, কৃত্রিম লেক ও ব্যক্তিগত সড়ক।
- উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
- অভিজাত ক্লাব ও অতিথি সুবিধা।
- উচ্চমানের অবকাঠামো ও নান্দনিক নকশা।
কেন প্রকল্পটি ব্যর্থ হলো?
প্রকল্পটি ব্যর্থ হওয়ার পেছনে কোন নির্দিষ্ট কারণ ছিলো না। অনেকগুলো কারণে প্রকল্প শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
১. অতিরিক্ত সরবরাহ
চীনের অনেক শহরে প্রকৃত চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি আবাসন নির্মাণ করা হয়। ফলে পর্যাপ্ত ক্রেতা না পাওয়া এই প্রকল্পের বেশিরভাগ ভিলাই অবিক্রিত থেকে যায়।
২. ঋণনির্ভর সম্প্রসারণ
সে সময় রিয়েল এস্টেট কোম্পানিগুলো ব্যাপক ঋণ নিয়ে নতুন প্রকল্প শুরু করেছিলো। বাজার ধীর হয়ে গেলে অর্থায়নের সংকট দেখা দেয়।

৩. ক্রেতার আস্থাহীনতা
আবাসনের দাম কমতে শুরু করলে অনেক সম্ভাব্য ক্রেতা বিনিয়োগ থেকে সরে দাঁড়ান।
৪. নির্মাণ বন্ধ
প্রকল্প শুরু হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই নির্মাণকাজ কার্যত থেমে যায়। অনেক ভবন কংক্রিটের কাঠামো হিসেবেই থেকে যায়।
প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা
বর্তমানে এই প্রকল্পে দেখা যায় অসমাপ্ত শতাধিক ভিলা। ভাঙা বারান্দা ও আগাছায় ঢেকে গেছে রাস্তা। খালি ভবনের ভেতরে ধুলা ও নষ্ট আসবাব। নির্জন পরিবেশ যা দিনের বেলায়ই দেখতে ভৌতিক মনে হয়। স্থানীয় কৃষকরা পরিত্যক্ত জমিতে ভুট্টা, সবজি ও অন্যান্য ফসল চাষ করছেন। অনেক ভবনের গ্যারেজ এখন খড় সংরক্ষণের স্থান এবং আশপাশে অনেক গবাদিপশু চরতে দেখা যায়।

“ভূত সিটি” কেন বলা হয়?
”ভূত সিটি” বলতে এখানে অতিপ্রাকৃত কিছু বোঝায় না। এর অর্থ হলো বিপুল সংখ্যক নির্মিত ভবন আর সুনশান নীরবতা। এতগুলো নির্মিত ভিলা আছে কিন্তু বাসিন্দা খুব কম বা নেই। অবকাঠামো থাকলেও নগরজীবন গড়ে ওঠেনি। অর্থনৈতিকভাবে প্রকল্প কার্যকর হয়নি।
চীনের রিয়েল এস্টেট সংকটের প্রতীক
এই প্রকল্পটি শুধু একটি ব্যর্থ আবাসন প্রকল্প নয়। এটি চীনের বৃহত্তর রিয়েল এস্টেট সংকটের একটি বিশাল প্রতীক। বহু ডেভেলপার অতিরিক্ত ঋণ নিয়ে প্রকল্প শুরু করলেও বাজারের মন্দা, জনসংখ্যাগত পরিবর্তন এবং ক্রেতার আস্থাহীনতার কারণে অনেক প্রকল্প অসমাপ্ত থেকে যায়। গ্রীনল্যান্ড গ্রুপসহ বেশ কয়েকটি বড় ডেভেলপারও আর্থিক চাপে পড়ে।
বিশ্বজুড়ে আলোচনার কারণ
এই প্রকল্প আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও আলোকচিত্রীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। এর কারণগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ইউরোপীয় রাজপ্রাসাদের মতো ভিলা অথচ কোনো বাসিন্দা নেই। প্রকৃতির দখলে চলে যাওয়া বিলাসবহুল স্থাপনা। কৃষিজমিতে রূপান্তরিত আবাসন এলাকা। চীনের আবাসন বুদবুদের বাস্তব চিত্র। ড্রোনচিত্রে দেখা যায়, সারিবদ্ধ বিশাল ভিলাগুলো দাঁড়িয়ে থাকলেও সেগুলো কার্যত পরিত্যক্ত।
গ্রীনল্যান্ড গ্রুপের এর স্টেট গেস্ট ম্যানসন প্রকল্প আধুনিক নগর পরিকল্পনার এক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। শুধু বড় বিনিয়োগ বা চমৎকার স্থাপত্যই একটি শহরকে সফল করে না। প্রকৃত চাহিদা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাই একটি নগর প্রকল্পের সাফল্যের মূল ভিত্তি। শেনইয়াংয়ের এই “ভূত সিটি” আজ বিশ্ববাসীর কাছে অতিরিক্ত নির্মাণ, ঋণনির্ভর উন্নয়ন এবং রিয়েল এস্টেট ব্যর্থতার একটি শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
তথ্যসূত্র: আর্কিটেকচারাল ডাইডেজস্ট, গেটি ইমেজ, রিয়েল এস্টেট ডটকম

















