প্রথাগত কোনো স্থাপত্য জ্ঞান তার ছিল না, ছিলেন একজন সাধারণ ডাকপিয়ন। অথচ নিজের একক চেষ্টায় অবিশ্বাস্য এক সুররিয়ালিস্টিক স্থাপত্যটি তৈরি করেন। যা পৃথিবীর অসাধারণ স্থাপত্য হিসেবে স্বীকৃত। ‘দ্য প্যালেইস আইডিয়াল’ (The Palais Idéal), যার অর্থ হলো আদর্শ প্রাসাদ। পুরোটাই পাথরে তৈরি এই অবকাঠামোটি ফ্রান্সের হটেরাইভসে অবস্থিত। আর এর নির্মাতা ফার্দিনান্দ শেভাল।
দ্য প্যালেইস আইডিয়াল নির্মাণের পেছনে রয়েছে চমকপ্রদ এক কাহিনী। শেভাল পথে কুড়িয়ে পাওয়া সব পাথর জোগাড় করে এই প্রাসাদটি একক প্রচেষ্টায় তৈরি করেছিলেন। প্রাসাদটি তৈরি করতে লেগেছিলো প্রায় ৩৩ বছর।
এটি হিন্দু মন্দির, আরব্য মসজিদ এবং বাইবেলের গল্পের সংমিশ্রণে তৈরি একটি অদ্ভূত ও শৈল্পিক স্থাপত্য। এই অসাধারণ কীর্তির জন্য তাকে শিল্পের “Art Brut” বা সাধারণ মানুষের তৈরি শিল্পকলা (Outsider Art) এর অগ্রদূত হিসেবে গণ্য করা হয়। শেভাল কোনো স্থাপত্য বা নির্মাণকাজে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ছিলেন না, কেবল অদম্য ইচ্ছা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে তিনি এই কাজটি সম্পন্ন করেছিলেন।
‘দ্য প্যালেইস আইডিয়াল’ (The Palais Idéal), যার অর্থ হলো আদর্শ প্রাসাদ। যার পুরোটাই পাথরে তৈরি এই অবকাঠামোটি ফ্রান্সের হটেরাইভসে অবস্থিত। এই প্যালেইস আইডিয়ালটি অন্যান্য ঐতিহাসিক স্থাপত্যকর্ম থেকে একটু আলাদা। এটি হলো এমন একটি প্রাসাদ যা মাত্র একজন ব্যক্তি নিজের হাতে তৈরি করেছিলেন।
ফার্দিনান্দ শেভাল জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৮৩৬ সালের ১৯ এপ্রিল। দক্ষিণ-পূর্ব ফ্রান্সের অন্তর্গত চার্মস স্যর ল’হারবাসসে-তে। তার প্রাথমিক জীবন সম্পর্কে খুব কম তথ্য পাওয়া যায়। তিনি ১৮৬৭ সালে ডাকপিয়নের চাকরি নেন। এর কিছুদিন তাকে বদলি করা হয় হটেরাইভসের একটি ডাকঘরে। যেখান থেকে তাকে টারসেন অঞ্চল পর্যন্ত চিঠি বিলির কাজ করতেন। সে হিসেবে তাকে প্রত্যেকদিন মোট ১৮ মাইল ভ্রমণ করা লাগতো।
এর এক বছর পরেই ঘটে যায় সেই চমকপ্রদ ঘটনা। প্রতিদিনের মতো সেদিনও শেভাল চিঠি বিলির কাজে নেমে পড়েছিলেন। যে পথ দিয়ে প্রত্যেকদিন তিনি যাতায়াত করতেন সে পথ দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ করেই একটি পাথরের সাথে তার পায়ে আঘাত লাগে। শেভাল কৌতূহলবশত পাথরটি হাতে তুলে নেন। পাথরটি অন্যান্য পাথরগুলোর তুলনায় ছিলো কিছুটা ভিন্ন আকৃতির। তাই তিনি সেটি পকেটে ভরে নেন। আর এই পাথরটিই তাকে প্যালেইস আইডিয়াল তৈরি করার অনুপ্রেরণা যোগায়।

৪৩ বছর বয়সে শেভাল স্থাপনা তৈরির কাজে হাত দেন। এক সাক্ষাৎকারে শেভাল বলেছিলেন, একজন ডাকপিয়ন চিঠি বিলির সময় ঠেলাগাড়ি বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছেন ব্যাপারটা আশেপাশের মানুষজনদের কাছে অদ্ভুত ও হাস্যকর ঠেকেছিলো। তবে শেভাল এসবে ভ্রুক্ষেপ করেননি। বরং তিনি প্রতিদিনকার মতো চিঠি বিলির কাজ করে চলেছিলেন এবং পাথর জোগাড় করে যাচ্ছিলেন। চিঠি বিলির কাজে যাওয়ার সময় তিনি অদ্ভুত আকৃতির পাথরগুলো চিহ্নিত করে রেখে যেতেন এবং কাজ শেষে বাসায় ফেরার পথে পাথরগুলো তুলে বাসায় নিয়ে আসতেন। তিনি দিনের বেলা তার ডাকপিয়নের কাজ এবং পাথর কুড়ানোর কাজ করতেন এবং রাতে একা একা নিজের প্রাসাদ তৈরির কাজে হাত দিতেন। প্রাসাদ তৈরির ক্ষেত্রে তিনি প্রকৃতি, পোস্টকার্ডের ছবি এবং অন্যান্য ছবিওয়ালা সাময়িক পত্রিকা যেগুলো মূলত তিনি বিলি করতেন সেগুলো থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েছিলেন।
ঠেলাগাড়িতে পাথর সংগ্রহ
শেভাল এরপর যতবারই সে এলাকা দিয়ে গিয়েছেন তিনি প্রত্যেকবারই এরকম অদ্ভুত আকৃতির পাথর পেয়েছেন। এবং প্রতিবারই তিনি সেগুলো পকেটে তুলে নিয়ে জমা করছিলেন। যত দিন যাচ্ছিলো, পাথর জমানোর পরিমাণও বেড়ে চলছিলো। এতে করে তিনি একটি ব্যাগ সাথে রাখার সিদ্ধান্ত নিলেন। এমনকি ব্যাগও যখন পাথরে পরিপূর্ণ হয়ে যাচ্ছিলো এবং তা বহন করা কষ্টসাধ্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিলো, শেভাল তখন সিদ্ধান্ত নিলেন সাথে করে একটি ঠেলাগাড়ি রাখার।
দ্য প্যালেইস আইডিয়ালের কাজ শেষ হয় ১৯১২ সালে। ফার্দিনান্দ শেভালের বয়স তখন ৭৬ বছর। প্রাসাদটি ২৬ মিটার লম্বা হয়েছিলো, যার একপ্রান্তের শেষভাগটার উচ্চতা ছিলো ১২ মিটার এবং অন্যপ্রান্তের উচ্চতা ১৪ মিটার। স্থানটির স্থাপত্যকলায় প্রাধান্য পেয়েছে বিভিন্ন যুগের নির্মাণশৈলী। তাই প্যালেইস আইডিয়ালের গঠনে দেখা যায় হিন্দু মন্দির, আরব্য মসজিদ এবং মধ্যযুগীয় দুর্গ বা কেল্লার অবয়বও। সেই সাথে প্রাসাদটিতে দেখতে পাওয়া যায় অনেক কিছুর ভাস্কর্য। যেমন- ভালুক, পাখি ও হাতির মতো পশুপাখি।
শেভাল মুলত তার বিলি করা পোস্টকার্ডে দেখা সব পশুপাখিদের তার প্রাসাদে স্থান দিয়েছিলেন। তাই তার প্রাসাদের প্রতিটি ক্ষুদ্রক্ষুদ্র অংশে দেখতে পাওয়া যায় নাম জানা-অজানা প্রচুর পশুপাখি। এছাড়াও পৌরাণিক সকল জীবজন্তুর ভাস্কর্যের পাশাপাশি প্যালেইস আইডিয়ালে আরো রয়েছে জুলিয়াস সিজার, ভারসিনগেটোরিক্স এবং আর্কিমিডিসের ভাস্কর্যও!

নিজের সমাধি নিজেই তৈরি করেন
শেভাল চেয়েছিলেন তার সমাধি হবে নিজের হাতে তৈরি করা এই অসাধারণ প্যালেইস আইডিয়ালেই। কিন্তু ফ্রান্সের কর্তৃপক্ষ থেকে অনুমোদন পাননি তিনি। তিনি এতে মোটেই দমে যাননি। তাই নিজের জন্য একটি সমাধিমন্দিরই তৈরি করে ফেলেছিলেন সেখানকার স্থানীয় সমাধিক্ষেত্রে, যা তার প্রাসাদ থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দূরেই।
প্রত্যাখ্যাত হয়েও শেভাল থেমে যাননি। তিনি তাঁর চিরস্থায়ী বিশ্রামের জন্য একটি বিকল্প পথ বেছে নেন।তিনি স্থানীয় অটারাইভস (Hauterives) গ্রামের সাধারণ কবরস্থানে একটি জায়গা কেনেন। ১৯১৪ সাল থেকে ১৯২২ সাল পর্যন্ত টানা আট বছর ধরে তিনি তাঁর সেই বিখ্যাত “প্যালেস আইডিয়াল”-এর অনুকরণে একটি সমাধি নির্মাণ করেন। তিনি এই সমাধিটির নাম দিয়েছিলেন ‘দ্য টম্ব অফ সাইলেন্স অ্যান্ড এন্ডলেস রেস্ট’। সমাধি নির্মাণের দুই বছর পর ১৯২৪ সালে ৮৮ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। অবশেষে তাকে তার নিজের তৈরি করা সেই দৃষ্টিনন্দন সমাধিক্ষেত্রেই সমাহিত করা হয়।
আজও পর্যটকরা তাঁর অসাধারণ “প্যালেস আইডিয়াল” দেখার পাশাপাশি অটারাইভস কবরস্থানে তাঁর এই শিল্পমণ্ডিত সমাধিটি দেখতে ভিড় জমান।
দ্য প্যালেইস আইডিয়াল যুগ যুগ ধরে প্রচুর দর্শণার্থীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এমনকি প্রাসাদটির নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার আগেই এর সুনাম চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছিলো এবং ভ্রমণকারীদের অন্যতম আকর্ষণে পরিণত হয়েছিলো।
















