ঢাকার বায়ু, পানি ও মাটির দূষণ হ্রাস করে পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার উদ্দেশ্যে ‘মিয়াওয়াকি’ পদ্ধতিতে নগর বনায়ন কার্যক্রম শুরু করেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। গত ১৮ মে উত্তরার দিয়াবাড়ি এলাকায় ৪ নম্বর সেতুসংলগ্ন ১১ নম্বর লেকপাড়ের পূর্ব পাশে নির্ধারিত সবুজায়ন এলাকায় গাছ রোপণের মাধ্যমে এই প্রকল্পের সূচনা হয়।
নগর সংকট থেকে সবুজ পুনর্গঠনের দিকে
এই উদ্যোগটি কেবল মূলত বৃক্ষরোপণের পাশাপাশি একটি ঘন নগর-বন তৈরির মাধ্যমে শহরের ভেতরে নতুন ইকোলজিক্যাল ল্যান্ডস্কেপ তৈরি করার চেষ্টা। এখানে বায়োফিলিক ডিজাইন, বায়োমিমিক্রি এবং ল্যান্ডস্কেপ-ভিত্তিক স্পেস অভিজ্ঞতা একত্রে কাজ করছে।
বাঁকানো পথ, ভূদৃশ্যের পরিবর্তন এবং লেকপাড়ঘেঁষা হাঁটার ব্যবস্থা একটি “immersive landscape experience” তৈরি করছে, যেখানে জাপানি ধারণা ‘শিনরিন ইয়োকু’ বা বন-স্নান যুক্ত করা হয়েছে।

মিয়াওয়াকি পদ্ধতি: পরিবেশগত অবকাঠামো হিসেবে ঘন বন
মিয়াওয়াকি পদ্ধতি জাপানি উদ্ভিদবিজ্ঞানী আকিরা মিয়াওয়াকির বিকশিত একটি বন পুনর্গঠন কৌশল। এটি “potential natural vegetation (PNV)” অর্থাৎ, সম্ভাব্য প্রাকৃতিক উদ্ভিদবিন্যাস ধারণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এখানে নির্ধারণ করা হয় কোনো অঞ্চলে স্বাভাবিকভাবে কী ধরনের বন গড়ে উঠত।
এই পদ্ধতিতে বনকে একটি বহুস্তরীয় ইকোসিস্টেম হিসেবে গড়ে তোলা হয়। ক্যানোপি, সাব-ক্যানোপি, ঝোপ ও গ্রাউন্ড কভার একসঙ্গে কাজ করে একটি ঘনবনের কাঠামো তৈরি করে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: ইকোলজি থেকে নগর পুনর্গঠন
এই পদ্ধতির ভিত্তি গড়ে ওঠে ২০শ শতকের মাঝামাঝি সময়ে। মিয়াওয়াকি জার্মান উদ্ভিদবিজ্ঞানী রাইনহোল্ড টিউক্সেন -এর PNV ধারণা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে বনকে “dynamic ecological system” হিসেবে দেখেন।
১৯৮০-এর দশক থেকে এই পদ্ধতি জাপানের শিল্পাঞ্চল, শহুরে খালি জমি এবং উপকূলীয় এলাকায় প্রয়োগ করা হয় এবং ধীরে ধীরে এটি বৈশ্বিক নগর বনায়ন কৌশলে পরিণত হয়।

বন গঠন প্রক্রিয়া: একটি ইকোলজিক্যাল ডিজাইন প্রোটোকল
প্রথম ধাপে স্থানীয় সম্ভাব্য প্রাকৃতিক বন (PNV) নির্ধারণ করা হয় এবং দেশীয় প্রজাতি নির্বাচন করা হয়। এরপর মাটি জৈবভাবে সমৃদ্ধ করে প্রস্তুত করা হয়।
পরবর্তী ধাপে বিভিন্ন স্তরের গাছ অত্যন্ত ঘনভাবে রোপণ করা হয়। এই ঘনত্ব প্রাথমিক প্রতিযোগিতা তৈরি করে, যা দ্রুত vertical growth এবং canopy formation ত্বরান্বিত করে।
প্রথম ২–৩ বছরে নিয়মিত পরিচর্যার পর বনটি ধীরে ধীরে স্বয়ংক্রিয়ভাবে টেকসই একটা ইকোলজিক্যাল সিস্টেমে পরিণত হয়।
জাপানের নগর উদাহরণ: ক্ষুদ্র ঘন বন
জাপানে এই পদ্ধতি শিল্পাঞ্চল, স্কুল এবং শহুরে খালি জমিতে ব্যবহার করা হয়েছে। এসব জায়গায় ছোট আকারের কিন্তু ঘন বন তৈরি হয়েছে, যা দ্রুত সবুজ কাঠামো ও জীববৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনে।

শিনরিন ইয়োকু: সংবেদনশীল ল্যান্ডস্কেপ অভিজ্ঞতা
‘শিনরিন ইয়োকু’ বা বন-স্নান হলো প্রকৃতির মধ্যে ধীরে হাঁটা এবং ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে পরিবেশকে অনুভব করার একটি জাপানি ধারণা।
এটি মানসিক চাপ কমানো এবং মনস্তাত্ত্বিক পুনরুদ্ধারে সহায়ক হিসেবে গবেষণায় উল্লেখ পাওয়া যায়।
ডিএনসিসির এই প্রকল্পে বাঁকানো পথ, টিলা এবং লেকপাড়ঘেঁষা হাঁটার মাধ্যমে এই অভিজ্ঞতাকে নগর কাঠামোর মধ্যে আনা হয়েছে।
ঢাকার প্রেক্ষাপট: ঘন শহরের জন্য ঘন বন কৌশল
ঢাকা একটি অত্যন্ত ঘন নগর, যেখানে সবুজ জায়গা সীমিত। এই প্রেক্ষাপটে মিয়াওয়াকি পদ্ধতি স্বল্প জায়গায় ঘন বন তৈরি করার একটি কার্যকর কৌশল হিসেবে কাজ করতে পারে।
তবে এর সফলতা নির্ভর করে সঠিক প্রজাতি নির্বাচন, মাটির গুণমান এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণের ওপর।

মিয়াওয়াকি পদ্ধতি ঢাকার প্রেক্ষাপটে কেবল একটি বনায়ন কৌশল নয়, এটি শহরকে একটি জীবন্ত ইকোসিস্টেম হিসেবে পুনর্গঠনের একটি দৃষ্টিভঙ্গি। এই প্রকল্প যদি দীর্ঘমেয়াদে সঠিকভাবে পরিচালিত হয়, তবে এটি ঢাকার ভেতরে বিচ্ছিন্ন সবুজ জায়গাগুলোকে একটি ঘন, কার্যকর এবং সংযুক্ত নগর বন নেটওয়ার্কে রূপান্তর করতে পারে।
তথ্যসূত্র
JSTOR Daily, Earthwatch Europe, Bio4Climate।
















