ঘরের পরিবেশ, প্রতিবেশ আর সাজসজ্জা আমাদের নানাভাবেই প্রভাবিত করে। কিভাবে সাজাবেন ঘর, কেমন হওয়া উচিত গৃহসজ্জার সামগ্রী, আপনি জানেন কি?
প্রতি বসন্তেই অনুষ্ঠিত হয় ইতালির মিলান শহরে বসে ডিজাইন উইক। সহজ বাংলায় বলতে গেলে এটি হলো ফার্নিচারের মেলা। সপ্তাহব্যাপী এ মেলা বিশেষ করে আসবাবপত্র ও অন্দরসজ্জার নির্মাতা থেকে শুরু করে ব্যবহারকারী পর্যন্ত সবার কাছে জনপ্রিয়।
বিশ্বের নানা দেশ থেকে সৃজনশীল মানুষদের সম্মেলন ঘটে এ মেলায়। ফার্নিচারের সব নতুন নতুন ডিজাইন এবং পরবর্তী বছরের ট্রেন্ডিং ডিজাইনের সব ফার্নিচার এখানকার প্রদর্শনীতে পরিবেশন করা হয়।
১৯৬১ সাল থেকে শুরু হয়ে বিংশ শতাব্দীতেও এ মেলার চাহিদা ও লোকসমাগম একটুও কমেনি। নামিদামি প্রাসাদ ও স্টাইলিশ শোরুম থেকে শুরু করে ভিলা, অ্যাপার্টমেন্টসহ সবখানে এ মেলার ফার্নিচার শোভা বর্ধন করে।
এ মেলার নতুন বিশেষ ৮টি ফার্নিচার বন্ধনের পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলো।

কাঁটাযুক্ত ফুলদানি
বর্তমানে ডিজাইন জগতে যে ট্রেন্ডটি সবচেয়ে বেশি প্রচলিত হয়েছে তা হলো কাঁটাযুক্ত এই ফুলদানি। বসার ঘর, ডাইনিংয়ে এ ফুলদানি দারুণ মানানসই। এটিতে রয়েছে চকচকে বড় আকারের কাঁটা। কাঁটাগুলো এটিকে একাধারে একটি রুক্ষভাব এবং মনোরম এবড়োখেবড়ো একটি রূপ দিয়েছে।
কাঁটার কথা বলতে গেলে, মেগালিথ ডিজাইন প্রদর্শনী অ্যালকোভা-তে ফ্যাশন ব্র্যান্ড ‘আস্লান ওয়ার্ল্ড’-এর প্রতিষ্ঠাতা সিজে আস্লান একটি চেয়ার ও অটোম্যান উপস্থাপন করেছেন যা ধারালো স্টেইনলেস স্টিলের কাঁটায় আবৃত। এর মাঝে মাঝে খেলাচ্ছলে রত্নপাথর বসানো হয়েছে। এ ধারণা থেকেই এই ফুলদানির ডিজাইন করা হয়েছে।

সাই-ফাই বিছানা
নান্দনিক এই বিছানাটি অ্যাথেন্স-ভিত্তিক ডিজাইন স্টুডিও ‘অ্যাস্ট্রোনটস’-এর উদ্ভাবন। এর নাম ড্যানি ড্যাসাইরা এবং জো ব্র্যাডফোর্ড। তাতে এক ধরণের সাই-ফাই, ভাস্কর্যসুলভ চঞ্চলতা রয়েছে যা পাঙ্কি, ওয়াইটু-কে (Y2K) স্টাইলের প্রতি জেন জি প্রজন্মের মোহগ্রস্ততার সাথে মিল রেখে ডিজাইন করা হয়েছে।
এই বেডের ডিজাইন এমন একটি শিল্প প্রক্রিয়ায় হয়েছে যেখানে হাইড্রোলিক ফ্লুইড ব্যবহার করে নমনীয় ধাতুকে নতুন আকার দেওয়া হয়েছে। মিলানের নিলুফার গ্যালারিতে “লা কাসা ম্যাজিকা” (“দ্য ম্যাজিক হাউস”) প্রদর্শনীর অংশ হিসেবে এই বিছানাটি উপস্থাপন করা হয়েছিলো।

চেয়ারের ভেতরে চেয়ার
আহা, যদি চেয়ারের মতো করে ধরে রাখা যেতো। স্লোভেনীয় ডিজাইনার লারা বোহিঙ্কের এই আনন্দদায়ক ও বিভ্রান্তিকর ডিজাইন সত্যিই এক দারুণ ইল্যুশন। তার সৃষ্টিতে রয়েছে একটি চকচকে অ্যালুমিনিয়ামের চেয়ার। এই চেয়ারটির বসানো হয়েছে অপর একটি চেয়ারের উপর। নিচের চেয়ারটি একটি হেলানো মেহগনি কাঠের উপর বসানো।
পরস্পর সংযুক্ত চকচকে, গোলাকার আকৃতির এই বাঁকা ডিজাইন দেখে প্রায় মনে হয় যেন কোনো (মার্জিত ও ডিজাইন-সচেতন) ভাঁড় বেলুন দিয়ে বানানো একটি বিকৃত পশু তৈরি হয়েছে। এই পশুরূপী অনুভূতিটি কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়, কারণ বোহিঙ্কের এই চেয়ারটি স্লোভেনিয়ার আলকোভাতে সেন্টার ফর ক্রিয়েটিভিটি আয়োজিত “হাউস অফ ক্রিয়েচারস” প্রদর্শনীর অংশ হিসেবে আবিষ্কৃত হয়েছিল।

রাবার শিটের টেবিল
অভ্যন্তরীণ সজ্জা এখন এক অন্য মাত্রা পেয়েছে। মন্ট্রিয়ল-ভিত্তিক উদীয়মান ডিজাইন স্টুডিও ‘আতেলিয়ে ফোমেন্তা’ তাদের টেবিলের সর্বশেষ সিরিজটি তৈরি করতে কালো রাবারের সাহায্য নিয়েছে।
স্টুডিওটি রাবারের শিট ব্যবহার করে, যা আরভেলোর মতে চামড়ার সাথে অনেক গুণাবলীর মিল রাখে। নিউইয়র্ক-ভিত্তিক ডিজাইন প্ল্যাটফর্ম প্লেইংহাউসের উপস্থাপিত ‘তেত-আ-তেত’ প্রদর্শনীতে প্রদর্শিত প্রতিটি রাবারের টেবিলে রয়েছে বাঁধা টিউবের একটি ঢেউখেলানো ভিত্তি, যার উপরে একটি ঝোলানো শিট থাকে।

আর্মচেয়ার
গয়না ও গৃহসজ্জার ব্র্যান্ড কমপ্লিটেডওয়ার্কস সাধারণত গতানুগতিক ধারার বাইরে কাজ করে। এবারের মেলায় তাদের উপস্থাপিত একটি আর্মচেয়ার নজর কেড়েছে সবার।
ডিজাইন প্রদর্শনী ‘কনভে’-তে প্রদর্শিত তাদের ‘ব্লু আর্মচেয়ার’টি বেশ চৌকো ও দৃঢ়, এবং এতে রয়েছে অমসৃণ ও শিল্পসম্মত নকশা। কিন্তু এটি নিজস্ব ভঙ্গিতে বেশ পরিশীলিতও বটে। এটি হালকা নীল রঙে রাঙানো এবং ভাস্কর্যধর্মী ‘আর্ট’ ফার্নিচারের বর্তমান ধারার এক নিখুঁত প্রকাশ।

রহস্যময় ক্যান্ডেলব্রা
অ্যালকোভাতে প্রদর্শিত স্টুডিও লুগোর ক্যান্ডেলব্রাটির মধ্যে কিছুটা আনুষ্ঠানিক বা জাদুকরী ব্যাপার রয়েছে। এটি থেকে অন্দরসজ্জার জগতে মোমবাতির উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়ে। কারণ অনেকেই মোমবাতির নরম আভা এবং আরও প্রাকৃতিক অনুভূতির জন্য বেশ আকুল থাকে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সাশ্রয়ী মূল্যে সজ্জা প্রকাশের জন্য মোমবাতিদানিগুলো অনেক জনপ্রিয়।
ইস্তাম্বুল-ভিত্তিক এই স্টুডিওর প্রতিষ্ঠাতা দোরুক কুবিলয়। তুরস্কের এই শহরের দীর্ঘদিনের কারুশিল্প ও নির্মাণ সংস্কৃতি থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই তিনি এ ডিজাইন করেন। আলপাকা ধাতু (যা নিকেল সিলভার নামেও পরিচিত) দিয়ে তৈরি এই ক্যান্ডেলব্রাটিতে ঝালাই এবং তাপ প্রক্রিয়াকরণের দৃশ্যমান চিহ্ন রয়েছে।
একটি বিশাল হলওয়েতে বা ফায়ারপ্লেসের পরিবর্তে—গোধূলির সময় বা অন্য সময়ে—এটি ব্যবহারের জন্য উপযুক্ত।

আলোর বুনন
অ্যান্টওয়ার্প-ভিত্তিক নেলি বেলেগার্ডের (যিনি নাপালোসা নামে পরিচিত) রঙিন, তুলতুলে বাতিগুলোকে দেখতে মজাদার ছোট কার্টুনের মতো মনে হয়। অন্ধকারে ঘরের কোণাকে আলোকিত করতে বা ঘরে একটি খেলার আমেজ যোগ করতে এটি দারুণ কার্যকরী।
বেলেগার্ড একজন নিটওয়্যার ডিজাইনার, কিন্তু এখানে তিনি কৃত্রিম পশমের সুতা ব্যবহার করে নিজের কাজের পরিবেশকে আরও আনন্দদায়ক করতে এই ল্যাম্পটি তৈরি করেন। আলোর বুনন প্রকাশ করতেই তিনি এমন একটি ডিজাইন করেছেন যা কল্পনা শক্তিকে জাগিয়ে তুলতে পারে।

রুটির তৈরি টেবিল ল্যাম্প
মেলায় এমন একটি বাতি রয়েছে যা সত্যিই ভাবনার খোরাক জোগায়। ফরাসি ডিজাইন সংস্থা স্টুডিও কোপেইন সাওয়ারডো ব্যবহার করে নানা ধরনের বস্তু ও সজ্জাসামগ্রী তৈরি করে। এই ল্যাম্পটিও তারা সেভাবেই তৈরি করে যেভাবে অন্য নির্মাতারা মাটি বা কাঠ ব্যবহার করে অসবাব ও গৃহসজ্জার সামগ্রী তৈরি করেন।
এই সংগ্রহটি ডিজাইন একাডেমি আইনডহোভেনের একটি ইনস্টলেশনে অ্যালকোভাতে প্রদর্শিত হচ্ছে। প্রদশনীতে রয়েছে সেঁকা রুটি দিয়ে তৈরি আসবাবপত্র, বাতি এবং গৃহসজ্জার সামগ্রী। স্টুডিও কোপেইন “pâte morte” (মৃত খামির) ব্যবহার করেছেন।
খাটো এবং মোটা টেবিল ল্যাম্পটি এতই সুন্দর যেন মনে হয় এটি খাওয়ার যোগ্য।
এরকম আরও অনেক নান্দনিক গৃহসজ্জার সামগ্রী প্রদর্শন করা হয়েছে এই মেলায়। উল্লেখিত ডিজাইনগুলো অবশ্যই ব্যতিক্রম ও আধুনিক। ঘর সাজাতে এরকম বাহারী ডিজাইনের আসবাব ও অন্যান্য সামগ্রী আপনার ঘরকে নিস:ন্দেহে স্বপ্নময় করে তুলবে।
















