Image

স্থপতি নিশাতের ঘরে মা দিবসের এক দুপুর

মা দিবস উপলক্ষে কি ধরনের লেখা দিব তা নিয়ে বেশ চিন্তাই ছিলাম। সাথে সাথে মনে হলো, দুই প্রজন্মের দুইজন স্থপতির সন্ধান পেলে মন্দ হতো না। স্থাপত্যবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা করেছি এশিয়া প্যাসিফিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলাম স্থপতি মুহতাদিন ইকবালের মতো একজন মানুষকে, যিনি সবসময় তার চিরাচরিত শান্ত স্বভাবে শিক্ষার্থীদের পাশে থাকতেন। স্যারের মা-ও একজন স্থপতি—এমন কথা আগে শুনেছিলাম। যদি ব্যাপারটা সত্যি হয়, তাহলে এ দুজনকে নিয়েই হবে আমার মা দিবসের গল্প। 

যেই ভাবা, সেই কাজ। স্যার তখন সম্ভবত দেশের বাইরে, উচ্চশিক্ষার জন্য। তবুও একটা টেক্সট পাঠিয়ে রাখলাম। উনি পরক্ষণেই রিপ্লাই করলেন। কথায় কথায় নিশ্চিত হলাম, উনার মা সত্যিই একজন স্থপতি। তিনি বুয়েট থেকে পড়েছেন এবং স্থাপত্য অধিদপ্তর থেকে উপপ্রধান স্থপতি হিসেবে অবসর নিয়েছেন। আমি ভেবেছিলাম, স্যারের কাছ থেকেই গল্প শুনে স্টোরিটা লিখে ফেলব। হাতে একেবারেই সময় নেই। কিন্তু স্যার বললেন, আমি যেন উনার মায়ের কাছে যাই, কথা বলি উনার সাথে। বছরখানেক হলো স্যারের বাবা মারা গেছেন।

স্বামীর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীর স্মরণসভার চেয়ারগুলো তখনো লিভিং রুমে ছড়িয়ে ছিল, ছবি: লেখক

তার এই কথাটা বলার ভেতরেই একধরনের দায়িত্ববোধ টের পেলাম। মনে হলো, দূরে থেকেও একজন ছেলে তার মায়ের নিঃসঙ্গতা নিয়ে ভাবছে। সেখান থেকেই যেন আমার মা দিবসের স্টোরিটা আপনাআপনি লেখা শুরু করে দিল। 

রোববার মা দিবস। আমি শনিবার সকাল এগারোটার মধ্যেই স্যারের মায়ের বাসার নিচে হাজির। নিচ থেকে দারোয়ান ফোনে আমার নাম জানালে তিনি সম্মতি দিলেন। বুঝতে পারলাম, আমার জন্যই অপেক্ষা করছিলেন। হাতে একগুচ্ছ রজনীগন্ধা।

একগুচ্ছ রজনীগন্ধা হাতে উপস্থিত হয়েছিলাম। আলাপ শেষে তিনি এলেন—শুধু কয়েকটি ছবির জন্য, বাঙালিয়ানা সাজে

লিফট থেকে নেমেই দেখি, খুব সাধারণ ঘরোয়া পোশাকে একজন ভদ্রমহিলা দাঁড়িয়ে আছেন। ইনি স্যারের মা হবেন কিনা ভাবতেই তার মুখের দিকে নজর পড়ল। এই মুখটাই যেন স্যারের মুখে কেটে বসানো। এক প্রজন্মের মুখের রেখা আরেক প্রজন্মে কী নিখুঁতভাবে থেকে যায়! আমি অজান্তেই হেসে ফেললাম। আমার হাসি দেখে তিনিও হাসলেন।

— “ইকবালের স্টুডেন্ট তুমি?”
— “জি। আপনার জন্য কিছু ফুল এনেছিলাম।”

বেশ খুশি হয়ে ফুলগুলো রেখে আমাকে ধরে নিয়ে বসলেন নিজের বেডরুমে। ড্রয়িংরুম আর লিভিংরুম জুড়ে এখনো অনেক মানুষের বসার চেয়ার পড়ে আছে। গতকালই ছিল স্যারের বাবার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। ডেকোরেটরের লোকজন চেয়ারগুলো সরিয়ে নিচ্ছে। তাই আলাপটা বেডরুমেই করতে হচ্ছে। 

নিজের বেডরুমের পছন্দের এই কর্নারে তিনি ছবি তুললেন। উপরের আর্টপিসগুলো যেন ছবিতে আসে—এভাবে তিনি নির্দেশনা দিয়েছিলেন

এক বছর হলো নিজের সবচেয়ে কাছের মানুষটিকে হারিয়েছেন। সন্তানেরা কাজের সুবাদে সবসময় পাশে থাকতে পারবে না—এটাই স্বাভাবিক। এর মাঝেও আত্মীয়স্বজনেরা ফোন করে গতকালের আয়োজনের খোঁজখবর নিচ্ছেন। বাসায় থাকেন তিনি আর একজন কেয়ার গিভার। নতুন এই জীবনে ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে উঠছেন। 

আমার ছকবাঁধা কোনো প্রশ্ন ছিল না। গল্পই করব, এটাই ছিল ইচ্ছে। রেকর্ডারটা চালিয়ে কেবল আলাপ শুরু করলাম। 

স্যারের মায়ের নাম, স্থপতি নিশাত আরা খন্দকার। তিনি রংপুরে ক্লাস সিক্স পর্যন্ত পড়েছেন। বাবা সেখানে কলেজে রসায়নের শিক্ষক ছিলেন। প্রেসিডেন্সি কলেজে ড. মুহম্মদ কুদরাত-এ-খুদা’র প্রিয় ছাত্র ছিলেন তার বাবা। তিনিই তাকে ডেকে নেন সায়েন্স ল্যাবরেটরিতে। সেখানে বাচ্চাদের ও বড়দের জন্য বিজ্ঞান বিষয়ক লেখালিখি এবং সম্পাদনার এক বিশাল দায়িত্ব পান তিনি। অবসরের পরে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত থামেনি সেই লেখালিখি। 

ছবি তোলার সময় যতবারই হাসতে বলেছি, তিনি যেন বাধ্য মেয়ের মতোই হাসলেন।

তিন ভাইবোনের মাঝে নিশাত ছিলেন সবার বড়। তার দুই কাজিনকে তিনি স্থাপত্যবিদ্যায় পড়তে দেখেন, যারা তাকে প্রধান উৎসাহ জুগিয়েছিল। বাবার সাথে যুক্তি দিয়ে স্থাপত্যবিদ্যায় ভর্তি হন তিনি। ইডেন মহিলা কলেজ-এ আর্টস নিয়ে পড়ার ফলে বেশ চিন্তায় ছিলেন, শেষ পর্যন্ত স্থাপত্যবিদ্যায় ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাবেন কিনা। কিন্তু আর্টস হলেও গণিত ছিল বলেই কোনো সমস্যা হয়নি। সালটা ১৯৭৩। মুক্তিযুদ্ধের কিছুদিন পরের বাংলাদেশ। তখনও নারী শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা হয়নি। ঠিকই চান্স পেলেন স্থাপত্য বিভাগে।

“আমাদের ব্যাচে ছয়জন মেয়ে ছিল,” বললেন তিনি। “পরে একজন লিউকেমিয়ায় মারা গেলে পাঁচজন থাকি।”

বুয়েটের সমাবর্তনের দিনে বান্ধবীদের সাথে কাটানো এক আনন্দময় মুহূর্ত।

শিক্ষাজীবনটা সাবলীলভাবেই কেটেছে। শাড়ি পরে নিয়মিত ক্লাস করতেন। রাতে ক্যাম্পাসে থেকে কাজ করার সুযোগ ছিল না। কিন্তু লম্বা সময় ধরে স্টুডিওতে কাজ করেছেন। শিক্ষক হিসেবে পেয়েছেন সামসুল ওয়ারেস-কে। তার সন্তান ইকবালও পরে একই শিক্ষককে পেয়েছেন। এশিয়া প্যাসিফিকে পড়ার সময় আমিও পেয়েছি।

আজও ওয়ারেস স্যার তার শিক্ষার্থীদের মনে গভীর ছাপ রেখে চলেছেন। স্থপতি নিশাত জানালেন, খুব ভয় পেতেন তাকে। সহজেই ঘাবড়ে যেতেন। জুরিতে দাঁড়ালে গলার স্বর পর্যন্ত শোনা যেত না। তবে বন্ধুরা খুব উৎসাহ দিত। তখন কম্পিউটার বা সফটওয়্যারের যুগ ছিল না। হাতে ড্রয়িং করতে হতো। ট্রেসিং পেপার, বাটার পেপার, প্যারালাল বার—এসব নিয়েই ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ। কাজের চাপে সকালে মা নিজ হাতে খাইয়ে দিতেন, যাতে মেয়ের পেটে অন্তত কিছু খাবার যায়। 

বিয়ের সাজে স্থপতি নিশাত আরা খন্দকার

থার্ড ইয়ারে থাকতে বিয়ে হয় তার। স্বামী জাফর ইকবাল বুয়েট থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে ফিলিপ্স কোম্পানীতে সম্মানজনক পদে কাজ করছিলেন তখন। রাজারবাগের শ্বশুরবাড়ি থেকে শুরু হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া-আসা। স্বামীর মোটরসাইকেলের পেছনে বসে হাতে লম্বা ড্রয়িং ইন্সট্রুমেন্ট নিয়ে নিয়মিত বুয়েটে যেতেন। যৌথ পরিবারে খুব আনন্দের সাথে সময় কেটেছে তার। বউমার কাছে আলাদা প্রত্যাশা দূরে থাক, এখানেও তার পড়াশোনার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতেন সকলে। বরং সামাজিক নানা অনুষ্ঠানে কাজের চাপে নিশাত নিজেই উপস্থিত থাকতে পারতেন না।

“এখনো মাঝে মাঝে স্বপ্নে ঐ বাসা দেখি,” বললেন তিনি।

বলতে বলতে তার চোখেমুখে হালকা আলো ফুটে উঠল। মনে হলো, মানুষ বোধহয় বয়স বাড়লে শেষ পর্যন্ত সেই জায়গাগুলোতেই ফিরে যায়, যেখানে সে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসা পেয়েছিল।

প্রকৌশলী জাফর ইকবালের সাথে স্থপতি নিশাত আরা খন্দকার।

বুয়েটে পড়াশোনা শেষ হতেই স্থাপত্য অধিদপ্তরে তাদের পুরো ব্যাচের চাকরি হয়ে যায়। তখন দেশে স্থপতির সংখ্যা কম থাকায় এমন ব্যবস্থা হয়েছিল। ১৯৮০ সালে সবাই সহকারী স্থপতি হিসেবে যোগ দেন। শুরু হয় নতুন চাকরিজীবন।

১৯৮২ সালে জন্ম হয় স্থপতি নিশাতের প্রথম সন্তান মুহতাদিন ইকবাল-এর। এরপর ১৯৮৬ সালে দ্বিতীয় সন্তান মুহতাশিম ইকবাল-এর জন্ম। এই দুই সন্তান আর স্বামীকে কেন্দ্র করে তার পারিবারিক জীবন গড়াতে থাকে। সন্তানদের যত্নে অকৃত্রিম ভালোবাসা নিয়ে পাশে ছিলেন নিশাতের মা। তিনি এখনো জীবিত, যদিও ডিমেনশিয়ায় স্মৃতিশক্তি ক্ষয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে।

মা ও দুই সন্তানের সাথে স্থপতি নিশাত আরা খন্দকার।

চাকরিক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত তার দায়িত্বে ছিল ৩২টি মন্ত্রণালয়ের কাজ। নানান প্রজেক্ট সুপারভাইজ করা, ক্লায়েন্ট মিটিং, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া—এসব জায়গায় ছিল তার পারদর্শিতা। এজন্য কম্পিউটারে ড্রয়িং এর যুগ শুরু হয়ে গেলেও তার মেধার কাছেই নত থেকেছে প্রযুক্তি। সংসদ ভবন এলাকার বিভিন্ন স্থাপনার বাস্তবায়ন, গণভবন, বঙ্গভবনসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের সাথে যুক্ত ছিলেন তিনি। এছাড়াও দেশের বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে কাজ করেছেন। প্রয়োজনে ঢাকার বাইরেও সাইট ভিজিট করেছেন।

প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণে সাইট ভিজিটে স্থপতি।

১৯৮০ থেকে ২০১০—ত্রিশ বছরের দীর্ঘ চাকরিজীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে হয়তো আরও অনেক গল্প বলা যেত। কিন্তু কোভিডের পর থেকে স্মৃতিশক্তি কমে এসেছে বলে জানালেন।

স্বামীর মৃত্যুর ট্রমা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেননি। সম্প্রতি ডায়াবেটিসও ধরা পড়েছে। এই জায়গাটায় এসে আমি আসলে একটু বিপদে পড়ে যাই। সান্ত্বনা দিতে পারি না। কেমন যেন কুঁকড়ে থাকি। অথচ তিনি ভেঙে পড়ার মতো কথা বললেও নিজে ভেঙে পড়ছেন না। বরং নিজের ভেতরে একটা দৃঢ়তা ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। সেটা দেখেই উল্টো আমি অনুপ্রাণিত হচ্ছিলাম।

কয়েকটা প্রশ্নের পর তাই আর তার স্মৃতির উপর জোর করতে চাইনি। যদিও উনার গল্প করতে খুব ভালো লাগছিল।

সংসদ ভবনের সাউথ প্লাজায় সহকর্মীদের সাথে।

ইকবাল স্যারের কেন স্থপতি হতে ইচ্ছে করল জানতে চাইলে মা নিশাত বললেন, ছোটবেলা থেকেই মাকে কাজ করতে দেখে সৃষ্টিশীল এই মাধ্যমের প্রতি তার আগ্রহ জন্মায়। উচ্চমাধ্যমিকের পর মাকে নিজের ইচ্ছের কথা জানান। নিশাতও বিষয়টা খুব উপভোগ করেছিলেন। দুজনে মিলে একসময় নিজেদের অফিস দেবেন—এমন স্বপ্নও ছিল। কিন্তু সরকারি চাকরির ব্যস্ততায় সেটা আর হয়ে ওঠেনি।

ইকবাল স্যারকে নিয়ে মজা করে বললেন, “ডিজাইনে খুব ভালো ছিল, কিন্তু থিওরি পড়তে চাইত না। ভাবত ডিজাইনার হবে, শিক্ষক না।”

আজ সেই ইকবালই শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে নিয়ে দেশের বাইরে উচ্চশিক্ষা নিচ্ছেন। কথাটা বলতে বলতে নিশাত হেসে বললেন,
“ইকবাল আসলে বুঝতেই পারেনি, ও কী চায়।”

২০১০ সালে অবসরের পর শিক্ষকতা করতে ইচ্ছে হয়নি? প্রশ্ন শুনে একটু হেসে বললেন,

“আমি খুব সহজে ঘাবড়ে যেতাম। সাহস পাইনি। কিন্তু ইকবাল ওর স্টুডেন্টদের নিয়ে এই বাসায় এসে ক্লাস করেছে। ওদের জন্য খাবার নিয়ে এসেছে। ওর বাবা এটা খুব পছন্দ করত। ছেলেমেয়েদের প্রতি ইকবালের এই দায়িত্ববোধকে ওর বাবা খুব মূল্যায়ন করত। শিক্ষক হওয়ার ইচ্ছেটা আমার ইকবালের মধ্য দিয়েই পূর্ণতা পেয়েছে।”

নিজ বেডরুমে বসে যত্নের সাথে ছবিগুলো দেখার এক নীরব মুহূর্ত।

ইকবাল স্যারের স্ত্রী স্থপতি নাজলী হোসেন-এর কথাও বললেন তিনি। উনার গ্রিন বিল্ডিং নিয়ে কাজগুলোর জন্য বেশ গর্ববোধ করেন বুঝতে পারলাম। 

এর মাঝে কয়েকবার ছোট ছেলের ফোন এলো। প্রতিবারই ‘হ্যালো’র বদলে তিনি বলছেন, “বাবা…”

এই একটিমাত্র ডাকের মধ্যেই কত স্নেহ জমে থাকতে পারে! ওপাশ থেকেও ছেলের ভালোবাসা টের পাওয়া যায়। আমি মিটিমিটি হাসলাম। নিজের মায়ের কথা মনে পড়ে গেল।

আলাপ শেষে অ্যালবাম থেকে ছবি দেখাতে দেখাতে জানালেন, তিনি গানও করেন। বিশেষ করে রবীন্দ্রসঙ্গীত। আবার ছায়ানটে যাওয়া শুরু করেছেন। পরিবারের সবাই খুব উৎসাহ দিচ্ছে। এখন বাইরে খুব একটা বের হওয়া হয় না। তবুও আমার জন্য শাড়ি পরে এলেন। নিজেই বলে দিচ্ছিলেন কোন ফ্রেমে ছবি তুললে ভালো দেখাবে।     

শিশু মুহতাদিন ইকবালের সাথে মা, স্থপতি নিশাত আরা খন্দকার

এর মাঝে ইকবাল স্যারের সাথেও ফোনে একটু কথা হয়। স্থাপত্যবিদ্যায় মা তাকে কীভাবে প্রভাবিত করেছেন, সেটা জানতে চেয়েছিলাম।

তিনি বললেন, “শুধু স্থাপত্য কেন, আসলে মায়ের প্রভাব পুরো জীবনদর্শনের উপরই থাকে। ছোটবেলায় অনেকবার আম্মার অফিসে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। বড় বড় ড্রয়িং পেপার, অদ্ভুত ধরনের কলম-পেন্সিল, মডেল—এসব আমাকে খুব টানত। তাই পরবর্তীতে স্থাপত্যবিদ্যায় পড়ার আগ্রহটা স্বতঃস্ফূর্তভাবেই চলে আসে।”

তিনি আরও বললেন, যখন আর্কিটেকচার পড়তে শুরু করেন তখন আরো ভালো করে বুঝতে পারলেন স্থপতি নিশাত কতটা দায়িত্বশীল ছিলেন তার কাজের প্রতি। আর্কিটেকচার কমিউনিটি উনাকে কীভাবে দেখেন সেটা আরও ভালো করে জানতে পারেন। উনার সংবেদনশীলতা ও দায়িত্বশীল আচরণে উনাকে সবাই শ্রদ্ধার চোখে দেখেন। এই বিষয়টার জন্য সন্তান হিসেবে নিজের গর্বের কথাও জানালেন। 

নিজের বাসায় গানের আসরে শিশুপুত্র এবং মায়ের সাথে ।

স্যার বলেই চলেছেন, ‘‘পড়াশোনা চলাকালীন ডিজাইন সংক্রান্ত বিষয়ে অবশ্য আম্মার সাথে বেশি আলাপ হতো না। দু’জন দুই সময়ের মানুষ, দুইভাবে ভাবতে পারেন এই ভাবনার প্রতি আমাদের একে অপরের শ্রদ্ধা ছিল। এরপর পেশাগত পর্যায়েও তার অনেক সহযোগিতা পাই আমি। আমি নিজে যখন উনাকে স্থাপত্য সংক্রান্ত নানা অনুষ্ঠানে দেখতাম তখন বুঝতে পারি বাড়িতে আম্মার যে ইমেজ এবং পেশাগত জায়গায় যে ইমেজ সেটার মাঝে বেশ পার্থক্য আছে। তাই একজন দায়িত্বশীল স্থপতি হিসেবে নিজেকে কি করে গড়ে তুলতে হয়, এবং সমাজে কীভাবে মর্যাদাপূর্ণভাবে নিজেকে উপস্থাপন করতে হয় এটা আমি উনার কাছ থেকেই শিখেছি। এজন্য উনার প্রতি আমি চিরকৃতজ্ঞ’’।         

সানজিদা খাতুনের সঙ্গে গান গাইছেন স্থপতি নিশাত আরা খন্দকার

স্থাপত্যে মা-ছেলের এই দুই প্রজন্মের মাঝে শুধু পেশাগত উত্তরাধিকার নেই; আছে মমতা, সততা, দায়িত্ববোধ আর এক অদৃশ্য পরম্পরা। দুজনের মাঝেই আছে নম্রতা আর মনের কথা সহজভাবে বলে ফেলার এক বিরল ক্ষমতা।

বার্ধক্যের বাস্তবতায় মাকে নতুনভাবে আবিষ্কার করে সন্তান। আবার সন্তানের ভেতর দিয়েও মা নিজের অপূর্ণ ইচ্ছেগুলোর পূর্ণতা খুঁজে পান। একে অন্যকে আবিষ্কারের এই গল্পের কোনো শেষ নেই।

মা যদি কোনোদিন নির্ভরশীলও হয়ে পড়েন, সন্তানের ভেতর থেকে তার উপর নির্ভরশীলতাটা বোধহয় আর কখনো যায় না। এই যুক্তিহীন, অহেতুক ভালোবাসার সম্পর্কের আর কোনো নাম হয় না।

এক ডাকেই তাই শান্তি—’‘মা’’।

তবে কথার শেষে নিশাত দুইবার বললেন, “দোয়া করো, ছেলেরা যেন ওদের বাবার মতো মানুষ হয়। খুব ভদ্র, সৎ আর অমায়িক মানুষ ছিলেন উনি।”

স্থপতি তার নিজের ফোনের গ্যালারি থেকে সেরা দুটি ছবি বেছে দিলেন

বাসা থেকে নেমে কিছুদূর যেতেই হঠাৎ খেয়াল হলো, চশমাটা ফেলে এসেছি। ঠিক তখনই ফোন এল।

“তোমার চশমাটা এখানে রয়ে গেছে।”

আমি বললাম, “দুদিন পর এসে নিয়ে যাব। লেখাটাও দেখাব তখন।”

খুশি হলেন কিনা বুঝলাম না। তবে এটুকু বুঝলাম, আমার ফোনের অপেক্ষায় থাকবেন তিনি।

হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ মনে হলো—আমার অবচেতন মন হয়তো ইচ্ছে করেই চশমাটা ফেলে এসেছে।

Related Posts

লস অ্যাঞ্জেলেসে লেহরার আর্কিটেক্টসের বর্ণিল সাপোর্টিভ হাউজিং

মার্কিন স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান লেহরার আর্কিটেক্টস সম্প্রতি সম্পন্ন করেছে লোমা ভের্দে নামের একটি সাপোর্টিভ হাউজিং প্রকল্প, যা লস অ্যাঞ্জেলেসের…

বাঁশের পদ্ম: প্রকৃতি ও স্থাপত্যের অসাধারণ মেলবন্ধ

ইন্দোনেশিয়ার বালি দ্বীপের স্থাপত্যে প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক কখনোই কেবল দৃশ্যগত সৌন্দর্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং প্রকৃতি, জলবায়ু, স্থানীয়…

ইন্দোনেশিয়ার বাড়িতে সবুজ ছাদে পরিবার থাকবে একসূত্রে

ইন্দোনেশিয়ার তাঙ্গেরাংয়ের একটি কোণাকৃতির প্লটে দাঁড়িয়ে থাকা স্প্লিট ম্যাস রেসিডেন্স নামের বাড়িটি একটি পরিবারকে পারস্পরিক সংযুক্ত রাখার জন্য…

ইস্তানবুল মডার্ন: মাছের আঁশের মতো চকচকে এক জাদুঘর

ইতালীয় স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান রেনজো পিয়ানো বিল্ডিং ওয়ার্কশপ সম্প্রতি তুরস্কে তাদের প্রথম প্রকল্প সম্পন্ন করেছে। ইস্তানবুল মডার্ন নামের একটি…

01~1
previous arrow
next arrow

Bandhan Cover

সর্বশেষ

Trending Posts

Gallery

একরঙা শহর: স্থাপত্য থেকে রঙের হারিয়ে যাওয়া
লস অ্যাঞ্জেলেসে লেহরার আর্কিটেক্টসের বর্ণিল সাপোর্টিভ হাউজিং
Lotus
ইন্দোনেশিয়ার বাড়িতে সবুজ ছাদে পরিবার থাকবে একসূত্রে
ইস্তানবুল মডার্ন: মাছের আঁশের মতো চকচকে এক জাদুঘর
চীন ও নেপালের সাম্প্রতিক বন্যা এবং আমাদের যা করণীয়
within the earth
ব্রিক ইন আর্কিটেকচার অ্যাওয়ার্ডস ২০২৬-এর জন্য আবেদন শুরু হয়েছে
water tower