আধুনিক স্থাপত্যে মনুমেন্টালিজমের প্রবাদপুরুষ — লুই কান
১২৫তম জন্মদিনে শ্রদ্ধার্ঘ্য

স্থাপত্যে মনুমেন্টালিজম বলতে বোঝায় এমন এক ডিজাইন-দর্শন, যেখানে ভবনের আকার, অনুপাত, উপকরণ ও স্থানিক বিন্যাসের মাধ্যমে মহিমা, গাম্ভীর্য এবং চিরস্থায়িত্বতার আত্মপ্রকাশ ঘটানো হয়। মূলত আধ্যাত্মিক গাম্ভীর্য ও কালোত্তীর্ণতার সমন্বয় থাকাটা জরুরী। 

বলা হয় আধুনিক স্থাপত্যধারার শক্তিশালী মাধ্যম হলো, মনুমেন্টালিজম। আর মনুমেন্টালিজমের কথা এলেই সবার আগে আসে স্থপতি করবুসিয়ারের নাম। সেই পরম্পরাকে আরো সফলভাবে এগিয়ে নিয়েছেন যিনি তিনি হলেন, স্থপতি লুই কান। যার অনন্য এক উদাহরণ বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ ভবন, যেটি দেখে আমরা বড় হয়েছি। 

আধুনিক ও উত্তরাধুনিক কালে এসেও নির্মাণ সামগ্রী হিসেবে রাজ করছে স্টিল, কংক্রিট এবং কাচনির্ভর স্থাপনা। কিন্তু লুই কান সেই সময় থেকেই মানুষের ইন্দ্রিয়জ অনুভূতির কাছাকাছি যাওয়ার জন্য ভিন্নধর্মী উপাদানের প্রতি মনোযোগী হন। সিরামিক বা তামার মতো অপ্রচলিত উপাদানগুলি কিভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে তা জানতে তিনি প্রায়ই অফিসে বিশেষজ্ঞদের আমন্ত্রণ জানাতেন। 

লুই কান
সল্ক ইনস্টিটিউট ফর বায়োলজিক্যাল স্টাডিজ, যুক্তরাষ্ট্র। নির্মাণকাল: ১৯৬৫

তাঁর প্রজন্মের বেশিরভাগ স্থপতি মনুমেন্টালিজমকে সেকেলে ভাবতেন। কারণ এর বিশালত্বকে তাদের মনে হতো অতি আবেগী অপ্রয়োজনীয় একটি ঘটনা। ১৯৩৮ সালে স্থাপত্যের বিশেষ সমালোচক লুইস মামফোর্ড তো বলেইছিলেন, ‘‘মনুমেন্টালিজম কখনো আধুনিক হতে পারে না।’’ কান অবশ্য হেঁটেছেন ঠিক এর বিপরীতে। 

মনুমেন্টালিজমের সূচনা মূলত ইতালিতে। তাও আবার স্বৈরাচারের শাসনামলে। বিরাটাকার, সাধারণ ক্লাসিক্যাল আকৃতি, জায়গার উপরে কতৃত্ব, সিমেট্রিক ডিজাইন এরকম বিষয়গুলোর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের ক্ষমতা প্রদর্শনের একটা ব্যাপার এর মাঝ দিয়ে তারা ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছিল। কিন্তু কানের ভবনগুলো এই কঠরতার মাঝেই নির্মাণ করেছে কোমলতা। কঠরের বুক চিরে আলো-বাতাসের চলাচল ও সুন্দর সুন্দর হাঁটার পথের মধ্য দিয়ে এক স্বর্গীয় অভিজ্ঞতার সৃষ্টি করেছেন তিনি।

জ্যামিতিক স্পেসের গভীর বোঝাপড়া না থাকলে মনুমেন্টালিজম আসলেই জায়গা ও মানুষের উপরে রাজ করতে পারে। এজন্য তিনি রোম ভ্রমণের পর লিখেছিলেন, “ইতালীর স্থাপত্য ভবিষ্যতের সব কাজের জন্যে অনুপ্রেরণা দিয়ে যাবে। যারা এভাবে সেটি দেখতে পারছেন না, তাদের উচিৎ হবে আবার ভালো করে দেখা।” 

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের জাতীয় সংসদ ভবন। নির্মাণকাল: ১৯৮২

মনুমেন্টালিজম সম্পর্কে তিনি বলছেন, ‘‘স্থাপত্যে মনুমেন্টালিটি বলতে এমন এক আধ্যাত্মিক গুণকে বোঝানো হয় যা কোনো কাঠামোর অন্তরে নিহিত থেকে তার চিরস্থায়িত্বের অনুভূতি প্রকাশ করে। এই অনুভবকে আর সংযোজন বা পরিবর্তন করা যায় না। গ্রিক সভ্যতার অনবদ্য স্থাপত্য কর্ম পার্থেননের মধ্যে আমরা এই গুণটি গভীরভাবে অনুভব করি।’’

তিনি আরো বলেন, “মনুমেন্টালিটি এক রহস্যময় গুণ। একে ইচ্ছাকৃতভাবে সৃষ্টি করা যায় না। সবচেয়ে ভালো উপকরণ কিংবা সর্বাধুনিক প্রযুক্তিও মনুমেন্টালিজমের অপরিহার্য শর্ত নয়। ঠিক যেমন ম্যাগনাকার্টা (বিদ্রোহী ব্যারনদের চাপে স্বাক্ষরিত এই চুক্তিটিই প্রথম প্রমাণ করে যে রাজা আইনের ঊর্ধ্বে নন) রচনার জন্য উৎকৃষ্টতম কালির প্রয়োজন হয়নি।”

সল্ক ইনস্টিটিউট ফর বায়োলজিক্যাল স্টাডিজ, যুক্তরাষ্ট্র। নির্মাণকাল: ১৯৬৫

লুই কানের দৃষ্টিতে মনুমেন্টালিজমের মৌলিক উপাদানসমূহ:

১. কাঠামোগত যুক্তি (Structural Logic)

কান মনে করেন, স্থাপত্যের রূপ আসা উচিত স্ট্রেস, লোড ও কাঠামোগত আচরণের যৌক্তিক বিশ্লেষণ থেকে। I-beam, টিউবুলার ফর্ম, ক্যান্টিলিভার সব ক্ষেত্রেই তিনি দেখিয়েছেন যে কাঠামোর প্রকৃত স্ট্রেস ডায়াগ্রাম অনুসরণ করলে আরও মার্জিত, মিতব্যয়ী ও শক্তিশালী রূপ দেওয়া সম্ভব। এই কাঠামোগত সততাই মনুমেন্টাল রূপের ভিত্তি।

২. উপাদানের অন্তর্নিহিত প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধা (Respect for Material Nature)

কান বারবার জোর দিয়েছেন উপাদান কী হতে চায় তার উপর। কেননা সেটাই স্থাপত্যকে নির্ধারণ করে। ইট, কংক্রিট, স্টিল, কাচ প্রত্যেকটির নিজস্ব চরিত্র ও সম্ভাবনা আছে। এই উপাদানগত সত্যকে মেনে চললেই স্থাপত্যে স্বাভাবিকভাবেই মনুমেন্টাল গুণ ফুটে ওঠে।

৩. টিউবুলার ও কন্টিনিউয়াস স্ট্রাকচার (Tubular & Continuous Structure)

লুই কান দেখান, টিউব আকৃতির কাঠামো কম উপাদানে বেশি শক্তি দিতে পারে। একই সঙ্গে ওয়েল্ডিংয়ের মাধ্যমে কন্টিনিউয়াস জয়েন্ট তৈরি হলে বিম ও কলাম আলাদা না থেকে একটি সমন্বিত কাঠামো হিসেবে গড়ে ওঠে। এই স্ট্রাকচারাল কন্টিনিউটি মনুমেন্টাল স্থায়িত্বতৈরি করে।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের জাতীয় সংসদ ভবন। নির্মাণকাল: ১৯৮২
৪. কাঠামোর প্রকাশযোগ্যতা (Exposed Structural Expression)

লুই কান মনে করেন, আধুনিক ভবনে কাঠামোকে ঢেকে রাখার প্রয়োজন নেই। বরং বড় স্ট্রাকচারাল স্কেলেটন দৃশ্যমান হলে ভবন নিজেই এক বিশাল ভাস্কর্যে পরিণত হয়, যা মনুমেন্টাল আবেগ তৈরি করে।

৫. আলো, শূন্যতা ও ভরের সংলাপ (Light–Void–Mass Relationship)

মনুমেন্টাল স্থাপত্য ভারী ভলিউমের পাশাপাশি আলো, ছায়া, ফাঁকা জায়গা ও ভারী ভরের পারস্পরিক সংলাপে জন্ম দেয়। গম্বুজ, ভল্ট, আর্চ, বাট্রেস এই ফর্মগুলো আধুনিক প্রযুক্তিতে ফিরে আসবে আরও বেশি আবেগময় ও উদার স্পেস তৈরির জন্য।

৬. বিজ্ঞান ও প্রকৌশলের সঙ্গে স্থপতির নতুন সম্পর্ক

লুই কান বলেন, স্থপতি ও প্রকৌশলীকে বিজ্ঞানীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে হবে। নতুন উপাদান, নতুন গ্লাস, প্লাস্টিক, স্টেইনলেস স্টিল এসবের সম্ভাবনা বুঝে নতুন স্থাপত্য ভাষা গড়ে তুলতে হবে। এই বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের সৃজনশীল প্রয়োগই আধুনিক মনুমেন্টালিজমের ভিত্তি।

কিমবেল শিল্প জাদুঘর, যুক্তরাষ্ট্র। নির্মাণকাল: ১৯৭২

৭. রিব, ভল্ট, গম্বুজ ও আর্চের আধুনিক পুনরাবিষ্কার

কান মনে করেন, গথিক যুগের রিব, ভল্ট ও গম্বুজ নতুন উপাদান ও প্রযুক্তির মাধ্যমে আরও হালকা, শক্তিশালী ও আবেগময় রূপে ফিরে আসবে, যা স্থাপত্যকে দেবে নতুন মনুমেন্টাল ভাষা।

৮. সামাজিক প্রতিষ্ঠানকে স্মৃতিস্তম্ভে রূপান্তরকরণ

লুই কানের মতে, আধুনিক যুগে মনুমেন্টাল স্থাপত্যের বিষয়বস্তু হবে: ধর্মীয় উপাসনালয়, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, সংসদ ভবন, শ্রমিক কেন্দ্র ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানগুলোই হবে আমাদের সময়ের নতুন মনুমেন্টাল বিল্ডিং।

৯. বৃহৎ স্প্যান ও বিশাল উন্মুক্ত স্পেস

নতুন স্ট্রাকচারাল প্রযুক্তির মাধ্যমে বড় স্প্যান ও কলামবিহীন বিশাল স্পেস বানানো সম্ভব যা মানুষের মধ্যে মহত্ত্ব, বিস্ময় ও সামষ্টিক অভিজ্ঞতা তৈরি করে। এটাই মনুমেন্টালিজমের কেন্দ্রীয় অনুভূতি।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের জাতীয় সংসদ ভবন। নির্মাণকাল: ১৯৮২

১০. ল্যান্ডস্কেপ ও স্থাপত্যের সমন্বয়

কান ভবনকে আলাদা বস্তু হিসেবে দেখেননি। তিনি মনে করতেন, ভবনের সাথে ভূমি ও প্রাকৃতিক প্রেক্ষাপটের অন্তমিলের মধ্য দিতে পরিপূর্ণ মনুমেন্টাল অভিজ্ঞতা লাভ করা সম্ভব। ভূমির জ্যামিতি, জলাধার, ধাপ, বৃক্ষরাজি সব মিলে একত্রে মনুমেন্টাল স্পেস নির্মাণ করে।

১১. স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন ও প্রিফ্যাব্রিকেশনের সৃজনশীল ব্যবহার

কান বলতেন, স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন, প্রিফ্যাব্রিকেশন ও শিল্প উৎপাদন শিল্পীর শত্রু নয়, বরং এগুলো নতুন সৃজনশীল সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয় যার মাধ্যমে মনুমেন্টাল স্থাপত্যের সম্ভবনা আরো প্রবল হয়ে ওঠে।

ফিলিপস এক্সিটার একাডেমি লাইব্রেরি, যুক্তরাষ্ট্র। নির্মাণোকাল: ১৯৭২
লুই কান স্পষ্টভাবে বলেন, ভবিষ্যতের মনুমেন্টগুলো শার্ত্র ক্যাথেড্রাল, তাজ মহল বা পালাজ্জো স্ত্রোৎসি-এর অনুকরণে তৈরি হলে চলবে না। বরং আমাদের সময়ের প্রযুক্তি, দর্শন ও সামাজিক চাহিদা থেকেই নতুন মনুমেন্টাল রূপের জন্ম নিতে হবে। 

আজকের দ্রুতগামী, ভোগবাদী ও প্রযুক্তিনির্ভর নগরসভ্যতায়, যেখানে স্থাপত্য প্রায়শই কেবল পণ্য বা প্রদর্শনীর বস্তুতে পরিণত হচ্ছে, লুই কান আমাদের সামনে উন্মুক্ত করেন এক বিকল্প পথ। এ পথে স্থাপত্য শুধু দৃশ্য নয়, এটি হয়ে ওঠে দর্শন, সংযম, মানবিকতা এবং সময়ের প্রতি শ্রদ্ধার প্রতীক। তাঁর দৃষ্টিতে মনুমেন্টাল ভবন মানে ভবিষ্যতের কাছে আমাদের নীরব প্রতিশ্রুতি। যে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আমরা কেবল ব্যবহারযোগ্য কাঠামো নির্মাণ করি না, বরং প্রতিটি স্থানকে অর্থবহ, অভিজ্ঞতামূলক এবং মানবিক স্পর্শে পূর্ণ করি।

মনুমেন্টালিজম

তথ্যসূত্র:

  1. Monumentality in Architecture – National Endowment for the Humanities (National Endowment for the Humanities)
  2. Louis I. Kahn; writings lectures, interviews; introduced and edited by Alessandra Latour; 1991
  3. লুই কান: আলোর স্থপতি; কে এম হাসান; নভেম্বর ২৪, ২০১৮

স্থপতি সুপ্রভা জুঁই
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top