দ্য আর্ক: মধ্য এশিয়ার প্রাচীনতম দুর্গ

উজবেকিস্তানের বুখারা, প্রাচীন মধ্য এশিয়ার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের একটি স্মরণীয় অধ্যায়। মরুপ্রবণ ধূসর ভূ-প্রকৃতি হলেও বিখ্যাত সিল্ক রোড এই অখ্যাত জনপদকে নিয়ে আসে আলোর প্রদীপে। খ্যাতি পায় সিল্করুটের রাজকন্যা হিসেবে। বুখারা যদি রাজকন্যা হয় মধ্য এশিয়ার প্রাচীনতম দুর্গ আর্ক হচ্ছে সে রাজকন্যার কপালের টিকলি। ১৪০টির বেশি ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যের শহরে দি আর্ক একটি উল্লেখযোগ্য ইতিহাস বহন করে চলছে। এটি একটি সামরিক দুর্গ হলেও একটি ছোটখাটো শহর হিসেবে টেকসই হওয়ার জন্য যে যে সুবিধা দরকার, তার সবই এখানে আছে। বিভিন্ন সময়ে যেসব শাসক বুখারার আশপাশে শাসন করেছেন, তাঁদের অনেকেই এখানে বসবাস করেছেন এবং ১৯২০ সালে রাশিয়ার অধীনে যাওয়ার আগপর্যন্ত তা অব্যাহত ছিল।

প্রাচীন বুখারার উৎপত্তির সময় ও নামকরণের ইতিহাস নিশ্চিতভাবে জানা যায় না। শহর হিসেবে বুখারার গোড়াপত্তন সেই ৩০০০ সালেরও আগে বলে ধারণা করা হয়। পারসিক ধর্মগ্রন্থ জেন্দ আভেস্থায় খ্রিষ্টপূর্ব ত্রয়োদশ শতাব্দী কালের বুখারার উল্লেখ পাওয়া যায়। আবহাওয়াগত কারণে নদীপাড়ের এই জায়গাটি ছিল সুবিধাজনক। ইউরেশিয়ান স্তেপ থেকে কিছু মরুচারী আদি গোষ্ঠীও জরাফশান নদীর তীর ধরে বসবাস শুরু করলে একটি শহরের কাঠামো গড়ে ওঠে। তবে ৩০০ বছরের ব্যবধানে একসময় জরাফশান পানিহীন হয়ে পড়লে জায়গাটা পরিত্যক্ত হয়। বরং ওপরের এলাকায় ছোট ছোট জনপদ একটি দেয়াল দ্বারা ঘিরে লোকালয় তৈরি হতে থাকে। খ্রিষ্টপূর্ব ৫০০ সালের দিকে এভাবে বুখারা শহরের গোড়াপত্তন ঘটে।

আর্ক দুর্গ নিয়ে প্রচলিত গল্প হচ্ছে পারস্য থেকে আগত ধনাঢ্য যুবক শিয়াভুষ প্রণয়ে জড়িয়ে পড়েন স্থানীয় শাসক আফ্রাসিয়াবের কন্যার সঙ্গে। পিতা শর্ত দেন এ প্রণয় তিনি মেনে নেবেন, তবে তার আগে শিয়াভুষকে একটি সুদৃশ্য দুর্গ তৈরি করতে হবে। শিয়াভুষ অনেক কষ্ট করে এই দুর্গম এলাকায় আর্ক দুর্গ তৈরি করেন। খ্রিষ্টপূর্ব ৫০০ সালে বুখারা শহরের উত্তর অংশে আর্ক দুর্গের এই ভিত্তি গড়ে ওঠে। চারপাশের এলাকার স্তর থেকে প্রায় ২০ মিটার ওপরে উঠে প্রায় ৪ হেক্টর এলাকাজুড়ে প্রাচীন স্থাপত্য ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান। চারদিকে উঁচু প্রাচীর দ্বারা বেষ্টিত ছিল এবং এর দুটি প্রবেশপথ ছিল।

আবুবকর মোহাম্মদ ইবনে জাফরের (নরাশাখি) ৮৯৯-৯৬০ ইতিহাস গ্রন্থ হিস্ট্রি অব বুখারাতে বলা হয়, বুখারার শাসক বিন্দু এই দুর্গ নির্মাণ করেন। কিন্তু অচিরেই এটা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। একাধিকবার এটা পুনর্নির্মাণ করা হয়েছিল এবং প্রতিবারই আবার হারিয়ে যাচ্ছিল। সর্বশেষ শাসক নির্মাণ করার সময় বিদগ্ধ ব্যক্তিরা তাঁকে একটি বিশেষ কৌশল অবলম্বনের পরামর্শ দেন। সম্পূর্ণ দুর্গের পরিসীমা ধরে সপ্তর্ষিমণ্ডলের অনুসরণে সাতটি বিন্দু নির্দিষ্ট করে নিয়ে তারপর এক বিন্দু থেকে অপর বিন্দু পর্যন্ত দেয়াল করা হয় এবং সাতটি বিন্দুকে বিশেষভাবে শক্তিশালী করা হয়। এরপর থেকে দুর্গটি আর ধ্বংস হয়নি। দুর্গের বর্তমান স্তর থেকে প্রায় ২০ মিটার নিচে আরেকটি ভিত্তি স্তর পাওয়া যায়, যা থেকে ধারণা করা হয়, আর্ক দুর্গটি একটি পুরোনো কাঠামোর ওপর নির্মিত হয়েছিল, এর আগেও এখানে এ ধরনের একটি স্থাপনা বর্তমান ছিল, যা কালের বিবর্তনে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিল।

এখনো দুর্গের সবচেয়ে অবিকৃত ও সুদৃশ্য অংশ এর বর্তমান প্রবেশপথ বুখারা তোরণ। প্রাচীন খিলানসমৃদ্ধ বাহ্যিক দেয়াল। তোরণের দুপাশে ১৮ শতাব্দীর দুটো সুদৃশ্য মিনার, যার ওপরের অংশ গ্যালারি, কক্ষ এবং উন্মুক্ত বারান্দা সহযোগে পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত। প্রবেশপথের ঠিক ওপরের তলায় জুমা মসজিদের অবস্থান। এর পরেই খুশবেগ বা প্রধান উজিরের মেহমানখানা। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাজকর্মও এখান থেকেই পরিচালিত হতো। এর সংলগ্ন বাঁ পাশেই ছিল বড় হল, যেখানে বিদেশি মেহমানদের এখানে অভ্যর্থনা জানানো হতো। সালামখানা নামে অভিহিত করা হতো একে। নিচতলায় ছাদঢাকা করিডর চলে গেছে গুদাম এবং কারাকক্ষের দিকে। প্রধান প্রবেশপথ থেকে তাকালে সরাসরি যদি সালামখানা হয়, তাহলে মসজিদের অবস্থান বামে। এই মসজিদ শুধুই দুর্গের অভিজাতদের জন্য। সাধারণের জন্য দুর্গের বাইরে একটি বড় মসজিদ আছে, যেটি কালিয়ান নামে পরিচিত। দুর্গের কেন্দ্রীয় অবস্থানে একটি বড় প্রাসাদ কমপ্লেক্স। এটি মোটামুটি সংরক্ষণ করা হয়েছে। রাজা ও রাজপুত্রদের, আধিকারিকদের ও সেনাপতিদের, রাজ্যগুলোর অফিস এখানে ছিল। আরও ছিল সিংহাসন কক্ষ। এ অংশ বাদে আর্ক দুর্গের বর্তমানের স্থাপনা ১৮ শতাব্দীতে নতুন করে তৈরি করা।

উইকিপিডিয়া

শহরের প্রাণকেন্দ্রে আর্ক দুর্গ ও সংলগ্ন পরিসরের অবস্থান মনে হয় যেন মরুভূমির বুকে এক টুকরো মরূদ্যানের অনুভূতি তৈরি করেছে। বেড়াতে আসা দর্শনার্থীরা বিশাল ভবনের সামনে এলে ইতিহাসের শতাব্দীকাল অতীতে চলে যান। হাজার কিংবা আরও আগের প্রাচীন তুর্কিস্তানের ঐতিহ্যিক ভগ্নাবশেষ নিয়ে বুখারা শহরের এই প্রাচীন দুর্গ মধ্য এশিয়ার অন্যতম আকর্ষণ। সবচেয়ে আকর্ষণের বিষয় হচ্ছে এর সুবিশাল প্রাচীর এবং বাহ্যিক দর্শন। কীভাবে এত বড় দেয়াল নির্মাণ এবং কাঠামো সংরক্ষণ করা হয়েছে, সেটা ভাবতে বিস্ময় জাগে। দক্ষিণ-পূর্ব দিক দিয়ে তাকালে দেয়ালের গঠন কাঠামো সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়। ভেতরের দিক পুরোটাই কাদামাটির। মনে হয় যেন কাদামাটির স্তরের গা ঘেষে মাটির ইটের প্রলেপ দেওয়া হয়েছে। দেয়ালের ভাঁজ হওয়া অংশ দুর্গপ্রাচীরের সঙ্গে টাওয়ারের মতো কাজ করে। এটি আবার যতই উচ্চতা বেড়েছে পর্যায়ক্রমে চিকন হয়ে এসেছে। দেয়ালের একদম ওপরে কিয়স্ক বসানো, যে অংশটি পুনরুদ্ধার করা হয়েছে তা খুবই আকর্ষণীয় এবং একই সঙ্গে বিপরীতমুখী অনুভূতি তৈরি করে।

চেঙ্গিস খানের সৈন্যরা যখন বুখারা আক্রমণ করে, তখন শহরবাসী এই দুর্গে আশ্রয় নেয়। তবে সেনাপতির নির্দেশে সৈন্যরা দুর্গ ধ্বসিয়ে দেয় এবং পুরোপুরি দখল নিয়ে নেয়। অষ্টম শতাব্দীতে কুতায়বা ইবনে মুসলিমের নেতৃত্বে আরবরা বুখারা জয় করে এবং আর্ক হয়ে ওঠে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কেন্দ্র। তার আগে সপ্তম শতাব্দীতে বোখারহুদাত সম্রাজ্যের অধীনে দুর্গটির পুনর্গঠন করা হয়েছিল। এর মধ্যে তখন নতুন একটি প্রাসাদ তৈরি করা হয়েছিল, যেটি বোখারহুদাত প্রাসাদ নামেই ইতিহাসের পাতায় খ্যাত। প্রাসাদের অফিস ভবন, একটি কোষাগার, কারাগার এবং একটি মন্দির নির্মিত হয়েছিল। মুসলমানদের আগমনের সময় বুখারহুদাত প্রাসাদটি বর্তমান ছিল, আরও ছিল প্রাচীন সাহিত্যের কিংবদন্তি বীর সিয়াভুষের কথিত সমাধি। আর্কের পশ্চিম প্রবেশদ্বার ভূমি ও উদ্যানে প্রসারিত ছিল, গেটটি যেদিকে চলে গেছে সে এলাকা রেজিস্থান নামে পরিচিত। রেজিস্থান অর্থ বালুকাময়। পরবর্তীকালে ধ্বংস হওয়া পূর্ব গেটসংলগ্ন এলাকা পাশের শাহরিস্তানের দিকে চলে গিয়েছিল। তৈমুরিদ যুগের ইতিহাস অনুসারে, ১৪০৫ সালের বসন্তে, সিংহাসনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-সংঘাতের প্রাক্কালে আমির তৈমুরের মৃত্যুর পরে মির্জা উলুগ বেগ এবং ইব্রাহিম সুলতান তাঁদের কোষাগার ও অভিভাবকদের নিয়ে বোখারাতে গিয়ে আর্ক দুর্গে অবস্থান করেন। এখানে তাঁরা এক মাস ধরে শহরের দেয়াল এবং ফটকগুলো মজবুত করার কাজে নিযুক্ত ছিলেন। মধ্য যুগে রুদাকি, ফেরদৌসি, ইবনে সিনা, আল ফারাবী প্রমুখের কাজে দুর্গের বর্ণনা পাওয়া যায়। আর্ক দুর্গের গ্রন্থাগার বিষয়ে ইবনে সিনা বলেছিলেন, জ্ঞানের বিশাল গভীরতায় ঢোকার জন্য এত বড় আয়োজন তৈরি হয়ে আছে তা আমি কল্পনাও করতে পারিনি। সম্ভবত, যুদ্ধের একসময় গ্রন্থাগারটি লুট হয়ে যায়।

বুখারার ২৫০০তম বার্ষিকীর প্রস্তুতিতে এবং উজবেকিস্তান প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপতি ইসলাম করিমভের (১৯৯০-২০১৬) নেতৃত্বে এবং খিলানটি পুনরুদ্ধার করা হয়েছিল। আর্চ-এর বেশির ভাগ বিল্ডিং একটি সাধারণ মধ্য এশিয়ান কাঠের ফ্রেম থেকে তৈরি হয়েছিল কাদা-ইট দিয়ে পূর্ণ এবং স্টাকো দিয়ে আবৃত। ঘরগুলো একটি একজাত ফ্রেম থেকে সহজতর করা হয়েছিল, দুই সারির একটি থেকে আরও সমৃদ্ধ। আর্চটিতে পোড়া ইটের প্রবেশপথের একটি তাহতপুল বা সঢ়ালু, নাগরোহোনা-হনাকো মসজিদ, কোষাগারের ঘর, সিংহাসনের ঘরের দেয়াল, মাজার সায়িদ বাটলগোজি এবং খিলানের উত্তর-পূর্ব কোণে অবস্থিত একটি ছোট মাদ্রাসা নির্মাণ করা হয়েছিল।

বাইচকভস্কির মতে, (যিনি ১৯২৫-১২২৭ সালে আরকের উত্তর-পূর্ব অংশে অবস্থিত সোভিয়েত সংস্থাগুলোর একটিতে কর্মরত ছিলেন), ‘সেই সময় সেখানে অবিচ্ছিন্নভাবে ভবন ছিল, যেখানে আপনি এক ঘর থেকে অন্য ঘরে যেতে পারতেন। এগুলো গোলকধাঁধা স্যুট ছিল এবং প্রতিটি ঘরে একটি বিশেষ সজ্জা ছিল। কুশবেগী হারেমের একটি কক্ষে পরিষ্কার উঠোনে প্রায় ২ী২ মিটার আকারের একটি ছোট পুকুরও ছিল, যেখানে মহিলারা স্নান করত বলে মনে হয়।’ জানা যায় যে খানকের কাছে ছোট ছোট উঠান এবং ঘর ছিল, যা সুফি ও ইমামের প্রাঙ্গণ হিসেবে বিবেচিত হতো। গুল্বাবাচের প্রহরীদের অর্কের পুরো পূর্ব প্রাচীর বরাবর ঘর ছিল।

সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রের সময়কালে আর্কের পশ্চিম প্রাচীরের কাছে বেশ কয়েকটি ভবন সংরক্ষণ করা হয়েছিল। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ৩ হাজার মানুষ বাস করত। মোট বুখারার জনসংখ্যা ছিল ৭০ হাজার। আমির-ওমরা, দাপ্তরিক কর্মকর্তা, সেনাপতি এবং তাঁদের বিভিন্ন ধরনের সঙ্গী-সাথি এবং চাকরবাকরেরা এখানে বাস করত। ১৯২০ সালে বুখারার যুদ্ধে মিখাইল ফ্রাঞ্জির আদেশে বিমান থেকে ব্যাপক গোলাবর্ষণ করা হয়। দুর্গের একটা বড় অংশ ধূলিস্যাৎ হয়ে যায়।

উইকিপিডিয়া

বিজ্ঞানীরা মনে করেন, প্রাচীনকালে ভূগর্ভস্থ তাজার নালা থেকে আর্কে পানি পৌঁছে দেওয়া হতো, যা সাবেক খোদজা নিহোল মাদ্রাসা থেকে এসে সিন্দুকের দক্ষিণ প্রাচীরের কাছে এসেছিল। সম্ভবত, এখানে একটি লুকানোর জায়গা ছিল অথবা হতে পারে বদ্ধ জলাশয়ের অস্তিত্ব ছিল। সেখানে তারা পানি রেখেছিল, যেখান থেকে ফুলের বাগানে সেচের সুবিধার্থে ছোট নালা টেনে নিয়েছিল। চার লনের ফুলের বাগানে আমির প্রায়ই হাঁটতেন এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় পার করতেন।

আর্ক দুর্গেও সৌন্দর্য দেখার জন্য শুধু যে বাইরের দেশ থেকে পর্যটক আসে তা নয় দেশীয় মানুষও এখন বিপুল পরিমাণে আসে। তবে মজার বিষয় হচ্ছে, বুখারার অন্য সব স্থাপনার তুলনায় আর্কের বিভিন্ন ভবন এখন সবচেয়ে বেশি কদাকার। সম্ভাব্য কারণ হচ্ছে, বিভিন্ন সময়ে সব শাসকই এটাকে তাঁর নিজের পছন্দমতো সাজানোর চেষ্টা করেছেন। ফলে স্থাপত্য ও অবকাঠামোর ঐকতান ব্যাহত হয়েছে অনেক ক্ষেত্রেই। আর্ক দুর্গ, তবুও ঐতিহ্যপ্রিয় দর্শনার্থীর চোখে এখনো মধ্য এশিয়ার আকর্ষণের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ১৫২তম সংখ্যা, এপ্রিল ২০২৩।

স্থপতি খালিদ মাহমুদ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top