গ্রামীণ প্রচলিত স্থানিক স্থাপত্য আজও সাধারণ দরিদ্র, গ্রামীণ ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের আশ্রয়-নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য। তবে উপযোগী নকশা, সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য আর নির্মাণ উপকরণের সমন্বিত স্থাপত্য আন্দোলনের বিকাশ পৌঁছেনি এখনো কাক্সিক্ষত মাত্রায়। সাম্প্র্রতিক সময়ে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এই আন্দোলনের একটা আবহ তৈরি হয়েছে। তারা ভাবছে, গবেষণা করছে, বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছে; কাজ করছে নিজের হাতে। বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূলীয় প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় টেকসই সহজলভ্য উপকূলের স্থাপনার সমাধান কী হতে পারে, তরুণ স্থপতি মাসুম হক তেমনই কিছু ভাবনাকে উপস্থাপন করেছেন তাঁর চিন্তাকাঠামোর আলোকে।
বাংলাদেশে আধুনিক স্থাপত্যচর্চা হাঁটি হাঁটি পা পা করে এখন অনেকটা এগিয়েছে পরিণত পর্যায়ে। বিশ্বস্থাপত্য অঙ্গনে বাংলাদেশের স্থাপত্য ও স্থপতিদের তৈরি হয়েছে আলাদা এক অবস্থান। সাম্প্রতিক নগর উন্নয়নে বেড়েছে স্থপতিদের অংশগ্রহণও। তবে স্থাপত্যের যে চিরাচরিত স্থানিক ধারা সুদূর আবহমানকাল থেকে চলমান, সেই ধারার বিকাশ এবং উন্নয়ন সে তুলনায় একটু উপেক্ষিতই বলা চলে। মানুষের দৈনন্দিন জীবনমান পরিবর্তন হচ্ছে, সেই সঙ্গে পরিবর্তন হচ্ছে স্থাপত্যচর্চার ধরন ও ব্যাকরণ। চাহিদা, সৌন্দর্যবোধ, আর্থসামাজিক উন্নয়নের পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন, দুর্যোগ মোকাবিলায় সহনশীল অবকাঠামোর ভাবনা এখন অনেক বেশি। তবে এই অগ্রগতি ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মধ্যেও ক্রমান্বয়ে পিছিয়ে পড়ছে গ্রামীণ স্থাপত্য। ঘূর্ণিঝড়, বন্যাসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে এর গুরুত্ব থাকলেও কমছে দেশীয় গুরুত্ব।
বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ঘূর্ণিঝড়। বঙ্গোপসাগরের মোহনায় ত্রিকোনাকৃতি দ্বীপ এলাকা আর সমুদ্রের তীরবর্তী ভূপৃষ্ঠের উচ্চতা এর অন্যতম কারণ। এ এলাকার জনঘনত্বের পাশাপাশি সামুদ্রিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা একে করে তুলেছে আরও বিপজ্জনক। মৌসুমি ঋতুর আগে ও পরের সময়টাতে এখানে নিয়মিত আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড়। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ৪০ শতাংশ বজ্রপাত হয় এ দেশে। মৃত্যু আর ক্ষয়ক্ষতির বিবেচনায় বিগত ৩০ বছরে সবচেয়ে ভয়াবহ সব ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনেছে এ অঞ্চলেই।
সমুদ্র তীরবর্তী এই বিপর্যস্ত এলাকায় দুর্যোগ-প্রতিরোধী স্থানীয় স্থাপত্যের ব্যবহারের উপযোগী পরিকল্পনা ও কৌশল এক্ষেত্রে রাখতে পারে কার্যকর ভূমিকা। সমুদ্র তীরবর্তী অঞ্চলে স্থানিক স্থাপত্য মুখোমুখি হচ্ছে প্রধানত তিন ধরনের চ্যালেঞ্জের। এর প্রধানটি হচ্ছে ব্যয় সংকুলান, অপর দুটি হচ্ছে নির্মাণ উপকরণের সহজলভ্যতা এবং প্রযুক্তি ও দক্ষ শিল্পীর অভাব। এই গবেষণার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে এমন একধরনের নকশা তৈরি করা, যেটা হবে সহজে ধারণযোগ্য, সাশ্রয়ী এবং সহজে নির্মাণযোগ্য, যা একই সঙ্গে নিশ্চিত করবে দুর্যোগকালীন মানসম্মত আবাসন ও পরিবেশপ্রাপ্তি। আশাবাদী পরিসর আর প্রতিরোধী আকৃতি হচ্ছে এই চর্চার ধারণাগত বক্তব্য। বাড়িগুলো হবে সহনশীল ধাঁচের, সমুদ্রতীর উপযোগী, সহজে নির্মাণযোগ্য এবং যেকোনো আবহাওয়া সয়ে নেওয়ার সহনক্ষমতাসম্পন্ন।
উপরিউক্ত বিষয়গুলোকে মাথায় রেখে যে দুই ধরনের বিকল্প মডেল চিন্তা করা হয়েছে-
গবেষণা মডেল-১
এটা হচ্ছে প্রচলিত বাড়ির ছোট উদাহরণ, যেখানে থাকবে দুটি শয়নকক্ষ কিংবা একটি শয়নকক্ষ এবং একটি বারান্দা সমন্বয়ে শস্যভান্ডার। মোটামুটি ১৪০ বর্গফুট জায়গার জন্য বরাদ্দ থাকবে, যা একটি আধুনিক বহুতল ভবনের ৪০০ বর্গফুট পরিসরের সমান সুবিধা দিতে সক্ষম। রান্নাঘর আর প্রক্ষালনের ব্যবস্থা থাকবে বাইরে, যা তৈরি হতে পারে যেকোনো সহজলভ্য উপকরণে। দুটো শয়নকক্ষেই থাকবে প্রাইভেসি। এতেই তৈরি হবে আরামদায়ক স্বাধীন এক পরিসর।
গবেষণা মডেল-২
এই মডেলটিকে বলা যায়, মডেল-১-এর পরবর্তী সংস্করণ বা আরেকটু বিস্তৃত সংস্করণ। এখানে শয়নকক্ষের পাশাপাশি রান্নার পরিসর, শস্যভান্ডার ও প্রক্ষালনের ব্যবস্থাকেও সমন্বিত করা হয়েছে। সংলগ্ন চলাচলের পথকেই রান্নার সময়ে রান্নাঘর, খাওয়ার সময়ে খাবারের ঘর এবং অন্য সময়ে পারিবারিক পরিসরে রূপ নেবে। শয়নকক্ষের ১১০ বর্গফুটের জায়গাকে সংরক্ষিত রেখেই আরও ৩৫০ বর্গফুট জায়গা নিতে হবে এ বিবেচনায়। একটি দুই কক্ষবিশিষ্ট শহুরে ইউনিটে ৮০০ থেকে ১০০০ বর্গফুটের পরিসর বরাদ্দ থাকে, যা মূলত ১০ ফুট ও ১২ ফুট দৈর্ঘ্য-প্রস্থের শয়নকক্ষ। খোলামেলা ও মুক্ত প্রবহমান এই পরিসর বৃহৎ পরিসরের অনুভূতি তৈরি করবে। এই পরিসরের অবস্থান হতে পারে মাঝবরাবর বা যেকোনো পাশেও।
উভয়ক্ষেত্রেই একটা বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে যে একটি বাসযোগ্য পরিসরের কিছু অংশ থাকে আসবাবসংবলিত নির্দিষ্ট এবং কিছু পরিসর থাকে বহুমুখী ব্যবহারের উপযোগী। এখানে ধারণাগতভাবেই নির্দিষ্ট পরিসরকে কমিয়ে মুক্ত পরিসর যতটা সম্ভব বাড়ানো হয়েছে। মুক্ত পরিসর যদি ৬০ শতাংশে রাখা সম্ভব হয়, তাহলে ছোট একটি আবাসন ইউনিটে অনেক বেশি সুবিধা অর্জন সম্ভব।
আবাসনকে জলবায়ু সহনীয় করার জন্য এর বাহ্যিক আকৃতি যতটা সাধারণ এবং স্থির ধরনের করা যায়, ততই ভালো। একটি স্থাপনাকে গোলাকৃতি, ড্রামাকৃতি, গম্ভুজ ধাঁচের তৈরি করা যায়, তবে এতে বাহ্যিক নান্দনিকতা এলেও আমাদের প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরুদ্ধে এদের সহনক্ষমতা কম।
প্রস্তাবিত ডিজাইনে অবকাঠামোর প্রধান অংশকে ইটের সঙ্গে কংক্রিটের সমন্বিত নির্মাণ ধারায় বিবেচনা করা হয়েছে। ঘণ্টায় ২৫০ কিলোমিটার বেগে ধেয়ে আসা ঘূর্ণিবাতাসেও এটি স্থাপনাকে রাখবে নিরাপদ ও সহনীয়। কিছু বাড়তি অংশে প্রচলিত ধারার নির্মাণ উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছে, যা কাঠের খুঁটি অথবা সিমেন্টের তৈরি খুঁটির সঙ্গে টিনের সংযোগে তৈরি হয়েছে। ২৫ ডিগ্রি কোণে চালা বসানো আছে, ফলে উচ্চ বাতাসের ঝড় সামলে সে টিকতে পারবে। তা ছাড়া সব দিকে বাতাস বের হওয়াার সুযোগ থাকছে। ফলে এখানে বাতাস আটকে থাকার কোনো সুযোগ নেই, এতে বাতাসে ভবন কম ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বাইরের দিকের দেয়াল ইটের তৈরি হলেও ভেতরের দেয়াল বাঁশ বা সহজলভ্য-সস্তা উপকরণের হতে পারে। এগুলোকে স্থানান্তরযোগ্য করে তৈরি করা হবে, ফলে দরজা-জানালা বা যেকোনো ধরনের কপাট হিসেবে কাজ করবে। অথবা ফোল্ড-অ্যাবেল তথা ভাঁজ করা যায় এমন হবে।
এখানে একটা বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন যে গবেষণার আউটপুটে খুব আহামরি নতুন কিছু নেই। নকশার সবকিছুই আমাদের গ্রামীণ সমকালীন স্থাপত্যের ধারণা থেকে সংগৃহীত। উঁচু ভিত্তির ধারণা এসেছে বন্যা বা জলোচ্ছ¦াসের হাত থেকে নিরাপদ থাকাতে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সিমেন্ট কংক্রিট অবকাঠামোব্যবস্থা খুবই জনপ্রিয় আর নির্মাণকর্মীও সহজলভ্য। স্থাপনার চতুর্দিকে গ্রামীণ সবজি ও গাছপালার সমন্বয়ে যে সবুজায়নের চিন্তা করা হয়েছে, এটি গ্রামবাংলার অধিবাসীদের সহজাত প্রবৃত্তি। কেবল যথাযথ জায়গায় যথাযথ কৌশল ও পরিকল্পনাই স্থাপনাকে করে তুলতে পারে আরও কার্যকর; আরও টেকসই।
আর্কিটেক্টস ওয়াল ডিজাইন স্টুডিও
প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১২৭তম সংখ্যা, মার্চ ২০২১