টেকসই উন্নয়নে বহুমাত্রিক বিন্যাস

করোনাকালের এই সময়ে আমরা যদি আমাদের জীবনযাত্রার পরিবর্তনগুলোকে একটু ভালোভাবে লক্ষ করি, তাহলে কয়েকটি বিষয় খুব সহজেই উপলব্ধি করতে পারব। প্রথমত, আমরা ইচ্ছা করলেই আমাদের বসবাসের জায়গাগুলোকে নানাভাবে ব্যবহার করতে পারি। দ্বিতীয়ত, আমরা যেকোনো ভাইরাস সম্পর্কে কিংবা রোগ-জীবাণু সম্পর্কে যদি সঠিকভাবে অবগত হই, তাহলে সেগুলোকে বাসস্থানে কিংবা কর্মপরিবেশে সহজেই মোকাবিলা করতে পারব। তৃতীয়ত, আমরা আমাদের জীবনযাত্রা নিয়ন্ত্রণের ভিত্তিতে কর্মক্ষেত্রে-বাসস্থানে শক্তির অপচয় কমাতে সক্ষম হব, যা আমাদের অর্থনৈতিকভাবে করবে দারুন স্বাবলম্বী।

বিশ^খ্যাত ম্যাগাজিন ‘দি ইকোনমিকস’ (১১ জুন, ২০২০)-এর তথ্যমতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকগুলোর হিসাব অনুযায়ী গত কয়েক মাসে সাধারণের আয় থেকে ব্যাংকে বেশি পরিমাণ অর্থ সঞ্চিত হয়েছে এ যাবৎকালে। বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের পরিমাণের বিষয়টি এর ব্যাংকগুলোর দিকে তাকালেও পরিষ্কার হয়ে ওঠে। এমন পরিস্থিতি ব্রিটেন, জাপানসহ ইউরোপের বেশির ভাগ দেশেই। এর কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে যে খাবারের দোকানসহ মার্কেটগুলো বন্ধ থাকায় জ্বালানির ব্যবহার, গাড়ির ব্যবহার কমে যাওয়া, বাড়িভাড়া কমে যাওয়া কিংবা খাদ্যের অপচয় কমে যাওয়া এর পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করছে। সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, এই মহামারি পরিবারগুলোকে নিজেদের অদূর ভবিষ্যতের জন্য নগদ সংরক্ষণের জন্য অনুপ্রাণিত করছে। কিন্তু সঙ্গে এটিও ধারণা করা হয়েছে, এই নতুন জীবনধারা হয়তো খুব বেশি দিন টিকবে না! আর এই ধারণা আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য যে কতটা সঠিক তা বর্তমান বাস্তবতায় খুব বেশি করে বলার প্রয়োজন নেই।

অন্যদিকে পৃথিবীর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চলতি গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য বলছে, বর্তমান লকডাউনে পরিবারের আবাসনের বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ বেড়েছে অনেকাংশে। তাঁরা দেখিয়েছেন, প্রায় ২৩ শতাংশ বাসাবাড়িতে বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ বেড়েছে অন্য যেকোনো সময় থেকে। যদিও অন্যান্য সেক্টর যেমন অফিস-কারখানা বন্ধ থাকার জন্য সেখানে বিদ্যুতের ব্যবহার কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে। লক্ষণীয় বিষয় যে দিনের বেলায় সাধারণত ছেলেমেয়েরা স্কুল-কলেজে থাকে, অন্যরা অফিস কিংবা বাইরে থাকে, এখন যেহেতু তাদের বাড়িতে থেকেই সব কাজ করতে হচ্ছে, সেহেতু বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়িগুলোতে বেড়েছে অনেকাংশে। যার খরচ আগে অফিস কিংবা কারখানা বহন করত। এখন সেই খরচ ব্যক্তিগত পর্যায়ে চলে এসেছে, যা তাদের মানসিক দুশ্চিন্তার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত, নি¤œ মধ্যবিত্ত আর নিম্নবিত্ত শ্রেণির পরিবারগুলোর মধ্যে এই সমস্যা অত্যন্ত প্রকট, বিশেষত শহরাঞ্চলে। 

এ অবস্থায় আমাদের ভাবতে হবে এই মানুষগুলোর বাসস্থানের কথা। বিশেষ করে বাসস্থানের শক্তি, নিরাপত্তা আর জ্বালানি ব্যবহারের কথা। বাসস্থানগুলোকে এমনভাবে ঢেলে সাজাতে হবে যেন সেখানে শক্তির অপচয় হয় কম। আবাসন খাতগুলোকে বর্তমান পরিস্থিতি-নির্দেশনায় নতুন করে ভাবতে হবে। যেসব স্থাপনা নতুন করে তৈরি করা হবে সেগুলোকে একটি নির্দিষ্ট রেটিং সিস্টেমের আওতায় আনা যেতে পারে। একে ‘গ্রিন রেটিং সিস্টেম’ নাম দেওয়া যেতে পারে। এক একটি স্থাপনা ভেদে রেটিং সিস্টেম হতে পারে ভিন্নতর। যেমন, ছয়তলা কিংবা তার নিচের তলাবিশিষ্ট বাসস্থানগুলো কিংবা স্থাপনাগুলোর জন্য ব্যবহৃত হতে পারে একধরনের রেটিং সিস্টেম। ছয়তলার অধিক তলাবিশিষ্ট বহুতল ভবনের জন্য আরেক ধরনের রেটিং সিস্টেম ব্যবহৃত হতে পারে এবং রেটিং সিস্টেমগুলো বাসস্থানের জন্য, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য, অফিস-আদালত কিংবা আলাদা স্থাপনার জন্য ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণিবিন্যাস করা যেতে পারে, যা বর্তমানে উন্নত বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশ করছে। সেক্ষেত্রে হয়তো আরও সুনির্দিষ্টভাবে আবাসনশিল্পে প্রণয়ন করতে হবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের চিন্তা আর পরিকল্পনা। নইলে একদিকে যেমনি আবাসনশিল্প সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাবে, ঠিক তেমনি অন্যদিকে বসবাসের ব্যয়ভার অর্থনৈতিকভাবে আমাদের আরও মুমূর্ষু করে তুলবে। সেখানে কীভাবে এনার্জি রেট্রোফিটিংয়ের মাধ্যমে শক্তির অপচয় কমানো সম্ভব, তার পরিকল্পনা করতে হবে। এমনকি স্থাপনা নির্মাণে ফেব্রিকেশন বিষয়টিকে আবারও সামনে আনা যেতে পারে। 

বর্তমানে আরেকটি ধারণা কিংবা চিন্তাভাবনা কাজে লাগানো যেতে পারে। সেটি হচ্ছে ‘এলাকাভিত্তিক শক্তি সংরক্ষণ নীতিমালা’। সেটি বাসস্থানের ক্ষেত্রেও হতে পারে বা শিল্পপ্রতিষ্ঠান কিংবা অন্যান্য স্থাপনার ক্ষেত্রেও হতে পারে। বিষয়টি হচ্ছে একটি নির্দিষ্ট এলাকার মানুষের জীবনযাত্রার মান, গতি-প্রকৃতি ইত্যাদি বিচার-বিশ্লেষণ করে সেই এলাকার জন্য নির্দিষ্ট শক্তি সংরক্ষণ নীতিমালা যেকোনো শহরের জন্যই করা যেতে পারে। এতে একদিকে যেমন ওই নির্দিষ্ট এলাকার লোডশেডিং কিংবা জীবনযাত্রার মানকে উন্নত করবে, ঠিক তেমনি উদাহরণ হিসেবে একটি শহরের অন্যান্য এলাকা এভাবে তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী শক্তি সংরক্ষণ নীতিমালা প্রণয়ন করতে পারবে। আর এভাবেই শহরের সামগ্রিক শক্তি সঞ্চয়-এর উন্নয়ন সম্ভব, যা তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ওপর প্রভাব বিস্তার করবে ইতিবাচকভাবে। যেহেতু আমাদের শহরগুলো বহুমাত্রিকভাবে বিন্যস্ত, তাই আমাদের একদিকে চিন্তা করলে হবে না। আমাদের বহুমাত্রিক দিকে চিন্তা করতে হবে। জীবনযাত্রার টেকসই ও সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য। সেটি হতে পারে স্থাপনার দিক থেকে; শিল্পায়ন কিংবা নগরায়ণের দিক থেকে। হতে পারে সামাজিক আর অর্থনৈতিক দিক থেকে। আর এভাবে চিন্তা-ভাবনার মাধ্যমে আমাদের সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে দেশীয় দীর্ঘস্থায়ী টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে।

প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১২২তম সংখ্যা, অক্টোবর ২০২০

স্থপতি সজল চৌধুরী
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top