তারজালির নানা কথা

ঘরে ভয় চোরের, ফসলে ভয় হাঁস-মুরগি, পশুপাখির! বাড়ির কিংবা ফসলের নিরাপত্তায় প্রাচীনকাল থেকেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে নানা রকম বেড়া কিংবা ইট-কাঠ-বাঁশের দেয়াল। তবে দীর্ঘস্থায়ী ও তুলনামূলক দাম কম হওয়ায় হালে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে তারজালির ব্যবহার। মূলত বুননকৃত তার দিয়ে যে বেড়া বা নেট, একেই তারের বেড়া বা তারজালি বলা হয়। নিরাপত্তার স্বার্থে বা নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখতে তারজালি খুবই জনপ্রিয়। তারজালি শুধু বেড়া দিতেই নয় বরং ফেরোসিমেন্ট প্যানেল তৈরিতে, খোয়া-বালু চালার চালুনি বানাতে, জানালায় মশারোধী প্যানেল তৈরিসহ নানা কাজে ব্যবহৃত হয়।

রকমফের

চেইন নেট, ওয়্যার নেট, কাঁটাতার, পিভিসি ও জিআই এ পাঁচ ধরনের তার দিয়ে তারজালি তৈরি করা হয়। এর মধ্যে পিভিসির তারজালি হয় লাল, আকাশি, গোলাপি, হলুদ, সবুজ। এ ছাড়া কিছু কিছু জিআই তারও প্লাস্টিকে মোড়ানো থাকে। লাল প্লাস্টিকে মোড়ানো তারজালি কেবল কোয়েল পাখির জন্য ব্যবহার করা হয়। সব ধরনের তারজালি ফুট অনুযায়ী বিকিকিনি হয়। আর কাঁটা তার ও বালু চালনি ও খোয়া চালনির তারজালি কেজি দরে বিক্রি হয়।

যে কাজে লাগে

  • ঘাঁস-মুরগির বাণিজ্যিক খামারে
  • কবুতর, টার্কি ও পাখির খামারে
  • গরু, ছাগল, ভেড়া, ডেইরির বাণিজ্যিক খামারে (চারণভূমি ফেন্সিং)
  • কুমিরের বাণিজ্যিক খামারে
  • বাগানবাড়ির নিরাপত্তাবেষ্টনীতে
  • মৎস্য প্রকল্প/ পুকুরের চারপাশের নিরাপত্তার কাজে
  • নিজ বাড়ির নিরাপত্তায় সিকিউরিটি ফেন্সিংয়ে
  • বাড়ির আশপাশের ঝোপঝাড় নেট দিয়ে আটকে দিতে
  • ছোট ছোট বাচ্চাকে বেজি, গুইসাপ ও কুকুর থেকে সুরক্ষায়
  • বাসাবাড়িকে মশামাছি ও বিভিন্ন রকম পোকামাকড় থেকে সুরক্ষায়
  • সেনানিবাস ও বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সীমানায়
  • চারাগাছ সুরক্ষায়।

বিশেষত্ব

  • সহজে জং ধরে না
  • টিন ও বাঁশের বিকল্প
  • অনায়াসে ২০ বছর ব্যবহার করা যায়
  • সহজে ব্যবহারের উপযোগী
  • ক্ষার দ্বারা প্রভাবিত নয় ও টেকসই
  • রাসায়নিক এজেন্ট প্রতিরোধী
  • সহজে পরিবহন করা যায়
  • কংক্রিট, ইট, কাঠ বা প্লেট সিলিংসহ অনেক ধরনের পৃষ্ঠায় ব্যবহার করা যায়।

দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ

তারজালির দৈর্ঘ্যরে কোনো সীমা নেই। তবে প্রস্থ হয় দেড় ফুট থেকে ১০ ফুট পর্যন্ত। কাজের প্রয়োজন অনুসারে বিভিন্ন প্রস্থের তারজালি বানিয়ে নেওয়া যায়। বাসাবাড়িতে মশামাছি থেকে সুরক্ষার জন্য আড়াই ফুট প্রস্থের যেমন তারজালি রয়েছে, তেমনি বাণিজ্যিকভাবে অর্থকরি ফসলকে সুরক্ষাকারী ১০ ফুট প্রস্থের তারজালিও পাওয়া যায়।

নেট গ্যাপ বা ফাঁকার পরিমাণ

তারজালির নেট গ্যাপ বা ফাঁকার পরিমাণ সাধারণ প্রয়োজন অনুসারে করা হয়। বাসাবাড়িতে নেটের জালির গ্যাপ সাধারণত ১ মিলি মিটার থেকে ৪ মিলি মিটার পর্যন্ত হয়। আর বাণিজ্যিকভাবে খামারে নেট গ্যাপ হয় আধা ইঞ্চি থেকে শুরু করে ৪ ইঞ্চি পর্যন্ত।  

দরদাম

তারজালির দাম নির্ভর করে গ্যাপের বা ফাঁকার ওপর। গ্যাপের পরিমাণ কম হলে দাম বেশি। আর গ্যাপ বড় হলে দাম কম। সুরক্ষা বা নিরাপত্তায় সাধারণ আধা ইঞ্চি, এক ইঞ্চি, দেড় ইঞ্চি, দুই ইঞ্চি, আড়াই ইঞ্চি, তিন ইঞ্চি, সাড়ে তিন ইঞ্চি, চার বা সাড়ে চার ইঞ্চি পর্যন্ত গ্যাপ দেওয়া হয় বিভিন্ন তারজালিতে। গ্যাপ ছাড়াও তারের নম্বরের ওপর তারজালির দাম নির্ভর করে। ১০ নম্বর থেকে শুরু করে ২২ নম্বর পর্যন্ত তারে তারজালি বানানো হয়। নিচে বিভিন্ন রকমের তারের নম্বর, ফাঁকার পরিমাণ ও দরদাম দেওয়া হলো-

১০ নম্বর

ক্রমিকগ্যাপ বা ফাঁকার পরিমাণদাম (প্রতি বর্গফুট)
৩ ইঞ্চি১০-১২ টাকা
২ ইঞ্চি১২-১৪ টাকা
১ ইঞ্চি১৫-১৭ টাকা
১/২ ইঞ্চি১৭-২০ টাকা

১২ নম্বর

ক্রমিকগ্যাপ বা ফাঁকার পরিমাণদাম (প্রতি বর্গফুট)
৩ ইঞ্চি১০-১২ টাকা
২ ইঞ্চি১৬-১৮ টাকা
১ ইঞ্চি১৮-২০ টাকা
১/২ ইঞ্চি২০-২২ টাকা

১৪ নম্বর

ক্রমিকগ্যাপ বা ফাঁকার পরিমাণদাম ( প্রতি বর্গফুট)
৩ ইঞ্চি১০-১২ টাকা
২ ইঞ্চি১২-১৫ টাকা
১ ইঞ্চি১৫-১৭ টাকা
১/২ ইঞ্চি১৮-২০ টাকা

১৬ নম্বর

ক্রমিকগ্যাপ বা ফাঁকার পরিমাণদাম (প্রতি বর্গফুট)
৩ ইঞ্চি৮-১০ টাকা
২ ইঞ্চি১০-১২ টাকা
১ ইঞ্চি১২-১৪ টাকা
১/২ ইঞ্চি১৪-১৬ টাকা

বাসাবাড়িতে মশামাছি ও পোকামাকড় থেকে সুরক্ষার জন্য পাথর ও ইটের ভাঙা খোয়ার চালনিতে ১৮, ২০ ও ২২ নম্বর তারের জালি ব্যবহার করা হয়। আড়াই থেকে সাড়ে তিন ফুট প্রস্থের মশামাছি প্রতিরোধী তারজালির ব্যবহার সবচেয়ে বেশি। নেট গ্যাপ ১.৫ ও ২ মিলি মিটার ২২ নম্বর তারের জালি ১২০-১৩০ টাকা কেজি। ৩/৪ ইঞ্চি গ্যাপের খোয়া চালনি (পাথর/ইট ভাঙা) ১৮ নম্বর তারের আড়াই, তিন ও সাড়ে তিন ফুটের তারজালি ৫০-৫৫ টাকা। ১/২ ইঞ্চি গ্যাপের ১৮ নম্বর তারের খোয়া চালনি ৫৫-৬০ টাকা দরে বিক্রি হয়। ছকে রইল ১৮, ২০ ও ২২ নম্বর তারজালির বর্ণনা-

১৮ নম্বর

ক্রমিকতারের নম্বরগ্যাপ বা ফাঁকার পরিমাণদাম (প্রতি ফুট)
১৮১.৫ মিলি মিটার৫৫-৬০ টাকা
১৮২ মিলি মিটার৫৫-৬০ টাকা
১৮৩/৪ ইঞ্চি৫০-৫৫ টাকা
১৮১/২ ইঞ্চি৫০-৫৫ টাকা

২০ নম্বর

ক্রমিকতারের নম্বরগ্যাপ বা ফাঁকার পরিমাণদাম (প্রতি ফুট)
২০২ মিলি মিটার৫০-৫৫ টাকা
২০৩ মিলি মিটার৪৫-৫০ টাকা
২০৩/৪ ইঞ্চি৪০-৪৫ টাকা
২০১/২ ইঞ্চি৪০-৪৫ টাকা

২২ নম্বর

ক্রমিকতারের নম্বরগ্যাপ বা ফাঁকার পরিমাণদাম (প্রতি কেজি)
২২১.৫ মিলি মিটার১২০-১৩০ টাকা
২২২ মিলি মিটার১১০-১১৫ টাকা
২২২.৫ মিলি মিটার১০০-১০৫ টাকা
২২৩ মিলি মিটার৯০-১০০ টাকা

কয়েল হিসেবেও বিক্রি হয় তারজালি। ১৪ নম্বর তারের কয়েলের দাম ৪,৬০০-৪,৮০০ টাকা। এক কয়েল তারের ওজন ৫০ কেজি। প্রতি কেজি তারের দাম ৯০-৯৫ টাকা। ১০/১২ নম্বরের তার কয়েলের দাম ৩,৯৫০-৩,১০০ টাকা। প্রতি কেজির দাম ৭৮-৮৫ টাকা। প্রতি ১০০ ফুট বুনন মজুুরি ৮০ টাকা (১০/১২ নম্বর) প্রতি ঘণ্টায়। আর প্রতি ১০০ ফুট বুনন মজুুরি ১০০ টাকা (১৪ নম্বর) প্রতি ঘণ্টায়।

তারজালি তৈরি ও সরঞ্জামাদি

তারজালির মেশিনে বিভিন্ন মাপের ডাইস ও কাটার থাকে। যা তার কাটায় ব্যবহৃত হয়। তারগুলো পরে বুনন করতে হয়। ম্যানুয়াল মেশিন ও সেমি অটোমেশিনÑ এ দুভাবে তার বুনন করা যায়। ম্যানুয়াল মেশিন চালাতে তিন-চারজন লোকই যথেষ্ট। এর দাম ২৫ হাজার টাকা থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত। ম্যানুয়াল মেশিনে উৎপাদন কম হলেও তার নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা কম থাকে। আর তার যদি নষ্টও হয় তবে তা সহজে মেরামত করা যায়। অন্যদিকে অটোমেশিনে দিনে গড়ে ১০-১২ কেজি তার বাঁকা হয়ে নষ্ট হয়। ছোট সেমি অটোমেশিনের দাম ৯৫ হাজার টাকা থেকে দেড় লাখ টাকা। আর বড় অটোমেশিনের দাম ৭ লাখ টাকা থেকে শুরু করে ১৪ লাখ। সেমি অটোমেশিনে গ্যাপের মাপ দিয়ে দিলে অটোমেটিক বা স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার বের হয়। আবার অন্য মেশিনে বুনন করা যায়। আবার হাতেও বুনন করা যায়। অটোমেশিন চালানোর জন্য জায়গাও বেশি লাগে। এ মেশিন একজনই চালাতে পারে। ম্যানুয়াল মেশিনের চেয়ে অটোমেশিনের প্রোডাকশন ক্যাপাসিটি বা উৎপাদন সক্ষমতা বহুগুণ বেশি।

যেখানে পাবেন

সারা দেশের যেকোনো হার্ডওয়্যারের দোকানে তারজালির কাঁচামাল ও প্রস্তুতকৃত তারজালি পাওয়া যায়। ঢাকার নবাবগঞ্জ, শ্যামপুর, নাজিমুদ্দীন রোড, কেরানীগঞ্জে তারজালি ও এর তৈরির ম্যানুয়াল ও সেমি অটোমেশিন পাওয়া যাওয়া।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ১১২তম সংখ্যা, আগস্ট ২০১৯।

মোহাম্মদ রবিউল্লাহ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top