ক্লিংকার সিমেন্টের মূল উপাদান। এক টন ক্লিংকার উৎপাদনে এক টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হয়। বর্তমানে সারা বিশ্বে প্রায় ৪ ট্রিলিয়ন টন সিমেন্ট ব্যবহৃত হয়। যার ফলে সিমেন্ট শিল্প থেকে ৪ ট্রিলিয়ন টন কার্বন ডাই-অক্সাইড পরিবেশে নির্গত হয়। অর্থাৎ সারা বিশ্বে বায়ুমন্ডলে যে পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হয়, তার ১০ শতাংশ আসে সিমেন্ট শিল্প থেকে। সিমেন্ট শিল্প থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমনের হার কমানোর জন্য সিমেন্টের বিকল্প উপাদান ব্যবহার করা প্রয়োজন।
ক্লিংকার উৎপাদন কমানোর জন্য সম্ভাব্য বিকল্প উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে ব্লাস্ট ফার্নেস স্ল্যাগ, ফ্লাই অ্যাশের মতো পরীক্ষিত উপাদানসমূহ। গবেষণালব্ধ ফলাফল থেকে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে এই উপাদানসমূহ সিমেন্টে কেবল পরিবেশগত সমস্যার সমাধানের জন্যই ব্যবহৃত হয় এমনই নয়, বরং কংক্রিটের শক্তিও বাড়ায়। এর আগের প্রবন্ধে (৩য় পর্ব) চিহ্নিত করা হয়েছিল যে কংক্রিটের নমনীয়তা বাড়াতে, শক্তিমাত্রা বৃদ্ধিতে এবং দীর্ঘস্থায়িত্বের স্থাপনা নির্মাণে এই বিকল্প উপাদানগুলো অপরিহার্য।
সিমেন্টের মধ্যে বহুল ব্যবহৃত একটি মিনারেল অ্যাডমিক্সচার হলো ‘স্ল্যাগ’। এটি লৌহজাত শিল্পের একটি উপজাত দ্রব্য। এটি ব্লাস্ট ফার্নেস ব্যবহার করে লোহা প্রক্রিয়াজাত করার সময় তৈরি হয়। আয়রন স্ল্যাগ পানি দিয়ে দ্রুত ঠান্ডা করলে সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম কণিকায় পরিণত হয়। পরে এটি শুকানোর পর তা চ‚র্ণ করে মিহি পাউডারে রূপান্তর করে সিমেন্টের সঙ্গে মেশানো হয়। সিমেন্টের মতো আয়রন স্ল্যাগেও আছে সিলিকন ডাই-অক্সাইড ও ক্যালসিয়াম অক্সাইড। তাই এটি পানির সঙ্গে মিশে বাড়তি শক্তি প্রদান করে। এ ছাড়া এটি ক্লিংকারের হাইড্রেশনে যে ক্যালসিয়াম হাইড্রোঅক্সাইড উৎপন্ন হয় তার সঙ্গে বিক্রিয়া করে বাড়তি ক্যালসিয়াম সিলিকেট হাইড্রেট জেল তৈরি করে কংক্রিটের শক্তিমাত্রা আরও বৃদ্ধি করে।
নির্মাণসামগ্রীর প্রাপ্যতা বজায় রাখতে দীর্ঘস্থায়িত্বের উপযোগী স্থাপনা নির্মাণ করা অতীব জরুরি। সামুদ্রিক অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়িত্বের স্থাপনা নির্মাণ করা প্রকৌশলীদের জন্য একটি কঠিন কাজ। লবণাক্ত পানিতে প্রচুর ক্লোরাইড থাকে (প্রায় ২০,০০০ পিপিএম)। এই ক্লোরাইডগুলো কংক্রিটের ভেতরে অবস্থিত ক্যাপিলারি চ্যানেলের মাধ্যমে কংক্রিটের ভেতরে প্রবেশ করে। যার ফলে রডে মরিচার সৃষ্টি হয় এবং কংক্রিট স্থাপনার দীর্ঘস্থায়িত্ব হুমকিস্বরূপ হয়ে দাঁড়ায়। গবেষণালব্ধ ফলাফলের মাধ্যমে এটি প্রমাণিত হয়েছে যে স্ল্যাগ সিমেন্ট দিয়ে তৈরি কংক্রিটে খুব সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম ছিদ্র তৈরি হয়, যা সামুদ্রিক পানির মধ্যে অবস্থিত ক্লোরাইডকে কংক্রিটের ভেতরে প্রবেশে বাধা দেয়। যার ফলে কংক্রিটের মধ্যে অবস্থিত রডকে মরিচা পড়া থেকে সুরক্ষিত রাখে এবং কংক্রিট স্থাপনার দীর্ঘস্থায়িত্ব বাড়ায়।
স্ল্যাগ সিমেন্টের আরও কিছু উপকারিতা রয়েছে যেমন-স্ল্যাগ সিমেন্ট হিট অব হাইড্রেশন কমায়, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কংক্রিটের শক্তি বৃদ্ধি করে ইত্যাদি। আমাদের দেশের সিমেন্ট স্ট্যান্ডার্ডে (বিডিএস ইএন ১৯৭-১:২০০৩) স্ল্যাগের ব্যবহার করে কয়েক ধরনের সিমেন্ট যেমন: সিইএম টাইপ টু এ-এস, সিইএম টাইপ টু বি-এস এবং সিইএম টাইপ থ্রি- এ/বি/সি উল্লেখ করা হয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী কংক্রিটের স্থাপনা নির্মাণে, কংক্রিট স্থাপনার চারদিকের পরিবেশের কথা বিবেচনা করে সঠিক সিমেন্ট ব্যবহার করা অপরিহার্য। যেমন, সমুদ্রের পানিতে দীর্ঘস্থায়িত্বের কংক্রিটের স্থাপনা নির্মাণে স্ল্যাগ সিমেন্ট ব্যবহার করা যেতে পারে।
অধ্যাপক, সিভিল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্ট
ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি (আইইউটি), গাজীপুর।
প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১০৫তম সংখ্যা, জানুয়ারী ২০১৯