ইস্পাতের যত কথা

‘এগিয়ে যাও, ইস্পাত কঠিন মনোবল নিয়ে!’ শক্তিমাত্রার প্রতীক হিসেবে হরহামেশাই তুলনা চলে ইস্পাতের সঙ্গে। ইস্পাত অত্যন্ত শক্তিশালী ধাতব পদার্থ। বর্তমান বিশে^ ইস্পাত অন্যতম বহুল ব্যবহৃত পদার্থ। অবকাঠামো, স্থাপনা, যন্ত্রপাতি, জাহাজ, গাড়ি, তৈজসপত্র প্রভৃতি তৈরির অন্যতম প্রধান উপাদান ইস্পাত। স্থাপনা নির্মাণে এই অনুষঙ্গটির অবদান অতুলনীয়। ইস্পাত ছাড়া বহুতল ভবন বা বড় অবকাঠামো নির্মাণ অসম্ভবই বলা চলে। ইস্পাতের শক্তিমাত্রার কারণে এ উপকরণটি দিয়ে নির্মিত বা তৈরি করা সবকিছুই হয় অত্যন্ত দৃঢ়, শক্তিশালী ও দীর্ঘস্থায়ী। আর সে কারণেই বাড়ছে ইস্পাতের উৎপাদন ও ব্যবহার। গড়ে উঠছে প্রযুক্তিনির্ভর বড় বড় প্রসেসিং ও রি-রোলিং মিল। এই স্টিলই বিশ্বের সর্বাধিক ব্যবহৃত অ্যালয়, যার বৈশি^ক বার্ষিক উৎপাদন ১.৩ বিলিয়ন টন।

লোহা আর স্টিল দেখতে অনেকটাই সমধর্মী হওয়ায় অনেকের ধারণা উভয়ই একই পদার্থ কিংবা এদের মধ্যে পার্থক্য সামান্যই। কিন্তু এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। লোহা একধরনের রাসায়নিক খনিজ পদার্থ, যা ভূপৃষ্টে অথবা ভূগর্ভের নিচু স্তরে পাওয়া যায়। অপর দিকে স্টিল একধরনের অ্যালয়। অর্থাৎ দুই বা ততোধিক ধাতব ও অধাতব পদার্থের সমন¦য়ে তৈরি উপাদান। স্টিল মূলত লোহা ও কার্বনের মিশ্রণ। অনেকটাই লোহার বাই প্রোডাক্ট বা উপজাত। অথচ উভয়ের মধ্যে রয়েছে বিস্তর ফারাক। লোহা একটি মৌলিক পদার্থ, যার পারমাণবিক সংখ্যা ২৬; রাসায়নিক সংকেত ঋব। স্টিল লোহার থেকে হালকা তবে মজবুত ও দৃঢ়। উভয়ই মরিচাপ্রবণ হলেও পরিমাণে এগিয়ে লোহাই। উভয়ই রিসাইকেলঅ্যাবল বা পুনর্ব্যবহারযোগ্য। বিশ্বে ধাতুসমূহের প্রাচুর্যের দিক থেকে প্রকৃতিতে আলুমিনিয়ামের পর দ্বিতীয় স্থানে লোহা। তবে পৃথিবীর কেন্দ্রবিন্দুর অংশটি লোহার তৈরি বিধায় সেটাকে হিসাবে আনলে পৃথিবীতে লোহার পরিমাণই সবচেয়ে বেশি। তবে খাঁটি লোহা প্রকৃতিতে বিরল। প্রকৃত লোহা বেশ উজ্জ্বল রঙের হলেও বাতাসের সংস্পর্শে তা হয়ে পড়ে রুক্ষ। তা ছাড়া এটি বেশ নরম ও নমনীয়।

লোহা আবিষ্কৃত হয় খ্রিষ্টপূর্ব ২৫০০ থেকে ৩০০০ বছর আগে। যদিও প্রায় ৪ হাজার বছর আগে স্টিলের উদ্ভবের পর অদক্ষ উপায়ে শুরু হয় ইস্পাত তৈরি। তা সত্ত্বেও এটা ১৭শ শতাব্দীতে বেশি পরিচিতি পায় বেসমার প্রক্রিয়ায় (Bessemer Process) উন্নত উপায়ে ইস্পাত তৈরি শুরু হলে বাড়ে এর ব্যবহার। এ জন্য আগে প্রযুক্তির অভাবে কপারের ব্যবহার হতো বেশি। এই প্রক্রিয়ার ফলে ইস্পাতের উৎপাদন হয় সহজ ও ব্যয়সাশ্রয়ী। ফলে ধীরে ধীরে বিশ্বব্যাপী গড়ে ওঠে অসংখ্য স্টিল উৎপাদন কারখানা।

লোহা থেকে স্টিল অ্যালয়, ক্রুড আয়রন, রট আয়রন ও পিগ আয়রন তৈরি করা হলেও স্টিল অ্যালয় উৎপাদন প্রক্রিয়া কিছুটা জটিল। উৎপাদন প্রক্রিয়ায় বেশ সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়। স্মেল্টিং প্রক্রিয়ার উৎপাদন হয় স্টিল। উৎপাদনকালে লোহা থেকে আয়রন ওর (iron ore) ও অতিরিক্ত অক্সিজেন বের করে অন্যান্য রাসায়নিক মেশানো হয়। লোহার সঙ্গে ০.২ শতাংশ এবং ২.১ শতাংশ কার্বন যোগ করলে মূলত তা স্টিলে পরিণত হয়। এই মিশ্রণের ফলে প্রক্রিয়াজাতকৃত এই স্টিল প্রকৃত লোহার থেকে প্রায় ১ হাজার গুণ শক্তিশালী। এ ছাড়া নিকেল, ম্যাঙ্গানিজ, ভ্যানাডিয়াম, ক্রোমিয়াম, টাংস্টেনসহ অন্যান্য উপাদানও মেশানো হয়। এসব উপাদান স্টিলের শক্তিমাত্রা, ডাকটিলিটি ও টেনসাইল স্ট্রেন্থ বাড়াতে সাহায্য করে।

আকিজ ইসপাত

কার্বন দৃঢ়কারক এজেন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কার্বনের মিশ্রণের ফলেই স্টিল অত্যন্ত দৃঢ় ও শক্তিক্ষম ধাতু হয়ে ওঠে। নিকেল ও ম্যাঙ্গানিজ স্টিলের টেনসাইল স্ট্রেন্থ বাড়ায়। ক্রোমিয়াম শক্তিমাত্রা, দৃঢ়তা আর গলনাঙ্ক বাড়ায়। এ ছাড়া স্টিল উৎপাদনকালে সালফার লেভেলকেও নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। নইলে স্টিলের ডাকটিলিটি অর্জন ব্যাহত হয়। উৎপাদনের এই কম্পোজিশন নিয়মতান্ত্রিক ও সঠিক অনুপাতে না হলে ভালো মানের ইস্পাত পাওয়া যায় না। সঠিক কম্পোজিশনে উৎপাদিত স্টিল যে যে গুণাবলি অর্জন করে-

  • অগ্নিপ্রতিরোধক ক্ষমতা ( ৫০০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত)
  • মরিচারোধী ক্ষমতা
  • ভূমিকম্প প্রতিরোধ ক্ষমতা (সেসমিক লোডিং)
  • নমনীয় ও ঘাতসহনীয়
  • ওয়েল্ডিং ক্ষমতা
  • কংক্রিটের সঙ্গে বন্ডিং ক্ষমতা।

স্টিলের গুণগত মান শুধু রাসায়নিক কম্পোজিশনের ওপরেই নির্ভর করে না; এর উৎপাদন প্রক্রিয়া, কাঁচামালের গুণাগুণ, হিট ট্রিটমেন্ট ও কুলিং প্রসেসের ওপরেরও নির্ভরশীল। আগে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে স্টিল উৎপাদিত হলেও এখন কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত আধুনিক ও স্বয়ংক্রিয় মেশিনে উৎপাদিত হচ্ছে স্টিল। বিশ্বে স্টিলের প্রধান কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয় আকরিক লোহা নতুবা পুরোনো জাহাজ থেকে সংগ্রহকৃত লৌহজাত অংশ। এই লোহাকে রিরোলিং মিলে প্রথমত কাক্সিক্ষত হিট ট্রিটমেন্টের মাধ্যমে উপকরণসমূহকে গলানো হয়। এরপর কাক্সিক্ষত আকার, মাপ ও স্টিলের ব্র্যান্ডনেম প্রদান করে রোলিংকে কুলিং বেডে টেম্পকোর কুলিং সিস্টেমের মাধ্যমে ঠান্ডা করা হয়। শীতল পানির মধ্য দিয়ে স্টিল বার যখন প্রেরণ করা হয় তখন তাপমাত্রার ব্যাপক পরিবর্তনে এই ধাতুটিকে অত্যন্ত শক্তি প্রদান করে।

ভালো মানের ইস্পাত বাইরে প্রচণ্ড শক্তিশালী হলেও ভেতরে থাকে নমনীয় যা স্টিলকে দেয় প্রচণ্ড টেনসাইল স্ট্রেন্থ ও ইলোংগেশন ক্ষমতা। এ ছাড়া স্টিলে আরও যা যা গুণাবলি থাকে-

  • স্ট্রেন্থ
  • টাফনেস
  • ডাকটিলিটি
  • ওয়েল্ডঅ্যাবিলিটি
  • ডিউরাবিলিটি।

এমনই এক স্টিল টিএমটি (TMT) বার। টিএমটি বার বলতে বোঝায় থার্মো-ম্যাকানিক্যালি ট্রিটেড/ট্রিটমেন্ট (Thermo Mechanically Treated)। উচ্চ-শক্তিমাত্রার রেইনফোর্সমেন্ট বারের বাইরের শক্ত ও ভেতরের নমনীয় কোর অর্জন করে ভূমিকম্প ও মরিচারোধী ক্ষমতা। টিএমটি বার অন্য বারের তুলনায় বেশি শক-ওয়েভ শোষণক্ষম। এটি ভূমিকম্পের সময় ভবন ধসে বাধা দেয় এবং কাঠামোর দীর্ঘায়ু নিশ্চিত করে। সাধারণ ইস্পাত বারের তুলনায়, একই পরিমাণে টিএমটি বার গঠন ২০ শতাংশ অতিরিক্ত শক্তি সরবরাহ করে।

যেখানে আর্দ্রতা বেশি সেখানে এ ধরনের ইস্পাত ব্যবহার করা উচিত। তবে এই বারের শক্তিক্ষমতা ও কার্যকারিতা রাসায়নিক পরীক্ষা ও ম্যাকানিক্যাল প্রপার্টিজের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয় এর ডাকটিলিটি ক্ষমতা। বর্তমানে ইস্পাতের সঙ্গে ৫০০W রড  কথাটি জুড়ে দেয়া হয়, যার আসল অর্থ অনেকেরই অজানা। অর্থটি জেনে নেওয়া যাক-

এখানে W বলতে বোঝায় Welded

১ Welded = ১৪৫ psi,

৫০০x১৪৫=৭২৫০০ psi বা ৭২ গ্রেড রড।

৭২৫০০ psi হলো রডের ঈল্ড শক্তি। লোড এই শক্তির বেশি হলে রড টেনশনে ব্যর্থ হবে। ফলে স্ট্রাকচার ফেইল করবে।

আকিজ ইসপাত

স্টিলের সেসমিক স্ট্রেসের ডায়াগ্রাম

এখন বাংলাদেশেও উৎপাদিত হচ্ছে উন্নতমানের ইস্পাত। আগে লৌহজাত পণ্য উৎপাদনের একমাত্র প্রতিষ্ঠান ছিল চট্টগ্রামের পতেঙ্গাস্থ চিটাগাং স্টিল মিল। আকরিক লোহা থেকে এই কারখানায় বিভিন্ন লৌহজাত পণ্য উৎপাদিত হতো। তবে বর্তমানে স্টিল মিলটি বন্ধ রয়েছে। তবে এরপর দেশের বিভিন্ন এলাকায় অসংখ্য স্টিল অ্যান্ড রি-রোলিং মিল গড়ে উঠেছে। যেখানে রড ও লৌহজাত নানা পণ্য উৎপাদিত হচ্ছে। এসব স্টিল অ্যান্ড রিরোলিং মিলে কাঁচামাল হিসেবে বিদেশ থেকে কিনে আনা পুরোনো জাহাজের অংশ কেটে ব্যবহার করা হয়। জাহাজের কাটা অংশ ছাড়াও বিদেশ থেকে আমদানি করা আকরিক লোহা ব্যবহৃত হয়। দেশে এখনো সামগ্রিক চাহিদার বিপরীতে লৌহজাত পণ্য উৎপাদনশিল্পে ঘাটতি থাকলেও দেশে অনেক সুউচ্চ ভবন, আবাসিক ফ্ল্যাটসহ বৃহৎ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি দৈর্ঘের সেতু, ফ্লাইওভার নির্মাণ ও বিভিন্ন ধরনের উন্নয়নকাজে দেশি কোম্পানিগুলো ইস্পাত পণ্য সরবরাহ করছে। প্রতিবছর দেশে লৌহজাত পণ্যের চাহিদা বাড়ছে ১০ শতাংশ হারে।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৯৫তম সংখ্যা, মার্চ ২০১৮।

মঈন আহমেদ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top