শীত ফুরিয়ে এখন বসন্ত। হালকা শীত আর গরমের মিশেলে সময়টা মন্দ নয়। তবে প্রকৃতির এই নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া বেশি দিন থাকবে না! কারণ কড়া নাড়ছে গ্রীষ্ম! গ্রীষ্ম মানেই গনগনে সূর্যের প্রচণ্ড উত্তাপ আর ভ্যাপসা গরম। এই উত্তাপ কখনো কখনো রূপ নেয় তীব্র তাপদাহে। অসহনীয় গরমে ওষ্ঠাগত হয় প্রাণ। এই অবস্থায় পাখা বা এসি ছাড়া ঘরে টেকাই দায়। এতে আবার আগুনে ঘি ঢালে লোডশেডিং। গ্রীষ্মে স্বভাবতই বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় লোডশেডিং হয় ঘন ঘন। সারা দিনের কর্মব্যস্ততা সেরে ঘরে ফেরা কর্মজীবী মানুষের জীবন হয়ে ওঠে দুর্বিষহ। শিশু ও বৃদ্ধদের অবস্থা হয় আরও শোচনীয়। আইপিএস দিয়ে লোডশেডিং সমস্যার কিছুটা সমাধান হলেও এই অনুষঙ্গটির দাম অনেকের নাগালের বাইরে। তবে সবার সাধ্যের মধ্যে এমন বিরক্তিকর গরমে প্রশান্তি আনতে পারে চার্জার তথা রিচার্জেবল ফ্যান।
জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে রোদের তীব্রতা; ক্রমেই উষ্ণ হয়ে উঠছে পৃথিবী। তা ছাড়া গাছপালা, জলাধার ও উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ কমে যাওয়ায় নগরজীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলছে উষ্ণতার এই তীব্রতা। যদিও আধুনিক বিজ্ঞান এয়ারকন্ডিশনার, এয়ারকুলার ও বৈদ্যুতিক ফ্যানের মতো উপকরণ উদ্ভাবনের মাধ্যমে জনজীবনে স্বস্তি আনলেও শিল্পায়ন, নগরায়ণ আর মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদা যে হারে বাড়ছে, সে হারে বাড়ছে না স্বস্তি। আগে স্বল্প সময় লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণা হলেও এখন তা অনেকেটাই মাত্রাছাড়া। আর তাই দীর্ঘ সময়ের জন্য সাধারণ মানের রিচার্জেবল ফ্যান সময়োপযোগী ও কার্যকর নয়। এখন লোডশেডিংয়ের ব্যাপ্তি ঘণ্টার পর ঘণ্টা এমনকি বৈদ্যুতিক ত্রুটির কারণে দিন-রাত ব্যাপী হওয়ায় দীর্ঘ সময় ব্যাকআপ দিতে পারে এমন ফ্যান বেছে নেওয়াই উত্তম।
সাধারণত গরমে অতিষ্ঠ হয়ে সবাই ছুটে যান ইলেকট্রনিকস পণ্যের দোকানে অথবা ফুটপাতে বসা রিচার্জেবল ফ্যান বিক্রেতার কাছে। সেখান থেকে কিনে আনেন সস্তা বা কাজ চালানোর মতো রিচার্জেবল ফ্যান। এরপর কিছুদিন যেতে না-যেতেই দেখা যায় ফ্যানটি নষ্ট হয়ে গেছে নতুবা আগের মতো বাতাস দিচ্ছে না। কারণ, গরমের সময় চাহিদা বেশি থাকায় নিম্নমানের রিচার্জেবল ফ্যানে ছেয়ে যায় বাজার। মাত্র ২০০ টাকায় পাওয়া যায় এসব ফ্যান, সঙ্গে থাকে আলো জ্বালানোর ব্যবস্থা। এসব ফ্যান সাময়িক সেবা দিতে পারলেও কার্যক্ষমতা একেবারেই কম। এ জন্য জেনে-বুঝে ফ্যান কিনতে না পারলে প্রতারিত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।
বাজারে ব্র্যান্ড ও ননব্র্যান্ড এই দুই ধরনের রিচার্জেবল ফ্যান পাওয়া যায়। এগুলোর অধিকাংশই চীন থেকে আমদানি করা। এ ছাড়া জাপান, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, হংকং, পাকিস্তান, ভারতসহ বিভিন্ন দেশের নানান ব্র্যান্ডের ফ্যানও পাওয়া যায়। এসবের মধ্যে সনি, মিয়াকো, ওসাকা, নোভা, কেনেডি, সানকা, ফিয়াট, ডিফেন্ডার, সিবেক, কোনিওন প্রচলিত ব্র্যান্ড। এসব পণ্যের চাহিদা মোকাবিলায় ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে দেশীয় কোম্পানিগুলো। ব্র্যান্ড ছাড়াও আমাদের দেশে তৈরি ছোট ও মাঝারি আকারের অনেক ননব্র্যান্ডের চার্জার ফ্যান পাওয়া যায়। মানভেদে এই চার্জার ফ্যানের দামও ভিন্ন। ফ্যানের ব্যাটারির ক্যাপাসিটির ওপর এর দাম নির্ভর করে। ভালো মানের ফ্যানগুলো একবার চার্জে এক নাগাড়ে তিন থেকে ছয় ঘণ্টা চলে। অধিকাংশ ফ্যানেই রয়েছে এক বছরের ওয়ারেন্টি।
চার্জার ফ্যানের ডিজাইনেও রয়েছে ভিন্নতা। বক্স বা চারকোনা, গোলাকার, ডিম্বাকার আকৃতির বিভিন্ন ফ্যানগুলো আসলে টেবিল ফ্যানের মতোই। বেশির ভাগ ফ্যানের সঙ্গে আবার থাকে চার্জার লাইটও। এতে আরো রয়েছে রিচার্জেবল ব্যাটারি ও ইউএসবি পোর্ট সুবিধা। কিছু ফ্যানে আবার থাকে রিমোট কন্ট্রোল সুবিধাও। চার্জার ফ্যানগুলো সাধারণত ৮” থেকে ১৬” পর্যন্ত হয়ে থাকে। তবে ১০” ও ১২” ফ্যানের চাহিদাই বেশি।
রিচার্জেবল ফ্যানের ব্যবহারবিধি
- চার্জার ফ্যান কেনার পর ব্যবহার না করে একটানা ৮-১২ ঘণ্টা চার্জ দিতে হবে।
- পরবর্তী সময়ে ব্যবহারকালীন চার্জ শেষ হওয়ার আগেই চার্জ দিতে হবে। সে ক্ষেত্রে দুই থেকে তিন ঘণ্টা চার্জ দিলেই চলবে, তবে দীর্ঘ সময় ধরে নয়।
- এই ফ্যান দীর্ঘ সময় ধরে একটানা ব্যবহার না করাই ভালো।
- চার্জার ফ্যান সাধারণত পোর্টেবল হয় বিধায় এটি যাতে পড়ে না যায় এমন স্থানেই রাখা উচিত।
- কখনো যদি ফ্যানের ব্যাটারি নষ্ট হয়ে যায় তবে ফ্যানটি ফেলে না দিয়ে ২০০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে নতুন ব্যাটারি কিনে লাগিয়ে নিতে পারেন।
কেনার আগে
- গরম বেশি পড়লে রিচার্জেবল ফ্যানের চাহিদা বাড়ে। সে সুযোগে ব্যবসায়ীরাও বাড়িয়ে দেন পণ্যেটির দাম। এ জন্য তীব্র্র গরম পড়ার আগেই সংগ্রহ করুন আপনার পছন্দের চার্জার ফ্যানটি।
- কেনার আগে অবশ্যই ফ্যানটির গুণগত মান, চার্জ ব্যাকআপ সম্পর্কে অবশ্যই ভালোভাবে জেনে নেবেন।
- বিক্রয়োত্তর সেবা সম্পর্কেও জানবেন বিশেষ করে পণ্যের সঙ্গে ওয়ারেন্টি কার্ড থাকলে সেটি যত্ন করে রাখুন।
- কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ফ্যান বিক্রির আগে ফ্যানের আসল ব্যাটারি পাল্টে কম দামের বা ব্যবহৃত ব্যাটারি ফ্যানে ভরে রাখুন। সে ক্ষেত্রে ইনটেক প্যাকেট দেখেই ফ্যান কেনা ভালো।
- রিচার্জেবল ফ্যানের সঙ্গে যদি লাইটিং সিস্টেম থাকে তাহলে তা যেন এলইডি লাইট হয় তা নিশ্চিত করে নেবেন।
দরদাম
ফ্যানের সাইজ, ডিজাইন ও ব্র্যান্ডভেদেই নির্ধারিত হয় রিচার্জেবল ফ্যানের দাম। আমদানি করা ভালো মানের চার্জার ফ্যানের দাম কিছুটা বেশি হলেও পণ্যের গুণগত মান ভালো হয়। এ ধরনের ফ্যানের দাম সাধারণত ২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ৫ হাজার টাকা হয়ে থাকে। ১২” ফ্যানের দাম ২ হাজার থেকে ৩ হাজার, ১৪” ২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ৩ হাজার এবং ১৬” ফ্যান কিনতে হলে গুনতে হবে ৩ হাজার টাকা। এ ছাড়া রিমোট কন্ট্রোল চার্জার ফ্যান পাওয়া যাবে ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকার মধ্যে। স্ট্যান্ডসহ ফ্যানের দাম ৫০০ টাকা বেশি পড়বে। দেশি চার্জার ফ্যানের দাম ৬০০ টাকা থেকে ২ হাজার টাকার মধ্যে মিলবে। এ ছাড়া মাত্র ২০০ থেকে শুরু করে ৫০০ টাকার মধ্যেও মিলবে চার্জার ফ্যান। সম্প্রতি বাজারে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১৫০ টাকা থেকে ২০০ টাকার মধ্যে ছোট আকারের ইউএসবি চার্জার ফ্যান।
যেখানে পাবেন
রাজধানীর স্টেডিয়াম মার্কেট, বায়তুল মোকাররম মার্কেট, পুরান ঢাকার নবাবপুর, চকবাজার ও গুলিস্তানের সুন্দরবন স্কয়ার মার্কেটে মিলবে হরেক ডিজাইন ও ব্র্যান্ডের রিচার্জেবল ফ্যান। পাইকারি ও খুচরা উভয়ভাবেই বিক্রি হয় এসব মার্কেটে। এ ছাড়া নিউমার্কেট, বসুন্ধরা সিটি, মৌচাক মার্কেট, মোহাম্মদপুরের টাউন হল মার্কেট, মিরপুর, গুলশান ডিসিসি মার্কেটসহ সারা দেশের ইলেকট্রনিকস পণ্য বিক্রির দোকানগুলোতে পাবেন আপনার কাক্সিক্ষত ফ্যান। তবে বড় শপিং মলগুলোতে দাম পড়বে একটু বেশি। ইলেকট্রিক্যাল সার্ভিসের দোকানগুলোতে ফরমাশ দিয়ে বানিয়েও নিতে পারেন দরকারি এ অনুষঙ্গটি।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৯৫তম সংখ্যা, মার্চ ২০১৮।