ইমারত বা দালানের সৌন্দর্যের অন্যতম অনুষঙ্গ রং। যে কেউ মোহিত হয় রঙের উজ্জ্বলতায়। বাড়ি বানাতে কোটি টাকা খরচ করলেই সুন্দর হয় না, যদি না রঙের বাহারটা অসাধারণ না হয়। এখন আর আগেকার চুনরং নেই। যুগের পরিবর্তনে এসেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। দিন দিন রং-এর সুন্দর আর সৌন্দর্যে মোহিত হচ্ছে মানুষ। নতুন নতুন আবিষ্কার রাঙিয়ে দিচ্ছে দুনিয়াকে। শুধু লাল, নীল আর সবুজ, গোলাপিতে মন তুষ্ট হবার দিন শেষ। এখন উন্নত মানের রঙের দুনিয়া ঘুরে, ঘুরতে শুরু করবে আপনার-আমার মাথাও। আসুন, এমন একটি অসাধারণ রঙের দুনিয়ায় ঘুরে আসি; জেনে নেই সিনথেটিক এনামেলের আদ্যান্ত।
সিনথেটিক এনামেল হচ্ছে বিশেষ ধরনের রঙীন আবরণ, যা ব্যবহার করা হয় তাপবায়ু, ধুলাবালু থেকে পরিত্রাণের জন্য বাড়ির বাইরের অংশে ব্যবহার করা হয় রঙের সঙ্গে। তাপমাত্রার বৈচিত্র্যে যেন বাড়ির রং ঝলসে না যায়, তার জন্যই একটি রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে এই সিনথেটিক এনামেল।
মূলত সিনথেটিক এনামেল প্রস্তুত করা হয় কাচের গুঁড়ো সাচ স্ট্যাড সিনথেটিক থেকে রিজিনের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে নরম; গঠনগতভাবে সম্পূর্ণ ভিন্ন। রঙের কোমলতা বাড়ানোর জন্য ব্যবহৃত এই সিনথেটিক এনামেল দেয়ালের উজ্জ্বলতা বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে দেয়ালের স্থায়িত্বও বাড়িয়ে দেয় দ্বিগুণ। কখনো কখনো লোহার ওপর প্লাস্টিক পেইন্ট না লাগার কারণে ও সিনথেটিক এনামেল পেইন্ট ব্যবহার করা হয়। সিনথেটিক ও সাধারণ, এই দুই ধরনের এনামেল পেইন্ট বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। তাই আমরা আজ জানাব সিনথেটিক এনামেলের রূপ, গুণ আর এর চরিত।
গ্লস সিনথেটিক এনামেল
গ্লস সিনথেটিক এনামেল দেয়াল সুরক্ষার এক জাদুকরি ব্যবস্থার নাম, যা সর্বোৎকৃষ্ট মানের সিনথেটিক রেজিন ও উন্নতমানের পিগমেন্ট সমন্বয়ে তৈরি। কাঠ, বাঁশ, বেত, হার্ডবোর্ড, লোহা এবং টিন-জাতীয় পদার্থের দীর্ঘস্থায়ী সুরক্ষায় এটি ব্যবহৃত হয়। চকচকে ও দীর্ঘ স্থায়িত্বের বিকল্পহীন এক ব্যবস্থাপনার নাম গ্লস সিনথেটিক এনামেল।
সিনথেটিক এনামেল ম্যাট
সিনথেটিক এনামেল ম্যাট বর্তমানে সবচেয়ে উন্নত সিনথেটিকের একটি। দেয়ালের উজ্জ্বলতা চিরস্থায়ীকরণে অসাধারণ ক্ষমতা ও স্থায়ী শক্তির অপর নাম এনামেল ম্যাট। অক্ষুণ্ন স্তরভাগে দেয়ালকে টিকিয়ে রাখে বছরের পর বছর। দক্ষ হাতের কারুকার্যে ব্যবহার হলে টেকসই বাস্তবতাকে হার মানাবে। রঙের জগতের অসাধারণ বন্ধু হয়ে আছে সিনথেটিক এনামেল ম্যাট।
সি এনামেল
সি এনামেল প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বাড়িয়ে রঙের কারুকার্যে বৈচিত্র্য আনে। অসাধারণ প্রতিরোধ ক্ষমতায় সুগঠিত। সৌন্দর্যেও ভিত্তি স্থাপন করে সি এনামেল। পানিবাহী বা বৃষ্টির হাত থেকে সুরক্ষা পেতে সি এনামেল সিনথেটিক এক অবিশ্বাস্য পদ্ধতি। দেয়াল বিল্ডিংয়ের স্থায়িত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য সি এনামেলের ব্যবহার অনেক অনেক বেশি।
সিনথেটিক অ্যান্টি করোসিভ
লোহার নমুনার ওপর পোলানিয়ালিন রাসায়নিকভাবে সংশ্লেষিত একটি নমুনা হিসেবে এই সিনথেটিক অ্যান্টি করোসিভের জুড়ি মেলা ভার। তুলনামূলক পরীক্ষাগুলোতে দেখা যায় যে পোলানিয়ালিনের আনারলডিন বেসফর্মে সিনথেটিক অ্যান্টি করোসিভের গুরুত্ব অনেক অনেক বেশি। আর এর মাধ্যমে অসাধারণ সুরক্ষামূলক বৈশিষ্ট্য রয়েছে সিনথেটিক অ্যান্টি করোসিভের।
সিনথেটিক আন্ডার কোট
একটি কৃত্রিম রাবার সিনথেটিক, উন্নত শিল্পে উন্নত রাষ্ট্রে ব্যবহৃত একটি এনামেল ফেভার পেইন্ট। সিনথেটিক আন্ডার কোট অসাধারণ সুন্দর আর বাহারি রঙের চোখ ধাঁধানো উজ্জ্বলতার প্রতীক। এই সিনথেটিক দেয়ালসহ কাঠ কিংবা লৌহায়ও ব্যবহার করা হয়।
নানা ধরনের সিনথেটিকের ব্যবহার
কালের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মনেরও পরিবর্তন ঘটে। তাই পরিবেশ ও আবহাওয়ার সঙ্গে অধিকতর সামঞ্জস্য ও টেকসই থাকার জন্য মানুষের ব্যবহৃত দৈনন্দিন বস্তুতে রং, বার্নিশ বা কারুশিল্পের প্রয়োজন। সৌন্দর্যবর্ধনের পাশাপাশি পরিবেশের প্রতিকূল আবহাওয়া ও অবস্থা থেকে রক্ষার জন্যই সাধারণত রং ব্যবহার করা হয়।
যেমন: আমাদেন দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত আসবাবের মধ্যে অধিকাংশই তৈরি হয় সাধারণত কাঠ, বেত, বাঁশ, হার্ডবোর্ড, প্লাইউড এবং বিভিন্ন ধাতু দিয়ে। ধাতু ছাড়া এসব বস্তু সাধারণত কীটপতঙ্গ, ছত্রাক বা উঁই পোকার আক্রমণের শিকার হয় এবং স্থায়িত্ব কমে যায় তাই গুণগতমান ও স্থায়িত্বের কথা বিবেচনা করে বিভিন্ন ধরনের বস্তুর ওপর বিভিন্ন ধরনের রং বা বার্নিশের প্রলেপ দেওয়া হয়। এতে সব ব্যবহৃত বস্তুর কার্যকারিতা বেড়ে যায় অনেকাংশে।
অন্যদিকে বিভিন্ন ধাতুর তৈরি স্থাপনা বা সরঞ্জাম অধিকতর ক্ষয়রোধকারী হিসেবে ব্যবহার উপযোগী করার লক্ষ্যেই রং প্রলেপনের প্রয়োজন। বর্তমান যুগে আবাসনের ক্ষেত্রে একটি বিরাট অংশে জুড়ে আছে ইট ও সিমেন্টে তৈরি বিল্ডিং দেয়াল বা অট্টালিকার দেয়াল। এসব দেয়াল ক্ষয়রোধকারী বৈশিষ্ট্য অর্জিত না হলে তা অধিকতর ব্যবহার উপযোগিতা হারাবে। তাই সৌন্দর্যবর্ধনের পাশাপাশি দীর্ঘস্থায়িত বাড়াতেও রং প্রলেপনের প্রয়োজন।
সিনথেটিক এনামেল এলোমোশনের জন্য আবশ্যিক
আমাদের জানা দরকার, আলোর উজ্জ্বলতার সঙ্গে বা সংমিশ্রণে তৈরি হয় রঙের ভিন্নতা। রঙে আসে অসাধারণতা। তাই রঙের অ্যাঙ্গেল নির্ধারণ জরুরি। রঙের গুরুত্বপূর্ণ নানামাত্রিক দিক:
| রঙের নাম | রঙের অ্যাঙ্গেল |
| লাল আলো বা রং | ৬৩৫-৭০০ ন্যানো মিটার |
| কমলা আলো বা রং | ৫৯০-৬৩৫ ন্যানো মিটার |
| হলুদ আলো বা রং | ৫৬০-৫৯০ ন্যানো মিটার |
| সবুজ আলো বা রং | ৫০০-৫৬০ ন্যানো মিটার |
| নীল আলো বা রং | ৪৫০-৪৯০ ন্যানো মিটার |
| বেগুনি আলো বা রং | ৪০০-৪৫০ ন্যানো মিটার |
রং বা সিনথেটিক এনামেলের ব্যবহার নির্দেশিকা
রং করার জায়গা পরিমাপের সাধারণ হিসাব
যে জায়গা রং করতে হবে প্রথমেই উচিত সেই জায়গার পরিমাপ জেনে নেওয়া। কারণ, পরিমাপ জানা না থাকলে রঙের হিসাব এবং দাম ঠিকভাবে মেলানো কষ্টকর। তাই এ ক্ষেত্রে একজন দক্ষ রংমিস্ত্রি অথবা যেকোনো পেইন্টসের কাস্টমার সার্ভিসে যোগাযোগ করা যেতে পারে। তবে জায়গার পরিমাপ করার জন্য নিচে একটি সাদামাটা উদাহরণ দেওয়া হলো, যাতে করে আপনিও নিজে একটি ধারণা পেতে পারেন।
ধরুন আপনি একটি বাড়ি নির্মাণ করেছেন যাতে পাঁচটি কক্ষ রয়েছে। এখন আপনি একটি কক্ষের হিসাব কষে পুরো বাড়ির দেয়ালের পরিমাপ জানতে পারবেন। যেমন- বলা হলো আপনার বেডরুম অর্থাৎ শোবার ঘর রং করতে হবে, তাতে ঘরটির বর্ণনা যদি এ রকম হয় যে এর দৈর্ঘ্য ১৮ ফুট প্রস্থ ১২ ফুট এবং উচ্চতা ৯ ফুট এবং বলা হলো কক্ষটিতে একটি ৩ দশমিক ৭ ফুট মাপের দরজা আছে এবং ৪ দশমিক ৫ ফুট মাপের জানালা আছে। তাহলে নিচের হিসাবের সাহায্যে সহজেই এই ঘরের পরিমাপ বের করা যায়।
জরুরি চার দেয়ালের ক্ষেত্রফল জানা
চার দেয়ালের মোট ক্ষেত্রফল = ২ x দৈর্ঘ্য + ২ x প্রস্থ x উচ্চতা
অথবা
২ x দেয়ালের দৈর্ঘ্য + ২ x দেয়ালের প্রস্থ x দেয়ালের উচ্চতা
= ২ x ১৮ + ২ x ১২ x ৯
= ৩৬ + ২৪ x ৯
= ৬০ x ৯
= ৫৪০ বর্গফুট।
এবার ছাদের ক্ষেত্রফল = ১৮ x ১২ = ২১৬ বর্গফুট
দরজার জায়গার পরিমাণ = ৩ x ৭ = ২১ ফুট
জানালার জায়গার পরিমাণ = ৪ x ৫ = ২০ ফুট
তাহলে বেডরুম অর্থাৎ শোবার ঘরটির মোট পরিমাপ পেতে হলে দেয়াল এবং ছাদের পরিমাপ যোগ করে তা থেকে দরজা ও জানালার পরিমাপ বাদ দিতে হবে।
মোট পরিমাপ = ( ৫৪০ + ২১৬) – (২১ + ২০)
= ৭৫৬ – ৪১
= ৭১৫ বর্গফুট।
দরদাম
কোম্পানিভেদে সিনথেটিক এনামেলের মূল্য তালিকা-
হিসাবের সুবিধার্থে প্রতি এক লিটার বিবেচনায় মূল্য তালিকা-
এ ছাড়া অন্যান্য কোম্পানির বিভিন্ন মূল্যের সিনথেটিক এনামেল পাওয়া যায়। বাজার ঘুরে কেনা সেরা এনামেলটাই আপনার ঘরকে উজ্জ্বল ও রঙীন করবে।
সিনথেটিক এনামেলের ব্যবহার উপকরণ ও দরদাম
বিভিন্ন ধরনের দেয়াল রং করার কৌশল
দেয়ালের প্রকার
নতুন তৈরি দেয়ালের ভেতরের অংশ ও বাইরের অংশ। এ ছাড়া আরও দুই ধরনের দেয়াল রয়েছে, যা পুরোনো দেয়ালের ভেতরের অংশ ও বাইরের অংশ। এই দেয়ালে বিভিন্নভাবে রং করতে হয়।
নতুন দেয়াল
প্রথমে দেয়াল ভালোভাবে ৪০/৬০ গ্রেডের পাথর অথবা ১১০ সিরিশ কাগজ দিয়ে ভালোভাবে ঘষে নিতে হবে। এক কোট ইনটেরিয়র ওয়াটার বেস সিলার দিতে হবে। ৪-৬ ঘণ্টা শুকানোর পরে ওয়াল পাট্টি দিয়ে দেয়াল মসৃণ করতে হবে। এরপর পছন্দমতো অ্যাকোয়া ডিপ্লাস, প্লাস্টিক এমালসন, স্লিক এমালসনের সঙ্গে পরিমাণমতো পানি মিশিয়ে পরপর দুই কোট ব্যবহার করলে চমৎকার ফল পাওয়া যাবে।
পুরোনো দেয়াল
প্রথমে দেয়াল ভালোভাবে ৪০/৬০ গ্রেডের পাথর অথবা ১১০ সিরিশ কাগজ দিয়ে ভালোভাবে ঘষে নিতে হবে। কোথাও কোনো ছিদ্র বা ফাটা থাকলে তা সারিয়ে নিতে হবে। এক কোট ইনটেরিয়র ওয়াটার বেস সিলার দিতে হবে। ৪-৬ ঘণ্টা শুকানোর পরে ওয়াল পাট্টি দিয়ে দেয়াল মসৃণ করতে হবে। এরপর পছন্দমতো অ্যাকো ডিপ্লাস প্লাস্টিক এমালসন, স্লিক এমালসনের সঙ্গে পরিমাণমতো পানি মিশিয়ে পরপর দুই কোট ব্যবহার করলে চমৎকার ফল পাওয়া যায়।
নতুন তৈরি দেয়ালের বাইরের অংশ
নতুন দেয়াল
প্রথমে দেয়াল ভালোভাবে ৪০/৬০ গ্রেডের পাথর অথবা ১১০ সিরিশ কাগজ দিয়ে ভালোভাবে ঘষে নিতে হবে। কোথাও কোনো ছিদ্র বা ফাটা থাকলে তা সারিয়ে নিতে হবে। বাইরের অংশে পুটিং না করাই ভালো। কারণ, বৃষ্টির পানিতে পুটিং ফুলে উঠতে পারে। এক কোট এক্সটেরিয়র ওয়াটার বেস সিলার দিতে হবে। ৪-৬ ঘণ্টা শুকানোর পরে পছন্দমতো অ্যাকো ডিপ্লাস, আউটার কোট, আউটার চমকের সঙ্গে পরিমাণমতো পানি মিশিয়ে পরপর দুই কোট ব্যবহার করলে চমৎকার ফল পাওয়া যায়।
পুরোনো দেয়াল
প্রথমে দেয়াল ভালোভাবে ৪০/৬০ গ্রেডের পাথর অথবা ১১০ সিরিশ কাগজ দিয়ে ভালোভাবে ঘষে নিতে হবে। ছত্রাক, ফাঙ্গাশ-জাতীয় বস্তু থাকলে তা পরিষ্কার করতে হবে। কোথাও কোনো ছিদ্র বা ফাটা থাকলে তা সারিয়ে নিতে হবে। বাইরের অংশে পুটিং না করাই ভালো। কারণ, বৃষ্টির পানিতে পুটিং ফুলে উঠতে পারে। এক কোট এক্সটেরিয়র ওয়াটার বেস সিলার দিতে হবে। ৪-৬ ঘণ্টা শুকানোর পরে পছন্দমতো অ্যাকো ডিপ্লাস, আউটার কোট, আউটার চমকের সঙ্গে পরিমাণমতো পানি মিশিয়ে পরপর দুই কোট ব্যবহার করলে পাবেন চমৎকার ফল।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৯৩তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০১৮।