এসডব্লিউআর পাইপের ব্যবহারের বৈচিত্র্য

যেকোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় অনুষঙ্গ পাইপ। তবে পাইপের ব্যবহার শুধু নির্মাণকাজেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা ব্যাপক ও বিস্তৃত। তরল পদার্থ নির্গমনে পাইপের বিকল্প মেলা ভার। পাইপের জগতেও রয়েছে ভিন্নতা। কাজের প্রকৃতি ও ধরন অনুযায়ী প্রয়োজন হয় ভিন্ন ভিন্ন ধরনের পাইপ। সাধারণত বিভিন্ন ধরনের ধাতু ও প্লাস্টিক দিয়েই তৈরি হয় পাইপ ও পাইপসামগ্রী। কৃষিসেচ, বাসাবাড়ি, বাণিজ্যিক ভবন, শিল্পকারখানার পানি ও পয়োনিষ্কাশন, গ্যাস আর বিদ্যুতের কাজে ব্যবহৃত হয় হরেক রকম পাইপ। কিন্তু এসডব্লিউআর বিশেষ ধরনের পাইপ বহুমুখী পাইপ, যা একসঙ্গে অনেক প্রয়োজন মেটায়। SWR এই তিনটি আদ্যক্ষর দিয়ে বোঝায় (Soil, Waste & Rain) অর্থাৎ মাটি, বর্জ্য ও বৃষ্টি। এই তিন ক্ষেত্রে এই পাইপ বিশেষ ব্যবহারের উপযোগী। এক পাইপে এমন নানা সুবিধা থাকায় বাজারে রয়েছে এর ব্যাপক চাহিদা।

বাজারে হরেক রকম পাইপের ভিড়ে এসডব্লিউআর পাইপ ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে এর নানামাত্রিক ব্যবহারগত সুবিধার কারণে। আগে লোহা, ইস্পাত ও সিমেন্ট পাইপের চল থাকলেও সেই স্থানটি অনায়াসে দখলে নিয়েছে প্লাস্টিক পাইপ। প্রথম দিকে প্লাস্টিক পাইপে নানা রকম অসংগতি থাকলেও দিনে দিনে তা উন্নতি লাভ করেছে। বিশেষ করে পিভিসি (Poly vinyl Chloride)ও ইউপিভিসি (Unplasticized poly vinyl chloride) পাইপ বাজারে উদ্ভাবিত হওয়ার পর এর বহুমাত্রিক উপযোগিতা লক্ষ করা যায়। এসডব্লিউআর পাইপও তৈরি হয় একই পদ্ধতিতে। তা সত্ত্বেও এই পাইপের শক্তিমাত্রা, স্থায়িত্ব ও সব ধরনের কাজের উপযোগী করতে রেসিনসহ বিভিন্ন ধরনের উন্নত কাঁচামাল ব্যবহার করা হয়। পাইপ তৈরিতে উন্নত প্রযুক্তি ও স্বয়ংক্রিয় মেশিনের ব্যবহার এর আদর্শ মান নিশ্চিত করে।

সাধারণ পাইপের তুলনায় এসডব্লিউআর পাইপের কিছু গুণগত বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এসব বৈশিষ্ট্যের মধ্যে রয়েছে-

  • দামে সাশ্রয়ী
  • টেকসই ও দীর্ঘস্থায়ী
  • শক্তিশালী
  • দৃষ্টিনন্দন
  • হালকা ওজন
  • সহজে স্থাপনযোগ্য
  • কম স্থাপন ব্যয়
  • রক্ষণাবেক্ষণ খরচ নেই বললেই চলে
  • সর্বোচ্চ পানি প্রবাহ নিশ্চিত করে
  • উচ্চক্ষমতা ও ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থেও তেমন ক্ষতি হয় না 
  • বিরূপ আবহাওয়ায় টিকে থাকে
  • মাটি-পানির চাপ ও ভার সহনীয়
  • মরিচারোধী
  • চাপরোধী
  • বিদ্যুৎ অপরিবাহী
  • অগ্নিরোধী

এসডব্লিউআর পাইপ পানিনিষ্কাশন-ব্যবস্থায় এনেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। এই পাইপ নানা ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হচ্ছে। এসবের মধ্যে রয়েছে-

  • ভবনের প্লাম্বিং কাজ (পানি সরবরাহ, পয়োনিষ্কাশন ও বৃষ্টির পানি সংগ্রহ)
  • কৃষিতে সেচ
  • বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগ তারের নিরাপত্তা নিরোধক
  • শীতাতপ নিয়ন্ত্রণকাজে
  • সাধারণত টিউবওয়েলে
  • শ্যালো পাম্পে
  • তারা পাম্পে
  • সুইমিংপুলে

এসডব্লিউআর পাইপ সেচকাজে দারুণ কার্যকর। এই পাইপ মাটির ওপরে ও নিচের চাপ সহ্য করে দীর্ঘদিন টিকে থাকে। এ ছাড়া মাপে সঠিক ও উন্নতমানের কাঁচামালে তৈরি হওয়ায় এর মসৃণতা সাধারণ প্লাস্টিক পাইপের তুলনায় বেশি। ফলে পানির চাপ সহ্য করেও পানির প্রবাহ ঠিক রাখতে পারে। চাপ বাড়লেও ফেটে যাওয়া বা লিকেজ হওয়ার ভয় নেই। এর ফিক্সারগুলোও সঠিক মাপের হওয়ায় তা পাইপে দৃঢ়ভাবে আটকে থাকে। বিশেষভাবে তৈরি করা এই পাইপগুলো যেন সব ধরনের বর্জ্য নিষ্কাশনে সক্ষম, এ জন্য ব্যবহৃত হয় বিশেষ ধরনের রেসিন। এ জন্য এই পাইপের সাহায্যে কলকারখানা থেকে নির্গত যেকোনো ধরনের দূষিত বর্জ্য নিষ্কাশন করা যায় সহজেই।

জেইন ইরিগেশন

এসডব্লিউআর পাইপের অন্যতম বৈশিষ্ট্য উন্নত প্রযুক্তিতে তৈরি হওয়ায় এই পাইপ বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক তরলের সঞ্চালনে ব্যবহার করা হয়। তা ছাড়া বিদ্যুৎ অপরিবাহী ও অগ্নিরোধী হওয়ায় উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন রাসায়নিক। যেমন: অ্যাসিড, ক্ষার, অ্যালকালিস, লবণ ও অন্যান্য খনিজের মতো দ্রাবকের প্রবাহেও নষ্ট হয় না। আর তাই এই পাইপ এখন জিআই পাইপের বিকল্প হিসেবেও ব্যবহার করা সম্ভব। বিশেষ যেসব স্থানে ও কাজে এই পাইপ ব্যবহার সম্ভব; তার মধ্যে রয়েছে-

  • ল্যাবরেটরিতে
  • রাসায়নিক লাইনে
  • হাইড্রোপনিক বাগানের পাইপ লাইনে
  • স্যুয়ারেজ লাইনে
  • খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ পাইপ লাইনে
  • শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বর্জ্য নিষ্কাশন লাইনে
  • পেট্রোলিয়াম ও জীবাশ্ম জ্বালানি পরিচলন লাইনে
  • ভবনের দুর্গন্ধময় গ্যাস নিঃসরণে।

এসব উপযোগী নানা বৈশিষ্ট্য ছাড়াও এই পাইপ দামে সাশ্রয়ী ও ওজনে হালকা বলে সহজে স্থাপনযোগ্য। এ ছাড়া এই পাইপের বহন খরচও কম। আগে জিআই ও তামার পাইপ এ ধরনের কাজে ব্যবহৃত হলেও তা ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল, যা এসডব্লিউআর পাইপের বেলায় একদমই নেই। এই পাইপ জিআই ও সিআই (কাস্ট আয়রন) পাইপের বিকল্প। এই পাইপের আরেক সুবিধা হচ্ছে এর জয়েন্ট রিং ও ফিক্সারগুলো দেয় লিকপ্রুফ পাইপের নিশ্চয়তা। এই ফিক্সারগুলো প্রয়োজন হলে সহজেই খোলা বা লাগানো যায়।

সাইজ ও ব্র্যান্ডভেদে ধরন ও আকার

বাজারে বিভিন্ন ধরনের এসডব্লিউআর পাইপ পাওয়া যায়। এসব পাইপের সাইজ ১/২ ইঞ্চি থেকে ৮ ইঞ্চি পর্যন্ত হয়ে থাকে। বিভিন্ন সাইজের ইউপিভিসি পাইপ ১১ টাকা থেকে শুরু করে শতাধিক টাকায় বিক্রি হয়। বাজারে আরএফএল, বিআরবি, আনোয়ার, নাভানা, ন্যাশনাল পলিমার, হাতিমসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের এসডব্লিউআর পাইপ পাওয়া যায়। নিচের ছকের মাধ্যমে বিভিন্ন কোম্পানির এসডব্লিউআর পাইপের দাম ও সাইজের বিবরণ দেওয়া হলো:

পাইপের ধরন ( ইঞ্চি)ব্র্যান্ডদাম (টাকা)
১/২”আরএফএল১১-১২
বিআরবি১১-১২
আনোয়ার১১-১২
নাভানা১২-১৩
৩/৪”আরএফএল১৬-১৭
বিআরবি১৪-১৫
আনোয়ার১৬-১৭
নাভানা১৫-১৬
১”আরএফএল২৫-২৬
বিআরবি২৩-২৪
আনোয়ার২৫-২৬
নাভানা২৪-২৫
১.৫”আরএফএল৪২-৪৩
বিআরবি৩৫-৩৬
আনোয়ার৪২-৪৩
নাভানা৩৬-৩৭
২”আরএফএল৪৮-৪৯
বিআরবি৪৪-৪৫
আনোয়ার৪৮-৪৯
নাভানা৪৬-৪৭

এসডব্লিউআর ফিটিংস ও ফিক্সারস

পাইপ লাইনে যাবতীয় সাজসরঞ্জামকে প্লাম্বিং ফিটিংস বলে। পানির প্রয়োজনীয় ব্যবহার এবং ব্যবহৃত পানি বা তরল বর্জ্য নিষ্কাশনের জন্য প্লাম্বিং ব্যবস্থায় যেসব প্লাস্টিক উপকরণ ব্যবহৃত হয়, সেগুলোকে ফিক্সারস বলা হয়। উপকরণগুলোর মধ্যে রয়েছে-

  • এলবো
  • টি
  • ক্রস
  • রিডিউসিং এলবো
  • বিডিউসিং টি
  • ওয়াই
  • সকেট
  • রিডিউসিং সকেট
  • ক্যাপ
  • প্লাগ
  • রানিং নিপল
  • বুশ
  • নিপল।

প্রাপ্তিস্থান

বাজারের অধিকাংশ হার্ডওয়্যার ও নির্মাণসামগ্রীর দোকানেই পাওয়া যায় এসডব্লিউআর পাইপ। ঢাকার নবাবপুর, গ্রিনরোড, ফার্মগেট, বাংলামোটর, উত্তরা, বনানী, মিরপুর, মোহাম্মদপুরসহ দেশের সব শহরেই মিলবে এসডব্লিউআর পাইপ।

আশীর্বাদ

এসডব্লিউআর পাইপ ক্রয় ও স্থাপনের আগে

একটি ভবন তথা সব ধরনের স্যানিটেশন ও ওয়াটার সাপ্লাই পাইপ লাইন স্থাপনের কাজ অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে করা উচিত। এমনকি পাইপের ফিটিংস-ফিক্সারস লাগানোর কাজটাও সমান গুরুত্ব বহন করে। তা না হলে পরে নানা সমস্যার উদ্ভব হতে পারে। এ জন্য পাইপ কেনা থেকে শুরু করে স্থাপন করা পর্যন্ত প্রয়োজনীয় সব ধরনের সতর্কতা অবলম্বন করা অত্যাবশ্যক। এসবের মধ্যে রয়েছে- 

  • স্যানিটেশন অ্যান্ড ওয়াটার সাপ্লাই পাইপ ও ফিটিংস-ফিক্সারস-এর পুরুত্ব ও গুণগত মান সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হবে।
  • ভবনে পাইপ স্থাপনের আগে প্রকৌশলীর পরামর্শ নেওয়া উচিত।
  • অবশ্যই অভিজ্ঞ মিস্ত্রির সাহায্যে পাইপ স্থাপন করতে হবে।
  • কোনো ধরনের লিকেজ বা ফাটল থাকলে সে পাইপ স্থাপন থেকে বিরত থাকতে হবে।
  • স্যানিটেশন ও ওয়াটার সাপ্লাই সিস্টেমের দেয়ালে গ্রুভ করে পাইপ বসাতে হবে। তবে কোনো অবস্থাতেই দেয়াল গাঁথুনির পর ঠিকমতো জমাট বাঁধার আগে গ্রুভ কাটা উচিত নয়।
  • পানি ও পয়োনিষ্কাশনের জন্য স্থাপিত এই পাইপ লাইনসমূহ নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করার জন্য স্থাপনকালে যত দূর সম্ভব বাঁক এড়িয়ে চলতে হবে।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৯৩তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০১৮।

কাজী গোলাম মোর্শেদ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top