যানজট এখন শুধু ঢাকাতেই নয়, গোটা দেশের জন্য ভোগান্তি আর বিড়ম্বনার আরেক নাম। দেশের অগ্রগতি থমকে যাচ্ছে ভয়ংকর এ সমস্যায়; ক্ষতি হচ্ছে সামগ্রিক অর্থনীতির। ঢাকার যানজট শুধু সড়কের অপ্রতুলতার জন্যই ঘটে তা কিন্তু নয়, বরং তা অনেকগুলো পারস্পারিক সম্পর্কযুক্ত সমস্যার সামগ্রিক ফল। এটা কোনো ‘স্থানীয়’ সমস্যাও নয়। এই মেগাসিটিতে সারা দেশ থেকে প্রতিদিন হরেক রকম মানুষ আসে নানা কাজে, নানা প্রান্তে তাঁদের যেতে হয়। বিশ্বের বসবাসযোগ্য শহর নিয়ে ২০১৬ সালে করা ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের বার্ষিক প্রতিবেদন বলছে, মানুষের জীবনযাত্রার মানে ১৪০টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ১৩৭তম। যেখানে ঢাকার অবকাঠামোকে যেকোনো শহরের চেয়ে খারাপ হিসেবেও তুলে ধরা হয়েছে। দুঃসহ এ যানজট নিরসনে সাইকেল কি হতে পারে সময়োপযোগী সমাধান? ঢাকায় যে ভয়াবহ ট্রাফিক জ্যাম বা যানজটের সৃষ্টি হয়, এ থেকে পরিত্রাণের সবচেয়ে সহজ মাধ্যম হতে পারে সাইক্লিং। এমনি এক সাইকেলবান্ধব নগরের ধারণা নিয়ে এসেছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) স্থাপত্য বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী রাম সাহা। তাঁর শিক্ষা সমাপনী বর্ষের গবেষণা প্রকল্প ছিল ‘ঢাকার ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থাপনা’ নিয়ে, যার উল্লেখযোগ্য অংশই সাইকেলবান্ধব নগর-বৃত্তান্ত।
বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশেও সাইক্লিং তরুণ প্রজন্মের কাছে বেশ জনপ্রিয়। কিন্তু পরিবেশবান্ধব এই বাহনটি চলাচলে আমাদের সড়কগুলোতে নেই আলাদা কোনো লেন। বেশির ভাগ ফুটপাত এমনিতেই দখলে থাকে। সেখানে সাইকেল চালানো তো দূরের কথা, হেঁটে চলাই দায়। ফলে সাইক্লিং এ দেশে আটকে আছে বহুমুখী প্রতিবন্ধকতায়। শুধু আন্দোলন নয়, এটি দিয়ে রীতিমতো বিপ্লব করে ফেলা সম্ভব যদি শুধু বড় বড় রাস্তার পাশে ছোট একচিলতে জায়গায় একটা করে সাইকেল লেন করা যায়। সাইকেল ও ওয়াকিং ওয়ের সঙ্গে কীভাবে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট যুক্ত করা যায়, এটি ছিল প্রতিপাদ্য গবেষণার প্রধান অংশ। তা ছাড়া গণপরিবহনগুলোকে কীভাবে একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত করা যায় সেটিও রয়েছে এ প্রজেক্টে। এই গবেষণা সম্পন্ন হয়েছে বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগের প্রধান অধ্যাপক খন্দকার সাব্বির আহমেদের সার্বিক তত্ত্বাবধায়ন ও নিবিড় পর্যবেক্ষণে।
যানজটের কারণে ঢাকায় প্রতিদিন নষ্ট হচ্ছে ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা। এই তথ্য বিশ্বব্যাংকের। আর যানজটের কারণে বছরে যে আর্থিক ক্ষতি হয়, অঙ্কের হিসাবে তা প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। গত কয়েক বছরের বিভিন্ন গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করে আর্থিক ক্ষতির আনুমানিক এ হিসাব পাওয়া যায়। বর্তমানে ঢাকার জনসংখ্যা ১ কোটি ৮০ লাখ। ২০৩৫ সালে এই জনসংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে ৩ কোটি ৫০ লাখে দাঁড়াবে বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক। এমন জনসংখ্যার একটি নগরীর উৎপাদনশীলতা বাড়ানো গেলে তা অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখতে পারবে বলে বিশ^াস পরিবহন বিশেষজ্ঞদের। তাঁরা বলছেন, উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশ হতে হলে বাংলাদেশকে অবশ্যই ঢাকার যানজট সমস্যার কার্যকর সমাধান করতে হবে।
যখন শহরে সংকট হয় চলমান গণপরিবহনব্যবস্থায়, তখন মানুষের মধ্যে বাড়ে গাড়ি কেনার প্রবণতা। উচ্চ করারোপ করেও এই প্রবণতা রোধ করা যায় না। এ ধরনের মানসিকতার ফল সত্যিই ভয়াবহ। তৈরি হচ্ছে রাস্তা, যানজট সমাধানে নির্মিত হচ্ছে ফ্লাইওভার। কিন্তু গাড়িকে প্রাধান্য দিয়ে তৈরি ফ্লাইওভার কি আসলেই কোনো সমাধান দিতে পারছে? ফ্লাইওভার থেকে নেমে প্রধান সড়কে যেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় যানবাহনকে। উন্নতমানের গণপরিবহনব্যবস্থা না থাকা এবং ব্যক্তিগত গাড়ি কেনা ও ব্যবহারে নানা সুবিধা দেওয়ায় মানুষ প্রাইভেট কার ব্যবহারে উৎসাহী হচ্ছে, বাড়ছে যানজট। শহরের ব্রিদিং স্পেস হারিয়ে যাচ্ছে, বড় বড় ফ্লাইওভারে ঢাকা পড়ছে ঢাকার আকাশ। নিচের রাস্তার পরিবেশ হচ্ছে ব্যবহারের অনুপযোগী। এখানকার রাস্তাগুলো সংকুচিত হওয়ায় সেখানেও বাড়ছে ভয়াবহ যানজট।
ভাবুন, ধানমন্ডির একটি অভিজাত স্কুলের কথা। যদি ওই স্কুলে দুই হাজার শিক্ষার্থী থাকে, তাহলে খুব সম্ভবত ৫০০ শিক্ষার্থী স্কুলে আসবে গাড়ি নিয়ে তাদের ব্যক্তিগত ‘বাহন’-এ। এর ফলে স্কুল শুরু এবং শেষের সময়ে ধানমন্ডিতে তীব্র যানজট হওয়াটাই স্বাভাবিক। যদি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একজন করেও অভিভাবক থাকে, কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে তাঁদেরও। বাসায় আনা-নেওয়ার কাজে পুনরায় ট্রিপ দিচ্ছে তাদের ব্যক্তিগত গাড়িগুলো। তাহলে চিন্তা করা যায় স্কুলগুলো কীভাবে শহরের গতি কমিয়ে দিচ্ছে। যদি এমন একটি ব্যবস্থা করা হয় যে শিক্ষার্থীরা নিজস্ব নিরাপত্তা নিশ্চিত করে নিজের জন্য নিরাপদ পরিবহনও নিশ্চিত করতে পারছে, তাহলে এই ভোগান্তি সহজেই নিরসন করা সম্ভব।
ঢাকার রাস্তায় দিন দিন বাড়ছে বাইসাইকেল। নিয়মিত সাইকেল চালিয়ে স্কুল-কলেজ এমনকি কর্মক্ষেত্রেও যাচ্ছে কেউ কেউ। কিন্তু যানজট আর দুর্ঘটনার এই নগরীতে সাইকেলচালকদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন থাকছেই। এ অবস্থায় নিরাপদে চলাচল করতে রাজপথে বাইসাইকেলের জন্য আলাদা লেনের দাবি তুলেছে সাইক্লিস্টরা। বিডি সাইক্লিস্টের অ্যাডমিন আরিফুর রহমানের মতে, ‘সড়কে সাইকেলের জন্য তিন মিটার জায়গা বরাদ্দের নিয়ম থাকলেও ঢাকার রাস্তায় তা মানা হয় না। আলাদা লেন না থাকায় ঝুঁকির মধ্যে সাইকেল চালাতে হচ্ছে। দ্রুতগতির গাড়িগুলো রাস্তায় সাইকেলকে শুধু বাঁ-দিকে চাপতে চাপতে বিপদের মুখে ঠেলে দেয় এবং লোকজনকে সাইকেল চালনায় উৎসাহী করতে হলে আলাদা লেনের বিকল্প নেই।’
লেন-বিষয়ক এ জটিলতা নিরসনে প্রস্তাবিত সাইকেল ট্র্যাক ডিজাইন করা হয়েছে ভূমি ও এলিভেটেড এই দুই লেয়ারে। সাধারণত সাইকেল ট্র্যাক বলতে আমরা বুঝি রাস্তার পাশে তিন ফুট জায়গার এক বা একাধিক লেন, যা ছোট দূরত্বে যানজট সমাধানে সক্ষম। কিন্তু রাস্তার পথচারীদের হাঁটা এবং বেপরোয়া গাড়ি চলাচল এই সাইকেল চলার পথকে করে তুলছে দুর্বিষহ। কীভাবে সাইকেল লেন করা যেতে পারে সাইক্লিস্টদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে তা দেখানো হয়েছে এই প্রজেক্টে। সাইকেল ট্র্যাকের উচ্চতা হতে পারে ফুটপাত থেকে ছয় ফুট উঁচু এবং রেলিং থাকবে উভয় পাশে। আলাদা সিগন্যালের ব্যবস্থা থাকবে, যা ফুটপাত এবং রাস্তার মধ্যে ‘বাফার জোন’ হিসেবে কাজ করবে। কিন্তু এটি দীর্ঘমেয়াদি একই সঙ্গে দীর্ঘ রুটের ক্ষেত্রে নিরাপদ সমাধান দিতে পারবে না। নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন সাইকেল চালানোর জন্য দরকার আলাদা নিরাপদ এলিভেটেড ট্র্যাক।
২০৩৫ সালকে সামনে রেখে করা হয়েছে ঢাকার মাস্টারপ্ল্যান বা গ্রেটার ঢাকা প্ল্যান। নতুন মাস্টারপ্ল্যান ও পরিকল্পিত উন্নয়নের মাধ্যমে নতুন শহর তৈরি করে ঢাকাকে বাসযোগ্য করা সম্ভব। অন্যান্য দেশের মতো পুরোনো শহরের পাশে নতুন শহর তৈরির পাশাপাশি সহজেই উন্নত নাগরিকসুবিধা প্রদানের মাধ্যমে তৈরি করা সম্ভব সমাধানসূত্র। দিল্লির পাশে নতুন দিল্লি, চেন্নাই-নতুন চেন্নাই, কলকাতা-নতুন কলকাতা, নতুন মাস্টারপ্ল্যানে। গ্রেটার ঢাকার কেন্দ্র হচ্ছে বিমানবন্দর, পূর্বাঞ্চল, আশুলিয়া, ডেমরা হয়ে গাজীপুর পর্যন্ত এর বিস্তৃতি। উত্তরাকে বলা যেতে পারে নতুন ঢাকার শুরু। পরিকল্পিতভাবে তৈরি এই এলাকা নিয়ে প্রজেক্ট শুরু হলেও এটি চলে যাবে নতুন ঢাকার অন্য এলাকাগুলোতে। প্রজেক্টের আইডিয়াগুলো ভবিষ্যতের শহর পূর্বাচলে প্রয়োগ করা যাবে। নতুন এলাকাগুলো মাস্টারপ্ল্যান করার সময় সাইকেলের বিষয় মাথায় রেখে ডিজাইন করে এগুলোকে সাইকেলবান্ধব শহরে পরিনত করা সম্ভব।
এ ধরনের কথা এ নগরীতে হরহামেশাই শোনা যায়, ‘দুই কিলোমিটার রাস্তা পার হয়েছি দেড় ঘণ্টায়।’ কিন্তু সচরাচর কেউ বলেন না, যানজট দেখে হেঁটেছি দুই কিলোমিটার। ঢাকার বর্তমান রাস্তাঘাট এখনো হয়তো সাইকেলের জন্য পুরোপুরি উপযোগী নয়, কিন্তু এর প্রয়োজনীয়তা বদলাতে পারে বর্তমান পরিস্থিতি। আর প্রয়োজনীয়তা সৃষ্টির জন্য সাইকেল নিয়ে রাস্তায় নামতে হবে আপনাকে-আমাকে। ইউরোপের প্রায় সব শহরেই সাইকেল জনপ্রিয় বাহন। কেননা, ওখানকার মানুষ জানে সাইকেল চালানোর সুফল কী! সপ্তাহে তিন ঘণ্টা সাইকেল চালালে হার্ট অ্যাটাক কিংবা স্ট্রোকের ঝুঁকি কমে প্রায় অর্ধেক। পাশাপাশি নিয়মিত সাইকেল চালানো বাড়ায় শরীরের কর্মক্ষমতাও।
এলিভেটেড সাইকেল ট্র্যাক
মাত্র ১০ ফুট ফুটপ্রিন্ট ব্যবহার করে কীভাবে পরিবেশবান্ধব পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়, তার উদাহরণ এলিভেটেড এই ট্র্যাক। দ্বিতলবিশিষ্ট এই লাইনে থাকবে আসা ও যাওয়ার জন্য আলাদা তলা। এতে সাইকেলে দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা নেই বললেই চলে। আলাদাভাবে চলাচলের কারণে সাইকেলজট না হওয়ায় থাকবে না সিগন্যালের প্রবণতা। থাকবে নির্দিষ্ট বিরতিতে সাইকেল স্টেশন (প্রায় ১ কিলোমিটার পরপর)। প্রটোটাইপ সাইট হিসেবে উত্তরাকে বেছে নেওয়ায় সেখানে স্টেশন হবে হাউসবিল্ডিং, আজমপুর ও জসীমউদ্দীনে। থাকবে সাইকেল ওঠা-নামা করানোর সুব্যবস্থা। থাকবে সাইকেল পার্কিং এবং পাবলিক সাইকেল ভাড়া নেওয়ার সুবিধা। ইলেকট্রনিক কার্ড ব্যবহারের মাধ্যমে সাইকেল নেওয়া যাবে, একই সঙ্গে রাখাও যাবে; যা আমাদের দেশের জন্য নতুন। তা ছাড়া ২০০ মিটার দূরত্বে থাকবে মিনি স্টেশন, যেখানে শুধু লিফটসুবিধা ব্যবহারের মাধ্যমে সাইকেল ওঠানামা করা যাবে। পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলো থেকে সাইকেলের কানেকটিভিটি বাড়ানো যাবে। যাতে সহজেই ভূমিতে অবস্থিত সাইকেল ট্র্যাকের কেউ সহজেই ওপরে উঠতে পারে। নির্দিষ্ট বিরতিতে ট্র্যাকের মধ্যে থাকবে সাইকেল নিয়ে দাঁড়ানোর জায়গা, যাতে ক্লান্ত হয়ে গেলে বা গুরুত্বপূর্ণ ফোন এলে বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ পাওয়া যায়।
উত্তরা থেকে মতিঝিল যেতে চাইলে আপনাকে বাসে বা গাড়িতে যেতে হবে। লম্বা সময় টিকিট কাউন্টারে লাইনে দাঁড়িয়ে দেখা যায় ৫০ জনের বাসে বাসস্ট্যান্ডে ১৫০ জন নিয়ে এলে তখন বাসের দরজায় ঝুলে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। কোনোক্রমে যদি আপনি ঝুলেও যেতে পারেন ধরে নিতে হবে আগামী দেড় থেকে দুই ঘণ্টা এভাবেই ঝুলে থাকতে হবে আপনাকে। ঢাকা শহরে সাধারণ চাকরিজীবীর অফিস এবং অন্যান্য স্থানে যাতায়াত বাবদ মাসে ন্যূনতম ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা খরচ হয়। বছরে ২৪ হাজার থেকে ৬০ হাজার টাকা। এর চেয়ে সস্তায় যদি সরকারি ব্যবস্থাপনায় সাইকেলের ব্যবস্থা করা যায় তবে তো কথাই নেই। উন্নত দেশের মতো আমাদের দেশেও অনতি বিলম্বে চালু করা উচিত পাবলিক পরিবহন হিসেবে সাইকেল তথা দ্বিচক্রযান।
গবেষণা প্রকল্পে সাইকেল স্টেশন বা পার্কিং সমস্যার সমাধানও দেখিয়েছেন স্থপতি রাম সাহা। এ জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে ঢাকার উত্তরাকে। কারণ, উত্তরা অনেকাংশেই পরিকল্পিতভাবে তৈরি। ভবিষ্যতে এই মডেলটি নতুন যে শহর আসছে, যেমন: পূর্বাচল, আশুলিয়া, সেখানে পূর্বপরিকল্পিতভাবে প্রয়োগ করা যাবে। এই সাইকেল ট্র্যাকের ফুটপ্রিন্ট বা আচ্ছাদিত স্থান মাত্র ১০ ফুট চওড়া, যেখানে চলতে পারবে পাশাপাশি তিনটি সাইকেল। এটা একটি ফ্লাইওভারের ফুটপ্রিন্টের চেয়ে অনেক কম। এই স্থানটা অন্যান্য নাগরিকসুবিধার কাজে ব্যবহার করা যাবে। সেখানে থাকবে হকারদের বসার স্থান, সাইকেল রাখার জায়গা, পথখাবারের দোকান, যা পথচারীদের স্বাভাবিক চলাফেরাকে বাধাগ্রস্ত না করেই চলবে যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা। ফুটপ্রিন্ট কম ও দুর্ঘটনামুক্ত রাখতে ওপরে ও নিচে দুটি ট্র্যাকের মাধ্যমে সাইকেল চলবে ২০০ মিটার পরপর, থাকবে সাইকেল ওঠানো ও নামানোর জায়গা। প্রতি নোডে থাকবে চক্রাকার ঘুর্ণন পথ, যেটি ব্যবহার করে ডানে, বামে দিক পরিবর্তন করা যাবে কোনো বিরতি ছাড়াই।
ঋরম. ৭: ঝঢ়ড়রষ ধৎবধং ড়ভ ঃৎধপশ, ঢ়ঁনষরপ ধপঃরারঃরবং পধহ মৎড়ি ঃযবৎব
ট্র্যাকের নিচের জায়গা ব্যবহৃত হবে বিভিন্ন কাজে। হকার সমস্যা আমাদের শহরে দিনকে দিন প্রকট হচ্ছে। হকারদের পরিকল্পিতভাবে এখানে বসার জায়গা দেওয়া যেতে পারে। থাকতে পারে স্ট্রিট ফুডের দোকান। প্রবীণ নাগরিকদের জন্য বসার ব্যবস্থা। প্রতি ঘণ্টায় ১০ হাজার সাইকেল চলাচল করতে পারবে একই পথে।
ঋরম. ৫: জড়ঁহফধনড়ঁঃ ড়ভ পুপষব ষধহব
ঋরম. ৮: উবঃধরষং ড়ভ ঃযব সড়ফঁষব ড়ভ ধ পুপষব ঃৎধপশ
যোগাযোগ ব্যবস্থাপনাগুলোর সঙ্গে সমন্বয়হীনতা যানজট ও ভোগান্তির অন্যতম কারণ। ভবিষ্যতে আমাদের দেশের ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম কেমন হবে? উন্নত দেশের মতো আমাদের দেশে আসছে মেট্রো রেল, বাস র্যাপিড ট্রাজিট বা বিআরটি। ইতিমধ্যে এগুলোর কাজও শুরু হয়ে গেছে। এই ব্যবস্থাপনাগুলোর মধ্যে কানেকটিভিটি বাড়াতে পারে সাইকেল। প্রতিটি স্টেশনে থাকবে কার্ড ব্যবহারের মাধ্যমে সাইকেল ভাড়া করার সুযোগ। যার মাধ্যমে একজন যাত্রী এমআরটি বা বিআরটি স্টেশন থেকে নেমে যানবাহনহীনতায় পড়বেন না। চাইলে সাইকেল নিয়ে তিনি তাঁর গন্তব্যে সহজেই পৌঁছাতে পারবেন।
প্রাথমিকভাবে উত্তরা রেলস্টেশন থেকে গাজীপুর চৌরাস্তা পর্যন্ত বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বাস র্যাপিড ট্রানজিট বা বিআরটি, এটি সম্পূর্ণ নতুন ধারণা বাংলাদেশে। পাশের দেশ ভারতের আহমেদাবাদে কার্যকর আছে এটি, সেখানে বেশ ভালো সুফল পাওয়া গেছে। উত্তরা অংশে হাউস বিল্ডিং, আজমপুর ও জসীমউদ্দীন মোড়ে বসছে তিনটি স্টেশন। এই তিনটি স্টেশনের সঙ্গে সংযুক্ত করে প্রজেক্টে প্রস্তাব করা হচ্ছে তিনটি সাইকেল স্টেশন, যার মাধ্যমে কেউ সাইকেল এ চড়ে এসে বাস ধরতে পারবে, একইভাবে বাস থেকে নেমে, স্টেশন থেকে সাইকেল নিয়ে তাঁর বাসা বা গন্তব্যে যেতে পারবেন। থাকবে আন্ডারগ্রাউন্ড পাসিং ও আন্ডারগ্রাউন্ড টিকিট কাউন্টার, উত্তরা মাস্কট প্লাজায় প্রতিদিন যাওয়া-আসা করে হাজার হাজার মানুষ, তাঁরা সরাসরি বেইজমেন্ট থেকে বিআরটি ও সাইকেল স্টেশনে যেতে পারবে। এ ছাড়া প্রতিটি নোডের কমার্শিয়াল বিল্ডিং থেকে আন্ডারগ্রাউন্ড কানেকশনের মাধমে সরাসরি এই স্টেশনগুলোতে আসা-যাওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। তাতে কমবে দুর্ভোগ ও যানজট। ফুটওভারব্রিজের জায়গায় বিআরটির আন্ডারপাসগুলো রাস্তা পারাপারের কাজে ব্যবহৃত হবে।
স্কলাস্টিকা, রাজউক উত্তরা মডেল কলেজসহ অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অবস্থিত অভিজাত এ এলাকায়। কেউ চাইলে মহাখালী বা বসুন্ধরা থেকে এলিভেটেড সাইকেল ট্র্যাক ব্যবহার করে সহজেই এবং নিরাপদে তার স্কুলে পৌঁছাতে পারবে। স্কুল বা কলেজগুলোতে সাইকেল পার্কিংয়ের ব্যবস্থা থাকা আবশ্যক। একইভাবে ছুটির সময় সাইকেল ট্র্যাক ব্যবহার করে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবে।
বিআরটি স্টেশনগুলোকে যদি আন্ডারগ্রাউন্ড করা যায় তাহলে একই সঙ্গে কমার্শিয়াল স্থাপনার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন সম্ভব এবং সম্ভব যত্রতত্র রাস্তা পার হওয়া রোধ করা। সরাসরি বেজমেন্ট থেকে প্যাসেজের মাধ্যমে বিআরটি স্টেশন এবং এর একই সঙ্গে সাইকেল স্টেশনে আসা সম্ভব। এতে বাড়বে কানেকটিভিটি, কমবে দুর্ভোগ।
ঋরম. ১১: টহফবৎমৎড়ঁহফ পড়হহবপঃরড়হ ঃড় ইজঞ ধহফ ৎড়ধফংরফব পড়সসবৎপরধষ নঁরষফরহমং
সাইকেল ট্র্যাকটি আজমপুর হয়ে আসবে বিমানবন্দর রেলস্টেশনের দিকে, যেখানে করা যেতে পারে অত্যাধুনিক বিশ্বমানের মাল্টি মোডাল হাব। এমআরটি-১-এর লাইন যাচ্ছে এখান দিয়ে, যেটি গাজীপুর থেকে সায়েদাবাদ পর্যন্ত, বিআরটির টার্মিনাল, বর্তমান রেললাইনের আধুনিকায়ন করা হবে, রেল লাইনের ওপর দিয়ে যাচ্ছে ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেস। বিমানবন্দর থেকে থাকবে সাবওয়ে কানেকশন। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই পয়েন্টটিকে আধুনিক মাল্টি মোডাল হাবে পরিণত করার মাধ্যমে সামগ্রিক পাবলিক ট্রান্সপোর্টের উন্নয়ন এই প্রজেক্টের অংশ। পাশাপাশি এসব পাবলিক ট্রান্সপোর্টের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ থাকবে সাইকেল ও হাঁটার সুবিধা।
ধরুন, আপনার কোনো আত্মীয় আসছেন বগুড়া থেকে। তিনি রেলস্টেশনে নেমে মেট্রো ধরতে পারবেন, একইভাবে আপনি মেট্রো থেকে নেমে অন্যান্য ট্রান্সপোর্ট-সুবিধা নিতে পারবেন। কেউ চাইলে বিমানবন্দর রেলস্টেশন থেকে নেমে মেট্রো ধরতে পারবেন। একইভাবে মেট্রো থেকে নেমে রেল, বাস ধরা যাবে। সাইকেলের সঙ্গে রয়েছে প্রতিটি ট্রান্সপোর্টের সংযোগ, রয়েছে পাবলিক সাইকেল ব্যবহারের সুবিধা। উন্নত দেশের মতো কার্ড ব্যবহারের মাধ্যমে বার্ষিক ফি দিয়ে পাবলিক সাইকেল ভাড়া নেওয়া যাবে। বিমানবন্দরের পাশেই রয়েছে হজ বা হাজি ক্যাম্প। এই ক্যাম্পের সঙ্গে আন্ডারগ্রাউন্ড কানেকশন থাকবে মাল্টি মোডাল হাবের। ছোট পরিবহন কার্ট বা বাগির মাধ্যমে হাজিরা চলাফেরা করতে পারবে, থাকবে মুভেবল ওয়াকওয়ে। বিমানবন্দর থেকে সাবওয়ে কানেকশন থাকবে টার্মিনালে, বিমানবন্দরগামী বা আগত যাত্রীরা তাঁদের পছন্দের পরিবহন ব্যবহার করে যেকোনো গন্তব্যে যেতে পারবে। এতে কমবে বিমানবন্দরগামী যাত্রীদের নিত্যদিনের ভোগান্তি আর দুর্ভোগ।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৯৩তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০১৮।