স্থাপনার সৌন্দর্য প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম রং। অনুভূতি, অবস্থান এবং পরিস্থিতির নির্দেশক হিসেবেও এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তা ছাড়া মনোজগতে রঙের স্থান খুবই গভীর ও ব্যাপক। রং শুধু স্থাপনাকে রাঙিয়েই তোলে না বরং উপকরণটি পরিবেশের আর্দ্রতা, পানি, তাপ ও ক্ষয় প্রতিরোধক হিসেবেও রাখে সবিশেষ ভূমিকা। ফলে ভবনের স্থায়িত্বও যায় বেড়ে। এ ছাড়া প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক নানা ফিচার রঙে যুক্ত হচ্ছে, যা দেখতে যেমন উজ্জ্বল, তেমনি স্থায়িত্বও বেশি। এ ছাড়া এতে ধুলো-ময়লা লাগলেও সহজে পরিষ্কার করা যায়। রঙের এমনই সব যৌগ তত্ত্ব থাকছে দেয়াল রঙের খুঁটিনাটিতে।
রঙের উপাদানসমূহ
- পিগমেন্ট (রঞ্জক পদার্থ)
- বিন্ডার (বন্ধনী)
- সলভেন্ট (দ্রবণীয় পদার্থ)
পিগমেন্ট: এক ধরনের পাউডার, যা বিন্ডারের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এতে থাকে উদ্ভিদের নির্যাস।
বিন্ডার: বিন্ডার মূলত পলিমার, যেটি পিগমেন্ট স্থাপনের জন্য একটি ম্যাট্রিকস (ছাঁচ) গঠন করে। এ কাজে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত তিনটি বিন্ডার হলো-
- অ্যাক্রাইলিক পলিমার
- আলকড পলিমার
- ইপোক্সি পলিমার।
পেইন্টে প্রয়োজনীয় মাত্রায় ঘনত্ব আনয়নের জন্য একটি জৈব দ্রাবক পদার্থ যুক্ত করা হয়। এটি রং প্রয়োগের ক্ষেত্রে ঘনত্ব কমাতে সহায়তা করে। রঙে এক্সটেন্ডার্সও যুক্ত করা হয়। এটা বিশাল পিগমেন্ট কণাগুলো উন্নত সংশ্লেষ ও চিত্র শক্তিশালীকরণের কাজ করে। রং ব্যবহারের উদ্দেশ্য ভেদে তরল রং বা শুষ্ক চিত্র বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করতে অন্য পদার্থও এতে যুক্ত করা হয়। যেমন-
ড্রাইয়ার্স: দ্রুত শুকানোর জন্য পেইন্টে ড্রাইয়ার্স যুক্ত করা হয়।
সিলিকনস: রঙের আবহাওয়া প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সিলিকনস যোগ করা হয়।
ডিজপারজ্যান্টস: পিগমেন্ট কণাগুলো পৃথক ও স্থির রাখতে এই তরল পদার্থটি ব্যবহৃত হয়।
থিকোট্রোপিক এজেন্ট: এটা মূলত রঙকে পুরু সামঞ্জস্যতা দিয়ে থাকে।
অ্যান্টি-সেটলিং এজেন্টস: এটা পিগমেন্টের প্রতিস্থাপন প্রতিরোধে ব্যবহৃত হয়।
ব্যাক্টিরিসিডিস: রং কোটার ভেতরে সংরক্ষণের জন্য এই উপাদানটি ব্যবহার করা হয়।
রঙের রকমফের
এনামেল পেইন্ট
এই রং মূলত তেল-ভিত্তিক পেইন্ট। কঠিন্য ও স্থায়িত্বের কারণে কোনো কিছুর বহির্ভাগ, কাঠ ও ধাতুতে সাধারণত এই জাতীয় রং ব্যবহার করা হয়, যা উপরিভাগকে করে চকচকে ও মসৃণ। এই রং বায়ুর প্রবাহ ও আর্দ্র অবস্থার ওপর নির্ভর করে ৮ থেকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে শুকিয়ে যায়। তবে এই রং লোহাজাতীয় পদার্থ যেমন- স্টিলের গ্রিল, কেচি গেট, স্টিলের দরজা, টিন ও কাঠে ব্যবহৃত হয়।
ল্যাটেক্স পেইন্ট
পানি-ভিত্তিক এই রঙে একধরনের অ্যাক্রাইলিক ব্যবহার করা হয়। এই জাতীয় পেইন্ট তেলভিত্তিক পেইন্টের চেয়ে শুকাতে সময় কম নেয়। তবে এটা হয় কম চকচকে ও স্থায়িত্ব সম্পন্ন।
ম্যাট পেইন্ট বা ফিনিশ পেইন্ট
ম্যাট পেইন্ট অভ্যন্তরীণ দেয়াল রাঙাতে অধিক ব্যবহৃত হয়। তবে এটা রঙে চিত্তাকর্ষক, চকচকে ও উজ্জ্বলতা আসে না। একাধিক সিঙ্গেল কোট প্রয়োগের মাধ্যমে একটি সলিড রং পাওয়া যায়।
ইগশেল ও সাটিন ফিনিশ
ইগশেল ফিনিশে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে উজ্জ্বলতা ফুটে ওঠে। অন্যদিকে ইগশেল ফিনিশের চেয়েও সাটিন ফিনিশ আরও বেশি উজ্জ্বল। এতে আংশিকভাবে প্রতিফলন ঘটে। তবে অভ্যন্তরীণ দেয়াল রাঙানোর জন্য এটাকে উপযুক্ত হিসেবে তুলে ধরা হয় না। তবে এটা সহজেই প্রয়োগ করা যায়। রান্নাঘর ও বাথরুমের মতো জায়গায় এটি বেশি ব্যবহৃত হয়। কারণ, এই জাতীয় রং পানি থেকে সুরক্ষা দেয় এবং এটা পরিষ্কারযোগ্য।
ডিসটেম্পার
ইট, কংক্রিট ও প্লাস্টারের ওপর ডিসটেম্পার করা হয়। বিভিন্ন ধরনের ডিসটেম্পার রয়েছে, যেমন-অ্যাক্রেলিক, সিনথেটিক, ড্রাই ইত্যাদি। অ্যাক্রেলিক ডিসটেম্পার পানি দিয়ে ধোয়া যায়। কিন্তু সিনথেটিক ও ড্রাই ডিসটেম্পার পানি দিয়ে ধোয়া যায় না।
প্লাস্টিক পেইন্ট
প্লাস্টিক পেইন্ট ‘ইমালশন’ নামেই বেশি পরিচিত। পানি বেজড রং, যা দীর্ঘস্থায়ী ও ধোয়া যায়। প্লাস্টিক পেইন্ট তিন ধরনের। রেগুলার, ইকোনমিক ও প্রিমিয়ার ইমালশন।
সেমি-গ্লোস
কোনো কিছু পরিপাটিকরণের কাজে অতি সাধারণত সেমি-গ্লোস পেইন্ট ব্যবহার করা হয়। এটা দেয়ালের পরিবর্তে বেসবোর্ড, ছাঁচ নির্মাণ (আলংকারিক বন্ধনী) ও দরজা রাঙানোর কাজে ব্যবহার করা হয়। সেমি-গ্লোস পেইন্ট দিয়ে দারুন ফিনিশিং আনা যায় এবং এটা সহজেই পরিষ্কারযোগ্য ও ভারী ব্যবহারের জন্য উপযুক্ত। পূর্ণ গ্লোসের চেয়ে কম চকচকে। তবে ভালো মোড়কের জন্য সাধারণত একটি সিঙ্গেল কোটই যথেষ্ট।
জেনে রাখুন
বাজারে বিভিন্ন ধরনের রং রয়েছে। যেমন: বার্জার, আরএকে, রক্সি, এশিয়ান পেইন্টস, অ্যাকুয়া পেইন্টস, নাভানা পেইন্টস, এফএমসি পেইন্ট, পেইলাক পেইন্ট, এলিট পেইন্ট, রোমানা পেইন্ট, এলাইট পেইন্ট, উজালা পেইন্টস, জতুন পেইন্টস। রং গ্যালন হিসেবে বিক্রি হয়। এক গ্যালন রং বলতে চার লিটারের কৌটাকে বোঝানো হয়। তবে প্রকৃতপক্ষে রঙের পরিমাণ থাকে ৩ লিটার ৬৪ গ্রাম আর কৌটাসহ হয় মোট চার লিটার। কোম্পানিভেদে কয়েকটি রঙের দরদাম-
| কোম্পানি | দাম (প্রতি গ্যালন) |
| বার্জার সিনথেটিক এনামেল | ৯৫০-১ হাজার টাকা |
| বার্জার প্লাস্টিক ইমালশন | ৭৫০-৮০০ টাকা |
| বার্জার ওয়েদার কোট | ১১০০-১১২০ টাকা |
| পেইলাক সিনথেটিক এনামেল | ৯০০-৯৫০ টাকা |
| পেইলাক প্লাস্টিক ইমালশন | ৭০০-৭৫০ টাকা |
| এশিয়ান সিনথেটিক এনামেল | ৯০০-৯৯০ টাকা |
| এশিয়ান প্লাস্টিক ইমালশন | ৭৫০-৮০০ টাকা |
| এলিট সিনথেটিক এনামেল | ৯৫০-৯৮০ টাকা |
| এলিট প্লাস্টিক ইমালশন | ৭৫০-৭৯০ টাকা |
| রক্সি সিনথেটিক এনামেল | ৯৫০-৯৮০ টাকা |
| রক্সি প্লাস্টিক ইমালশন | ৭৫০-৭৮৫ টাকা |
| আরএকে সিনথেটিক এনামেল | ৯০০-৯৫০ টাকা |
| আরএকে প্লাস্টিক ইমালশন | ৭৫০-৭৮০ টাকা |
বার্জার, এশিয়ান ও আরএকের মতো শীর্ষ ব্র্যান্ডের রং বাজারে বহুল বিক্রীত। বাজারে ১৮.২ লিটারের বালতি-ভর্তি প্লাস্টিক ইমালশন, এনামেল পেইন্ট, ডিসটেম্পার পেইন্ট বিক্রি করা হয়।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৯০তম সংখ্যা, অক্টোবর ২০১৭।