বেইজিং ডাক্সিন বিমানবন্দর
আগামী বিশ্বের বৃহৎ বিমানবন্দর

পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যস্ততম বিমানবন্দর বলতে এখন বোঝায় যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া রাজ্যের হার্টসফিল্ড জ্যাকসন আটলান্টা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে। ২০১৪ সালে এই বিমানবন্দর দিয়ে রেকর্ডসংখ্যক ৯ কোটি ৬০ লাখ যাত্রী যাতায়াত করেছে! যাত্রী ওঠানামার ভিত্তিতে এই বিমানবন্দরের পরেই দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে চীনের সাংহাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। গত বছরে অর্থাৎ ২০১৬ সালে চীনের এই বিমানবন্দর দিয়ে যাত্রী যাতায়াত করেছে ৯ কোটি ৪০ লাখ। বিপুলসংখ্যক যাত্রী নিয়ে বিমানবন্দরটির সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনায় ইতিমধ্যেই হিমশিম খাচ্ছে চীনা বিমান কর্তৃপক্ষ। তবে অবস্থা যে এমন হবে তা তাঁরা অনুমান করেছিলেন আরও আগেই। আর সে জন্যই ২০০৮ সালেই চীন এক মহাপরিকল্পনা নেয় বিশাল এক বিমানবন্দর নির্মাণের, নাম যার ‘বেইজিং ডাক্সিন বিমানবন্দর’।

২০০৮ সালে পরিকল্পনা নেওয়ার পরে দীর্ঘ সময় ধরে চলে নকশা আহ্বান ও চূড়ান্তকরণের কাজ। ২০১৩ সালে ADPI ও ZAHA HADID নামক দুটি আর্কিটেকচারাল ফার্মের সম্মিলিত নকশা অনুমোদন করে চীনা সরকার। এরপর আরও বেশ কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরে ২০১৬ সালের একদম শেষভাগে, ডিসেম্বরের ২৬ তারিখে আনুষ্ঠানিকভাবে এই মেগা স্ট্রাকচারের কাজ শুরু হয় পুরোদমে। পুরো প্রজেক্টটিকে তিনটি অংশে ভাগ করা হয়েছে। যদি সব ঠিক থাকে তবে ২০১৯ সালে এই বিমানবন্দরের প্রথম অংশের কাজ শেষ হবে। তখন থেকেই এটি ফ্লাইট অপারেশন শুরু করবে।

প্রথম অবস্থায় এই বিমানবন্দরে একসঙ্গে চারটি রানওয়ে নির্মাণ করা হবে। এবং টার্মিনাল ব্যবহার করে প্রতি বছর সাড়ে চার কোটি যাত্রী যাতায়াত করতে পারবে। প্রথম ধাপের নির্মাণ শেষে বিমানবন্দর উন্মুক্ত করে দেওয়ার পাশাপাশি দ্বিতীয় অংশের কাজ শুরু হবে। দ্বিতীয় অংশের কাজ শেষ হলে ২০২৫ সাল নাগাদ এই বিমানবন্দর দিয়ে প্রতিবছর ৭ কোটি ২০ লাখ যাত্রী যাতায়াত করতে পারবে। আর যখন তৃতীয় ও শেষ ভাগের কাজ শেষ হবে তখন এই বিমানবন্দরের টার্মিনাল হবে বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বড়! আর তখন চীনের এই বিমানবন্দর পিছে ফেলে দেবে বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে ব্যস্ততম বিমানবন্দর যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া রাজ্যের হার্টসফিল্ড জ্যাকসন আটলান্টা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে! কারণ, তখন বেইজিংয়ের এই বিমানবন্দরের সাড়ে ৭ মিলিয়ন স্কয়ার ফুট এলাকা ব্যবহার করে প্রতিবছর ১০ কোটি মানুষ চলাচল করবে বিশ্বজুড়ে!

সিএনএন

এই বিমানবন্দর যে কতটা বড় হবে তা শুধু এর আয়তন নয়, রানওয়ের সংখ্যা বিবেচনা করলেও স্বচ্ছ একটা ধারণা পাওয়া যাবে। সম্পূর্ণ কাজ শেষ হলে এই বিমানবন্দরে থাকবে আটটি পৃথক পৃথক রানওয়ে। যার মধ্যে সাতটি রানওয়ে থাকবে বেসামরিক ব্যবহারের জন্য আর অন্য রানওয়েটি সংরক্ষিত থাকবে সামরিক ব্যবহারের জন্য।

এখন প্রশ্ন জাগতে পারে, শুধুই কি বড় আর ব্যস্ততম হবে এই মেগা এয়ারপোর্ট? না! মোটেই তা নয়। এটি শুধু আকারেই বড় হবে তা কিন্তু নয়। এটি যেমন বড় হবে তেমনি এর ব্যবস্থাপনা হবে অত্যাধুনিক। বিমানবন্দরটি টার্মিনালের নকশা করার সময় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছিল যা, তা হলো এটি যেন পুরোপুরি যাত্রীবান্ধব হয়। বিপুল পরিমাণ মানুষের চলাচলে যেন অযথা জটের সৃষ্টি না হয়। অর্থাৎ, একজন যাত্রী বিমানবন্দরে ঢোকা থেকে শুরু করে, কাস্টমস হয়ে বোর্ডিং করা পর্যন্ত যেন অযথা সময় নষ্ট না হয় বিমানবন্দরের বিশাল পরিসরের কারণে। আর সেই সঙ্গে বিপুল পরিমাণ যাত্রীর ভিড়ে ব্যাগেজ হ্যান্ডলিংয়ে যেন মাত্রাতিরিক্ত সময় না লাগে।

এই বিষয়গুলোকেই মাথায় নিয়ে ADPI ও HADID এই দুই আর্কিটেকচারাল ফার্ম পরিকল্পনা করে একদম ভিন্নআঙ্গিকে। তারা মূল টার্মিনাল ভবনের নকশায় আনে ‘ফিনিক্স’ শেইপ। শুধু এই ফিনিক্স শেইপের কারণে যাত্রী বোর্ডিং ও ব্যাগেজ হ্যান্ডলিংয়ে প্রয়োজনীয় সময় কমবে আশ্চর্যজনকভাবে। কর্তৃপক্ষ হিসাব করে দেখেছে যে এই ‘ফিনিক্স’ ডিজাইনের কারণে ব্যাগেজ হ্যান্ডলিংয়ে যাত্রী প্রতি গড়ে ব্যয় হবে মাত্র ১৩ মিনিট করে! একই ধরনের চমক যাত্রীর কাস্টমস থেকে বোর্ডিং পর্যন্ত। যাত্রী এয়ারপোর্টে প্রবেশের পর থেকে কাস্টমস হয়ে বোর্ডিং পর্যন্ত যাত্রীপ্রতি সময় লাগবে মাত্র ৮ মিনিট! যা কি না বর্তমান সময়ের ব্যস্ততম বিমানবন্দরগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে প্রায় অবিশ্বাস্য বলা চলে!

২ হাজার ৮৬০ হেক্টর বা ৬ হাজার ৬০০ একর জমির ওপর নির্মিত এই বিমানবন্দর মূল শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে। তাই শুধু এয়ারপোর্ট বানালেই চলবে না, এয়ারপোর্টের সঙ্গে লোকালয়ের নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগব্যবস্থাও গড়ে তুলতে হবে। মাত্র ৩০ মিনিটে যেন মূল শহরে পৌঁছানো যায় সে উদ্দেশে র‌্যাপিড রেলওয়ে সার্ভিস যুক্ত থাকবে এই বিমানবন্দরে। বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা সেরে বিমানবন্দর থেকেই ট্রেনে চেপে বসলে মাত্র আধা ঘণ্টায় পৌঁছা যাবে দক্ষিণ বেইজিং রেলওয়ে স্টেশনে। আর এই রেল সার্ভিস অবিরতভাবে ২৪ ঘণ্টা সেবা দেবে। আর সেই সঙ্গে উন্নত সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা তো থাকছেই।

সিএনএন

এই বিমানবন্দরটি নিয়ে চীনের রয়েছে অনেক পরিকল্পনা। ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে বেইজিংয়ের বর্তমান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটিকে শুধু ডোমেস্টিক ফ্লাইটের জন্য ও নির্মীয়মাণ ডাক্সিন এয়ারপোর্টকে শুধু আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার জন্য ব্যবহার করার একটি পরিকল্পনা রয়েছে চীনা কর্তৃপক্ষের। এই নির্মীয়মাণ বিমানবন্দরটি চীনকে যেমন আশার আলো দেখাচ্ছে, ঠিক তেমনিভাবে এটির সঠিক ব্যবহার সম্ভব হবে কি না, তা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছেন অনেক এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ। কারণ, চীনে কড়া সামরিক নীতির কারণে এই রাষ্ট্রের এয়ার স্পেসের ৮০ শতাংশই সামরিক বিমানের জন্য সংরক্ষিত। বেসামরিক বিমান চলাচল করে অবশিষ্ট মাত্র ২০ শতাংশ এয়ার স্পেস ব্যবহার করে। সেই কারণে অবধারিতভাবে প্রায়ই ফ্লাইট ডিলে হয়। আর তাই এই চমৎকার মেগা এয়ারপোর্টটির সক্ষমতার ১০০ শতাংশ ঠিকভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে কি না তা নিয়ে  সংশয় থাকছেই।

এক নজরে

প্রকল্পের কাজ শুরু: ২৬ ডিসেম্বর, ২০১৪

প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ের কাজ শেষ: ২০১৯ (সম্ভাব্য)

প্রকল্পের অবস্থান: ডাক্সিন, বেইজিং, চীন

মোট ব্যয়: ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার

মোট রানওয়ে: ৮টি (৭টি বেসামরিক ও ১টি সামরিক)

প্রকল্পের আনুমানিক ব্যয়: ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮৮তম সংখ্যা, আগস্ট ২০১৭।

ফয়সাল হাসান সন্ধী
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top