Image

বন্যা ব্যবস্থাপনার প্রকৌশলগত সমাধান

জ্যৈষ্ঠ শেষে আষাঢ় আসি আসি করছে। আর আষাঢ় মানেই বর্ষাকাল। কিন্তু এরই মাঝে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে শুরু হয়েছে বন্যার প্রকোপ। বিশেষ করে বৃহত্তর সিলেটের হাওর অঞ্চলের বন্যা তো ওই অঞ্চলের জনজীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে; সৃষ্টি করেছে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়। আশঙ্কা করা হচ্ছে, সামনের মাসগুলোতে অতিবর্ষণের কারণে হয়তো দেশের বিশাল অংশ বন্যার করাল গ্রাসে পড়বে। বাংলাদেশে এ এক অদ্ভুত সমস্যা! শীত বলুন আর গ্রীষ্ম, দেশের নদীগুলোতে পানি থাকে না। আর যেই না বর্ষা আসে সঙ্গে নিয়ে আসে ভরপুর পানি। শীত-গ্রীষ্মে যে দেশ পানির অভাবে ধুঁকতে থাকে, সেই দেশেই নাকি বর্ষা এলেই একরের পর একর ক্ষেতের ফসল ভেসে যায়, গৃহহীন হয় লাখ লাখ মানুষ, বিপুল ক্ষয়-ক্ষতি হয় জান-মালের। প্রতিবছর দেশের অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব রেখে ক্ষতি করে বন্যা নামের ভয়ংকর এ প্রাকৃতিক দুর্যোগ।

বন্যা কি প্রতিবছর হয়?

আমাদের অনেকের মাথাতেই নিশ্চয়ই বন্যাসম্পর্কিত একটা প্রশ্ন বারবার ঘুরে-ফিরে আসে। আর তা হলো প্রকৃতির নিয়ম অনুযায়ী বন্যা তো প্রতিবছরই হয়! তাহলে এটাকে আমরা ‘দুর্যোগ’ বলি কেন? তাহলে খুলেই বলি কেন বন্যাকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলা হয়। কারণ, বাংলাদেশে বন্যা কিন্তু প্রতিবছর হয় না! তথ্যটি বিস্ময়কর হলেও সত্য। বাংলাদেশের ভূভাগের একটা বড় অংশ প্রতিবছরের একটা বিশেষ সময়ে বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়। কিন্তু দেশের ভূভাগের কিছু অংশ প্লাবিত হওয়ামাত্রই তাকে বন্যা বলা যায় না। যখন কি না দেশের ভূভাগের ২০ শতাংশ বা তারও বেশি পানিতে প্লাবিত হয়, তখনই সেটাকে আমরা বন্যা বলি। কারণ, ২০ শতাংশ পর্যন্ত প্লাবিত হওয়াটা দেশের খুব বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হয় না বরং তা দেশের কৃষি ও মৎস্য সম্পদের জন্য খুবই প্রয়োজন। প্রতিবছর দেশে অন্তত ২০ শতাংশ অংশ প্লাবিত না হলে বছরজুড়ে ক্ষরা দেখা দিত। সে হিসাবে ২০ শতাংশ পর্যন্ত ভূভাগ প্লাবিত হলে তা বন্যা নয়। যখন এ মাত্রা ২০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে, তখনই আমরা তাকে বন্যা বলতে পারব। 

বন্যার চিত্র বাংলাদেশে

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বিডব্লিউডিবি)-এর বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের (এফএফডব্লিউসি) ১৯৫৪ সাল থেকে শুরু করে ২০১৩ সালের বন্যা সম্পর্কিত পরিসংখ্যান বলছে (চিত্র-১) ১৯৫৪ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যা ছিল ১৯৯৮ সালে। এতে ভূভাগের প্রায় ৬৮ শতাংশ বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছিল। এর আগে ১৯৮৮ সালের বন্যায় প্লাবিত হয়েছিল ভূভাগের ৬১ শতাংশ। পাশের সারণি বিবেচনায় নিলে দেখা যায়, পরপর দুই বছর বড় ধরনের বন্যা হয়েছিল ১৯৮৭ ও ১৯৮৮ সালে। এই দুই বছর যথাক্রমে ৩৯ শতাংশ (চতুর্থ সর্বোচ্চ) ও ৬১ শতাংশ (দ্বিতীয় সর্বোচ্চ) ভূভাগ প্লাবিত হয়েছিল।

বাংলাদেশের নদ-নদীর উৎপত্তি ও গতিপথ

প্রতিবছর নির্দিষ্ট সময়ে বাংলাদেশে যে বন্যা হয় তার প্রধান কারণ হলো প্রবল বৃষ্টির কারণে নদীতে পানিপ্রবাহের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া। যার ফলে নদীর দুই পাশ প্লাবিত হয় অতিরিক্ত পানিতে। নদীমাতৃক দেশ হওয়ায় এ দেশে রয়েছে অসংখ্য নদ-নদী। কিন্তু বড় আকারের বা প্রধান নদীর মধ্যে রয়েছে পদ্মা, মেঘনা, যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র। এই নদীগুলোর গতিপথ উত্তর থেকে দক্ষিণের বঙ্গোপসাগরে। কিন্তু যখন এসব নদীতে অতিরিক্ত পানি প্রবাহিত হয় তখন তা সাগরে মেশার আগে নদীর যাত্রাপথে জালের মতো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অসংখ্য ছোট নদী হয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং ভূভাগকে প্লাবিত করে। অর্থাৎ বন্যা তখনই হয়, যখন এই প্রধান প্রধান নদীতে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত পানি থাকে। মূলত অধিক বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলের কারণেই নদীর পানি বেড়ে যায়।

এ তো গেল সাধারণ কথা। এবার একটি অদ্ভুত কিন্তু প্রাকৃতিক ঘটনা জানাই। বাংলাদেশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে যে পানি যায় তার মাত্র ৮ শতাংশ পানির উৎপত্তি এ দেশে, বাকি ৯২ শতাংশ পানির উৎপত্তিস্থল পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে। এক নজরে দেখা যাক, দেশের প্রধান প্রধান নদীর উৎপত্তিস্থল ও গতিপথÑ

পদ্মা: পদ্মার উৎপত্তি হিমালয়ের গায়ত্রী হিমবাহ থেকে। তারপরে এটি ভারতে গঙ্গা নাম নিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের খানিক আগে দুই ভাগে বিভক্ত হয়েছে। একটি ভাগ ভাগীরথী নামে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে থেকে গেছে আর আরেকটি ভাগ পদ্মা নাম নিয়ে বৃহত্তর রাজশাহী দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। পরে রাজবাড়ির গোয়ালন্দ ঘাটে এটি যমুনার সঙ্গে মিলিত হয়ে পদ্মা নাম নিয়ে এগিয়ে চলেছে যতক্ষণ না মেঘনার দেখা পাওয়া যায়।

ব্রহ্মপুত্র: হিমালয় পর্বতমালার চীনের তিব্বত অংশের কৈলাশ শৃঙ্গের কাছে মানস সরোবরে এর উৎপত্তি। এরপরে তা চীন থেকে ভারত হয়ে বাংলাদেশের উত্তর দিক দিয়ে প্রবেশ করেছে। জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জে ব্রহ্মপুত্র এসে দুই ভাগে ভাগ হয়ে এক অংশ যমুনা ও আরেক অংশ পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নাম ধারন করে এগিয়েছে।

মেঘনা: ভারতের সেভেন সিস্টার্সের আসামের নাগা মণিপুর পাহাড়ের দক্ষিণ দিকের লুসাই পাহাড় থেকে বরাক নদীর উৎপত্তি। পরে সিলেট অঞ্চল দিয়ে বাংলাদেশে ঢোকার একটু আগে সুরমা ও কুশিয়ারা নামে দুই বিভক্ত হয়েছে। সুরমা ও কুশিয়ারা এই দুই নদী পৃথকভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করে আজমিরিগঞ্জে আবার মিলিত হয়ে মেঘনা নাম ধারণ করেছে। মেঘনার চলার পথে ভৈরববাজারে গিয়ে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র মেঘনার সঙ্গে মিলিত হয়ে মেঘনা নামে বয়ে চলেছে। এরপর চাঁদপুরে পদ্মা এসে পড়েছে মেঘনায় এবং সমস্ত জলরাশি নিয়ে বাংলাদেশের দীর্ঘতম নদী হিসেবে ৩৩১ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে মেঘনা গিয়ে মিশেছে বঙ্গোপসাগরে।

এ তো গেল প্রধান তিন নদী। বাংলাদেশ যৌথ নদী কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে ৫৪টি অভিন্ন নদী। আর মিয়ানমার থেকে প্রবেশ করা অভিন্ন নদীর সংখ্যা তিনটি। এখন নিশ্চয় বোঝা যাচ্ছে তিনটি প্রধান নদীসহ এই ৫৭টি অভিন্ন নদীর পানিই বাংলাদেশ হয়ে বঙ্গোপসাগরে পড়েছে। তাই স্বভাবতই এই ৯২ শতাংশ পানির নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশের হাতে নেই আদৌও, যা কি না সরাসরি প্রভাব ফেলে বাংলাদেশের বন্যা পরিস্থিতির ওপর।

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থা ও বার্ষিক পানিপ্রবাহ

ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশকে বিবেচনা করা হয় নিম্নাঞ্চল হিসেবে। পুরো দেশের ভূভাগকে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উচ্চতার ভিত্তিতে মূলত তিন ভাগে ভাগ করা যায়-

১.      পার্বত্যভূমি: বাংলাদেশের পার্বত্যভূমি মাত্র ১২ শতাংশ। এই ১২ শতাংশ অঞ্চলের গড় উচ্চতা ৬১০ মিটার। এই পার্বত্যভূমির পুরোটাই চির সবুজ বনানীতে মোড়া।

২.     উচ্চভূমি: বরেন্দ্র ও মধুপুর এলাকার অপেক্ষাকৃত উচ্চভূমি, যা কি না দেশের ৮ শতাংশ।

৩.     প্লাবন সমভূমি: দেশের বাকি ৮০ শতাংশই হলো এর অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ এই ৮০ শতাংশ ভূমি সরাসরি বন্যার কবলে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা বেসিন ও অন্যান্য নদী বাংলাদেশের ওপর দিয়ে প্রতিবছর প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে পড়ে প্রায় ১ হাজার ২০০ বিলিয়ন কিউবিক মিটার পানি নিয়ে। যার কি না ৯২ শতাংশ অর্থাৎ ১ হাজার ১০০ বিলিয়ন কিউবিক লিটার পানি আসে চীন, ভারত, নেপাল ও ভুটান থেকে। এই ১ হাজার ২০০ বিলিয়ন কিউবিক মিটারের ৮৫ শতাংশ অর্থাৎ ১ হাজার বিলিয়ন কিউবিক লিটার পানি প্রবাহিত হয় জুন থেকে অক্টোবর এই পাঁচ মাসে।

১ হাজার ২০০ বিলিয়ন কিউবিক লিটার পানি বলতে যে আসলে কতটুকু পানি বোঝানো হচ্ছে, তা বোঝার জন্য বাস্তবে অসম্ভব একটি বিষয় এখন কল্পনা করব আমরা। ধরে নিই এই ১ হাজার ২০০ বিলিয়ন কিউবিক লিটার পানি বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারল না, আটকে পড়ল দেশের মধ্যে! তাহলে কী হবে? হিসাব করে দেখা যায়, এই বিপুল পরিমাণ পানি দেশের ৮০ শতাংশ প্লাবন সমভূমিকে ৯ মিটার পানির নিচে ডুবিয়ে দেবে! অর্থাৎ বাংলাদেশের ভূভাগের ৮০ শতাংশ থাকবে প্রায় ৩০ ফুট বা তিনতলা সমান পানির নিচে!

বন্যা ব্যবস্থাপনা প্রেক্ষিত বাংলাদেশ

বন্যা বাংলাদেশের নিত্যচিত্র। হাজার বছর আগেও এ ভূভাগে বন্যা হতো। বছর বছর বন্যায় ব্যাপক ক্ষতি করে জান-মালের। তাই প্রাচীনকাল থেকেই চলছে বন্যা ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ। একসময় বন্যা প্রতিরোধ বলতে মানুষ বুঝত বাড়ির ভিটে উঁচু করা। কেউ যদি বাড়ি বানাত তাহলে হয়তো পাশের জমিতে একটা পুকুর কাটত। তাতে এক ঢিলে মরত দুই পাখি! পুকুরও পাওয়া যেত আবার খোঁড়া মাটি দিয়ে বাড়ির ভিতটা উঁচু করে নেওয়া যেত। মানুষ যেন মেনেই নিয়েছিল যে বন্যার সঙ্গেই তাকে বাস করতে হবে। বন্যার পানিতে রাস্তাঘাট, মাঠ পুরো অঞ্চল ডুবে যাবে কিন্তু শুধু ভিটেমাটিটা রক্ষা পেলেই হলো।

কিন্তু ধীরে ধীরে সে অবস্থা বদলাতে শুরু করে ষাটের দশকের শুরুতে। সরকারিভাবে ১৯৬৪ সালে দেশজুড়ে ৫৮টি বন্যা প্রতিরোধ এবং নিষ্কাশন প্রকল্পসংবলিত একটি মাস্টারপ্ল্যান গৃহীত হয়, যার আওতাভুক্ত এলাকা ছিল ৫ দশমিক ৮ মিলিয়ন হেক্টর। তিন ধরনের পোল্ডার বা উদ্ধারকৃত নিম্নভূমি এই বন্যা প্রতিরোধ ও নিষ্কাশন কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত ছিল: পোল্ডারসহ মাধ্যাকর্ষণ শক্তিকে কাজে লাগিয়ে পানি নিষ্কাশন; টাইডাল সøুইস গেটের মাধ্যমে জোয়ারের পানি নিষ্কাশন; এবং পাম্পের মাধ্যমে বন্যার পানি নিষ্কাশন। ১৯৯৩ সালে সর্বমোট আর্দ্র ভূমির পরিমাণ ছিল ৩ দশমিক ১৪ মিলিয়ন হেক্টর, যার মধ্যে ১ দশমিক ৫৫ মিলিয়ন হেক্টরে চাষাবাদ হয়েছিল এবং ১ দশমিক ৩৮ মিলিয়ন হেক্টর ভূমি থেকে পানি নিষ্কাশিত হয়েছিল ভূ-পৃষ্ঠের ওপরের নালীসমূহের মাধ্যমে। কৃষিজমি ও জনপদকে বন্যা থেকে বাঁচানোর জন্য। নদীর তীরে উঁচু করে বাঁধ দেওয়া শুরু হয় সে সময় থেকে। সেই নদীতীর উঁচু করে বাঁধ দেওয়ার পদ্ধতিটিই দীর্ঘকাল ধরে চলে এসেছে বাংলাদেশে। এর পাশাপাশি খাল খনন আর নদীর তলদেশ ড্রেজিং করা যুক্ত হয় পরে।

ড্রেজিং অনেক ক্ষেত্রেই কার্যকরী। ড্রেজিং মূলত দুই প্রকার-

১.      ক্যাপিটাল ড্রেজিং

২.     মেইনটেন্যান্স ড্রেজিং

ক্যাপিটাল ড্রেজিং করা হয় সাধারণত নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে। আর মেইনটেন্যান্স ড্রেজিং করা হয় খুব সীমিত অঞ্চলে যেমন ফেরি পারাপারের পথটুকু ধরে। তবে ড্রেজিং বেশ ব্যয়বহুল হওয়ায় বড় নদীতে ড্রেজিং করাটা সব সময় সুফল দেয় না। যেমন যমুনার ক্ষেত্রে দেখা গেছে হয়তো সারা দিনে ড্রেজিং করে দুই ফুট পলি সরানো হয়েছে কিন্তু রাতের বেলাতেই আবার সে জায়গা তিন ফুট পলিতে ভরে গেছে। এ জন্য অপেক্ষাকৃত ছোট নদীতে ড্রেজিংয়ে ভালো ফল পাওয়া যায় বড় নদীর তুলনায়।

বন্যা ব্যবস্থাপনায় কারিগরি কৌশল

বন্যা থেকে মুক্ত হওয়া হয়তো পুরোপুরিভাবে সম্ভব না এ দেশের মানুষের। তবে বন্যায় যে ক্ষয়ক্ষতি হয় তা কিন্তু সুপরিকল্পিতভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব। এ জন্য দুই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। যথা-

১.      কাঠামোগত পদ্ধতি (স্ট্রাকচারাল মেথড)

২.     অকাঠামোগত পদ্ধতি (নন-স্ট্রাকচারাল মেথড)

কাঠামোগত পদ্ধতি

কাঠামোগত পদ্ধতির মধ্যে রয়েছে ড্যাম নির্মাণ, রিসার্ভার নির্মাণ, নদীর তীর উঁচু করে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ, পোল্ডার তৈরি, ফ্লাড ওয়াল তৈরিসহ নানা পদ্ধতি। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বড় আকারের ড্যাম তৈরি করে বিভিন্ন অঞ্চলকে বন্যামুক্ত করা হয়। এ বিষয়টি বাংলাদেশে প্রয়োগ করা সম্ভব কি না তা নিয়ে বেশ কিছু গবেষণা হয়েছে। কিন্তু ভৌগোলিকভাবে দেশের ভূ-প্রকৃতি ভিন্নধর্মী হওয়ায় ড্যাম নির্মাণ করে খুব একটা সুফল পাওয়া সম্ভব নয়। পাহাড়সমৃদ্ধ অঞ্চলের নদীর ক্ষেত্রেই ড্যাম অনেক কাজে দেয়। যেমনটি আমরা দেখেছি যুক্তরাষ্ট্রের হুভার ড্যাম, পাকিস্তানের মাঙ্গলা ড্যাম, চীনের থ্রি জর্জেস ড্যাম ইত্যাদি। বাংলাদেশে অবশ্য নদীর তীর ধরে বেশ কিছু শহররক্ষা বা লোকালয় রক্ষা বাঁধ রয়েছে, যেগুলো বেশ সুফল দিচ্ছে। বন্যার ক্ষতি ও প্রতিকূল প্রভাব হ্রাস করতে ও অতিরিক্ত পানি সেচকার্যের ব্যবহারের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড কিছুসংখ্যক বাঁধ তৈরি করেছে ও খাল খনন করেছে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য: জি-কে (গঙ্গা-কপোতাক্ষ) প্রজেক্ট, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-ডেমরা (ডিএনডি) প্রজেক্ট, কর্ণফুলী বহুমুখী প্রকল্প, উপকূলীয় বাঁধ প্রকল্প, উত্তরবঙ্গের নলকূপ প্রকল্প, ব্রহ্মপুত্র বাঁধ, চাঁদপুর সেচ প্রকল্প, মেঘনা-ধনাগোদা প্রকল্প, মনু নদী প্রকল্প, খোয়াই নদী প্রকল্প, পাবনা সেচ প্রকল্প, গোমতী প্রকল্প, মহুরী বাঁধ প্রকল্প, তিস্তা বাঁধ প্রকল্প (পর্যায়-১), ঢাকা সমন্বিত বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্প, প্রণালি পুনর্বাসন প্রকল্প, জরুরি বাস্তবায়ন প্রকল্প। ফ্লাড ওয়াল বাংলাদেশে সেভাবে দেখা যায় না। তবে শহর অঞ্চলের জন্য ফ্লাড ওয়াল বেশ কার্যকরী। যুক্তরাজ্যে টেমস নদীর তীরে স্টিলের তৈরি চার-পাঁচ ফুট উচ্চতার ফ্লাড ওয়াল লন্ডনকে অপ্রত্যাশিত বন্যা থেকে রক্ষা করছে। এই ধরনের ফ্লাড ওয়ালের কথা চিন্তা করা যেতে পারে শহর অঞ্চলের জন্য। ঢাকা ফ্লাড কন্ট্রোল প্রজেক্টে ইতিমধ্যেই ৩৭ কিলোমিটার দীর্ঘ ফ্লাড ওয়াল রয়েছে।

নদীর বা বৃষ্টির অতিরিক্ত পানি ধারণের জন্য স্টোরেজ বা রিসার্ভার পদ্ধতি বেশ প্রচলিত সারা বিশ্বে। কিন্তু ভূ-প্রকৃতির কারণে বাংলাদেশে তা বাস্তবসম্মত নয়।

অকাঠামোগত পদ্ধতি

কাঠামোগত পদক্ষেপসমূহ ছাড়াও বন্যা প্রশমন প্রক্রিয়া ও ক্ষয়ক্ষতি হ্রাসের একটি বিকল্প কৌশল হিসেবে অকাঠামোগত পদক্ষেপের কথা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। অকাঠামোগত পদক্ষেপ বলতে বন্যা মোকাবিলায় সামাজিক অভিযোজনকে বোঝানো হয়। এর মধ্যে রয়েছে-

  • বন্যার পূর্বাভাস: জনগণ যাতে দ্রুত নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে পারে সে লক্ষ্যে বন্যার পানির উচ্চতা বৃদ্ধির যথেষ্ট সময় আগে জনগণের কাছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ পূর্বাভাস   জান-মাল রক্ষায় কার্যকরী ভূমিকা রাখে।
  • বনায়ন: নদ নদীর উপচে পড়া পানি হ্রাসের লক্ষ্যে সঠিক ভূমি ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে বনায়ন ও পুনর্বনায়নের সমন্বিত কর্মসূচি গ্রহণ ও তার যথাযথ সংরক্ষণ, যাতে পরিশোষণ প্রক্রিয়া বৃদ্ধির মাধ্যমে বন্যার পানির উচ্চতা কমাতে পারে। বাঁধের ওপরে ‘ভেটিভার’ (বৈজ্ঞানিক নাম: ক্রিসোপোগন জিজানিয়োডেস) নামক একধরনের বিশেষ প্রজাতির ঘাস রোপণ করা যেতে পারে, যা শিকড় মাটির গভীরে গিয়ে মাটিকে শক্ত করে ধরে রাখে। এটি মাটির বাঁধের ওপর রোপণ করলে তা বাঁধকে রক্ষা করতে পারে।
  • ভূমির সঠিক ব্যবহার ও বিল্ডিং কোডের প্রয়োগ: ভূমি ব্যবহার পরিবর্তন এবং বিল্ডিং কোডের যথাযথ প্রয়োগ, শস্য উৎপাদন বহুমুখীকরণ তথা বন্যা প্রতিরোধী বা বন্যা সহনক্ষম শস্য চিহ্নিতকরণ ও রোপণ করা এবং শস্য রোপণ মৌসুমের অভিযোজন। অল্প পানিতে প্লাবিত অবস্থায় বেঁচে থাকতে পারে এমন জাতের ফসল আবিষ্কারের অবিরত চেষ্টা করে যাচ্ছে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কেন্দ্র।
  • প্লাবনভূমিসমূহকে বিভিন্ন জোনে বিভক্ত করা এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ভূমি ব্যবহার জোন তৈরি করা। এ ক্ষেত্রে এমন নিয়ম চালু করা যেতে পারে যে বন্যাপ্রবণ অঞ্চলে বাড়ি নির্মাণ করতে চাইলে বেশি পরিমাণে রাজস্ব দিতে হবে। এ ধরনের নিয়ম উন্নত বিশ্বে প্রচলিত। অকাঠামোগত পদক্ষেপসমূহ স্বল্প ব্যয়ে বাস্তবায়ন করা সম্ভব শুধু যদি একটু সতর্কতা অবলম্বন করা যায়।
  • ফ্লাড ইনস্যুরেন্স: উন্নত দেশে ফ্লাড ইনস্যুরেন্স ব্যবস্থা চালু রয়েছে। তা যদি বাংলাদেশেও চালু করা যায় তাহলে বন্যার ক্ষয়ক্ষতির হাত থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করা সম্ভব।

বাংলাদেশের মানুষের আদিকাল থেকে বন্যার সঙ্গেই বসবাস। তাই এ সময়ে এসে বন্যাকে ভয় পেলে চলবে না। বরং সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগগুলোকে একসঙ্গে করে সঠিক সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে উন্নত বন্যা ব্যবস্থাপনার উপায় বের করতে হবে ভবিষ্যৎ বন্যার ক্ষতির হাত থেকে বাঁচতে।

দেশে দেশে বন্যা প্রতিরোধব্যবস্থা

বন্যা সমস্যা কি শুধুই বাংলাদেশের? ইতিহাস কিন্তু এমনটা বলছে না। গ্রীষ্মের সময় পানির অভাব আর বর্ষার শুরুতেই প্রবল বন্যার শুরু; এই সমস্যা শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা বিশ্বের অনেক দেশকেই মোকাবিলা করতে হতো। আসুন না দেখি তারা কীভাবে উদ্ভাবনী শক্তি কাজে লাগিয়ে বন্যাকে নিয়ন্ত্রণে এনেছে-

টোকিও ওয়াটার রিসার্ভার, জাপান

প্রতিবছর একই সময়ে একই নদী প্লাবিত করত ভূভাগকে। একই সমস্যা ছিল প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে দ্বীপরাষ্ট্র জাপানের রাজধানী টোকিওর। মূলত চারটি বড় বড় দ্বীপ ও অসংখ্য ছোট ছোট দ্বীপ নিয়েই জাপান। হংশু, হোক্কাইডো, শিকোকু ও কিউশু এই চার প্রধান দ্বীপের মধ্যে সবচেয়ে বড়টি হলো হংশু। এই হংশুর উপকূলবর্তী মেগাসিটি টোকিও। বাংলাদেশের মতো টোকিওকেও নদীমাতৃক শহর বললে ভুল হবে না। টোকিওর মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে আট-নয়টি বড় নদী। এসব নদী গিয়ে মিশেছে প্রশান্ত মহাসাগরে। এই নদীগুলো টোকিওকে যেমন বাঁচিয়ে রেখেছিল সুপ্রাচীন কাল থেকে তেমনি প্রতিবছর বয়ে নিয়ে আসত অনন্ত দুঃখ-কষ্ট। ১৯৫০-৬০-এর দশকের প্রবল বন্যায় ভেসে যেত টোকিওর রাস্তাঘাট। মানুষজন রাস্তায় নেমে মাছ ধরত। ঠিক এমনই অবস্থা ছিল তখন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ও ব্যয়বহুল এ শহরটির।

জন্মলগ্ন থেকেই টোকিও ছিল ‘জিওলজিক্যালি চ্যালেঞ্জড’ এক মেগাসিটি। বছরে ১৫৩০ মি.মি. বৃষ্টিপাত হয় টোকিওতে। বিজ্ঞানীদের ভবিষ্যদ্বাণী তা নাকি আরও বাড়বে। এ অবস্থায় জাপান চিন্তা করতে থাকে যুগান্তকারী কিছু করার, যা কি না এই মেগাসিটিকে বাঁচাবে সব ধরনের সমস্যা থেকে। সমুদ্রপারের টোকিওর প্রায় ১০০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা ‘সি লেভেলের’ চেয়ে নিচু। আর ৬০-৭০-এর দশকে সেই শহরে ব্যাপক শিল্পায়ন শুরু হলে নতুন করে চাহিদা দেখা দেয় মিঠা পানির। সেই প্রয়োজন মেটাতে ভূগর্ভস্থ পানির উৎসে চোখ যায় শিল্পপতিদের। আর তা করতে গিয়ে প্রচুর ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে টোকিও শহরের মাটি আরও দেবে যায় ৬০-৭০ সে.মি.।  এ অবস্থায় শহরের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া আটটি বড় নদী প্রতি বর্ষাতেই পানিতে উপচে পড়ে শহরের বিশাল অংশ প্লাবিত করত।

তখনই ১৯৯৩ সালে প্রায় অস্বাভাবিক ও স্বপ্নের এক প্রজেক্ট বাস্তবায়নে নামে জাপান। ভাবে এমন এক বিশালাকার ভূগর্ভস্থ পানির ট্যাংকের কথা, যা বর্ষাকালে টোকিও শহরের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীগুলোর অতিরিক্ত পানিকে মাটির প্রায় ২০০ ফুট নিচে নিয়ে যাবে এবং তারপর সেখান থেকে দীর্ঘ টানেলের সাহায্যে ‘ইডো’ নদীতে নিয়ে ফেলবে বহমান পানিকে, আর ইডো নদী থেকে পানি সরাসরি মিশবে প্রশান্ত মহাসাগরে। যেমন ভাবা তেমন কাজ। ১৯৯৩ সাল থেকে শুরু হয় মেগা প্রজেক্টের কাজ। প্রথম চ্যালেঞ্জ ছিল জনাকীর্ণ শহরের মাটি গর্ত করে প্রায় ২০০ ফুট গভীরে যাওয়া। এর পরে যেসব স্থানে নদীগুলো প্লাবিত হয় বেশি সে রকম পাঁচটি স্থান চিহ্নিত করেন জাপানি প্রকৌশলীরা। পরিকল্পনা ছিল এই পাঁচটি স্থানে পাঁচটি বড় আকারের মুখ তৈরি করার মাধ্যমে এই নদীগুলোর অতিরিক্ত পানি মাটির ৭০ মিটার গভীওে নেওয়া। নির্মাণের পরে এই পাঁচটি বিশালাকার ভূগর্ভস্থ ফানেল হয় দেখার মতো! প্রতিটির গভীরতা ৭০ মিটার, ব্যাস ৩২ মিটার। আয়তনের কথা যেন বলাই বাহুল্য। প্রতিটিতে একটা করে স্পেস শ্যাটল এঁটে যাবে নিমেষেই!

এ তো গেল বিপজ্জনক পাঁচ পয়েন্টে পাঁচ মহা ফানেল লাগানোর কথা। পানি না হয় মাটির নিচে চলে যাবে। কিন্তু এরপর কী হবে? এখানেই উদ্ভাবনী চিন্তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত দেখতে পাই আমরা। এই পাঁচটি ফানেল মাটির ৭০ মিটার গভীরে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত থাকবে দীর্ঘ টানেলের মাধ্যমে। এবার তাহলে অনুমান করুন সেই টানেলের দৈর্ঘ্য কত হতে পারে? বলে দিই। পানি নিষ্কাশনের এই টানেলের দৈর্ঘ্য হলো ৬ দশমিক ৪ কিলোমিটার। যেন মাটির নিচে এক মহাযজ্ঞ! এই মেগা প্রজেক্টের মূল তিনটা অংশের দুটো হলো পাঁচ ফানেল ও ৬ দশমিক ৪ কিলোমিটার লম্বা টানেল। আর সর্বশেষ বা সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং অংশটা হলো এই ৬ দশমিক ৪ কিলোমিটার লম্বা টানেলের শেষ মাথায় অবস্থিত ইডো নদীতে এই বিপুল পরিমাণ পানি নিয়ে ফেলা। নাকা, কুরমাস্তু, কৌমাস্তু, অতশিফুরুতনের মতো নদীর অতিরিক্ত পানি যখন প্রবল বেগে টানেল হয়ে আসছে তখন সেই বিপুল জলরাশিকে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য অপেক্ষা করছে বিশাল এক ওয়াটার ট্যাংক।

পাঁচতলার সমান উচ্চতাবিশিষ্ট এই গভীর ট্যাংকের ছাদ দাঁড়িয়ে রয়েছে ৫৯টি লম্বা পিলারের ওপর। এসব পিলারের প্রতিটির ওজন প্রায় ৫০০ টন। পুরো ট্যাংকটি দৈর্ঘ্যে ১৭৭ মিটার, প্রস্থে ৭৮ মিটার। আর উচ্চতা ২৫ দশমিক ৪ মিটার। যখন প্রবল বৃষ্টি শুরু হয় আর নাকা, কুরমাস্তু, কৌমাস্তু, অতশিফুরুতন নদীগুলোর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করে তখনই অতিরিক্ত পানি প্রবেশ করা শুরু করে পাঁচটি বিশালাকৃতির এই ফানেলে। তারপর সেই ফানেল হয়ে ৬ দশমিক ৪ কিলোমিটার ভূগর্ভস্থ টানেলে করে পানি আসে সেই বিশালাকৃতির ওয়াটার ট্যাংকে। এই পুরো প্রক্রিয়াটিই সেন্ট্রাল কন্ট্রোল রুম থেকে পালাক্রমে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা মনিটর করেন সুদক্ষ প্রকৌশলীরা। তারা যখন দেখেন ওয়াটার ট্যাংকে যথেষ্ট পানি জমেছে ঠিক তখনই ড্রেনেজ পাম্প স্টেশনের চারটি শক্তিশালী পাম্প চালু করেন। পাম্পগুলোর প্রতিটির পানি নিষ্কাশনক্ষমতা ৫০ কিউবিক মিটার প্রতি সেকেন্ডে। অর্থাৎ, টানেল হয়ে ওয়াটার ট্যাংকে জমা হওয়া পানি অপসারণের জন্য চারটি পাম্প একসঙ্গে চালু করে দিলে সেগুলো প্রতি সেকেন্ডে ২০০ কিউবিক মিটার পানি পাম্প করে নিয়ে গিয়ে ইডো নদীতে ফেলে। আর সেই পানি গিয়ে পরে প্রশান্ত মহাসাগরে, মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকে শহর টোকিও।

এই প্রজেক্টটি কেমন কাজে লাগছে, জানতে চান? শেষ ১০ বছরে ৭০ বার ব্যবহার করা হয়েছে এটি। তাহলেই বুঝুন। এই পুরো প্রজেক্টে ব্যয় হয়েছে ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। কিন্তু আর্থিক সাশ্রয় হচ্ছে শত শত বিলিয়ন ডলার। প্রতিবছর পর্যটকেরা এই মেগা প্রজেক্ট দেখতে ভিড় জমান টোকিও শহরে। এই প্রজেক্টের কাছেই আছে একটা ওয়াটার মিউজিয়াম। একই সঙ্গে দুইটি বিস্ময়কর স্থাপনার স্বাদ নিয়ে যান পর্যটকেরা।

ম্যায়েসলানটেকারিং, নেদারল্যান্ডস

এটি নেদারল্যান্ডসের বিখ্যাত বন্যা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা। ইস্পাতের তৈরি এই ‘মুভেবল’ বাঁধ কপাটের মতো কাজ করে। জোয়ার-ভাটার সময় এই কপাট খুলে-বন্ধ করে আশপাশের প্রাচীন শহর ও কৃষিজমিকে রক্ষা করা হয়।

হুভার ড্যাম, যুক্তরাষ্ট্র

যুক্তরাষ্ট্রের কলরাডো নদীতে এই ড্যামের অবস্থান। ১৯৩৬ সালে বাঁধটি নির্মিত হয় আশপাশের এলাকার বন্যা নিয়ন্ত্রণে, সেই সঙ্গে খরার জন্য পানি সংরক্ষণে। ৭২৬ ফুট উঁচু এই বাঁধের ওপরের ব্রিজ দিয়ে শত শত যান চলাচল করে। প্রতিবছর কংক্রিটের এই ড্যাম দেখতে আসে প্রায় ১০ লাখ পর্যটক। প্রেসিডেন্ট হাভার্ড হুভারের নামে এই ড্যামের নামকরণ করা হয়েছে। এই ড্যাম বানাতে সময় লেগেছিল পাঁচ বছর। বন্যা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি জল বিদ্যুৎ উৎপাদনেও কাজ করছে ড্যামটি।

মোস প্রজেক্ট, ইতালি

ইতালির ভেনিসকে পানির নিচে ডুবে যাওয়া থেকে বাঁচাতে ভেনিসকে রক্ষায় নেওয়া হয়েছে এক বৃহৎ প্রকল্প মোস (Modulo Sperimentble Elettromeccanico, Experimental Elecromechanical Module)। এই মেগা প্রজেক্ট কাজ করে যাচ্ছে। একাধিক বিশাল বিশাল গেটের সাহায্যে সমুদ্রের পানির প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করে শহর ভেনিসকে বন্যামুক্ত রাখাই এর উদ্দেশ্য।

পরিশেষে

আদিকাল থেকে বন্যার সঙ্গেই এ দেশের মানুষের নিত্যবসবাস হলেও আজও এর নিয়ন্ত্রণে সঠিক সমাধান সম্ভব হয়নি। বিশ্বের উন্নত দেশ নানা ধরনের গবেষণার মাধ্যমে বন্যা প্রতিরোধ ও অবশ্যম্ভাবী ক্ষয়ক্ষতি কমাতে বন্যা ব্যবস্থাপনায় প্রকৌশল ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা গ্রহণে নতুন ধরনের পদ্ধতি অনুসরণ করছে। তার সবগুলো অবশ্য আমাদের দেশের জন্য কার্যকর নাও হতে পারে। কারণ, বিশ্বের সবচেয়ে বড় ব-দ্বীপ বাংলাদেশের ভূ-প্রকৃতি একেবারেই আলাদা। এ দেশের ভূভাগ যেমন নিচু, তেমনি দেশের ভেতরে জালের মতো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে অসংখ্য নদ-নদী। বন্যার ক্ষতি থেকে বাঁচতে সরকারি-বেসরকারিভাবে প্রকৌশলী, প্রযুক্তিবিদ, গবেষকদের সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়নে উন্নত বন্যা ব্যবস্থাপনার উপায় খুঁজে বের করতে হবে। এমন যেন না হয় যে বন্যা প্রতিরোধ করতে গিয়ে দেশের জলজ সম্পদ ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি হয়। হাজার বছর ধরে মানুষ বন্যার সঙ্গেই বাস করছে; ভবিষ্যতেও করবে। তাই বন্যাকে অভিশাপ না ভেবে সঠিক বন্যা ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বন্যার পানিকে আশীর্বাদে বদলে দেওয়া কিন্তু মোটেই অসম্ভব নয়!

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮৬তম সংখ্যা, জুন ২০১৭।

Related Posts

বাংলার বাঘা মসজিদ সুলতানী ঐতিহ্যের এক সাক্ষী

বাংলার ইতিহাস কত সমৃদ্ধ তা শুধু ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো দেখলেই বুঝা যায়। দেশে দেশে ইতিহসে রয়েছে বৈচিত্রতা। কোন দেশে…

স্থপতি নিশাতের ঘরে মা দিবসের এক দুপুর

মা দিবস উপলক্ষে কি ধরনের লেখা দিব তা নিয়ে বেশ চিন্তাই ছিলাম। সাথে সাথে মনে হলো, দুই প্রজন্মের…

শ্রমিক এবং পরিবেশবান্ধব শিল্পায়ন: সবুজের সঙ্গে সেতুবন্ধন

শ্রমিক দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রতিটি ইট, প্রতিটি দেয়াল, প্রতিটি উৎপাদনের পেছনে আছে শ্রমিকের ঘাম, সময় ও…

হাইওয়ের বুকে খাড়া শহর: নগরের নতুন ভাষা

হাইওয়ে একদিকে যেমন চলাচলের জন্য অপরিহার্য, অন্যদিকে এটি শহরের ভেতরের জীবনকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এমনই এক দ্বন্দ্বের মধ্যে…

ByByshuprova Apr 20, 2026

বন্যা প্রতিরোধী বাঁশের বাড়ি নির্মাণের এখনই সময়

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। সাগর উপকূলে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ব-দ্বীপ বাংলাদেশ। বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বন্যা বাংলাদেশের জন্য খুবই…

পাহাড়ের ঢালে খোদাই করা ‘নট আ হোটেল সেতোউচি’

এর নকশাটি ছিল সরাসরি জাপানি লোকজ স্থাপত্য থেকে অনুপ্রাণিত। যা স্ক্যান্ডিনেভিয়ান সংবেদনশীলতার মাধ্যমে এর যুক্তিকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করে।…

নদীর মাঝে ফুটে ওঠা কংক্রিটের টিউলিপ পার্ক

প্রায় আড়াই একর জায়গাজুড়ে রয়েছে ঘোরানো হাঁটার পথ, সাজানো বাগান, আর ৭০০ আসনের একটি এম্ফিথিয়েটার। ২৬০ মিলিয়ন ডলারের…

নগর ও নারী: স্পেসের ভেতর নির্মিত বৈষম্য

জেন্ডার, স্পেস, ক্ষমতা এবং স্থাপত্য এই চারটির পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে আমাদের জানাশোনা তুলনামূলকভাবে কম। অথচ সময়ের সাথে সাথে…

নির্বাচনী ইশতেহারে পরিবেশ, ভূমি ও আবাসন: কি বলছে দলগুলো?

বাংলাদেশের নির্বাচনী ইশতেহারগুলোতে সাধারণত অর্থনীতি, শাসনব্যবস্থা, কর্মসংস্থান, দুর্নীতিবিরোধী কর্মসূচি ও সামাজিক নিরাপত্তা বিষয়ে তুলনামূলকভাবে বিস্তৃত আলোচনা থাকলেও নগর…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *