বাথরুমের আয়না-বৃত্তান্ত

একটা সময় ছিল যখন কোনো রকমে ক্লিপ দিয়ে আয়না ঝুলিয়ে রাখা হতো দেয়ালজুড়ে। দিন বদলেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন ঘটেছে মানুষের রুচিবোধের। বর্তমান সময়ে আয়না শুধু মুখ দেখার প্রয়োজনেই ব্যবহৃত হয় না, বরং আয়নার নকশা ও আকৃতির ওপর অনেকাংশে নির্ভর করে গৃহকর্তার শিল্পসত্তা ও সৌন্দর্যবোধ। স্নানঘরের আয়না নির্বাচনে যোগ হয়েছে বাড়তি সচেতনতার। প্রতিদিন গোসল শেষে কতটা স্নিগ্ধ লাগছে আপনাকে তা দেখে নেওয়ার জন্য চাই একটি ভালো আয়না।

স্নানঘরে কেমন আয়না মানাবে তা নির্ভর করে স্নানঘরটি কোন ঘরের সঙ্গে সংযুক্ত তার ওপর। মাস্টার বেডরুমের সঙ্গে লাগোয়া স্নানঘরের জন্য প্রয়োজন একটি উন্নতমানের আয়না। যদি স্নানঘরটা বড় হয় সে ক্ষেত্রে আয়নাটিও বড় আকারের হলে ভালো মানাবে। এতে গোসল শেষে পূর্ণ অবয়বটা দেখে নেওয়া যায়। আর ছোট আয়না বসাতে চাইলে সামনে-পেছনে উভয় পাশেই বসানো যেতে পারে। অনেকে আবার বড় আয়না কেটে কয়েক টুকরো করে বাথরুমে বসান। এ ক্ষেত্রে লক্ষ রাখতে হবে টুকরো আয়নাগুলোর দূরত্ব এমন না হয়, যাতে চেহারা দেখতে সমস্যা হয়। বর্তমানে অধিকাংশ বাসাতেই আগত অতিথির জন্য বাথরুম থাকে একটা। এ বাথরুমে ব্যবহৃত আয়নার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া উচিত। কেননা বাথরুমটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন এবং অন্দরসজ্জার ওপর নির্ভর করে বাড়ির কর্তার ব্যক্তিত্ব ও রুচিবোধের। এ ক্ষেত্রে স্নানঘরটির পরিসরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আয়না নির্বাচন করতে হবে। তবে এ ক্ষেত্রে বেশি বড় আকৃতির আয়না না বসিয়ে একটু লম্বাটে ছোট আকৃতির আয়না নির্বাচন করা ভালো।

বর্তমানে অধিকাংশ বাথরুমেই টাইলস ব্যবহার করা হয়। হালকা রঙের টাইলসের সঙ্গে গাঢ় রঙের বর্ডার দেওয়া বা গাঢ় রঙের কাজ করা আয়না বেশি মানায়। তবে একটা বিষয় অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে, আয়না বসানোর আগে টাইলস বসানো হয়। তাই টাইলস বসানোর সময় আয়না বসানোর জায়গাটা ফাঁকা রাখা ভালো। এতে পরে আয়না বসানোর সময় ঝামেলা কম হয়। ফাঁকা জায়গায় আঠা দিয়ে আয়নাটা লাগাতে হবে। অনেক সময় আয়নার ভেতরে সাদা দাগ পড়ে যায়। তাই দেয়ালের সঙ্গে আয়নাটা এমনভাবে আটকাতে হবে যেন আয়নার পেছনে পারদের জায়গায় পানি না ঢুকতে পারে।

একটি স্টাইলিশ আয়না আপনার স্নানঘরের অভ্যন্তরীণ চেহারাই বদলে দিতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে কিছু বিষয়ের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে। যেমন:

আয়নার ফ্রেমের বিষয়টিকে প্রাধান্য দিন

স্নানঘরের আয়নার সৌন্দর্যবর্ধনে বাজারে পাওয়া যাচ্ছে বিভিন্ন রকম ফ্রেম, যা আয়নায় নতুনত্বের মাত্রা যোগ করে। স্নানঘরের টাইলসের রঙের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আয়নার ফ্রেমের রং নির্বাচন করা উচিত। যদি আপনার স্নানঘরে ধূসর রঙের টাইলস ব্যবহৃত হয়, তাহলে আয়নার ফ্রেমেও ধূসরের আধিপত্য বা ধূসরের ছোঁয়া থাকা ভালো। ফ্রেম পছন্দ বা নির্বাচন করার সময় টেকসই ফ্রেম পছন্দ বা নির্বাচন করা উচিত। যাতে করে ঘন ঘন মেরামত করার ঝামেলায় আপনাকে না পড়তে হয়। কাঠের ফ্রেম ব্যবহার না করাই ভালো। কেননা স্নানঘরের অতিরিক্ত আর্দ্র তাপমাত্রা কাঠের ফ্রেমের জন্য উপযোগী নয়। কাঠের ফ্রেম ব্যবহার করলেও তা বার্নিশ করে নেওয়া উচিত। আয়নার শোভাবর্ধনে কাচের তৈরি ফ্রেম বর্তমানে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। তবে ব্যতিক্রমধর্মী কিছু চাইলে ধাতব অথবা ব্রোঞ্জের ফ্রেম ব্যবহার করতে পারেন, যা আপনার স্নানঘরকে একটা ক্ল্যাসিক্যাল লুক দেবে। পিভিসি বোর্ডের তৈরি ফ্রেমও ক্রেতাবাজারে বিশেষ জায়গা দখল করে নিয়েছে বর্তমান সময়ে।

মানানসই আকৃতিটি বেছে নিন

অধিকাংশ বাথরুমেই সাধারণ মানের চারকোনা আকৃতির আয়না ব্যবহার করা হয়। তবে যদি আপনার বাথরুমটির পরিসর বেশি হয়, তাহলে বড় আকারের আয়না ব্যবহার করতে পারেন। আর ছোট পরিসরের বাথরুমের ক্ষেত্রে গোলাকার বা ডিম্বাকৃতির আয়না ব্যবহার করা উত্তম, যা সৌন্দর্য বাড়ায় তথা জায়গা বাঁচায়। শিশুদের বাথরুমে বসানো যেতে পারে কার্টুন আকৃতির আয়না। এ ক্ষেত্রে একটি বড় আয়না কিনে দোকান থেকে কাটিয়ে কার্টুনের আকৃতি করে নেওয়া যেতে পারে।

আয়নাকে আকর্ষণীয়ভাবে সাজিয়ে তুলুন

স্নানঘরের আয়নাটিকে আকর্ষণীয় করার জন্য আলাদাভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। তাতে স্নানঘরটিকে নান্দনিকতার সঙ্গে ফুটিয়ে তোলা সম্ভব হবে। স্নানঘরের আয়নাটিতে আলাদাভাবে অল্প ওয়াটের লাইট ব্যবহার করতে পারেন। আরও ভালো ফলাফলের জন্য বিভিন্ন রকমের লাইট ব্যবহার করতে পারেন। ফলে স্নানঘর ও আয়না দুটোকেই আকর্ষণীয় লাগবে। বিভিন্ন আকারের আয়না বসিয়ে নিজের পছন্দ অনুযায়ী নকশা করে নেওয়া যেতে পারে। আয়নার যেকোনো এক কোনায় গ্লাস পেইন্ট দিয়ে নকশা করে নিলে ভিন্নতার মাত্রা যুক্ত হবে আয়নাটিতে। আবার কাচের দোকান থেকে আয়নাটির কিছু অংশ ফ্রস্টেও করে নিতে পারেন। ছোট ছোট কাচের টুকরো আয়নায় বসিয়ে কিংবা বিভিন্ন রঙের কাচের চুড়ির ভাঙা টুকরো আঠা দিয়ে আয়নায় বসিয়ে বিভিন্ন ডিজাইন করে নিতে পারেন। আজকাল অনেকেই আবার এচিং করা আয়না বাথরুমে বসাচ্ছেন।

আয়না প্রাত্যহিক জীবনের প্রয়োজনীয় একটি অনুষঙ্গ। সঠিক নিয়মে পরিষ্কার করলে ও যত্ন নিলে আপনার শখের আয়নাটি ভালো থাকবে বহুদিন। ঝকঝকে-পরিচ্ছন্ন একটি আয়না ঘরকে করে তোলে প্রফুল্ল। চলুন জেনে নেওয়া যাক আয়নার যত্নআত্তি সম্পর্কে:

  • ভিনেগার ও পানি মিশিয়ে বোতলে ভরে আয়নার ওপর স্প্রে করুন। এবার মাইক্রোভাইবার ক্লথ বা সুতি কাপড় দিয়ে মুছে ফেলুন। আয়নাটি হয়ে উঠবে ঝকঝকে।
  • এক চা-চামচ বেকিং সোডা কাপড়ে নিয়ে পুরো আয়না ভালোভাবে ঘষে নিন। এবার একটি ভেজা তোয়ালে দিয়ে আয়নাটি মুছে ফেলুন।
  • আয়নাকে ঝকঝকে-চকচকে করতে ডিস্টিল ওয়াটারের জুড়ি নেই। ডিস্টিল ওয়াটার সাধারণ পানির চেয়ে অধিকতর কার্যকর। একটি কাপড়ে ডিস্টিল ওয়াটার নিয়ে আয়নাটি ভালোভাবে মুছে ফেলুন। চকচকে হয়ে উঠবে আয়নাটি।
  • খবরের কাগজ গরম পানিতে ভিজিয়ে আয়না ঘষে ঘষে মুছুন। তারপর শুকনো কাপড় দিয়ে মুছে নিন।
  • নরম কাপড়ে হ্যান্ডওয়াশ নিয়ে ফেনা করে তা দিয়ে কিছুক্ষণ আয়নাটি ভালো করে ঘষে নিন। এবার ব্রাউন পেপার দিয়ে মুছে নিন। চকমকে হয়ে উঠবে আপনার প্রিয় আয়নাটি।
  • বাজারে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের গ্লাস ক্লিনার ও গ্লাস ওয়াশিং পাউডার পাওয়া যায়, যা দিয়ে খুব সহজেই আয়না পরিষ্কার করা যায়।
  • বাথরুমের আয়নায় অনেক সময় পানির কঠিন দাগ পড়ে, যা ওঠানো বেশ কঠিন। এ ক্ষেত্রে আয়নায় শেভিং ফোম বা ক্রিম মেখে কিছুক্ষণ রেখে দিতে হবে। তারপর কাপড় দিয়ে মুছে ফেলতে হবে। সব দাগ উঠে যাবে।
  • আয়নাকে অনাকাক্সিক্ষত দাগের হাত থেকে সুরক্ষার্থে প্রয়োজনে স্বচ্ছ স্টিকার লাগিয়ে নিতে পারেন। আয়নায় পানি পড়লে অবশ্যই গোসল শেষে মুছে ফেলতে হবে।
  • পানিতে অল্প শ্যাম্পু মিশিয়ে নিন। মিশ্রণটি দিয়ে পুরো আয়নাটি মুছুন। কিছুক্ষণ রেখে দিন। তারপর স্পঞ্চ দিয়ে মুছে পরিষ্কার করুন। এতে করে আয়না পরিষ্কার থাকবে এবং কাচের ঘোলাটে ও হলুদ ভাব দূর হয়ে যাবে।
  • যেসব আয়নায় কাচে নকশা করা থাকে, সেগুলো সরাসরি সাবান-পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। তারপর পরিষ্কার সুতি কাপড় দিয়ে মুছে নিন।
  • আয়নার কাচে স্টিকার লাগানো থাকলে তা তুলে ফেলার পরও আঠা লেগে থাকে। শুকনো কাপড় কেরোসিনে ভিজিয়ে ঘষলে দাগ উঠে যাবে।

দরদাম

আয়নার দাম নির্ভর করে আয়নার নকশা, পুরুত্ব, আকার ও মানের ওপর। যে আয়নার পুরুত্ব বেশি ও আকারে বড়, সেই আয়নার দামও তুলনামূলকভাবে বেশি। ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকার মধ্যে পাওয়া যাবে মাঝারি আকারের আয়না। ফাইবার বা পিভিসি বোর্ডের ফ্রেম লাগানো আয়না পাওয়া যাবে আকারভেদে ৫০০ থেকে ৮ হাজার টাকার মধ্যে। কাঠের ফ্রেমের ছোট আকারের আয়না পাওয়া যাবে ৫০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে। কাঠের ফ্রেম বসানো মাঝারি আকারের আয়না মিলবে ১ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকার মধ্যে। কাঠের ফ্রেম বসানো বড় আকারের আয়না পাওয়া যাবে ৪ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকার মধ্যে। মেটালের ফ্রেম করা আয়না কাঁসা, পিতল ও বিভিন্ন মেটালিক এতে পাওয়া যাবে ২ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকার মধ্যে।

প্রাপ্তিস্থান

নান্দনিক নকশার বিভিন্ন আয়না পাওয়া যাবে বসুন্ধরা সিটির লেভেল ৬ ও নিচতলা, আড়ং, গুলশান ডিসিসি মার্কেট, বাংলামোটর, হাতিরপুল, নিউমার্কেট, মিরপুর, কাজিপাড়া ও শেওড়াপাড়ার দোকানগুলোতে।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮৪তম সংখ্যা, এপ্রিল ২০১৭।

শ্রাবন্তী সোমা
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top