তাক যখন দেয়ালজুড়ে

দৃষ্টিনন্দন ও স্থানসাশ্রয়ী বলে ঘরের দেয়ালে শেলফ বা তাকের ব্যবহার ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। শুধু ঘরের সৌন্দর্যবর্ধনই নয়, জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখতেও এ অনুষঙ্গটি বেশ প্রয়োজনীয়। একটা সময় ছিল, যখন বাঙালি বাড়ির বৈঠকখানার দেয়ালজুড়ে শোভা পেত তাক বা শেলফ, যা প্রধানত বই রাখার কাজে ব্যবহৃত হতো। সময়ের পরিক্রমায় মানুষের জীবনধারায় পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে তাক বা শেলফের ব্যবহার শুধু বই রাখার কাজেই সীমাবদ্ধ নয়, তাতে যুক্ত হয়েছে ভিন্নমাত্রা। বিভিন্ন নকশা, আকৃতি ও রঙের তাক অন্দরসজ্জায় বিশেষ উপকরণ হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে সহজেই। চলুন জেনে নেওয়া যাক প্রয়োজনীয় এই অনুষঙ্গটির সম্পর্কে খুঁটিনাটি।

ঘরের তাকটি কী উপকরণে তৈরি হবে তা নির্ভর করে ঘরের আসবাবের ওপর। এতে করে রুচিবোধ ও সৌন্দর্যের মধ্যকার বিষয়টি সহজেই বোঝা যায়। ঘরের আসবাব যদি রট-আয়রনের হয়, তবে দেয়ালের তাকটাও রট-আয়রনের হওয়া উচিত। তেমনি আসবাব কাঠের হলে তাকটিও হতে হবে কাঠের। একইভাবে বাঁশ ও বেতের আসবাবের ক্ষেত্রেও বিষয়টি খেয়াল রাখতে হবে। তবে আসবাব ও দেয়ালের তাকের রঙে যেন পার্থক্য থাকে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। আবার ঘরের দেয়ালের রঙের বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে। যেমন, ঘরের দেয়ালটি সাদা হলে তাকটি বাদামি বা কালো করতে পারেন। দেয়ালে যদি অন্য কোনো রঙের ব্যবহার হয় তবে ব্যবহৃত তাকটিতে সাদা প্রলেপই ভালো দেখায়। বর্তমান সময়ে সৌন্দর্যবর্ধনকৃত এই আসবাবটিতে বইয়ের পাশাপাশি জায়গা করে নিয়েছে- শোপিচ, রঙিন মোম, ফটোফ্রেম, সিডি, ফুলদানি, ইনডোর প্লান্টসহ রকমারি সব সামগ্রী। অনেকেই আবার কাঠের তাক বা ইউনিট বানানোর ক্ষেত্রে নিচের দিকে ছোট ড্রয়ারের মতো কেবিন বানিয়ে নিচ্ছে। ফলে প্রয়োজনীয় টুকিটাকি জিনিসপত্র ড্রয়ারে রাখা যেতে পারে, যা সময়োপযোগী চাহিদা মেটাতে সক্ষম।

বিভিন্ন আকৃতি ও নকশার রেডিমেট তাক বা শেলফ পাওয়া যায় ফার্নিচারের দোকানে। আর নিজের পছন্দ অনুযায়ী নকশায় নির্ধারিত পছন্দে বানাতে চাইলে কারিগর দিয়ে বানিয়ে নিতে পারেন আপনার প্রয়োজনীয় শেলফটি। ইন্টারনেট বা ম্যাগাজিন থেকে বেছে নিতে পারেন আপনার পছন্দের নকশাটি, যেটি আপনার ব্যক্তিত্বের সঙ্গে মানানসই। তবে শেল্ফ বা তাক বানিয়ে নেওয়ার মূল সুবিধা হচ্ছে কাঠ নিজের পছন্দমতো নির্বাচন করা যায়। নকশার ক্ষেত্রে আঁকাবাঁকা বা জ্যামিতিক নকশার তাক এখন বেশ জনপ্রিয়। তাকের প্রথম অংশটি বৃত্তাকার নকশায় রেখে সঙ্গে জুড়ে দেওয়া যেতে পারে জিগজ্যাগ বা আঁকাবাঁকা রেখার তাক। ঘুমানোর আগে যাঁদের বই পড়ার অভ্যাস, তাঁরা ছোট ছোট কতগুলো বর্গক্ষেত্র আকৃতির তাক বসিয়ে নিতে পারেন শোয়ার ঘরের বিছানার ওপরের দেয়ালটিতে। তবে অন্দরসজ্জায় ভিন্নতা আনতে সুপারহিরো, ক্যাটওয়াক, জাগোয়ার, অপটিক্যাল, স্পাইডার ও গাছের শাখার বুকশেলফ ক্রেতা চাহিদার শীর্ষে স্থান করে নিয়েছে। নান্দনিকতায় নতুন মাত্রা যোগ করতে বড় গোলাকার আকৃতির নকশার তাকও লাগাতে পারেন দেয়ালে। এ ছাড়া অর্ধকৃত ত্রিভুজ আকৃতি বা চওড়া রেখার তাকও বর্তমানে বেশ জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। কিছুটা নতুনত্ব আনতে ছোট থেকে বড় আকৃতির কয়েকটি যেকোনো চওড়া কাঠের ফ্রেম বানিয়ে নিতে পারেন।

এবার দেয়ালে পেন্টিং ঝোলানোর মতো করে সেগুলোকে পর্যায়ক্রমে ছোট থেকে বড় আকারে ঝুলিয়ে দিন। এবার প্রতিটিতে একটি করে শোপিচ, মোম বা ইনডোর প্লান্ট রাখুন। আজকাল অনেকেই আবার ড্রয়িং বা লিভিং রুমের যেকোনো একটা দেয়ালের পুরোটাজুড়েই একটা কাঠের ইউনিট তৈরি করিয়ে নেন। ইউনিটটির একটি নির্দিষ্ট জায়গা টিভির জন্য বরাদ্দ। বাকি অংশে খোপ খোপ তাক লাগিয়ে সিডি, বই বা সৌন্দর্যবর্ধনকৃত যেকোনো আইটেম রাখা যেতে পারে। অনেক সময় বড় আকৃতির বুকশেলফ রুম ডিভাইডার হিসেবেও ব্যবহার করা হয়। সিড়ির নিচের ফাঁকা জায়গায় বা বাড়ির বাড়তি কোনো জায়গায় তাক বানিয়ে নিলে প্রয়োজনীয় জিনিস রাখার জন্য জায়গার যেমন সংস্থান হয়, সঙ্গে গৃহের অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্যও বাড়ে বহুগুণে।

সঠিকভাবে যত্ন নিলে আপনার শখের তাকটি টিকবে বহুদিন। কোনো প্রকারের তাক পরিষ্কারের ক্ষেত্রে পানি ব্যবহার করা উচিত নয়। তাক কখনো ভেজা কাপড় দিয়ে মুছবেন না। তবে কাঠের আসবাব মোছার জন্য বাজারে একধরনের তরল দ্রব্য পাওয়া যায় তা দিয়ে পরিষ্কার করুন। এ ছাড়া কাঠের তাক প্রতিবছর বার্নিশ করতে পারলে তা অনেক দিন পর্যন্ত ভালো থাকে। রডের কিংবা আয়রনের তাকে রঙের প্রলেপ দিলে মরিচা পড়ার আশঙ্কা কমে। তবে পোকার আক্রমণ থেকে বাঁচতে বইয়ের তাকের কোনায় কোনায় ন্যাপথলিন বা শুকনো মরিচের পোড়াও রাখতে পারেন। উল্লেখ্য, দেয়ালে তাক লাগানোর ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। ক্লাম্প দিয়ে শক্ত করে লাগাতে হবে যাতে ভারী জিনিসের ওজনে বা ভূমিকম্পের সময় তা খুলে না পড়ে।

আকৃতি ও নকশাভেদে শেলফের মূল্য নির্ধারিত হয়। শিশুদের জন্য বিশেষভাবে নকশা করা বুকশেলফ পাওয়া যাবে তিন থেকে ছয় হাজার টাকায়। মেহগনি ও সেগুন কাঠের তাকের দাম পড়বে নকশাভেদে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা। আর কৃত্রিম কাঠের তাক মিলবে ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকার মধ্যে। উচ্চতা ও নকশাভেদে বাঁশ ও বেতের শেলফ পাওয়া যাবে ৫ হাজার টাকার মধ্যে। এ ছাড়া পারটেক্স, হার্ডবোর্ড বা মালয়েশিয়ান বোর্ডের তৈরি শেলফ বা তাক পাওয়া যাবে ৫ থেকে ৮ হাজার টাকায়। বিভিন্ন ধরনের কেবিনেট বুকশেলফ পাওয়া যাবে ৪ থেকে ৩৫ হাজার টাকার মধ্যে। এ ক্ষেত্রে বোর্ডের কেবিনেটগুলোর দাম পড়বে আকৃতিভেদে ৪ থেকে ১২ হাজার টাকা। কাঠের কেবিনেটের দাম শুরু হয় ৮ হাজার টাকা থেকে। দেয়ালের জন্য ঝুলন্ত শেলফের দাম পড়বে ৪ থেকে ১৬ হাজার টাকার মধ্যে। আর নকশাভেদে কর্নার শেলফ পাবেন ৫ থেকে ১০ হাজার টাকায়।

বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মধ্যে অটবি, হাতিল, নাভানা, আখতার ফার্নিচার, পারটেক্স, ব্রাদার্স ফার্নিচারের শোরুমে পাওয়া যাবে রেডিমেট তাক। আর বাজেট কম হলে নন-ব্র্যান্ডের দোকান তো রয়েছেই। এসব দোকানেও রকমারি ডিজাইনের তাক পাবেন। ঢাকার শ্যামলী, মিরপুর, কাজীপাড়া, পান্থপথ, পল্টন, বিজয়নগর, গুলশান ১ ও ২-এ ফার্নিচারের দোকানে পাবেন নন-ব্র্যান্ডের তাকগুলো।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮১তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০১৭।

শ্রাবন্তী সোমা
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top