যেকোনো স্থাপনার অন্যতম অনুষঙ্গ দরজা। নিরাপত্তা ও যাতায়াতের সুবিধার্থে আদিকাল থেকেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে দরজা। শুরুটা পাথরখণ্ড দিয়ে। এরপর লোহা, কাঠ, বাঁশ, টিন, কাচসহ নানা উপকরণে তৈরি হয়েছে দরজা। তবে কাঠের দরজার চাহিদা সব সময় তুঙ্গে থাকলেও প্রতিনিয়ত দাম বেড়ে যাওয়ায় এখন অনেকেই বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করছেন প্লাস্টিকের দরজা। তবে কাঠই হোক বা প্লাস্টিক অন্দরসাজে আভিজাত্য আনতে কমবেশি সবাই বেছে নিচ্ছেন নান্দনিক কারুকার্যখচিত দরজা। নিরাপত্তাকে প্রাধান্য দিয়ে স্টিলের তৈরি দরজাগুলোও ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। তবে অফিসে বেড়েছে কাচের দরজার ব্যবহার। যুগে যুগে দরজার এমন বিবর্তনই এ লেখার প্রতিপাদ্য।
প্রাচীন মিসরের সমাধিতে প্রথম দরজার নকশা পাওয়া যায়। মিসরীয় সভ্যতায় দরজাকে সাধারণত মৃত্যুর পরবর্তী প্রবেশদ্বার হিসেবে ভাবা হতো। পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো দরজা পাওয়া যায় বাদশাহ সোলায়মানের পীঠস্থানে। আর তা ছিল জলপাইগাছের কাঠের তৈরি, যা ছিল স্বর্ণ দিয়ে মোড়ানো। জলপাই কাঠ ছাড়াও উলমাস, এরস, ওক ও দেবদারু কাঠ ব্যবহৃত হয় দরজা তৈরিতে। সুইজারল্যান্ডেও পাঁচ হাজার বছর আগের একটি দরজার সন্ধান পাওয়া গেছে। খ্রিষ্টপূর্ব দুই হাজার বছর আগেও দরজার সন্ধান পাওয়া যায়। ব্রোঞ্জের তৈরি ওই দরজাটি বর্তমানে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে। ওই দরজাটি প্রায় ৮ ফুট ৪ ইঞ্চি প্রশস্ত ও উচ্চতায় ২৭ ফুট। তামার তৈরি দরজাটি নানা নকশায় খচিত। এ ছাড়া ৩ ইঞ্চি থেকে ১৪ ইঞ্চি পর্যন্ত দরজার সন্ধান পাওয়া গেছে। পাওয়া গেছে কাঠের সঙ্গে তামা ও পিতলের নকশা করা দরজার সন্ধানও।
সিরিয়ায় কাঠের অভাবে পাথরকে দরজা হিসেবে ব্যবহার করা হতো। সিরিয়ার প্রাচীন সময়ের ৫ ফুট ৪ ইঞ্চি ও ২ ফুট ৭ ইঞ্চির একটি পাথরের দরজার সন্ধান পাওয়া যায়, যা বর্তমানে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে। এ ছাড়া সিরিয়ার বসরার কাছে কুফিয়ারে ৯ থেকে ১০ ফুট দীর্ঘ দরজার সন্ধান পাওয়া গেছে। এই দরজাটি শহরে প্রবেশের জন্য ব্যবহৃত হয়। প্রাচীন গ্রিক ও রোমানরা একক, দ্বৈত ও ত্রিমাত্রিক দরজা ব্যবহার করতো নিজেদের সুরক্ষা ও পেছনে যাওয়ার জন্য। ইতালির পামপি নগরীর ইমাচিয়ায় ত্রিমাত্রিক পাথরের দরজা ব্যবহৃত হতো। এ ছাড়া এগ্রিজেনটামে থিরনের সমাধিতে পাথরের চারটি একক দরজার ব্যবহার লক্ষণীয়।
ইতালির রোমের এসএস কসমাস ও ডামিয়ানো চার্চেও পাথরের দরজা ব্যবহৃত হয়েছে। রোমানদের শাসনামলে রোমের প্যান্থিয়ন ধর্মীয় উপাসনালয়ে একই নকশার তামার দরজা ব্যবহৃত হয়। ক্যাথলিক লেটারেন বাসিলিকা চার্চে একই নমুনার দুইটি তামার দরজা ব্যবহারের বর্ণনা পাওয়া যায়। গ্রিক স্কলার হেরন প্রথম শতাব্দীতে রোমান ইজিপ্ট আমলে অটোমেটিক ডোরের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। এরপর ৬০৪-৬১৮ সালে চীনে সর্ব প্রথম ইয়াং সুইয়ের আমলে স্বয়ংক্রিয় দরজা আবিষ্কৃত হয়। রাজকীয় লাইব্রেরিতে প্রবেশের জন্য দরজা তৈরি করেন চীনের রাজসভার স্থপতিরা। এরপর ১২০৬ সালে প্রথমবারের মতো স্বয়ংক্রিয় দরজার ব্যবহার শুরু হয়। আরবের আল জাজারি স্বয়ংক্রিয় দরজার আবিষ্কারক। তামা ও অন্য উপাদানের মিশ্রণে তিনি এটি তৈরি করেন। এর ব্যবহার শুরু হয় মধ্যযুগীয় স্থাপত্যকলায়।
এরপর ষষ্ঠ শতাব্দীতে ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরের বেতেলহাম চার্চে দরজা ব্যবহার করা হয়। পিতলের বিভিন্ন নকশা দরজায় সংযুক্ত করা হয়। এরপর অষ্টম ও নবম শতাব্দীতে তুরস্কের ইস্তাম্বুলের নাটিভিটি ও হাজিয়া সোফিয়া উপাসনালয়ে তামার দরজা ব্যবহৃত হয়। নবম শতাব্দীতে জার্মানির আখিন চার্চে ও ইতালির ভেনিস শহরের সেন্ট মার্কসে দরজা ব্যবহৃত হয়। জার্মানির আখিন চার্চে ক্যাথলিকেরা প্রার্থনা করে। এর আগে ১৪২৩ সালে জার্মান নাগরিক গীবারতি তামার দরজার নকশা করেন। ১২ শতাব্দীতে ফ্রান্সের প্যারিসের লিংকনের নটর ডেমে বিশে^র সবচেয়ে সুন্দর দরজার ব্যবহার শুরু হয়। একই সময়ে এর ব্যবহার হয় ইংল্যান্ডেও। ১০৫০ সালে ওয়েস্ট মিনিস্টার অ্যাবেতে পাওয়া যায় ইংল্যান্ডের সবচেয়ে পুরোনো দরজা।
দরজার বৈচিত্র্যতা
একসময় পাথরে নানা ধরনের নকশাখচিত দরজা ব্যবহৃত হতো; এরপর কাঠের তৈরি দরজা বিভিন্ন নকশায় সাজানো হয়। এরই ধারাবাহিকতায় আসে নানা ধরনের আধুনিক দরজা। সুদূর মিসরে দরজার বর্ণনা পাওয়া গেলেও বর্তমানে দরজা মালামাল সুরক্ষা ও নিরাপত্তার এক কার্যকর হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশে কাঠের দরজার ব্যবহার বেশ পুরোনো। তবে কাঠের দরজার একচেটিয়া চাহিদা থাকলেও দাম বেশি হওয়ায় এখন অনেকেই আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবনে কাঠের বিকল্প হিসেবে প্লাস্টিকের দরজা (আনপ্লাস্টিসাইজড পলিভিনাইল ক্লোরাইড বা ইউপিভিসি) ব্যবহার করছেন। এক দশক আগেও দেশে প্লাস্টিকের দরজার বাজার ছিল পুরোপুরি আমদানি-নির্ভর। বর্তমানে দরজার ৯০ শতাংশই এখন দেশে তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশ প্লাস্টিকদ্রব্য প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক অ্যাসোসিয়েশন (বিপিজিএমইএ) এবং আবাসন ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন রিহ্যাবে এমন তথ্যই মিলেছে। দেশে এখন পাঁচটি প্রতিষ্ঠান বড় পরিসরে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তিতে প্লাস্টিকের দরজা তৈরি করছে। এর মধ্যে আছে প্রাণ-আরএফএল, পারটেক্স, ন্যাশনাল পলিমার, ইউনাইটেড ডোরস ও স্বপন ডোরস। পাশাপাশি নিজস্ব যন্ত্র দিয়ে ছোট আকারের আরও ২৫টির বেশি প্রতিষ্ঠান প্লাস্টিকের দরজা তৈরিতে যুক্ত।
এর বাইরে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আমদানি করা প্লাস্টিকের দরজা বিক্রি করে। সাশ্রয়ী মূল্য, প্রতিস্থাপন সুবিধা এবং যুগের চাহিদা মিটিয়ে নিত্যনতুন নকশার কারণে প্লাস্টিকের দরজা ব্যবহারে আবাসন ব্যবসায়ী ও গ্রাহক ক্রমেই আগ্রহী হয়ে উঠছেন। চলমান প্রকল্পগুলোর ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রেই এই দরজা ব্যবহৃত হচ্ছে। সামনের দিনগুলোতে এটি বাড়বে ছাড়া কমবে না। প্রতি মাসে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর তৈরি এক লাখের বেশি প্লাস্টিকের দরজা বিক্রি হয়, যার বাজারমূল্য প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ কোটি টাকা। আমদানি হওয়া দরজার বিক্রি মিলে মাসে তা ৫০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। সেই হিসাবে বছরে কমপক্ষে ৬০০ কোটি টাকার প্লাস্টিকের দরজা বিক্রি হয়। এই বাজার প্রতিবছর বাড়ছে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ হারে।
ন্যাশনাল পলিমার (এনপলি) প্লাস্টিকের দরজা বানানো শুরু করে ২০১৩ সালে। বর্তমানে দেশব্যাপী ৪ হাজার ২০০ পরিবেশকের মাধ্যমে তারা দরজা বিক্রি করছে। ২০০৭ সালে যাত্রা শুরু করে প্লাস্টিকের দরজার বাজারে এখন শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান প্রাণ-আরএফএল। কসমিক, পপুলার, গোল্ড, সলিড, প্লাটিনাম, গ্লাস মূলত এই ছয় ধরনের বিভিন্ন নকশা, রং ও আকারের প্লাস্টিকের দরজা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। খুচরা পর্যায়ে ২ হাজার ২০০ টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৭ হাজার ৭০০ টাকায় এসব দরজা কিনতে পাওয়া যায়।
দরজার রকমফের
বাংলাদেশের স্থাপনাতে আগে থেকেই দুই পাল্লাবিশিষ্ট সুইং দরজার ব্যবহার চলে আসছে। তবে তৈরি এবং ব্যবহারের উপযোগিতার কারণে এখন বাসাবাড়ি বা অ্যাপার্টমেন্ট ভবনে এক পাল্লার সুইং দরজার ব্যবহারই বেশি। স্লাইডিং দরজা সাধারণত বড় বড় বিপণিবিতান বা বাণিজ্যিক ভবনে ব্যবহৃত হয় বেশি। অনাবাসিক ভবনে শোবার জায়গা থেকে লাগোয়া বারান্দাতে যাওয়ার জন্য স্লাইডিং দরজা ইদানীং বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। কেননা এ ক্ষেত্রে দরজাটি জানালার কাজও করে। আর রিভলভিং দরজা সাধারণত পার্ক বা উন্মুক্ত পরিসরে ব্যবহার করা হয়। দরজা নির্মাণে উপকরণ হিসেবে কাঠ, লোহা, অ্যালুমিনিয়াম আর কাচের ব্যবহারই বেশি।
দরজা তৈরিতে যা লাগে
স্টিল, শক্ত কাঠ, এমডিএফ, অ্যালুমিনিয়াম এলোয়, গ্লাস প্লাস্টিক, বাঁশ ও অন্যান্য।
খোলার ধরন: সুইং, স্লাইডিং, অটোমেটিক, ফোল্ডিং, রোলিং।
দরজার ভিন্নতায়
বিস্ফোরণে কার্যকর দরজা, বুলেট প্রতিরোধী দরজা, অগ্নি প্রতিরোধী দরজা, গ্যাস প্রতিরোধী দরজা, বিকিরণ প্রতিরোধী দরজা, পানি প্রতিরোধী দরজাসহ নানা ধরনের দরজা রয়েছে।
বর্তমানে দেশে প্লাস্টিকের দরজাই বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। ইউপিভিসি হাইটেক ডোর, যা মূলত কৃত্রিম ডোর, বিশ্বব্যাপী কাঠের ডোরের পরিবর্তে বর্তমানে এটি বহুল ব্যবহৃত হচ্ছে। এটির বৈশিষ্ট্য হচ্ছে- এটি টেকসই, পানিবান্ধব, সাশ্রয়ী মূল্যের এবং দৃঢ়, বিভিন্ন রং ও সাইজের হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য-
- ইউপিভিসি গোল্ড ডোরস
- ইউপিভিসি সলিড ডোরস
- ইউপিভিসি প্লাটিনাম ডোরস
- ইউপিভিসি পপুলার ডোরস
- ইউপিভিসি পপুলার প্লাস ডোরস
- ইউপিভিসি কসমিক ডোরস
- ইউপিভিসি গ্লাস
- স্টিল ডোরস
- এলিয়েন ডোরস
- ডায়মন্ড ডোরস।
কসমিক ডোরস
এই ডোর সাধারণ ওয়াশরুম ও টয়লেটে ব্যবহৃত হয়। এটি ২.৫ বাই ৫ ফুট, ২.৫ ফুট বাই ৬ ফুট, ৩ ফুট থেকে ৫ ফুট, ৩.৫ ফুট থেকে ৭ ফুট হয়। এই ডোর হয় লকসহ কিংবা লক ছাড়া। লকসহ ও লকবিহীন কসমিক ডোরের দামে রয়েছে তারতম্য। রং ও ডিজাইনের ভিন্নতার ওপর এর দাম নির্ভর করে।
কসমিক ডোরস সাধারণত ৭ থেকে ৯ হাজার টাকায় কিনতে পাওয়া যায়। আর ফ্রেম বিক্রি হয় ২ থেকে ৪ হাজার টাকার মধ্যে। প্রাণ-আরএফএল, পারটেক্স, ন্যাশনাল পলিমার, ইউনাইটেড ডোরস ও স্বপন ডোরস রপ্তানি হয় প্রায় অর্ধশতাধিক দেশে। কসমিক ডোরের কোনো গ্যারান্টি বা ওয়ারেন্টি নেই। ব্যবহারের ওপর এর স্থায়িত্ব নির্ভর করে। সাধারণ ১৫ থেকে ২০ বছর পর্যন্ত দেদারসে ব্যবহার করা যায় কসমিক ডোর। কসমিক ডোরের আলাদা ফ্রেমও বিক্রি হয়। ফ্রেম সাধারণ ৭ ফুট বাই ২.৫ ফুট, ৩.৫ ফুট বাই ৭ ফুট, ৩ ফুট বাই ৭ ফুট হয়ে থাকে।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৭৯তম সংখ্যা, নভেম্বর ২০১৬।