বাংলার সুবেদার মুর্শিদ কুলী খানের শাসনামলে (১৭০১-১৭২৭) বরেন্দ্রী ব্রাহ্মণ রঘুনন্দন তাঁর ছোট ভাই রামজীবনের নামে নাটোরে প্রতিষ্ঠা করেন বিশাল জমিদারি। মন্দির, প্রাসাদ, দিঘি, উদ্যান ও মনোরম অট্টালিকায় গড়ে ওঠে সুসজ্জিত এক নগরী। রাজবংশের সেই জৌলুশ এখন ইতিহাসের অংশ হলেও নাটোরের গৌরব স্বমহিমায় প্রকাশ করে উত্তরা গণভবন, দেশের সবচেয়ে বড় বিল চলনবিল আর রসনাবিলাসী বিখ্যাত কাঁচাগোল্লা। ব্যবসা-বাণিজ্যেও এ জনপদটি এগিয়ে চলেছে, যাতে অবদান রাখছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। নাটোরের বনপাড়া নতুন বাজারে অবস্থিত ‘মেসার্স রেজা এন্টারপ্রাইজ’-এর কর্ণধার মো. রেজাউল করিম (রেজা) তেমনি একজন সফল নির্মাণপণ্য ব্যবসায়ী। আকিজ সিমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক মো. তরিকুল ইসলাম এবং জ্যেষ্ঠ আঞ্চলিক বিক্রয় কর্মকর্তা মো. ইকরামুল কবিরের সহযোগিতায় বন্ধন-এর ‘সফল যাঁরা কেমন তাঁরা’-য় সফল এ ব্যবসায়ীর সাফল্যকাহিনি।
ব্যবসায়ী মো. রেজাউল করিমের জন্ম ১৯৬৪ সালের ১০ জানুয়ারি, মালিপাড়া, নাটোরে। বাবা মরহুম মো. আমিনুল হক এবং মা মোছা. আনোয়ারা খাতুন। পরিবারে চার ভাই দুই বোনের মধ্যে রেজাউল করিম দ্বিতীয়। তিনি সেন্ট জোসেফ বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয় থেকে ১৯৮২ সালে মাধ্যমিক এবং নবাব সিরাজ-উদ্-দৌলা (এনএস) সরকারি মহাবিদ্যালয় থেকে ১৯৮৪ সালে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর রাজশাহী সরকারি কলেজ থেকে বিএসসি করেন। ঠিকাদারির মাধ্যমে শুরু কর্মজীবনের। এই সময়েই পরিচিত হন নির্মাণপণ্য ব্যবসার সঙ্গে। গভীরভাবে উপলব্ধি করেন নির্মাণপণ্য ব্যবসার আগামীর সম্ভাবনা। নিজের একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়তেই সম্ভাবনাময় এ ব্যবসায় জড়িয়ে যান। ১৯৯৭ সালে বনপাড়া পুরান বাজারে গড়ে তোলেন নিজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। ঐকান্তিক চেষ্টা, শ্রম ও কৌশলে বাড়তে থাকে ব্যবসার পরিসর। আর তাই ব্যবসাটিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিতেই ২০১১ সালে বনপাড়া নতুন বাজারে স্থানান্তর করেন নিজস্ব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটিকে।
ব্যবসার শুরু থেকেই ব্যবসা করতেন খুচরা পর্যায়ে। এখান থেকেই নির্মাণপণ্য বিশেষত সিমেন্ট বিক্রিতে নিজেকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়। কখনো হয়েছেন বনপাড়ার সেরা বিক্রেতা, কখনো-বা নাটোরের সেরা আবার কখনো দেশসেরা হওয়ার খ্যাতিও অর্জন করেছেন। এ জন্য অনেক কোম্পানিই তাঁকে পরিবেশক হিসেবে চেয়েছে। কিন্তু তিনি খুচরা পর্যায়ে ব্যবসা করেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। আকিজ সিমেন্টের ব্যবসা শুরুর পর থেকেই পেয়েছেন ধারাবাহিক সাফল্য। ২০১১-২০১৩ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন নাটোর টেরিটরির প্রাইম সেলার। ব্যবসায়িক সাফল্য ও কৌশলের স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন আকিজ সিমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের পরিবেশকস্বত্ব। বর্তমানে তিনি নাটোর টেরিটরির একজন এক্সক্লুসিভ ডিলার। এ ছাড়া উল্লেখযোগ্য পরিমাণে পণ্য বিক্রি করায় কোম্পানিটির পক্ষ থেকে অর্জন করেছেন টেলিভিশন, মোবাইল, ডিজিটাল ক্যামেরা, ডিনার সেট, স্বর্ণালংকার, নগদ টাকাসহ অসংখ্য উপহার। এ ছাড়া ঘুরে এসেছেন চীন, থাইল্যান্ড ও নেপাল থেকে। মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও ভারত ভ্রমণের অফার থাকলেও ব্যবসায়িক ব্যস্ততায় যেতে পারেননি। তবে কিছুদিনের মধ্যেই যাবেন শ্রীলঙ্কা সফরে।
তাঁর এ সাফল্যের মূলে রয়েছে নিজস্ব ব্যবসায়িক কৌশল, সততা ও কঠোর পরিশ্রম। এলাকার প্রায় সবাই পরিচিত হওয়ায় সব সময় চেষ্টা করেন গুণগতমান, সঠিক ওজন ও ন্যায্যমূল্যে পণ্যে বিক্রি করতে। সরাসরি তিনি ক্রেতাদের সঙ্গে নির্মাণপণ্যের ভালো-মন্দ দিক সম্পর্কে আলোচনা করেন। আকিজ সিমেন্টের এক্সক্লুসিভ ডিলার হওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই তাঁর ব্যবসায়িক কৌশলে পরিবর্তন আনতে হয়। প্রায়ই খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে যেতে হয়, তাঁদের খোঁজখবর নেওয়া ছাড়াও এ পর্যায়ে ব্যবসা উন্নয়নের কৌশল সম্পর্কেও পরামর্শ দিতে হয়।
ব্যবসায়ী রেজা বিয়ে করেছেন ১৯৯৫ সালে। সহধর্মিণী জাকিয়া সুলতানা কেয়া। সুখী এ দম্পতির দুই ছেলে। বড় ছেলে মোস্তফা মাহিম মাসরুখ, কাদিরাবাদ ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছে। ছোট ছেলে নাফিস সাদিক ওয়াছী, বনপাড়া বার্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী। ব্যবসায়ী রেজার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান শহরে হলেও শহরের অদূরে মালিপাড়া গ্রামেই তাঁর বসবাস। সবুজ ফসলের ক্ষেত, গাছপালা আর পুকুরঘেরা প্রকৃতির মাঝে তাঁর বাড়ি। সেখানে দক্ষিণা বাতাস খেলা করে সব সময়। বাড়িতে হরেক রকম ফল-ফুলের গাছ। দোতলা বাড়ির বারান্দায় সারি সারি মৌমাছির চাক। ব্যবসায়িক ব্যস্ততার ফাঁকে এ বাড়িতেই তিনি খুঁজে পান প্রশান্তির ছায়া। ভাই-বোনেরা কর্মসূত্রে দেশের বিভিন্ন স্থানে থাকলেও তিনি রয়ে গেছেন তাঁর আপন ঠিকানায়।
ব্যবসায়ী রেজা এখন ঠিকাদারি পেশার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকলেও নির্মাণপণ্যের এ ব্যবসাটিই তাঁর ধ্যান-জ্ঞান। উভয় পেশাতে তিনি ব্যস্ত সময় পার করলেও এলাকার কতিপয় সামাজিক সংগঠনের সঙ্গেও নিজেকে জড়িয়েছেন। তিনি ইসলামপুর গনিহাটি ফাজিল ডিগ্রি মাদ্রাসার সভাপতি, মালিপাড়া গভীর নলকূপ সমবায় সমিতির সভাপতি, মালিপাড়া দরিদ্র তহবিলের সভাপতি, মালিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দাতা প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, মালিপাড়া কেন্দ্রীয় মসজিদের সভাপতি, বনপাড়া শিল্প বণিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক এবং বনপাড়া বাজার নিয়ন্ত্রণ কমিটির অন্যতম সদস্য।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৭৮তম সংখ্যা, অক্টোবর ২০১৬।