পদ্মা, মেঘনা ও ডাকাতিয়া নদীর সঙ্গমস্থল চাঁদপুর। প্রাচীনকাল থেকেই চাঁদপুর উপমহাদেশের অন্যতম বাণিজ্যিক নদীবন্দর। অবিভক্ত বাংলার সিংহদ্বার হিসেবে এ নদীবন্দরের সুখ্যাতি সমগ্র ভারতবর্ষে। কথিত আছে, খ্যাতিমান বণিক চাঁদ সওদাগর তাঁর বিখ্যাত সপ্তডিঙ্গা ‘মধুকর’ ভাসিয়ে এ নদীবন্দরে বাণিজ্য করতে আসেন। আর তাঁরই নাম অনুসারে এই বন্দরের নাম রাখা হয় চাঁদপুর। তবে এ জেলা শহরের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র হাজীগঞ্জ। শহরটির রেলী ব্রাদার্স নতুন ট্রাক রোডে অবস্থিত ‘মেসার্স হাবিব স্টিল’-এর স্বত্বাধিকারী আলহাজ মো. মশিউর রহমান পাটওয়ারী একজন সফল নির্মাণপণ্য ব্যবসায়ী। আকিজ সিমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের আঞ্চলিক বিক্রয় কর্মকর্তা মো. সাইদুর রহমানের সহযোগিতায় বন্ধন-এর ‘সফল যাঁরা কেমন তাঁরা’ পর্বে এবারের সফলজন ব্যবসায়ী মশিউর রহমান পাটওয়ারী।
ব্যবসায়ী মো. মশিউর রহমানের জন্ম ১৯৭৭ সালের ২০ সেপ্টেম্বর, চাঁদপুর জেলার হাজীগঞ্জ থানার কাজিরগাঁওয়ের সম্ভ্রান্ত পাটওয়ারী পরিবারে। বাবা মরহুম নাজির আহমেদ পাটওয়ারী ও মা নুরুন্নাহার বেগম। হাজীগঞ্জ পাইলট উচ্চবিদ্যালয় থেকে ১৯৯২ সালে মাধ্যমিক এবং কুমিল্লা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে ১৯৯৭ সালে ডিপ্লোমা-ইন-পাওয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করে ল্যাকটোজেন মিল্ক ফ্যাক্টরিতে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন। তিন বছর চাকরি করার পর পারিবারকি কারণে ব্যবসা করতে ফিরে আসেন হাজীগঞ্জে। প্রথমে তেল ব্যবসার মাধ্যমে ব্যবসায়ী জীবনের পথচলা শুরু হলেও ২০০৯ সালের শেষ দিকে নির্মাণপণ্য ব্যবসায় নিজেকে যুক্ত করেন।
উত্তরাধিকার সূত্রে মো. মশিউর রহমান ব্যবসায়িক পারিবারের সন্তান। তাঁর দাদা মরহুম আবিদ মিয়া পাটওয়ারী ছিলেন অত্র এলাকার সুপরিচিত পাট ব্যবসায়ী। বাবাও প্রথম জীবনে রড, সিমেন্ট, সার ও পাটের ব্যবসা করতেন। পরে সপ্তগ্রাম বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। পারিবারিক এমন ব্যবসায়িক পরিচিতি এলাকায় ব্যবসা সম্প্রসারণে সহায়ক হয়। এ ছাড়া তিনি কঠোর পরিশ্রম করেন ব্যবসাটিকে দাঁড় করাতে। গুণগতমানের পণ্য বিক্রি, সুন্দর ব্যবহার, সঠিক ওজন ও ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিক্রির মাধ্যমে ধীরে ধীরে ক্রেতাদের আস্থা অর্জন করেন। একই সঙ্গে বাড়ে প্রতিষ্ঠানটির বিক্রি ও পরিসর। তাঁর সার্বিক প্রচেষ্টায় বছর কয়েকের মধ্যেই ‘মেসার্স হাবিব স্টিল’ হাজীগঞ্জের অন্যতম নির্মাণপণ্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
প্রতিষ্ঠানটির এমন সাফল্যে প্রসিদ্ধ কিছু নির্মাণসংশ্লিষ্ট কোম্পানি তার সঙ্গে ব্যাপক পরিসরে ব্যবসা করতে আগ্রহী হয়। বর্তমানে তিনি তিনি আকিজ সিমেন্ট কোম্পানি লি., হাজীগঞ্জ টেরিটরির একজন এক্সক্লুসিভ ডিস্ট্রিবিউটর। এ ছাড়া বিএসআরএম, কেএসআরএম, এসএএসএম রডের স্থানীয় ডিলার। ব্যবসায়িক সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ বিভিন্ন কোম্পানির পক্ষ থেকে উপহার হিসেবে পেয়েছেন মোটরসাইকেল, এসি, টেলিভিশন, ফ্রিজ, গৃহস্থালিসামগ্রী, নগদ টাকাসহ অসংখ্য সম্মাননা। আকিজ সিমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের পক্ষ থেকে সুইজারল্যান্ড, থাইল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কায় ভ্রমণ এবং সৌদি আরবে ওমরাহ হজ করার সুযোগ পেয়েছেন। ব্যবসায়িক ব্যস্ততায় সব জায়গায় যেতে না পারলেও ঘুরে এসেছেন মালয়েশিয়া ও নেপাল। বর্তমানে তাঁর রয়েছে একটি শোরুম ও তিনটি গোডাউন। যেখানে কাজ করেন ২০ জন শ্রমিক-কর্মচারী। এ ছাড়া ব্যবসায় পণ্য পরিবহনের সুবিধার্থে রয়েছে একটি করে ট্রাক, ট্রলার ও ট্রাক্টর।
ব্যবসায়ী মশিউর রহমান বিয়ে করেছেন ২০০৪ সালে। সহধর্মিণী আবেদা আক্তার সুমী। সুখী এ দম্পতির দুই ছেলে ও এক মেয়ে। বড় ছেলে মোস্তাফিজুর রহমান আবির, রওজাতুল উলুম হাফিজিয়া ও নুরানি মাদ্রাসায় তৃতীয় শ্রেণিতে ও মেজো ছেলে আলীনুর রহমান অয়ন একই মাদ্রাসায় দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ছে। ছোট মেয়ে নুরজাহান আরিশার বয়স প্রায় দুই বছর। নির্মাণপণ্য ব্যবসা ছাড়াও ল্যান্ড ও বিল্ডিং ডেভেলপার ব্যবসাও রয়েছে তাঁর। পাশাপাশি তিনি তাবলিগ জামাত ও স্থানীয় সামাজিক সংগঠনের সঙ্গেও জড়িত। তিনি ইন্টারন্যাশনাল রোটারি ক্লাব, হাজীগঞ্জের সদস্য ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক, হাজীগঞ্জ সবুজ সংঘের আজীবন সদস্য, মাতৈন আদর্শ পাঠাগার ও সমাজকল্যাণ সংসদের সহসভাপতি, মাতৈন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তিনবারের সভাপতি এবং হাজীগঞ্জ বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সদস্য।
ব্যবসা পরিচালনায় তাঁর সহযোগী ছোট ভাই আলহাজ মো. হাবিবুর রহমান পাটওয়ারী। দুই ভাই একই সঙ্গে ব্যবসা করেন। সামাজিক বিভিন্ন কাজে যখন ব্যস্ত থাকেন, তখন হাবিবুর রহমান সবকিছু দেখাশোনা করেন। বিশেষ করে তাবলিগ জামাতের দাওয়াতে যখন তিনি বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করেন, তখন সব দায়ভার বর্তায় অনুজ হাবিবুর রহমানের ওপর। তখন তিনি নিজ বুদ্ধিমত্তা ও ব্যবসায়িক দক্ষতায় সবকিছু সামলে নেন। পারিবারিক প্রতিপত্তি রক্ষার জন্যই ব্যবসায় নেমেছিলেন মশিউর রহমান। শুরু থেকেই ন্যায়, নীতি ও সততার সঙ্গে ব্যবসা করছেন। এখন তাঁর লক্ষ্য সততার সঙ্গে ব্যবসাটিকে সামনে এগিয়ে নিয়ে নেওয়া।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৭৭তম সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০১৬।