মোহস্টিলের প্রতি কাস্টমারদের বিশ্বাস ও আস্থাই আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন

মারুফ মোহসিনের জন্ম ১৯৮৮ সালে ঢাকায়। ‘ও’ এবং ‘এ’ লেভেল করেছেন গ্রিন হেরাল্ড স্কুল থেকে। ২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব টেনিসি থেকে বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক আর ২০১২ সালে ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড ইনফরমেশন ইঞ্জিনিয়ারিং উইথ হিউম্যান ম্যানেজমেন্টে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করে বেশ কিছুদিন কাজ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বখ্যাত জার্মান গাড়ি প্রস্তুতকারক কোম্পানি ভক্সস ওয়াগন ও জাপানের টয়োটায়। ২৮ বছর বয়সী তরুণ এ শিল্পোদ্যোক্তা মোহস্টিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। আইকনিক এ তরুণ কথা বলেছেন বন্ধন-এর সঙ্গে। কথার সূত্রধর বন্ধন সম্পাদক শরিফুল বারী টুটুল ।          

মোহস্টিলের যাত্রা কবে, কীভাবে শুরু হয়?

সত্তরের দশকের মাঝামাঝি কিংবা শেষের দিকে আমার দাদা হাজি আবদুর রহিম শ্যামপুরের ছোট ফ্যাক্টরিতে নন-গ্রেড কাস্ট আয়রন থেকে গ্রেড ডায়মন্ড স্টিল (৪০ গ্রেড) উৎপাদন শুরু করেন,  যার পরিচিতি রহিম স্টিল নামে। বিদেশ থেকে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে দেশে এসে বাবা হাল ধরেন আমাদের পৈতৃক এ ব্যবসার। দেশে এসেই বাবা ৬০ গ্রেড স্টিল উৎপাদনের লক্ষ্যে শ্যামপুর থেকে নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুরে নতুন রোলিং মিল স্থাপন করেন। নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে ইঞ্জিনিয়ারিং ফিজিবিলিটির ধারাবাহিকতায় ২০০০ সালের মাঝামাঝিতে ৫০০ এক্সট্রিম নামে নতুন আঙ্গিকে উৎপাদনে যায় রহিম স্টিল। তবে শুরু থেকেই আমরা মানের ব্যাপারে আপসহীন। ২০১২ সালে বাজারে আসে মোহস্টিল সুপার ৫০০ ডব্লিউইউ প্রোডাক্টটি। মোহস্টিলের রয়েছে নিজস্ব নয়টি রোলিং মিল। এতে সুবিধা হলো, একটি মিল মেইনটেন্যান্সে গেলে অন্যগুলোতে কাজ চালিয়ে নেওয়া যায় অনায়াসে।

নামটা মোহস্টিল কেন?

আমার দাদা হাজি আবদুর রহিমের নামে কিন্তু রহিম স্টিলের নাম। আমাদের কোম্পানির বর্তমান চেয়ারম্যান তথা আমার বাবা মোহাম্মদ মোহসিন। স্টিল ব্যবসায়  বাবা ৬০ বছরের অভিজ্ঞতায় যে বিশ্বস্ততা ও গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছেন, তার স্বীকৃতিকে সম্মান জানিয়ে আমরা তাঁর নামানুসারে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির এ স্টিলের নাম রেখেছি ‘মোহস্টিল’।             

শুরুতে আপনাকে কী ধরনের বাধাবিপত্তিতে পড়তে হয়েছে? কীভাবে সেগুলো সামলেছেন?

মান ধরে রাখাটাই আমাদের এখানে সবচেয়ে বড় বাধা। মান আর স্থায়িত্বের ব্যাপারে আমরা প্রথমেই ইঞ্জিনিয়ারিং চিন্তা করি, পরে ভাবি অর্থনৈতিক দিকটা। আমি এটা দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে পারি, রহিম গ্রুপ ও মোহস্টিল দেশের একমাত্র ইঞ্জিনিয়ারিং বেইজড কোম্পানি। কেননা এই কোম্পানির তিন প্রজন্মই পেশাগতভাবে ইঞ্জিনিয়ার। আমার দাদা, বাবা ও আমি প্রত্যেকেই ইঞ্জিনিয়ার।   

দেশে এখন অনেকগুলো কোম্পানি স্টিল নির্মাণে যুক্ত। এত প্রতিযোগিতার মধ্যে কেমন করছে মোহস্টিল? অন্যদের তুলনায় এ স্টিলের বিশেষত্ব কী?

ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা ব্যক্তিগতভাবে আমার ভীষণ পছন্দের। মানের ব্যাপারে সততা আমার কাছে সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ। মোহস্টিলে ওজন ও রানিং ফিটটা পাবেন বিএসটিআই স্ট্যান্ডার্ডে, বুয়েট টেস্টের সঙ্গে কখনো মিসম্যাচ পাবেন না। তদুপরি, আমরা আইএসও এবং ইউকেইএ সার্টিফাইড। সম্প্রতি মালয়েশিয়ার একটা রোলিং মিল ভিজিটে গিয়ে দেখলাম ওদের মিল আর মোহস্টিলের মিল হুবহু একই। বিন্দুমাত্র পার্থক্য নেই। আমি বিশ্বাস করি, হিউম্যান ক্যাপিটাল হচ্ছে আমার সবচেয়ে বড় এস্টেট। এ কোম্পানির প্রত্যেক এমপ্লয়িই কোম্পানিটির একজন অংশীদার। আর তাই তাদের কাছ থেকে পাওয়া ওয়ার্কব্যাকটাও দারুণ। অনেকেই বলে তাদের রড ফ্যাটিগ টেস্টে উত্তীর্ণ কিংবা এত মাত্রার সাইক্লিক লোড সহনীয়। আমরা এভাবে প্রচারে যাই না। আমরা আমাদের কাস্টমারদের সরাসরি আমাদের রোলিং মিলে এসে দেখে তারপর রড কিনতে বলি।       

বিএসআরএম, একেএস টিএটিবার কিংবা আরএসআরএমের মতো কোম্পানি বাজারে থাকলেও  আপনারা বেশ জোরালো অবস্থান তৈরিতে সক্ষম হয়েছেন। এলাম, দেখলাম, জয় করলাম অবস্থা। কীভাবে এটা সম্ভব হয়েছে? সাফল্যের গোপন মন্ত্র কী?

আমি মনে করি তিনটি কারণে এটা সম্ভব হয়েছে। তা হলো কোয়ালিটি, কোয়ালিটি ও কোয়ালিটি। আর এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিশ্বাস ও আস্থার নামটি। প্রোডাকশন যদি কখনো কোয়ালিটি ফেল করে, তবে সেটি আমরা বাজারে যেতে দিই না। সঙ্গে সঙ্গে সেটি নিজস্ব রোলিং মিলেই মেল্ডটিং করে ফেলি। সার্ভিস ও সাপোর্টটাও এখানে সমান গুরুত্বপূর্ণ। কাস্টমারকে আমরা সময়মতো মাল ডেলিভারি দিয়ে আমাদের সার্ভিসটা ঠিক রাখি। আর তাই সমভাবে কাস্টমারদের কাছ থেকেও পাই দুর্দান্ত সাপোর্ট। আজ আমরা যত দূর পৌঁছেছি তার পুরো কৃতিত্বই কিন্তু আমাদের কাস্টমারদের। 

শিল্প হিসেবে স্টিলের বাজার কত বড়, এ খাতের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা কেমন?

এখনো আমরা স্টিল বিজনেসে চীন থেকে ১০ গুণ আর ভারত থেকে ৫ গুণ পিছিয়ে আছি। ওদের সমকক্ষ হতে এ শিল্পকে এগিয়ে নিতে শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক বিজনেস করলে হবে না, ছড়িয়ে দিতে হবে সারা দেশে। আবাসনশিল্পের প্রসারে ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে এর বাজার। ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে এর বাজার সম্ভাবনাও অনেক।     

ভূমিকম্প মোকাবিলা কিংবা রানা প্লাজা, স্পেকট্রাম গার্মেন্টসের মতো ভবনধসের ক্ষেত্রে আরসিসি নির্মিত ভবন নির্মাণক্রটিজনিত দুর্ঘটনার হাত থেকে রক্ষা করতে প্রিফেব্রিকেটেড স্টিল বিল্ডিং কতটা সহায়ক বলে আপনি মনে করেন?

প্রিফেব্রিকেটেড স্টিল বিল্ডিং নির্মাণেও রয়েছে স্টিলের ৪০, ৫০ কিংবা ৬০ গ্রেড। এ গ্রেড অনুসারে বিল্ডিং নির্মাণ করতে হবে। এখন ৪০ গ্রেডটা যদি হাইরাইজ বিল্ডিংয়ের জন্য দেন, তাতে ধস অনিবার্য। আর এতে দোষ হবে কিন্তু রডের। এ ক্ষেত্রে এ ধরনের বিল্ডিংয়ের মালিক, ইঞ্জিনিয়ার, আর্কিটেক্ট ও মানসম্মত কোম্পানির নির্মাণপণ্য অন্যতম বিবেচ্য। মোহস্টিল প্লেটে দেশে অনেকগুলো প্রিফেব্রিকেটেড স্টিল বিল্ডিং নির্মিত হয়েছে ও হচ্ছে।       

মোহস্টিলের উল্লেখযোগ্য গ্রাহক কারা?

আমাদের গ্রাহক এখন অনেকেই। প্রিফেব্রিকেটেড স্টিল বিল্ডিংয়ের ক্ষেত্রে বিলট্রেন্ড। এ ছাড়া আছে সুবাস্তু, ইউনিক গ্রুপ, ইউপিএসএল, বেক্সিমকো গ্রুপ। গার্মেন্টস ই›ডাস্ট্রিতে রয়েছে রিয়ালা টেক্স, হলটেক্সের মতো প্রতিষ্ঠান। তা ছাড়া বড় বা ছোট ফ্যাক্টরি নির্মাণে, ব্যক্তি প্রতিষ্ঠান বা বাসগৃহ তৈরিতে ব্যবহৃত হচ্ছে মোহস্টিল। 

আপনাদের স্টিল বিদেশে রপ্তানির সম্ভাবনা কতটুকু?

এখনো শুরু হয়নি। তবে কাজ চলছে। দেশের চাহিদা পূরণের পর শিগগিরই দেশের বাইরে রপ্তানি শুরু করব। 

মোহস্টিলের অর্জনের স্বীকৃতি সম্পর্কে জানতে চাই?

মোহস্টিলের প্রতি কাস্টমারদের বিশ্বাস ও আস্থাই আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন। পরিমাণ কম বা বেশি নয়, যেকোনো পরিমাণ স্টিলের কাস্টমারই আমাদের কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই সাপোর্ট দিতে আমরা সব সময় প্রস্তুত। ইতিমধ্যে আমরা আইএসও ও ইউকেইএ সার্টিফাইড। আমাদের পরবর্তী লক্ষ্য লিড সার্টিফিকেট প্রাপ্তি।   

মোহস্টিলকে নিয়ে ভবিষ্যতে বিশেষ কোনো পরিকল্পনা আছে কি?

আমরা এন ইউজারের জন্য চিন্তাভাবনা করছি। আমাদের একটা টেকনোলজি আছে কাট টু লেন্থ। জায়গা ছোট হওয়ায় রড ফেলে রাখতে চাই না। তাই ভাবছি ওটাকে সাইকেলিক করার। ইতিমধ্যে এ ব্যাপারে একটা অটোমেশন কোম্পানির সঙ্গে কথা বলেছি। যাতে কাস্টমারকে দ্রুত মাল ডেলিভারি দিতে পারি যেন তা কোনোভাবেই ওভার প্রোডাকশন না হয়। কাস্টমারের যে পরিমাণ চাহিদা তা উৎপাদন করে কেবল সেই পরিমাণই তাৎক্ষণিকভাবে সরবরাহের ব্যবস্থা করা। বিল্ডিয়ে রিং পরানোর পাশাপাশি রড ওয়েস্টেজটা কীভাবে কমানো যায় সেটা নিয়েও চিন্তাভাবনা করছি। 

এ শিল্প বিকাশে সরকারের কাছে আপনার চাওয়াটা কী?

স্টিল শিল্পের বিকাশে প্রথমে দরকার দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন। শিল্পায়নকে গুরুত্ব দিতে হবে। এ লক্ষ্যে দেশীয় শিল্পোদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে হবে। আমদানি-নির্ভর পণ্যের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে দেশীয়ভাবে উৎপন্ন মানসম্মত পণ্যের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। আমদানি-নির্ভরতা কমাতে সরকার বিদেশি পণ্যের ট্যারিফ বাড়াতে পারে। প্রয়োজনবোধে আমদানি নিষিদ্ধ করতে পারে। তবেই প্রাণ পাবে দেশীয় শিল্প। অবকাঠামো উন্নয়নকামী দেশ যেমন- নেপাল, ভুটান কিংবা মিয়ানমারে আমরা স্টিল রপ্তানি করতে পারি। এ ব্যাপারে সরকারের উদ্যোগী ভূমিকা আশা করছি।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৭২তম সংখ্যা, এপ্রিল ২০১৬।

মারুফ মোহসিন
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top