Image

স্থাপনার সুস্থতায় নন-ডেসট্রাকটিভ টেস্ট

মানবদেহ কিংবা প্রাণিকুলের স্বাস্থ্য-সচেতনতায় আমরা যেমন নিয়মিত ক্লিনিক বা হাসপাতালে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য যাই, তেমনি আমাদের অবকাঠামো কেমন আছে তা জানতে প্রয়োজন Non-Destructive Test, যা এনডিটি নামে পরিচিত। বর্তমান বিশ্বে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে, শিল্প-কারখানার কাজে এটি বহুল প্রচলিত একটি পদ্ধতি, যার মাধ্যমে খুব সহজে পদার্থের বৈশিষ্ট্য, বস্তুর অবস্থান, সার্বিক কাঠামোর মতো বিষয় সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাওয়া যায় কাঠামোর কোনো রকম ক্ষতি না করেই (যেমন-নির্মাণসংক্রান্ত ক্ষেত্রে বর্তমানে কংক্রিট কতটুকু শক্তিশালী, রডের অবস্থান নির্ণয় প্রভৃতি)। এটি অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য একটি পদ্ধতি, যা প্রয়োগ করে অল্প সময়ে এবং কম খরচে গবেষণা ও বাস্তবিক প্রযুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় ডেটা সংগ্রহ ও কোনো বস্তুর ভৌত গঠন সম্পর্কে সঠিক ধারণা করা যায় সহজেই। বর্তমানে আমাদের এখানে এই পদ্ধতিটি প্রকৌশল প্রযুক্তিতে বিশেষত দালানকোঠা, সেতুর মতো অবকাঠামো যেসব পদার্থের সমন্বয়ে তৈরি হয়; তার বৈশিষ্ট্য, কংক্রিটের শক্তি, রডের অবস্থান নির্ণয়, কাঠামোর মৌলিক চরিত্র নির্ণয়ে ব্যবহৃত হচ্ছে। বর্তমানে প্রচলিত যেসব পদ্ধতি এখানকার পুরকৌশল প্রযুক্তিতে ব্যবহার হচ্ছে, আলোচনায় তারই কয়েকটি-

কংক্রিটের মধ্যে রডের অবস্থান নির্ণয়ে Ferro Scan ও Rebar Detector

নির্মাণের সময় যদি রডের অবস্থান সঠিকভাবে ডিজাইনের সঙ্গে মিল রেখে না রাখা হয়, তবে ভবন ডিজাইনের সময় যে পরিমাণ শক্তি হিসাব করে ভবন তৈরি করা হয়, তা অর্জন করা সম্ভব হয় না। আবার ভূমিকম্প সহনশীল ভবন তৈরির জন্য আমাদের বিল্ডিং কোডে রেইনফোর্সমেন্ট ব্যবহারের যে নীতিমালা রয়েছে, তা সঠিকভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না তা জানা জরুরি। তাই আমাদের দেয়াল একবার তৈরি হয়ে যাওয়ার পর স্ট্রাকচারাল অংশের মধ্যে রডের অবস্থান ঠিকভাবে আছে কি না পরীক্ষা করে নেওয়া দরকার, আর একবার ভবন তৈরি হয়ে গেলে তার অবস্থান নির্ণয় করা অত্যন্ত কঠিন কাজ। বর্তমানে এনডিটি প্রযুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমেই কেবল কংক্রিটের মধ্যে রডের অবস্থান সঠিকভাবে জানা সম্ভব। এই পদ্ধতিতে বিশ্বজুড়ে প্রচলিত দুটি Ferro Scan ও Rebar Detector প্রায় সঠিকভাবে রডের অবস্থান নির্ণয় করতে পারে। এই যন্ত্র দুটি সহজে বহনযোগ্য এবং এর অপারেটিং সিস্টেমও সহজ। যার ফলে দক্ষ কারিগর দ্বারা সঠিকভাবে এটির প্রয়োগ সম্ভব। Ferro Scan Hilti PS 200 পদ্ধতিটি ইলেক্ট্রো-ম্যাগনেটিক পালস ব্যবহার করে কংক্রিটের মধ্যে প্রায় ১৮০ মিলিমিটার পর্যন্ত স্ক্যান করতে পারে, যা ৬ থেকে ৩৬ মিলিমিটার ব্যাসের রডকে ঠিকভাবে চিহ্নিত করতে পারে, যার নির্ভুলতার মাত্রা +/- ১ মিলিমিটার পর্যন্ত। এতে তিন ধরনের পদ্ধতি ব্যবহার করে রডের অবস্থান, কাভার দূরত্ব এবং রডের ব্যাস সহজেই নির্ণয় করা সম্ভব। এই যন্ত্রের মাধ্যেমে লাইন স্ক্যান পদ্ধতিতে কংক্রিটের মধ্যে মেইন রেইনফোর্সমেন্ট ও ট্রান্সভার্স রেইনফোর্সমেন্টের অবস্থান ও কাভার দূরত্ব জানা সম্ভব, ইমেজ স্ক্যান ব্যবহার করে রেইনফোর্সমেন্টের ব্যাস নির্ণয়সহ একটি ছোট গ্রিডের (২ ফুট x ২ ফুট) স্ক্যান ইমেজ পাওয়া যায়, যার মাধ্যমে কংক্রিটের মধ্যে রডের সার্বিক অবস্থান জানা যায়। ব্লকস্ক্যান পদ্ধতি ব্যবহার করে একটি বড় অংশ বা গ্রিডের চিত্র পাওয়া যায়, যা সাধারণত ভবনের ফ্লোরের রেইনফোর্সমেন্টের অবস্থান নির্ণয়ে ব্যবহার করা হয়। এই যন্ত্রের সঙ্গে একটি মনিটর থাকায় স্ক্যান করার পর তার ইমেজ দেখতে পাওয়া যায়। অন্যদিকে Rebar Detector (যেমন- Profoscope) ব্যবহার করে রডের অবস্থান সঠিকভাবে নির্ণয় করা গেলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কাভার দূরত্ব সঠিকভাবে নির্ণয় করা সম্ভব নয়, তবে যদি রডের ব্যাসের মান জানা থাকে, তবে কাভার দূরত্ব সঠিকভাবে নির্ণয় করা যায়। আমাদের দেশে এই দুটি যন্ত্র বর্তমানে বহুল ব্যবহৃত।

আলট্রাসনিক পালস ভেলোসিটি (UPV-ইউপিভি) মিটার

আলট্রাসনিক পালস ভেলোসিটি মিটার যেকোনো ম্যাটেরিয়ালের শক্তি এবং বৈশিষ্ট্য পরিমাপ করতে ব্যবহার করা হয়। সাধারাণত ওই ম্যাটেরিয়ালের ঘনত্ব ও স্থিতিস্থাপকতার সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে নির্ভুলভাবে ইউপিভি দ্বারা শক্তি এবং বৈশিষ্ট্য পরিমাপ করা যায়। ইউপিভি যন্ত্রে একটি রিসিভার ও একটি ট্রান্সমিটার থাকে, ট্রান্সমিটার দ্বারা সৃষ্ট আলট্রাসনিক পালস যেকোনো ম্যাটেরিয়ালের (যেমন কংক্রিট) মধ্য দিয়ে রিসিভার পর্যন্ত পৌঁছার সময়কাল, অ্যাপ্লিফিকেশন ইত্যাদি পরিমাপের মাধ্যমে পদার্থের শক্তি পরিমাপ করা যায়। এ ছাড়া আলট্রাসনিক পালস ব্যবহার করে পদার্থের মাঝে যদি কোনো ধরনের ফাটল থাকে তা নির্ণয় এবং ফাটলের পরিমাণ মাপা যায়। কংক্রিটের শক্তি বা ফাটল পরিমাপের জন্য তিন ধরনের ট্রান্সমিশন পদ্ধতি ব্যবহৃত হয় (চিত্রের মতো ডিরেক্ট, সেমি-ডিরেক্ট এবং ইন-ডিরেক্ট ট্রান্সমিশন পদ্ধতি)।

আলট্রাসনিক ডিভাইস

কার্যপ্রণালি

ডিরেক্ট ট্রান্সমিশন

সেমি-ডিরেক্ট ট্রান্সমিশন

ইন-ডিরেক্ট ট্রান্সমিশন

আমাদের দেশেও স্বীকৃত গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো কংক্রিটের বৈশিষ্ট্য নির্ণয়ের জন্য আলট্রাসনিক পালস ভেলোসিটি মিটার ব্যবহার করে, বিশেষ করে এই পদ্ধতিতে কংক্রিটের বৈশিষ্ট্য নির্ণয় বিশেষজ্ঞ কর্তৃক গ্রহণযোগ্য। ইউপিভি যন্ত্রে পরিমাপ করা পালস ভেলোসিটির ওপর নির্ভর করে বিভিন্ন ধরনের কংক্রিটের শ্রেণিবিন্যাসকৃত ছক-

ছক: UPV ভেলোসিটি ওপর নির্ভর করে কংক্রিটের প্রকার (সূত্র: GoI-UNDP, ২০০৭)

UPV পালস ভেলোসিটি (মিটার/সেকেন্ড)কংক্রিটের বৈশিষ্ট্য
৪০০০ বা ততোধিকখুব ভালো
৩৫০০ থেকে ৪০০০ভালো, তবে কংক্রিটের মধ্যে পোরোসিটি থাকতে পারে
৩০০০ থেকে ৩৫০০খারাপ
২৫০০ থেকে ৩০০০খুব খারাপ
২০০০ থেকে ২৫০০খুব খারাপ, এবং কম শক্তিসম্পন্ন
২০০০ বা তার কমখুব দুর্বল, কংক্রিটের মধ্যে ফাঁপা অংশ থাকার সমূহ আশঙ্কা

রিবাউন্ড হ্যামার বা স্মিথ হ্যামার

রিবাউন্ড বা স্মিথ হ্যামার খুব সাধারণ একটি যন্ত্র, যা দিয়ে কংক্রিটের শক্তি এবং রিবাউন্ড নাম্বারের মধ্যকার সম্পর্ক ব্যবহার করে সারফেস হার্ডনেস (পৃষ্ঠতলের দৃঢ়তা) নির্ণয় করা সম্ভব। সারফেস হার্ডনেস জানা থাকলে সাউন্ডনেস এবং কাভার কংক্রিটের বৈশিষ্ট্য জানা যায়। অপেক্ষাকৃত কম রিবাউন্ড নাম্বারের কংক্রিট বেশি রিবাউন্ড নাম্বারের কংক্রিট অপেক্ষা দুর্বল হয়। যে কংক্রিটের রিবাউন্ড নাম্বার যত বেশি, তার সারফেস তত শক্তিশালী এবং ক্ষয় হওয়ার আশঙ্কা তত কম।

ছক: রিবাউন্ড নাম্বারের ওপর নির্ভর করে কংক্রিটের প্রকরণ

(সূত্র: GoI-UNDP, ২০০৭)

গড় রিবাউন্ড নাম্বার, কংক্রিটের প্রকার

৪০ বা ততোধিক, খুব ভালো শক্ত স্তরসমৃদ্ধ

৩০ থেকে ৪০, ভালো স্তরসমৃদ্ধ

২০ থেকে ৩০, মোটামুটি মানের

২০ বা তার কম, দুর্বল কংক্রিট

০ (শূন্য), Delaminated

মাইক্রোট্রেমর

মাইক্রোট্রেমর যন্ত্রটি যেকোনো স্ট্রাকচারের দোলনকাল, স্বাভাবিক কম্পন নির্ণয়ে ব্যবহার করা হয়। এই যন্ত্রটির সাহায্যে কোনো ভবনের দোলনকাল ও মাটির কম্পাঙ্ক হিসাব করে ভূমিকম্পের সময় অনুনাদ হওয়ার সম্ভাবনা আছে কি না তা বের করা সম্ভব। এ ছাড়া মাইক্রোট্রেমর সেন্সর ব্যবহার করে মাটির গভীরতা বরাবর মাটির প্রকৃতি এবং S-wave velocity নির্ণয় করা হয়।

মেড ইন চায়না

গ্রাউন্ড পেনেট্রেটিং রাডার (এচজ-GPR)

জিপিআর যন্ত্রটি ইলেক্ট্রো ম্যাগনেটিক রেডিয়েশন ব্যবহার করে মাটির তলার, কংক্রিটের মধ্যকার কিংবা পানির নিচের ইমেজ প্রসেসিং করা হয়। এই পদ্ধতিতে পদার্থের বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে ভিন্ন ভিন্ন কম্পাঙ্কের এন্টেনা ব্যবহার করা হয়। এন্টেনার ট্রান্সমিটার থেকে সাব-সারফেসের মধ্য দিয়ে যে শক্তির রেডিয়েশন হয় তা সারফেসের মধ্যে বিভিন্ন স্তরে শোষিত বা প্রতিফলিত হয়ে ফিরে আসে, যা এন্টেনার রিসিভারে মাটির স্তরের বা বস্তুর ইমেজ তৈরি করে। জিপিআরের মাধ্যমে কোনো বস্তুর মাঝে কোনো ফাঁপা অংশ, ফাটল, রেইনফোর্সমেন্ট, কোরোশন ইত্যাদি বের করা সম্ভব। এমনকি এটি ব্যবহার করে সম্ভব মাটি বা পানির নিচে বর্জ্য অংশ বের করা। কংক্রিটের মধ্যে প্রায় ১৮ ইঞ্চি পর্যন্ত ইমেজ স্ক্যান করা যায় এরই সাহায্যে।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৬৪তম সংখ্যা, আগস্ট ২০১৫

(অথর যুক্ত করুন)

Related Posts

ইরান যুদ্ধের অজুহাতে আকাশচুম্বী নির্মাণ পণ্যের দাম

ইরানের যুদ্ধ শুধু ইরান আর ইসরায়েলেই সীমাবদ্ধ থাকলো না। শেলের আঘাতে বিদ্ধস্ত পক্ষ-বিপক্ষ। তবুও আগুন ছড়িয়ে গেছে সারা…

নির্মাণে উচ্চশক্তির রড ব্যবহারে বিএনবিসি কোড

কি সত্যিই অন্তরায়? ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক উন্নয়নের মধ্য দিয়ে উঠে আসা পৃথিবীর ১৯৫টি দেশের মধ্যে ৩২তম শক্তিশালী দেশ বাংলাদেশ।…

হরেক রকম টাইলস

কয়েক দিন আগের কথা। একটা বাড়ির ইন্টেরিয়রের কাজে ক্লায়েন্টের সঙ্গে হাতিরপুল টাইলস মার্কেটে গিয়েছিলাম। মার্কেট দেখে বেশ ভালো…

সিল্যান্ট নিয়ে যত কথা (শেষ পর্ব)

….পূর্ব প্রকাশের পর ব্যবহারের ভিত্তিতে সিল্যান্টের কারিগরি বৈশিষ্ট্য সিল্যান্ট বাজার থেকে কিনে আনার সময় তা পেস্ট আকারে থাকে।…

01~1
previous arrow
next arrow

CSRM

সর্বশেষ

Trending Posts

Gallery

Belgium
Buet
কী কী থাকছে আকাশছোঁয়া শান্তা পিনাকলে
সমুদ্রবাণিজ্যের বর্জ্য থেকে অনন্যা এক স্থাপত্য
Home of Haor
Weather
Youth Park
Tower
শহর,সেতু আর সুরের টেনেসির আর্টস সেন্টার