কম্প্যাকশন গ্রাউটিং

মাটিকে সুদৃঢ় করার অনন্য এক পদ্ধতি কম্প্যাকশন গ্রাউটিং (Compaction Grouting)। এর সাহায্যে মাটির নিচের আলগা দানাদার মাটিকে দৃঢ় করা হয়। এই প্রযুক্তি ভূনিম্নস্থ শূন্যস্থান বা সিংকহোল মেরামত করে মাটির ঘনত্ব ও ভারবহন ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। এই পদ্ধতিতে লো স্ল্যাম্প ও মোবিলিটি (Mobility) যুক্ত সিমেন্ট এগ্রিগেট গ্রাউট তরলাকারে মাটির অভ্যন্তরে প্রবেশ করানো হয়। ইনজেকশনকৃত তরল গ্রাউট মাটিকে ধাক্কা দিয়ে পাশে সরিয়ে দেয়। এর ফলে চারপাশের মাটি অপসারিত হয়ে ট্রিটমেন্ট জোনের মাটির বৈশিষ্ট্যসমূহের প্রয়োজনীয় উন্নতি ঘটে। ফলে অবকাঠামো বা স্থাপনার নিরাপদ নির্মাণ নিশ্চিত হয়।

গ্রাউটিং পদ্ধতির রকমফের

১. পারমিয়েশন গ্রাউটিং (Permeation Grouting)

২. কম্প্যাকশন গ্রাউটিং (Compaction Grouting)

৩. হাইড্রো ফ্রাকচার গ্রাউটিং (Hydro Fracture Grouting)

৪. জেট গ্রাউটিং (Jet Grouting)

৫. রক গ্রাউটিং (Rock Grouting)

৬. কমপেনসেশন গ্রাউটিং (Compensation Grouting)

৭. ডিপ মিক্সিং পদ্ধতি (Deep Mixing Method)

কর্মপদ্ধতি

কম্প্যাকশন গ্রাউটিং প্রক্রিয়ায় খুব শক্ত সমপ্রকৃতির (Homogeneous) গ্রাউট মিক্স (O4 থেকে 14 স্ল্যাম্প) অপেক্ষাকৃত উচ্চ চাপে এবং খুবই কম গতিতে (<২ ফুট ৩/মিনিট) ইনজেকশন করা হয়। কম্প্যাকশন গ্রাউটিং প্রয়োগ করার জন্য সম্পূর্ণ সাইটকে কয়েকটি গ্রিড লাইনে ভাগ করা হয়। লাইনসমূহের মধ্যবর্তী দূরত্ব ১ দশমিক ৫ মিটার থেকে ৩ মিনিট পর্যন্ত হয়ে থাকে। গ্রিডলাইনের ক্রস পয়েন্টগুলো প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণিতে বিভক্ত করে ক্রমানুসারে এসব পয়েন্টে প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ মিলি ব্যাসের ড্রিল হোল (Drill Hole) তৈরি করা হয়। Rotary Wash পদ্ধতিতে ড্রিল হোল করার জন্য Drill Rig ব্যবহার করা হয়। প্রথমে একটি ইনজেকশন পাইল ড্রিল হোলের ভেতর দিয়ে মাটির সর্বোচ্চ ট্রিটমেন্ট গভীরতায় প্রেরণ করা হয়। তারপর লো মোবিলিটি গ্রাউট পুশ করা হয়। যখন গ্রাউট বাল্ব প্রসারিত হয় তখন এর চারপাশের মাটি গিয়ার বিকৃতির মাধ্যমে দূরে সরে যায়। গিয়ার বিকৃতির ফলে মাটির দানাযুক্ত পুনর্বিন্যাস ঘটে, ফলে মাটি আরও বেশি ঘনসন্নিবিষ্ট হয়। গ্রাউট প্রয়োগে বল ওভার-বারডেন (Over-burden) প্রেসার অতিক্রম পর্যন্ত গ্রাউট ইনজেকশন অব্যাহত রাখা যায়। এরপর পাইলকে ধীরে ধীরে ওপরে তোলা হয় এবং পুনরায় আবার গ্রাউট পুশ করা হয়। এভাবে গ্রাউট বাল্বের পারস্পরিক ওভারল্যাপ দ্বারা একটি গ্রাউট কলামের সৃষ্টি হয়। একটি পয়েন্টে গ্রাউটিং প্রয়োগ শেষ হলে পর্যায়ক্রমে অন্য পয়েন্টগুলোতে গ্রাউটিং করতে হয়।

ইভিজিসিপি

যা লক্ষ রাখতে হবে

  • গ্রাউট ইনজেকশন পাইপ বসানোর জন্য বিশেষভাবে ডিজাইনকৃত কম্প্যাক্ট সরঞ্জাম (Equipment) ব্যবহার করে ড্রিল করতে হবে।
  • ইনজেকশন পাইপ লম্বালম্বিভাবে অথবা কৌণিকভাবে ড্রিল করতে হবে।
  • ইনজেকশন পাইপ স্থাপন করার পর গ্রাউটে উচ্চ প্রেসার প্রয়োগ করতে হবে।
  • সম্পূর্ণ পাম্পিং প্রক্রিয়া চলার সময় বিদ্যমান কাঠামোর অবস্থান পরিবর্তন এবং গ্রাউট লাইনের প্রেসার ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
  • মাটির বৈশিষ্ট্য, গ্রাউট ইনজেকশন গতি, গ্রাউট মিক্স ডিজাইন, ইন সিটু মাটির অবস্থা এবং ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির ক্ষমতার মধ্যে নিবিড় সমন্বয় রাখতে হবে।
  • ভূগর্ভস্থ অবস্থানে পূর্বপরিকল্পিত প্যাটেনে ক্রমানুসারে বিভিন্ন পয়েন্টে গ্রাউট প্রয়োগ করতে হবে।

সুবিধা যত

  • ফাউন্ডেশনের তলদেশের মাটির ভারবহন ক্ষমতা বাড়ে।
  • ভূমিকম্পের সময় মাটির লিকুইফেকশন (Liquefaction) আশঙ্কা হ্রাস করে।
  • ফাউন্ডেশনের বসন (Settlement) প্রতিরোধ করে।
  • বিদ্যমান কাঠামো স্থির বা সমতলকরণ করে।
  • প্রাক্-নির্মাণ (Pre-construction) সাইটের উন্নতিকরণ ঘটায়।
  • বিদ্যমান ভূনিম্নস্থ কাঠামো (যেমন: টানেল, পাতালরেল, পাইপ) স্থির করা এবং কাঠামোর ওপরের মাটির বসন নিয়ন্ত্রণ করে।
  • নরম ও কম্প্যাক্ট যোগ্য মাটির বৈশিষ্ট্যের উন্নয়ন ঘটায়।
  • ত্রুটিপূর্ণ পাইলের মেরামত করে।
  • কাঠামোর সাপোর্ট হিসেবে কম্প্যাকশন গ্রাউটেড পাইল স্থাপন করা হয়।
  • মাটির ভেতর দিয়ে পানির Seepage  হ্রাস করে।
  • ভূগর্ভস্থ সিংকহোল মেরামত অথবা সিংকহোলপ্রবণ এলাকায় সিংকহোলের সম্ভাব্যতা কমায়।
  • মাটির লেয়ারের ভয়েড ভরাটের পাশাপাশি মাটির ঘনত্ব বৃদ্ধি করে।

বিশেষত্ব

  • যেসব স্থানে প্রবেশ কঠিন এবং স্থান সীমিত, সেখানেও কম্প্যাকশন গ্রাউটিং প্রয়োগ করা সম্ভব।
  • লো মোবিলিটি গ্রাউট কলামের সঙ্গে ফাউন্ডেশনের কোনো ধরনের স্ট্রাকচারাল সংযোগের প্রয়োজন হয় না।
  • বিদ্যমান কাঠামোর কাছাকাছি অবস্থিত মাটির লেয়ারের জন্য বিশেষভাবে উপযুক্ত।
  • বসে যাওয়া কাঠামোর সমতলকরণে খুবই কার্যকরী।
  • অনেক ক্ষেত্রে কম্প্যাকশন গ্রাউটিং প্রচলিত পদ্ধতির (যেমন: অপসারণ এবং প্রতিস্থাপন বা পাইলিং) চেয়ে অধিক সাশ্রয়ী হয়।

ডিজাইনের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য

  • ভূপৃষ্ঠের অভ্যন্তরস্থ মাটির প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ধারণা নেওয়া।
  • ভূনিম্নস্থ বিভিন্ন স্তরের গভীরতা সম্পর্কে ধারণা নিশ্চিত করা।
  • প্রকল্প অঞ্চলের মাটির স্তরের বিভিন্নতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া।
  • প্রয়োজনীয় ল্যাবরেটরি পরীক্ষা করতে প্রতিনিধিত্বকারী নমুনা সংগ্রহ করা।
  • ভূনিম্নস্থ পানিতলের অবস্থান, পরিবর্তনশীলতা ও পানির চাপ সম্পর্কে ধারণা নেওয়া।
  • প্রস্তাবিত অথবা বিদ্যমান কাঠামোর ওপর ভিত্তির ধরন ও গভীরতা নির্ধারণ করা।
  • মাটির ভারবহন ক্ষমতা নির্ণয় করা।
  • মাটির ভেদ্যতা সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা নেওয়া।
  • সর্বোচ্চ অনুমোদনযোগ্য বসন (ঝবঃঃষবসবহঃ), সর্বোচ্চ উরভভবৎবহঃরধষ ঝবঃঃষবসবহঃ, ডিজাইন ভূমিকম্প বল ও শেয়ার স্ট্রেংথ নির্ধারণ করা।

লক্ষণীয় যা কিছু

  • বিদ্যমান কাঠামোটি যাতে কম্প্যাকশন গ্রাউটিং করার সময় ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
  • অবশ্যই এই পদ্ধতির ওপর বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ও তত্ত্বাবধান নিশ্চিত করতে হবে।
  • ক্স  খেয়াল রাখতে হবে মাটির বৈশিষ্ট্যের সামান্য উন্নয়নের জন্য অর্থের বিশাল পার্থক্য হওয়ার দিকটিও।
30 soletanche-bachy

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কম্প্যাকশন গ্রাউটিংয়ের ব্যবহার চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে। কারণ, ভূগর্ভস্থ মাটির বিভিন্ন সমস্যার কার্যকরী সমাধানে কম্প্যাকশন গ্রাউটিং অতুলনীয়। বিগত ১০-১৫ বছর ধরে সিংকহোল মেরামত ও মাটির লিকুইফিকশন প্রতিরোধে এই পদ্ধতি পেয়েছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৬৪তম সংখ্যা, আগস্ট ২০১৫

চন্দন কুমার বসু
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top