মর্তুজা আহমেদ ফারুক বাপেক্সের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক। বর্তমানে কাজ করছেন একটি দেশীয় প্রতিষ্ঠানের প্রজেক্ট মনিটরিং কনসালট্যান্ট হিসেবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন ১৯৭৭ সালে। ১৯৮৯ সালে পেট্রোলিয়াম অন্বেষণ ও মজুদ ব্যবস্থাপনার ওপর ডিপ্লোমা করেছেন নরওয়ের ইউনিভার্সিটি অব ট্রোরেনদেহিম থেকে। এরপর ১৯৯৮ সালে কোরিয়ার কিম চেক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি থেকে ডিপ্লোমা করেছেন খনি ব্যবস্থাপনা ও শ্রমিক নিরাপত্তা নিয়ে। দেশ-বিদেশ থেকে নিজের অর্জিত জ্ঞান কাজে লাগাতে যোগ দেন পেট্রোবাংলায়। সেখানে কাজ করেছেন বহুদিন। এরপর বাপেক্সে। সেখানেও সাফল্য দেখান তিনি। দেশের খনিজ শিল্প ও তার ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করছেন তিনি। ১৯৫৪ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি জন্ম নেওয়া জ্বালানি বিশেষজ্ঞ মর্তুজা আহমেদ ফারুক দেশীয় খনি শিল্প ও বাপেক্সের নানা দিক নিয়ে কথা বলেছেন বন্ধন-এর সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আনিস রহমান
বাপেক্সের শুরু গল্পটা কেমন? একটু ধারণা দেবেন?
১৯৮৯ সালে বাপেক্সের জন্ম হলেও এই প্রতিষ্ঠানটি পাকিস্তান আমলের Oil and Gas Development Company বা OGDC এবং বাংলাদেশের পেট্রোবাংলার উত্তরসূরি। ১৯৬২ সালে সোভিয়েত সহায়তায় ওজিডিসি প্রতিষ্ঠার পর থেকে পাকিস্তান আমলেই বাংলাদেশে গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু করে এবং চারটি কূপ খননের পাশাপাশি সেমুতাংয়ে গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে সাবেক ওজিডিসির জনবল, রিগ ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি নিয়ে দেশে ‘তৈল সন্ধানী’ নামে একটি অনুসন্ধান কোম্পানি সৃষ্টি করা হয় এবং মূলত এ কার্যক্রমকে দেখভাল করার জন্য সৃষ্টি হয় পেট্রোবাংলার। সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়ে ‘তৈল সন্ধানী’কে পেট্রোবাংলার সঙ্গে একীভূত করা হয়। এরপর থেকে পেট্রোবাংলাই এই অনুসন্ধানের কাজ চালায়। ১৯৮৯ সালে পেট্রোবাংলার Exploration Directorate-কে অবলুপ্ত করে বাপেক্স গঠন করা হয়।
বাপেক্সের সাফল্যের হার সম্পর্কে বলুন?
১৯১০ সাল থেকে এ পর্যন্ত দেশি-বিদেশি কোম্পানি মিলে অনুসন্ধান কূপ খনন করেছে ৭৫টি, যার মধ্যে গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে ২৫টি অর্থাৎ সাফল্যের হার ৩ : ১। অন্যদিকে শুধু দেশীয় কোম্পানির কথা যদি ধরি তাহলে ওজিডিসি, পেট্রোবাংলা ও বাপেক্স মিলিতভাবে এ পর্যন্ত ১৮টি অনুসন্ধান কূপ খনন করে আটটি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করেছে। এদের মিলিত সাফল্যের হার ২.২৫ : ১। আর শুধু বাপেক্সের কথা যদি ধরি তাহলে বাপেক্স চারটি অনুসন্ধান কূপ খনন করে তিনটিতে গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করেছে। অর্থাৎ সাফল্যের হার ১.৩৩ : ১৬। অর্থাৎ যে জাতীয় প্রতিষ্ঠানের দক্ষতাহীনতার কথা বলে বহুজাতিক কোম্পানি ডেকে আনা হচ্ছে, সেই প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের হার বাংলাদেশ কর্মরত ওসব বিদেশি কোম্পানির সাফল্যের হারের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি।
বাংলাদেশের স্থলভাগে আরও তেল পাওয়ার সম্ভাবনা কতটা?
গত ১০৫ বছরে ৮১টি খননকাজ হয়েছে। এর মধ্যে সফলতার সংখ্যা উল্লেখযোগ্য নয়। মাটির গভীরে খননকাজ করা হলে সম্ভাবনা বেশি থাকে। স্থলভাগ ও সমুদ্রে আরও অনুসন্ধান চালাতে হবে। কয়লার সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি দেশের কাজে অবদান রাখার সুযোগ দিতে হবে। ভারতের পাশাপাশি নেপাল ভুটানের কাছ থেকে আমদানির প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। নিউক্লিয়ারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন নিশ্চিত করতে হবে।
বাপেক্সে কী কী সংকট রয়েছে?
কোনো আয়ের উৎসবিহীন বাপেক্স ভালোভাবে চলবে কীভাবে বলুন? শুরু থেকেই এর আর্থিক দিকগুলো যেমন আয়, স্থায়ী খরচ, অনুসন্ধান ও খনন খরচ সবকিছুই দারুণ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে। একেকটা প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ লম্বা প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাওয়ার কারণে বাপেক্সের কাজ হয়ে পড়ে দারুণ মন্থর। তার ওপর আছে জনবল সংকট।
দক্ষ জনবল ধরে রাখতে পারছে না বাপেক্স, এই অভিযোগ পুরোনো। কিন্তু কর্মী ধরে রাখতে চেষ্টাও করছে না প্রতিষ্ঠানটি। আপনার অভিমত?
যখন কারও বাজারে ভালো সুযোগ থাকে তাহলে সে কোনো কম সুযোগ নিয়ে কোথাও পড়ে থাকবে? দেশের অন্যান্য সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানটি যে সেবা দিচ্ছে, বাপেক্স তার কর্মীদের সে সুবিধা নিশ্চিত করতে পারছে না। এটা একটি বড় সংকট। যার ফলে কর্মীদের ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। তবে কর্মী যাওয়া-আসা একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া। একজন যাচ্ছে, সেখানে নতুন লোক আবার নেওয়া হচ্ছে।
বাপেক্স কর্মীদের সক্ষমতা ও দক্ষতার বিষয়ে কিছু বলুন?
বাপেক্সের কর্মীরা নিজেদের মতো করে দক্ষতা অর্জন করেছে। কিন্তু কর্মীদের দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়নি। ছোট ছোট শর্টকোর্স করিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে। গত কয়েক বছর এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এটি বাড়ানো উচিত। বাস্তবসম্মত জ্ঞান অর্জন করতে বিদেশে একটু বড় বড় প্রশিক্ষণের আয়োজন করা উচিত।
বাপেক্সের কাজের সীমাবদ্ধতাটা কোথায়?
যেকোনো প্রতিষ্ঠান সুন্দরভাবে পরিচালিত হওয়া নির্ভর করে তার অর্থনৈতিক সক্ষমতার ওপর। প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য বছরের শুরুতে ঘোষিত বরাদ্দটুকু যে কত দিনে আসবে তার কোনো নিশ্চয়তা যেখানে নেই, তা কেমন হবে বোঝা যাচ্ছে। তারপরও অসংখ্যবার সংশোধিত বাজেট হয়ে সেটা বাপেক্সের হাতে আসে অনেক খর্বিত আকারে। কখনো কখনো আসে অর্থবছরের একদম শেষ সময়ে। খুব অল্প সময়ে সেই বরাদ্দটুকু খরচ করে ফেলার একটা তাগিদ থাকে। আর এসবের মাঝে পড়ে সে সময় শুরু হয় বাপেক্সের দক্ষ লোকদের বাইরে চলে যাওয়া।
বর্তমানে বাপেক্সের প্রধান সংকট কী?
বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর তুলনায় অনেক কম খরচে গ্যাস অনুসন্ধান, উত্তোলন ও বিক্রয় করা ছাড়াও বাপেক্স বা পেট্রোবাংলা নিয়মিতভাবে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে অর্থ জোগান দিয়ে যাচ্ছে। ১৯৯৮-৯৯ অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা, ২০০৭-২০০৮ অর্থবছরে ৩ হাজার ১৫০ কোটি টাকা এবং ২০০৮-২০০৯ অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৩৪৯ কোটি টাকা, যার মধ্যে বাপেক্স দিয়েছে ৮২ কোটি টাকা এবং সবচেয়ে বেশি দিয়েছে বিজিএফসিএল ১ হাজার ৪৩১ কোটি টাকা। অথচ এ প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়মিত আপগ্রেড না করার ফলে এগুলোকে কাজ করতে হচ্ছে মান্ধাতার আমলের যন্ত্রপাতি, অপ্রতুল লোকবল এবং স্বল্প পুঁজি নিয়ে।
বাপেক্সকে আরও কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে কী ধরনের কাজ করা যেতে পারে?
দক্ষতা, যোগ্যতা, সক্ষমতা ইত্যাদি শুরু থেকেই কোনো দেশের থাকে না, সুনির্দিষ্ট নীতি ও পরিকল্পনার মাধ্যমেই এগুলো অর্জন করতে হয়। আজকে স্থলভাগে বাপেক্সের যতটুকু দক্ষতা, সেটা যেমন ধীরে ধীরে অর্জিত হয়েছে, তেমনি স্থলভাগে যতটুকু সংকট ও সীমাবদ্ধতা এবং সমুদ্রভাগে যে অক্ষমতা, সেটাও ওপর মহলের পরিকল্পনাহীনতারই ফল। আমি মনে করি, অন্য সব ক্ষেত্রের মতো জ্বালানি ক্ষেত্রেও জাতীয় সক্ষমতার কোনো বিকল্প নেই; প্রয়োজন গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের জন্য সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার।
বাপেক্সকে একটি সুবিধাজনক জায়গায় পৌঁছাতে কী কাজ করতে হবে?
ভবিষ্যতে দেশের অভ্যন্তরে এবং উপকূলে অবস্থিত ব্লকসমূহে অনুসন্ধান ও উৎপাদন কাজ শুধু বাপেক্সের ওপর ন্যস্ত করতে পারলে ভালো। বাপেক্সকে আরও দক্ষ ও শক্তিশালী করার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। স্থলভাগের মতো গভীর সমুদ্রেও দেশীয় কোম্পানিগুলো নিজেরাই তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনকার্য চালাতে পারে, সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করতে হবে। বাপেক্সের কারিগরি জনবলের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য দেশ-বিদেশে উপযুক্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। কারিগরি জনবলকে উপযুক্ত মর্যাদা ও গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। বাজেটে বাপেক্সের জন্য পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ সঠিক সময়ে দেওয়ার কাজ করা। মূল সংস্থা পেট্রোবাংলাকে দক্ষ ও শক্তিশালী করতে হবে। সেই সঙ্গে পেট্রোবাংলা ও বাপেক্সে টেকনিক্যাল জ্ঞানসম্পন্ন দক্ষ মানুষদের দিয়ে পরিচালিত করা প্রয়োজন। গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন নিয়ে সরকারের একটি সুনির্দিষ্ট ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা থাকতে হবে।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৬৩তম সংখ্যা, জুলাই ২০১৫