এ গল্পটি হতে পারত অন্য যে কারও; যদি না তিনি না জন্মাতেন এই ধরাধামে। আর তাঁর জন্মের সঙ্গেই যেন শুরু হলো অন্য এক যুগের। ভিন্ন এক চিন্তাজগতের। জন্মেছিলেন জাপানে; ১৩ সেপ্টেম্বর ১৯৪১ সালে। নাম যাঁর তাদাও আন্দো। বড় হয়ে যিনি হলেন একজন জাপানি স্বশিক্ষিত স্থাপত্য স্থপতি, যাঁর পদ্ধতিকে ‘ক্রিটিক্যাল রিজিয়নালিজম’ নামে শ্রেণিকরণ করা হয়। তিনি এমন সব স্থাপত্যকলা নির্মাণ করেছেন, যেগুলো সারা বিশ্বের স্থপতি ও স্থাপত্য ছাত্রদের কাছে বিশেষভাবে সমাদৃত। একটি শান্ত-স্নিগ্ধ স্থাপনার ভেতর তিনি যেভাবে মানবীয় গুণাবলিকে ফুটিয়ে তুলেছেন, তা শেষ অবধি তুলে ধরতে পেরেছেন অনেক কম স্থপতিই।
আন্দো ১৯৪১ সালে জন্মেছিলেন জাপানের ওসাকাতে। জন্ম তাঁর যমজ ভাইয়ের কয়েক মিনিট আগে। বয়স যখন দুই বছর তখন তাঁর পরিবার তাঁদের আলাদা করার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন থেকেই নানির সঙ্গে থাকতে শুরু করেন আন্দো। স্থাপত্য পেশায় নিযুক্ত হওয়ার আগে কাজ করতেন ট্রাক ড্রাইভার আর বক্সার হিসেবে। স্থাপত্যকলায় ফরমাল কোনো শিক্ষা নেননি তিনি। স্থপতি ফ্র্যাঙ্ক লয়েড রাইট পরিকল্পিত হোটেলের একটি কাজে টোকিওতে যান দ্বিতীয় বর্ষের কলেজছাত্র হিসেবে। সেখানে তিনি ফ্রাঙ্কের কাজ দেখে মুগ্ধ হন। সেই মুগ্ধতা তাঁকে পেয়ে বসল। অবশেষে সেখানেই তাঁর বক্সিং পেশা ইতি টানার সিদ্ধান্ত নেন, ঠিক দুই বছর পর উচ্চবিদ্যালয় থেকে স্থাপত্যে স্নাতক করেন। তিনি নৈশ শ্রেণিতে যোগ দেন আঁকা শিখতেন আর অভ্যন্তরীণ নকশার বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিতে। বিখ্যাত সব স্থাপত্য শিল্পীর করা ইমারত নকশা পরিদর্শন করেন তিনি এই সময়ে। এঁদের মধ্যে Le Corbusier, Ludwig, Mies van der Rohea, Frank Lioyd Wrigh and Louis Kahn অন্যতম। ১৯৬৮ সালে ওসাকা থেকে ফিরে আসার আগে নিজস্ব ডিজাইন স্টুডিও প্রতিষ্ঠা করেন। যার নাম ‘তাদাও আন্দো আর্কিটেক্ট অ্যান্ড অ্যাসোশিয়েশনস’। তারপর যা ঘটেছিল সবই ইতিহাস।
কর্মজীবন
আন্দো বেড়ে ওঠেন জাপানে, যেখানে জীবনের ধর্ম ও জীবনধারণ তাঁর স্থাপত্য নকশার ক্ষেত্রে দারুণভাবে প্রভাবিত করেছে। আন্দোর স্থাপত্যশৈলী ‘হাইকু’র প্রভাব থেকে তৈরি করা, যেখানে ফাঁকা স্থানের ওপর সরলতার সৌন্দর্য উপস্থাপনকেই জোর দেওয়া হয়েছে। তিনি জটিল নকশা গ্রহণ করতেন, যখন সরলতম অবস্থার আবির্ভাব হতো। অনেকটা ইচ্ছে করেই চমক সৃষ্টি করতেন স্পেসে। এ ক্ষেত্রে তিনি সফল ছিলেন পুরোমাত্রায়। একজন স্বশিক্ষিত স্থাপত্যশিল্পী আন্দো যখন গবেষণার জন্য ইউরোপ ভ্রমণে যেতেন, তখন তিনি জাপানি সংস্কৃতি আর ভাষাকে মনে রাখতেন, যা নিজের কাজে প্রতিফলন ঘটানোর চেষ্টা করতেন। একজন স্থাপত্যশিল্পী হিসেবে তিনি বিশ্বাস করতেন যে স্থাপত্যকলা সমাজ পরিবর্তন করতে পারে, যা সমাজের লোকদের মানসিকতা পরিবর্তন ঘটিয়ে শহর ও সমাজের পুনর্গঠন করতে পারে। সমাজের পুনর্গঠন করে একটি স্থানের উন্নয়ন ঘটাতে পারে অথবা ওই স্থানের পরিচয়ের পরিবর্তন আনতে পারে। হতে পারে একটি ল্যান্ডমার্ক। এ বিষয়ে ওয়ার্নার ব্লেসার বলেন,
‘একটি ভালো ভবন যা তাদাও আন্দোর স্মরণীয় পরিচয় এবং তাঁর গঠনের ফলে জনগণের আকর্ষণের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত হয় এবং বাজারে নব্য চেতনার অনুপ্রবেশ ঘটে।’
তাদাও আন্দোর স্থাপত্যকলায় ডিজাইনের সহজ-সরল বিন্যাসের ওপর জোর দেওয়া হয়। সংবেদন এবং শারীরিক ধারণার অভিজ্ঞতা প্রধানত জাপানি সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত। জাপানি ধর্মীয় চেতনা জেনের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে সরলতার ধারণার প্রসার ঘটে এবং এর ভেতরের ঘনীভূত বাহ্যিক চেহারা বদলের বোধ তৈরি করে। জেনের প্রভাব স্পষ্টভাবে আন্দোর কাজ এবং বিশ্বস্থাপত্যের মাঝে পার্থক্য চিহ্ন হয়ে ওঠে। এটি করার জন্য আন্দোর সরলতার ধারণার প্রতিফলন ঘটান তাঁর স্থাপত্যকলাগুলোতে। বেশির ভাগ স্থাপত্য নির্মিত হয় কংক্রিটে। কংক্রিটের দেয়ালগুলো পরিচ্ছন্ন একটা ধারণা প্রদান করে এবং একই সময়ে গুরুত্বহীনতাকেও প্রাধান্য দেয়। বাহ্যিক কারণে নান্দনিক স্থাপনা তৈরি করার জন্য খুব সাধারণ কিছু বিষয় দিয়েই পুরো স্থাপনাটি ফুটিয়ে তুলতে হয়। স্থপতি তাদাও সেটা করেন খুব স্বাচ্ছন্দ্যে।
জাপানের ধর্মীয় স্থাপনার পাশাপাশি আন্দো বেশ কিছু গির্জার নকশাও করেন। এগুলোর মধ্যে The Church of the Light-১৯৮৯ এবং The church in Tarumi-১৯৯৩ উল্লেখযোগ্য। যদিও জাপানি এবং খ্রিষ্টান গির্জার স্থাপন চরিত্রের মধ্যে পার্থক্য ছিল, তথাপি আন্দো এগুলোকে একইভাবে প্রকাশ করতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, ধর্মীয় ও বাড়ির স্থাপনা নকশায় পার্থক্য করা উচিত হবে না। তিনি এটি যেভাবে ব্যাখ্যা করেন, ‘আমাদের একটা স্থাপনা থেকে অন্যটা পার্থক্য করার প্রয়োজন নেই। একটি ঘরের ভেতরে বাস করা শুধু প্রয়োজনই নয় বরং আত্মিক কারণও এর পেছনে দায়ী। ঘর হচ্ছে মনের কেন্দ্রবিন্দু আর মন হচ্ছে স্রষ্টার স্থান। ঘরে বাস হচ্ছে মনের সন্ধান করা, স্রষ্টার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে। গির্জার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হচ্ছে আধ্যাত্মিক অর্থে উন্নত করা। একটি আধ্যাত্মিক জায়গায় মানুষ তাদের মনের মধ্যে শান্তি খোঁজে, তাদের স্বদেশের মতো করে।’
এ ছাড়া স্থপতি আলভার আলতো বলতেন, ‘আন্দো প্রকৃতি এবং স্থাপত্যের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপনের ওপরও জোর দিয়েছেন। তিনি স্থাপত্যের মাধ্যমে মানুষের জন্য প্রকৃতির আত্মিক সৌন্দর্যের সহজ অভিজ্ঞতা নিতে ইচ্ছুক। তাঁর বিশ্বাস, স্থাপত্য দৃশ্যের আচরণ প্রকাশের মাধ্যমে দায়িত্বশীল এবং এটা অনেক কিছু দৃশ্যমান করে তোলে। এটি সমাজে শুধু তাঁর স্থাপত্যের ভূমিকার তত্ত্ব প্রকাশ করে না বরং তিনি কেন দীর্ঘ সময় ব্যয় করেন স্থাপত্যের অধ্যয়নে, শারীরিক অভিজ্ঞতা থেকে সেটিও প্রকাশ করে।’
১৯৯৫ সালে আন্দো স্থাপত্যে Pritzker পুরস্কার জেতেন। এ ক্ষেত্রে তিনি সর্বোচ্চ পার্থক্যকারী হিসেবে বিবেচিত হন।
ডিজাইন অনুষঙ্গ
তাদাও আন্দোর ‘ক্রিটিক্যাল রিজিয়নালিজম’ পরিচিত হয় প্রাকৃতিক আলোর সৃজনশীল ব্যবহার এবং বাহ্যিক কাঠামোর জন্য; যা প্রাকৃতিক গঠন অনুসরণ করে। আন্দোর ভবন প্রায়ই চিহ্নিত করা হয় ত্রিমাত্রিক ব্যাসার্ধের প্রবাহ পথের দ্বারা। এই পথ অভ্যন্তর এবং মধ্যে বোনা এবং ভেতরে বড় মাপের বহিঃস্পেস জ্যামিতিক আকার এবং তাদের মধ্যে শূন্যস্থান।
তাঁর Sumiyoshi বা সারি ঘর (Azuma বাড়ি) একটি ছোট দুই তলা ডিজাইন, যা ১৯৭৬ সালে ঢারাই নামক স্থানে তৈরি করা একটি কংক্রিটের স্থাপনা। মূল স্থাপনাটি একটি মাত্র আয়তাকার ক্ষেত্র, যা তিনটি সমান আয়তক্ষেত্রাকার ভলিউম দ্বারা গঠিত। দুটি ভলিউম অব স্পেস অভ্যন্তরে একটি খোলা চত্বর দিয়ে বিভক্ত। দুটি ফর্মের মধ্যে আঙিনা অবস্থিত, যা বাড়ির অভ্যন্তর ভলিউমের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেছে অন্যান্য স্থপতির কাছে। এই ভবনটি বিখ্যাত এর ডিজাইনের কারণে। যেখানে আন্দোর জ্যামিতিক কাটাছেঁড়া পুরো বাড়িটিকে ঐশ্বর্যমণ্ডিত করে তুলেছে।
জাপানের কোব শহরের বাইরে অবস্থিত Rokko-তে আন্দোর কমপ্লেক্স ডিজাইন ও কনস্ট্রাকশন সংঘটিত হয়েছে ১৯৭৬ সালে। তাদোর কাজের ধরন বোঝার জন্য এই কাজ নিয়ে স্থাপত্য শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করেন। কারণ, এটা আন্দোর প্রথমজীবনে করা একটি কাজ। দুটো রেকটেঙ্গুলার স্পেসের মাঝে একটি কোর্টইয়ার্ড দিয়ে ঘেরা এই স্থাপনায় একটি নতুন ভোকাবুলারি তৈরি করেন, যা পরবর্তী সময়ে অন্য স্থপতিরা গ্রহণ করেন সাদরে।
আন্দো ও জাপানি ঐতিহ্য
স্থান নষ্ট না করা বা সব স্থানের সঠিক ব্যবহার সব সময় জাপানি স্থাপত্যের অংশ এবং অন্তত ১৬শ শতক থেকে এটা চলে আসছে। স্থপতি ফ্র্যাঙ্ক লয়েড রাইট পশ্চিমের স্থাপত্যে আরও অবাধে এর প্রভাব বিস্তার করেন। জাপানি স্থাপত্য থেকে এই চর্চা শেষমেশ ছড়িয়ে পড়ে পুরো বিশ্বময়। ঘরের প্রতিটি অংশের সঠিক ব্যবহার না করা এখন একটি অন্যায় হিসেবে ধরা হয়। মূলত আন্দোই এটা শুরু করেছিলেন।
টোকিওতে ফ্রাঙ্ক লয়েড রাইটের ইম্পেরিয়াল হোটেলটি ডিজাইন করেছিলেন পুরোপুরি আন্দোর প্রাচীন জাপানি স্থাপনা পদ্ধতির মতে। যেটি ১৯২৩ সালে মহা ভূমিকম্পেও টিকে ছিল। আন্দোর হিয়াগো-আওয়াজি ভবনের বিভিন্ন এলিভেশন ট্রিটমেন্ট আগে থেকে জানা ছিল রাইটের। তিনি সেটাকে খাটিয়েছিলেন সেখানে। এই জাপানি স্থাপনা পদ্ধতি এখন পুরো বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত। বাংলাদেশের স্থপতিরা ছাত্রাবস্থা থেকেই এই স্থাপনা পদ্ধতি শিখে আসছেন এবং অনেক স্থপতিই একে নিজের আইডল হিসেবে বেছে নিয়েছেন এবং আন্দো হয়েছেন একজন অদৃশ্য শিক্ষক, যাঁর শত শত ছাত্র এখন তাঁর ধারণাকে ধ্রুব সত্য মেনে স্থাপনা তৈরি করছেন দুনিয়াজুড়ে।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৬২তম সংখ্যা, জুন ২০১৫