দেশীয় উপকরণে পরিবেশবান্ধব স্থাপনা

স্থাপত্যচিন্তার মূল অনুষঙ্গ মাটি ও মানুষ। শিকড় থেকে রস নিয়ে যে স্থাপনা তৈরি হয় তাতে মানুষের পছন্দ, ঐতিহ্য আর পরিচয়ের প্রতিফলন ঘটে। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের অনগ্রসর জনপদ কুড়িগ্রামের রাজারহাটে পানি সামাজিক কেন্দ্র প্রয়োজন ও সৌন্দর্যের এ ধারাকে বিবেচনায় নিয়েই স্থানীয় মানুষের জন্য জন্ম দিয়েছে ছোট এক উঠোনের। নেদারল্যান্ডের রটরড্যামভিত্তিক সামাজিক উন্নয়ন সংস্থা পানি ফাউন্ডেশন বিশুদ্ধ পানির মতো মৌলিক একটি প্রয়োজন নিয়ে কাজ করছে বেশ কিছুদিন ধরে। শুধু পানি নয়, কাজ করছে মানুষের জীবনমান উন্নয়নে। দারিদ্র্যপীড়িত মানুষের আত্মকর্মসংস্থানের জন্য বাঁশের তৈরি বাইসাইকেল প্রকল্প, ওয়ার্কশপ, শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার মানসে তারা চালু করেছে বিদ্যালয়। আছে সামাজিক বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্যোগ। এসব কাজকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য সীমান্তবর্তী এলাকা রাজারহাটে পানি নামে একটি সামাজিক কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করে তারা। কমপ্লেক্সটির ডিজাইনের জন্য দায়িত্ব দেয় ডাচ্্ স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান চিল্ডারস্কল্ট আর্কিটেক্টকে।

তিনটি ছোট ছোট ভবন বিশাল একটি ছাদের নিচে এমনভাবে সাজানো, যাতে মধ্যখানে একটি উপভোগ্য ছায়াঢাকা উঠোনের পরিসর তৈরি হয়। ছাদের পিলার বাঁশের আর ওপরে করুগেটেড টিনের ছাউনি। প্রায় নয় হাজার বর্গফুটের এই কমপ্লেক্সে দ্বিতল দুটি ভবন; স্কুল ভবন হিসেবে ব্যবহৃত এবং একতলাটি মূলত একটি বাঁশের তৈরি বাইসাইকেল ওয়ার্কশপ স্টোর, যার উন্মুক্ত ছাদ ব্যবহৃত হবে অনুষ্ঠান আয়োজনে। ওয়ার্কশপ আর স্টোর রাস্তার দিকে মুখ করা। ক্লাসরুম ও টয়লেটের ব্লক উল্টো দিকে পেছনে বসানো। পেছনের দিকটা দক্ষিণের দিক। যেটিতে আগে থেকেই রয়েছে টলমলে পানিতে পূর্ণ দিঘি। সামনের রাস্তার দিকে দৃশ্যমান কংক্রিট সারফেস, যার মাঝে চিকন লম্বাটে জানালা সারিবদ্ধভাবে সাজনো। এভাবে জানালা সারি থাকার কারণে সরাসরি সূর্যের আলো ঢোকে কম। তিনটি প্লাস্টার করা ইটের তৈরি ভবনটির কিছু অংশ আবার হলুদ রঙা।

স্টিল ও কাঠের সমন্বয়ে তৈরি সিঁড়িটি দুই ব্লকের মাঝ দিয়ে উঠে গেছে দোতলায়। উঠোনের চমৎকার একটি পায়ে হাঁটা সেতু দোতলার ওয়ার্কশপের খোলা ছাদ অর্থাৎ সবার জন্য খোলা আড্ডার জায়গায় যাওয়া যায়। সেতুর নিচে বাচ্চারা দোলনায় ঝুলছে। ভবনটি একই সঙ্গে গ্রামের সব বয়সী মানুষের জন্য কমিউনিটি সেন্টার হিসেবে কাজ করবে।

সম্পূর্ণ নতুন ধারার পরিবেশবান্ধব স্থাপত্যের সঙ্গে মানুষের পরিচয় করিয়ে দেওয়াই এ স্থাপনার উদ্দেশ্য। পূর্ব-পশ্চিমে লম্বালম্বি ১৯০ ফুট বাই ৮০ ফুট দুটো ব্লক একটি বড় বাঁশের শেডের নিচে অবস্থিত। ক্লাসরুম ও গবেষণাগারগুলো দক্ষিণ দিকে। ওয়ার্কশপ ও স্টোর এরিয়া সাজানো হয়েছে উত্তর ব্লকে। কক্ষের উচ্চতা বেশি হওয়ার কারণে তাপমাত্রা কম অনুভূত হয়। এ ছাড়া ক্রস ভেন্টিলেশন, চতুর্দিকের গাছপালার ছায়া এবং সামনের পুকুর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। এই ব্যতিক্রমধর্মী ডিজাইন করে স্থপতিদ্বয় প্রমাণ করেছেন যে স্থানীয় উপকরণ দিয়ে দৃষ্টিনন্দন ও পরিবেশবান্ধব ডিজাইন করা সম্ভব।

স্থানীয়ভাবে বাঁশকে খুব সস্তা ও তুচ্ছ নির্মাণ উপকরণ হিসেবে দেখা হয় কিন্তু স্থপতিরা এই বাঁশকে নির্বাচন করেছেন এই কমপ্লেক্সের ছাদের প্রধান উপকরণ হিসেবে। এমনকি দেয়ালের অনেকাংশে এবং ওয়ার্কশপের ফ্রেঞ্চ ডোরকে বাঁশ দিয়ে ঢেকে দিয়েছেন।

ভবনের অবস্থানগত দিক প্রাকৃতিক বাতাসের সুষম চলাচলকে প্রাধান্য দিচ্ছে। অনেক সময় পাখা ঘোরানোর প্রয়োজনও পড়বে না। দুই দিকেই ছাদ একটু বাড়তি থাকায় একদিকে যেমন ছায়া দেবে, তেমনি বৃষ্টির ঝাপটার প্রভাব কমিয়ে দেবে অনেকটাই। পুরো ধারণাটাই হচ্ছে স্থানীয় উপকরণ ও নির্মাণকৌশলের সমন্বয়ে। সাধারণভাবে আমরা যা জানি, তাকে ব্যবহার করেই আধুনিক ও উন্নত প্রযুক্তির সুবিধা নেওয়া হয়েছে এখানে।

বাংলাদশের উত্তরাঞ্চলে বাড়িঘরগুলো মোটামুটি টিনশেড ধরনের। অর্থাৎ চারদিকে ইটের দেয়াল এবং ওপরে করুগেটেড টিনের ছাউনি। এই পরিচয় মাথায় রেখেই এখানে ইটের দেয়াল করা হয়েছে। তবে, পরিমাণে যতটা সম্ভব কমানো এবং একটু ভিন্ন ধরনের কাজ দিয়ে, যাতে কিনা একটানা দেয়াল না দিলেও চলে। এতে একদিকে স্থানীয় কর্মীদের কাজে লাগানো গেল আবার খরচ কমানোর সুযোগ পাওয়া গেল। ইউ আকৃতির টুকরো টুকরো দেয়াল বেশ শক্ত কলামের মতো কাজ করবে। দক্ষিণের দিকে তাকালে বাইরে থেকে মনে হবে ডিজাইনকৃত অনেকগুলো চিকন কিন্তু লম্বাটে জানালা। বাস্তবিক পুরো দেয়ালটাকে একটু দূর থেকে দেখলে মনে হবে যেন একটি কংক্রিটের দেয়াল। এখানে কনস্ট্রাকশন খরচ, সময় এবং শ্রম সবকিছুই সাশ্রয়ী।

ভবনের স্প্যানগুলো এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে যেন ক্লাসরুমের মধ্যে সরাসরি সূর্যের আলো না আসে কিন্তু ভেতরে আলোর বিচ্ছুরণ এমন হবে যে তাতে স্বাভাবিক কাজকর্ম অনায়াসে চলতে পারে। সামনের পুকুর দক্ষিণের প্রবহমান বাতাসকে ঠান্ডা রাখবে সেই বিষয়টা বিবেচনায় ছিল। নির্মাণকৌশলের খুঁটিনাটি দিকগুলো খুব সহজেই স্থানীয় কর্মীদের বোঝানো সম্ভব ছিল। যারা মূলত নির্মাণকাজের আধুনিকায়নের মূল কারিগর। বাঁশের বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যবহারের মাধ্যমে শাটারিংয়ে মূল্যবান কাঠের ব্যবহার কমানো হয়েছে। পরবর্তী সময়ে কমানো হয়েছে খরচও।

কিছু মানবীয় কৌশল প্রয়োগ করা হয়েছে এখানে। ইটের দেয়ালের পুরো অংশ প্লাস্টার করা হয়েছে কিন্তু পেইন্ট করা হয়েছে সামান্য। ভেতরের দেয়াল হালকা নীল ধরনের রং করা হয়েছে, যা পোকামাকড়কে কম আকৃষ্ট করবে। ক্লাসরুমের জানালার অন্তস্থ সেকশনের চারদিকে দেওয়া হয়েছে হলুদ রং। পুরো প্রজেক্টে হলুদ রংকে একটু বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত রাই-সরিষার রঙে মেতে ওঠা বাংলাদেশকে সারা বছর প্রাণবন্ত রাখার একটি প্রচ্ছন্ন চেষ্টা। ধূসর এবং কালচে রং বৃষ্টির আগে এবং পরের মাটির বিচিত্র রঙের বহিঃপ্রকাশ।  

এক নজরে

পানি সামাজিক উন্নয়ন কেন্দ্র

উদ্যোক্তা: পানি ফাউন্ডেশন, নেদ্যারল্যান্ড।

লোকেশন: রাজারহাট, কুড়িগ্রাম

এরিয়া: ৯১০ বর্গমিটার

সময়: ২০১৪

Architects: Gerrit Schilder, Hill Scholte

(Schilder Scholter Architects)

স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার: PT-structural, Rotterdam, the Netherlands.

নির্মাতা: এমইআই, রাজারহাট

নির্মান খরচ: ৪৪ হাজার পাউন্ড (৫২ লাখ ৮০ হাজার টাকা)।

স্থপতির কথকতা

ডাচ্্ স্থপতি Gerrit Schilder JNR আর্কিটেকচারের পাশাপাশি ইন্টেরিয়র আর্কিটেক্ট ও ফার্নিচার ডিজাইনে সমান উৎসাহী। ১৯৯৩ সালে কনস্টানটিন হুজেন্স একাডেমি (Constantijn Huygens Academy) থেকে গ্র্যাজুয়েশন করার পরে বিভিন্ন স্থাপত্য প্রতিষ্ঠানে স্থপতি হিসেবে কাজ করেন। একই প্রতিষ্ঠানে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবেও সময় দেন কিছুদিন। ২০০৩ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত তিনি ডাচ্্ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টেরিয়র আর্কিটেক্টসের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। আর্কিটেকচার ডিপার্টমেন্টের ইন্টেরিয়র ফ্যাকাল্টির ডিপার্টমেন্ট প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি ইউনিভার্সিটি অব অ্যাপ্লাইড সায়েন্সের আন্ডারে উইলিয়াম ডি কুর্নি একাডেমির ইন্টেরিয়র এবং ২০০৮ থেকে ২০১১ সেশনে ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অব ইন্টেরিয়র আর্কিটেক্টের জেনারেল সেক্রেটারি হিসেবে কাজ করেন। পেশাজীবনে স্থাপত্য চর্চার পাশাপাশি আর্কিটেকচার, ইন্টেরিয়র ডিজাইন, ডিজাইন মেথেডোলজির ওপরে বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বক্তব্য দেন। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিভিন্ন সেমিনার ও সিম্পোজিয়ামে।

নিজস্ব পরিসরে জুম আর্কিটেক্টস নামে কাজ শুরু করলেও একসময় আরেকজন খ্যাতিমান স্থপতি  HILL SCHOLTE-কে সঙ্গে নিয়ে Schilder Scholte Architects নামে যাত্রা শুরু করেন। নেদারল্যান্ডভিত্তিক সামাজিক উন্নয়ন সংস্থা পানি ফাউন্ডেশন যখন বাংলাদেশের রাজারহাটে গ্রামীণ অবয়বে একটি কমিউনিটি প্রতিষ্ঠান ডিজাইনের জন্য তাঁদের নিয়োগ দেয়, তখন কনটেস্ট বিবেচনায় তাঁরা এটিকে একটি সুমধুর চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেন।

প্রজেক্টটির মূল উদ্দেশ্য ছিল টেকসই ও সহজে সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া যাবে এমন কিছু দক্ষতার সঙ্গে প্রসার ঘটানো। যেমন পরিত্যক্ত টিন, কাঠ, সহজলভ্য বাঁশ ব্যবহার করে বেশির ভাগ কাজ করা হয়েছে। স্থপতিদের নিজেদের বক্তব্য ছিল, ডিজাইন করার ক্ষেত্রে স্থানীয়ভাবে প্রাপ্ত নির্মাণ উপকরণ এবং আবহ্ওায়ার অবস্থা বিশেষ বিবেচনায় আনা। ডিজাইনের শুরুতেই চিন্তা করা হয় সাইটের ১৫ কিলোমিটারের মধ্যে কী ধরনের ম্যাটেরিয়াল এবং দক্ষ কর্মী পাওয়ার সম্ভাবনা। বাঁশ, হাতে তৈরি মাটির ইট, আম কাঠ, পরিত্যক্ত লোহা, স্থানীয় কাদামাটি, পরিত্যক্ত টিনের শিট হবে স্থাপনাটির প্রধান উপকরণ। বিদ্যুৎ ও অন্য যেকোনো জ্বালানির ব্যবহার হবে শূন্যের কোঠায়। উদ্দেশ্য ছিল টেকসই এবং দীর্ঘস্থায়িত্বের ধারণার ওপরে জনগণের সচেতনতা বাড়ানো। প্রজেক্টে রাখা হয়েছে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থাও।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৬২তম সংখ্যা, জুন ২০১৫

(অথর যুক্ত করুন)

+ posts