ভবনের সুরক্ষায় অগ্নিনিরোধক প্লাস্টার বোর্ড

প্লাস্টার বোর্ডের প্রধান উপাদান জিপসাম। জিপসাম প্রাকৃতিক খনিজ পদার্থ। এটা ক্যালসিয়াম সালফেট ও পানির মিশ্রণে তৈরি। রাসায়নিক নাম হাইড্রাস ক্যালসিয়াম, সালফেট (Caso4)। জিপসাম কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বিভিন্ন শিল্পকারখানায়, নানা ধরনের দ্রব্য তৈরিতে ও কৃষিকাজে। এর মধ্যে ৮০ শতাংশ জিপসাম উত্তোলন করে ব্যবহার করা হয় বিভিন্ন ধরনের উৎপাদিত দ্রব্যাদি তৈরিতে। যেমন ড্রাইওয়াল বা প্লাস্টার বোর্ড তৈরিতে। যা ঘরে ব্যবহার করায় এর সৌন্দর্য বাড়ে বিশেষভাবে। ক্যালসিয়াম জিপসাম ভিজিয়ে পেস্টের আকারে তৈরি করে সরাসরি ভবনের দেয়ালে, মেঝেতে ও সিলিংয়ে লাগানো যায়। তাতে যেমনি ঘরের সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায়, তেমনি এটির অগ্নিরোধক গুণাবলির থাকায় অগ্নিনিরোধক হিসেবে কাজ করে। দেশভেদে এটি ড্রাইওয়াল, ওয়ালবোর্ড, জিপসাম বোর্ড, প্লাস্টার বোর্ড নামে পরিচিত।

প্লাস্টার বোর্ড যেভাবে তৈরি হয়

প্লাস্টার বোর্ড হচ্ছে জিপসাম প্লাস্টারের সমন্বিত স্যান্ডউইচ, যার বহিরাদেশে কাগজের প্রলেপ থাকে। আকরিক জিপসাম Caso4, 2H2O প্রথমে উত্তপ্ত করে পানি বের করা হয়। তারপর সামান্য পরিমাণ পুনঃতাপ দিয়ে হেমিহাইড্রেট ক্যালসিয়াম সালফেট (Caso4, ½H2O) প্রস্তুত করা হয়। মিশ্রণ প্লাস্টারকে একটি বিশেষ ধরনের কাগজ অথবা ফাইবার গ্লাস, প্লাস্টি সাইজার এবং ফোমিং এজেন্টের সঙ্গে মিশ্রিত করা হয়। সবশেষে জিপসাম ক্রিস্টাল মিশ্রিত করা হয়। বিভিন্ন ধরনের সংযোজক দ্রব্য ব্যবহৃত হয়, যাতে প্লাস্টার তৈরিতে বোর্ডটি কম সময়ের জন্য ভেজা থাকে এবং অগ্নিনিরোধক উপাদান হিসেবে কাজ করতে পারে। মোম-জাতীয় তরল ইমালশন মিশ্রিত করা হয় পানি গ্রহণের প্রবণতা কমানোর জন্য। বোর্ডটি তৈরি করা হয় স্যান্ডউইচ আদলে, যাতে অনমনীয় এবং যথেষ্ট শক্ত হয়। প্লাস্টার বোর্ড শুকাতে প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহার করা হয়। একটি এক হাজার বর্গফুট বোর্ডের জন্য ১ দশমিক ৭৫ এবং ২ দশমিক ৪৯ মিলিয়ান BTU প্রয়োজন। যেহেতু রাসায়নিক অব্যবহারযোগ্য প্লাস্টি সাইজার ব্যবহার করা হয়। সে জন্য প্রচুর পরিমাণ পাতলা অর্ধতরল মিশ্রণ প্রবাহিত হয় বোর্ড নির্মাণকালে। তাই পানির মাত্রা কমানোর জন্য তাপ প্রয়োগ করা হয়, যাতে শুষ্ককরণ ত্বরান্বিত হয়ে সময় কম লাগে।

অগ্নিনিরোধক হিসেবে প্লাস্টার বোর্ড

আগুন প্রতিরোধ হিসেবে যদি কোনো উপকরণের কথা ভাবা হয়, তবে প্লাস্টার বোর্ডকেই আগুন প্রতিরোধের অন্যতম উপকরণ হিসেবে ধরা যায়। প্রাকৃতিক জিপসামে পানির সম্পৃক্ততা থাকে অনেক বেশি। তাই যখন আগুনের সংস্পর্শে আসে তখন পানি বাষ্পে পরিণত হয়, যার তাপমাত্রা থাকে ৮০ থেকে ১৭০০ সেন্টিগ্রেড  যতক্ষণ না জিপসাম থেকে পানি বাষ্পে পরিণত না হয়। অধিক পরিমাণে, প্লাস্টার বোর্ড ব্যবহার করা হয় যাতে আগুন প্রতিরোধ হিসেবে পরবর্তী চার ঘণ্টা পর্যন্ত দেয়ালের জন্য এবং তিন ঘণ্টা পর্যন্ত সিলিংয়ের জন্য কার্যকর হয়। প্লাস্টার বোর্ডে জিপসামের সঙ্গে গ্লাস ফাইবার মিশ্রিত করা হয় আগুন প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে। কারণ, একবার অগ্নিকাণ্ড ঘটে গেলে জিপসামে নিয়োজিত পানির পরিমাণ কমে গিয়ে জিপসাম পাউডার আকার ধারণ করে। প্লাস্টার বোর্ডে একটি বিশেষ ধরনের উপাদান ব্যবহৃত হয়, যা অবকাঠামোর দেয়াল ও সিলিং নির্মাণের সময় ব্যবহার করা হয়, যাতে অগ্নিনিরোধকের মাত্রা দীর্ঘ সময়ের জন্য বজায় থাকে।

প্লাস্টার বোর্ডের শব্দ নিয়ন্ত্রণ

প্লাস্টার বোর্ড শব্দ নিয়ন্ত্রণে ব্যবহার করা যায়। এটা নির্ভর করে কোন পদ্ধতিতে স্থাপন করা হচ্ছে এবং কোন ধরনের প্লাস্টার বোর্ড ব্যবহৃত হচ্ছে। যত বেশি পুরুত্বের প্লাস্টার বোর্ড ব্যবহার করা হবে, তত বেশি শব্দ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। তবে প্রকৌশলীদের মত, অধিক পরিমাণ প্লাস্টার বোর্ড ব্যবহার করা হলে শব্দ নিয়ন্ত্রণটা ভালো হয়। অনেক সময় বিভিন্ন পুরুত্বের প্লাস্টার বোর্ড ব্যবহৃত হয়। যদি ভালোভাবে আঠা লাগানো যায়, একটির প্লাস্টারের সাথে অপরটি তাহলে প্লাস্টার বোর্ড ভালোভাবে আটকে থাকবে এবং সে ক্ষেত্রে শব্দ নিয়ন্ত্রণটা খুব ভালো হবে।

পানির সংস্পর্শে প্লাস্টার বোর্ড

অনাবৃত প্লাস্টার বোর্ড দীর্ঘ সময় পর্যন্ত পানিতে ভেজা অবস্থায় থাকলে বোর্ডটি নষ্ট হয়ে যায়। ঘরের অভ্যন্তরে যখন প্লাস্টার বোর্ড ফিটিং করা হয় এবং সেখানে যদি অসর্তকতাজনিত পানি থাকে এবং কোনো কারণে প্লাস্টার বোর্ডের সংস্পর্শে আসে তবে প্লাস্টার বোর্ড নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অনেক সময় ঘরের দেয়ালে সংস্থাপন করার সময় কোনো কারণে মেঝের পানি প্লাস্টার বোর্ডে দীর্ঘ সময় স্পর্শ করে থাকে, তাহলে সেটা তখন দুর্বল প্লাস্টার বোর্ড হিসেবে চিহ্নিত হয়। এমন পরিস্থিতি যদি দীর্ঘ সময় থাকে তাহলে প্লাস্টার বোর্ডটি অচিরেই নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে। দীর্ঘদিন ছাদ থেকে ফোঁটা ফোঁটা পানি চুইয়ে পড়ে প্লাস্টার বোর্ডকে প্রথমে ওজনে ভারী করবে। তারপর অতিরিক্ত ভারে বোর্ডটি বেঁকে যেতে পারে এবং পরিশেষে ঘরের সিলিং ভেঙে নিচে পড়ে যাবার আংশকা থাকে।

knauf

প্লাস্টার বোর্ডের পার্টিশন

ঘরের মধ্যে যদি পার্টিশন দেয়াল প্লাস্টার বোর্ড দিয়ে করার কথা ভাবা যায়, তাহলে এটা খুবই সহজ-সরল একটা পদ্ধতি। তবে এ কাজটি করার জন্য কিছু টুলস, যেমন ড্রিল মেশিন, স্ক্রু, অ্যাডেসিভ গ্লু, প্লাস্টার বোর্ড দরকার হয়। ধাপভিত্তিক ধারা-

  • প্রথমেই নির্ধারণ করতে হবে কোন ধরনের প্লাস্টার বোর্ড দরকার। সাধারণত সাদা প্লাস্টার বোর্ডের জলীয়বাষ্প ও পানি শোষণ করার ক্ষমতা বেশি এবং যদি অতিরিক্ত ভেজা থাকে তাহলে সেটি নষ্ট হয়ে যায়। প্লাস্টার বোর্ড বাঁকানো উচিত নয়। কারণ, সেটি নির্দিষ্ট স্থানে সংযোজন করতে অসুবিধার সৃষ্টি করে। সাদা প্লাস্টার বোর্ডের মূল্য অপেক্ষাকৃত কম। নীল অথবা সবুজ রঙের প্লাস্টার বোর্ডও পানি নিরোধক কিন্তু এর মূল্য সাদা বোর্ড থেকে দুই থেকে তিন গুণ বেশি।
  • প্রথমেই মেঝেতে একটা সোজা লাইন এঁকে নিতে হবে অথবা যে স্থানে প্লাস্টার বোর্ডটি স্থাপন করা হবে, সেখানেও এ কাজটা করা যেতে পারে।
  • কাঠ দিয়ে ফ্রেম তৈরি করতে হবে। তারপর স্ক্রু-ডাইভারের সাহায্যে তা সংযোজন করতে হবে। তবে স্থায়ীভাবে আটকানোর জন্য অ্যাডেসিভও লাগানো যেতে পারে। কারণ, যদি পরবর্তী সময়ে এটি সরিয়ে ফেলতে ইচ্ছে হয়।
  • মাপ অনুযায়ী প্লাস্টার বোর্ড কাটতে হবে।
  • এরপর কাঠের ফ্রেমে প্লাস্টার বোর্ডটি স্ক্রু দিয়ে দৃঢ়ভাবে আটকাতে হবে।
  • দেয়ালের সঙ্গে ইনসুলেশন যোগ করা যেতে পারে ইচ্ছে করলে। ফ্রেমের অভ্যন্তরে সঠিকভাবে মাপ অনুযায়ী চিহ্নিত স্থানে কাটতে হবে। তবে নিশ্চিত হতে হবে, যাতে ইনসুলেশনটি সঠিক ধরনের ইনসুলেটর হয়। এটা নির্ভর করবে কোন ধরনের ইনসুলেশন ব্যবহার করা হবে। অর্থাৎ এটা কি তাপমাত্রার জন্য নাকি শব্দের জন্য, নাকি দুটোরই জন্য।
  • দেয়ালে আটকানোর পর কোনো কাগজ দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে।

পরিত্যক্ত প্লাস্টার বোর্ডের পুনর্ব্যবহার

অতিসম্প্রতি পুনর্ব্যবহার করে প্লাস্টার বোর্ড তৈরির গবেষণা চলছে। অনাবশ্যক বিধায় ফেলে দেওয়া হয়েছে এমন প্লাস্টার বোর্ড ব্যবহার করে অনেক অবকাঠামোর মাটির ভিত্তি শক্তিশালী করা হয়েছে। যেমন- সোডিক ক্লে (Sodic Clay) ও শিল্ট (Silt)-এর মিশ্রণ একত্রিত করে মাটির ভিত্তি তৈরি করা হচ্ছে। খনিজ জিপসাম বর্তমানে অনেক স্থানে ব্যবহৃত হচ্ছে। বর্তমানে জিপসাম মাটির উন্নতি সাধন করে সিমেন্ট উৎপাদনসহ অন্য নিত্যনতুন দ্রব্যাদি তৈরি করছে। যেহেতু প্লাস্টার বোর্ড তৈরিতে প্রায় ৯০ শতাংশ জিপসাম লাগে যদি জিপসামকে প্লাস্টার বোর্ড থেকে রিসাইকেলের মাধ্যমে ফিরিয়ে আনা যায় তাহলে প্রায় শতভাগ জিপসামই পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে। বর্তমানে উত্তর আমেরিকায় অনেক স্থানেই অব্যবহৃত জিপসামের প্লাস্টার বোর্ড পুনরায় তৈরি করা হচ্ছে। এতে একদিকে সিমেন্ট উৎপাদনে উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, তেমনি গাছের উৎপাদন বৃদ্ধিতে সার তৈরিতে ব্যবহৃত হচ্ছে।

প্রকাশকাল: বন্ধন ৫৭তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০১৫

প্রকৌশলী মহিউদ্দীন আহমেদ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top