স্থাপত্য সৌন্দর্যে মাটি

বাংলার ঐতিহ্যে অনবদ্য সৃষ্টি মাটির স্থাপনা। এ দেশের আবহাওয়া ও জলবায়ুর বিচারে স্থাপনা নির্মাণের অন্যতম প্রাকৃতিক অনুষঙ্গ মাটি। আগে বঙ্গ জনপদের মানুষেরা বসবাস করত মাটির বাড়িতে। সভ্যতার বিকাশে ইট, সিমেন্ট, রড, কাচসহ বিভিন্ন ধরনের নির্মাণপণ্যের উদ্ভব হওয়াই মাটির স্থাপনা হারিয়েছে তার জৌলুশ। এখন শুধু গ্রামেই টিকে রয়েছে মাটির বাড়ি। তাও আবার দরিদ্রদের বসতি হয়ে। অনেকের কাছেই মাটির বাড়ি মানে গরিবের ঘর। সমাজের উচ্চশ্রেণির কাছে বাড়িগুলো পায়নি তেমন জনপ্রিয়তা। অথচ বাংলার কৃষকের এক চিলতে দোচালা কুঁড়ে আজ উন্নত বিশ্বে সামার কটেজ নামে খ্যাত বাংলোর মডেল। পর্তুগিজ, ডাচ, ব্রিটিশসহ পশ্চিমা বিশ্বে এই মডেলটিকে ছড়িয়েছে বাংলা থেকে বিশ্বময়। যার নামকরণ হয়েছে বাংলো। এভাবেই বাঙালির কুঁড়েঘরের নকশা বিশ্বজয় করলেও হারিয়েছে তার নির্মাণ উপাদান। মাটি, বাঁশ, খড়ের বদলে সেখানে স্থান পেয়েছে ইট, কংক্রিট আর রড। তাদের দেখানো পথে হেঁটেছি আমরাও। দেশীয় স্থাপত্য নির্মাণকৌশলে মাটি ব্যবহার ক্রমেই হয়েছে লুপ্ত।  

স্থাপত্য ডিজাইন ও নির্মাণকৌশল সদা পরিবর্তনশীল। বাংলার স্থাপত্যরীতিতেও এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। এখানে যেমন নব্য প্রস্তর যুগের কুঁড়েঘর ও মাটির তৈরি নানা স্থাপনার নিদর্শন মিলেছে, তেমনি পর্তুগিজ, ডাচ, ইংরেজ, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন স্থাপত্য সংস্কৃতিরও দেখা মেলে। গুপ্ত, পাল, সেন ও সুলতানি আমল পর্যন্ত মাটির কাজের স্বাধীন শিল্পচর্চার ধারাবাহিকতা অব্যাহত ছিল। বাংলার স্থাপত্যিক রীতিতেই তৈরি হয় মাটির দুর্গ, দেউল, মন্দির, উপাসনালয়। খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীতে গুপ্তযুগের মহাস্থানগড়, সপ্তম ও অষ্টম খ্রিষ্টাব্দে পালযুগের পাহাড়পুর-ময়নামতির স্তূপ এবং বৌদ্ধবিহারে মাটি ও পোড়ামাটি শিল্পকর্মের অনুপম নিদর্শনের দেখা মেলে। সুলতানি আমলে অর্থাৎ ১৩৪২ থেকে ১৫৭৫ খ্রিষ্টাব্দ মোট ২৩৩ বছর পর্যন্ত বাঙালি শিল্প, স্থাপত্য, সাহিত্য ও ব্যবসা-বাণিজ্য অভূতপূর্ব উন্নতি লাভ করেছিল। মোগল-পূর্ব ও মোগল আমলের স্থাপত্যধারা মিলেমিশে একে মিশ্র ইন্দো-মোগল রীতির সৃষ্টি হয়। পরবর্তী সময়ে মোগল আমলে এই চর্চায় ছেদ পড়ে। তারা পোড়ামাটির বদলে বালু-সুরকির আস্তরণের চল শুরু করে। পরবর্তী সময়ে ভবনের বাইরে এবং ভেতরে আস্তরণের ওপর বিভিন্ন ধরনের নকশাসহ রং ব্যবহারের প্রচলন হয়। সস্তা চুন-সুরকির ‘স্টাকো’ ও মৃৎ ভাস্কর্যের মিলিত ব্যবহার শুরু করে ইংরেজরা। এভাবেই বঙ্গ স্থাপত্যকলা থেকে পোড়ামাটির শিল্পের নান্দনিকতা বিচ্ছিন্ন হতে থাকে।

ইউরোপিয়ান শিল্পীদের আগমন, বাঙালি নব্য ধনী ও পর্তুগিজ, আর্মেনিয়ান ব্যবসায়ীরা গৃহসজ্জার জন্য মৃৎশিল্পীদের নিয়োগ করতে থাকে। এ ছাড়া অর্থনৈতিক কারণ ও পোড়ামাটির ফলকসমৃদ্ধ মন্দির নির্মাণেও এটি বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। পোড়ামাটির মন্দির নির্মাণের বিপুল ব্যয়ভার বহন করার ক্ষমতা আগের ভূ-স্বামীদের মতো ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত জমিদারদের ছিল না। এসব কারণে উনিশ শতকের শেষ দিকে অনন্য এ শিল্প মাধ্যমটি হারায় তার ঐতিহ্য। স্থাপত্য নির্মাণে চুন-সুরকির পলেস্তারার (Stacco work) সূত্রপাত ঘটার সঙ্গে সঙ্গে পোড়ামাটির ইটে নির্মিত স্থাপত্য ও গাত্রালংকার হিসেবে পোড়ামাটির ফলকের ব্যবহার তার উপযোগিতা হারায়। সেই সঙ্গে বাংলার সুপ্রাচীন স্থাপত্য ও ভাস্কর্যরীতিতে মাটির ব্যবহারের পরিসমাপ্তি ঘটে। পোড়ামাটি শিল্পের বিলুপ্তির সঙ্গে সঙ্গে মৃৎ ভাস্কররাও অন্য পেশা বেছে নিতে বাধ্য হন।

প্রাচীন বাংলার স্থাপত্যশিল্পে টেরাকোটা ঐতিহ্যবাহী শিল্প। পোড়ামাটির ভাস্কর্য, ফলক নির্মাণ বাংলা তথা ভারতবর্ষে বহু প্রাচীনকাল থেকেই চর্চিত হয়ে আসছে। বাংলার মানুষের সামাজিক জীবন ও লোক সংস্কৃতির নানা চিত্র নান্দনিক উপস্থাপনার মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে টেরাকোটায়। এসব সৃষ্টির পেছনে রয়েছে সুদক্ষ মৃৎশিল্পীদের নিপুণ হাতের ছোঁয়া। বিশেষ ধরনের মাটি, উচ্চতর কৌশল ও দক্ষতা দিয়ে এই মৃন্ময় সৌন্দর্যকে অক্ষুণ্ন রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। কাদামাটি থেকে সরাসরি হাতে বা ছাঁচে তৈরি হতো এসব ফলক। চতুর্দশ থেকে ষোড়শ শতাব্দী পর্যন্ত বাংলার বহু মসজিদ, মন্দির, উপাসনালয়, দেউল ও প্রাসাদে টেরাকোটার শিল্পকর্ম দেখা যায়। মন্দিরের মধ্যে দিনাজপুরের কান্তজিউ মন্দিরের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পুরো মন্দিরটাই অসংখ্য টেরাকোটায় অলংকৃত। এ ছাড়া মহাস্থানগড়ে বাসু বিহার, গোবিন্দ ভিটা, পলাশবাড়িসহ আউলিয়া মসজিদ, গৌড়ের ছোট সোনা মসজিদ, বিবিচিনি শাহি মসজিদ, বাবা আদম মসজিদ, বাঘা মসজিদ, পাবনার জোড় বাংলা মন্দির প্রভৃতি স্থাপনায় টেরাকোটার অলংকরণ দেখা যায়। এসব টেরাকোটা ও ফলকে বিভিন্ন চিত্র সূক্ষ্মভাবে খোদাই করা। চিত্রকর্মে ধর্মীয়, আনন্দ-উৎসব, প্রেম ও কাল্পনিকতার সংমিশ্রণও ঘটেছে। যেমন- পুরাণকে কেন্দ্র করে নির্মিত হয়েছে রামায়ণ-মহাভারতের কাহিনির নানা মূর্তি। প্রকৃতি, প্রেম ও লোকসংস্কৃতির চিত্রকর্ম হিসেবে প্রাধান্য পেয়েছে বিভিন্ন ভঙ্গির নারী মূর্তি, হাতি, ঘোড়া, ময়ূর, গরু, হরিণ, বাঘ, সিংহ ইত্যাদি পশুপাখির মূর্তি। মহাস্থানগড়, পাহাড়পুর, শালবন বিহারসহ দেশের কয়েকটি প্রাচীন স্থানে বাংলার মৃৎশিল্পীরা বৌদ্ধ প্রাকৃত জনগোষ্ঠীর জীবন ইতিহাসের ওপর এক অভিনব আলোকপাত করেছেন। আর নব্য যুগের দিকে দৃষ্টি দিলে এ শিল্পরীতিতে ইউরোপীয় প্রভাব দেখা যায়। এখানে স্থান করে নিয়েছে সামরিক পোশাক-পরিচ্ছদ, সাহেবিয়ানা এবং দৈনন্দিন জীবনযাপনের চিত্র নির্মাণ ও গঠনশৈলী।

প্রকৃতির অফুরন্ত উপাদান মাটি। মানুষের প্রথম উদ্ভাবন ও সৃজন-প্রক্রিয়ার অন্যতম বিকাশ মৃৎশিল্পে। এই তত্ত্বের প্রমাণ মেলে বিশ্বের প্রধান সভ্যতাসমূহের প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখননের সময় পাওয়া মৃৎশিল্পের নিদর্শনসমূহে। মাটির অন্যতম প্রধান উপাদান জলীয় পদার্থ তাপ দিয়ে অনার্র্দ্রকরণ ও নমনীয়তা দূর করে রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটিয়েই বিকশিত হয় মৃৎশিল্প। নদীমাতৃক বাংলাদেশ পলিমাটির দেশ। মাটি বাংলাদেশের প্রাণ। এ দেশের পাল সম্প্রদায় ও লোকশিল্পীদের মাটি চেনার ক্ষমতা অসাধারণ। বিজ্ঞানসম্মত জ্ঞান না থাকলেও তাদের জ্ঞান দৃষ্টি সবার প্রশংসাযোগ্য। মাটি ক্যালসিয়াম ক্লোরাইড, ফেরিক ক্লোরাইড প্রভৃতি যৌগের উপস্থিতিতে লোনা ধরে। যে মাটিতে উক্ত যৌগ থাকে না, সেখানে লোনা ধরতে পারে না। শিল্পীরা অভিজ্ঞতা দিয়ে মাটি নির্বাচন করে তা দিয়ে শিল্প তৈরি করার পরে সেগুলোকে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় পুড়িয়ে তৈরি করেছেন নান্দনিক ফলক। সাধারণত কোনো ভবন, বিশেষ করে উপাসনালয়ের ভিত্তি, বহির্দেয়াল, জানালার ওপরে, ছাদ বা কার্নিশের নিচের অংশে এই শিল্পকর্ম সার বেঁধে বিভিন্ন আঙ্গিকে স্থাপন করা হতো। একটি ব্যবহারিক অপরটি নান্দনিক। দেয়ালের বহির্ভাগে পোড়া ইটের ব্যবহারে বৃষ্টির পানি কখনো ভেতরে প্রবেশ করতে পারত না এবং যত দূর সম্ভব দেয়াল জলমগ্নতা থেকে রক্ষা পেত। এসব মৃৎভার্স্কয এখন পর্যন্ত কোনো লোনা ধরেনি। যে জন্য এখন পর্যন্ত পোড়ামাটির ভাস্কর্যসমৃদ্ধ স্থাপত্যসমূহ এ দেশের জল-হাওয়ায় নিজেদের রক্ষা করতে পেরেছে।

নগরে আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন, শিল্পকারখানা, উপাসনালয়, হাসপাতাল, শিক্ষা ও বিনোদনকেন্দ্রসহ অসংখ্য স্থাপনা নির্মিত হলেও সেখানে মাটির ব্যবহার নেই বললেই চলে। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক পরিবর্তনে কমছে মাটির বাড়ি। নগরে অধিক মানুষের ঠাঁয় নিশ্চিত করতে গড়ে উঠছে বহুতল ভবন। বিশেষ করে রাজধানী পরিণত হয়েছে কংক্রিটের জঙ্গলে। নেই কোনো জঙ্গল ও জলাভূমি। গ্রীষ্মে কংক্রিট ও কাচঘেরা স্থাপনাগুলো হয়ে ওঠে প্রচণ্ড উত্তপ্ত। এসি ও বৈদ্যুতিক পাখা ছাড়া যেন চিন্তাও করা যায় না। সর্বদাই মানুষের গরমে হাঁসফাঁস। নগরের এ পরিবর্তনে পরিবেশ ও নাগরিক জীবন যখন বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে তখন রবীন্দ্রনাথের সুরে আমরাও বলি, ‘দাও ফিরিয়ে সে অরণ্য, লও এ নগর’।

শহরের পর নগরায়ণের এ থাবা পড়েছে গ্রামেও। মানুষ একটু বিত্তবান হলেই প্রথমে টিনের বাড়ি পরে ইটের দালান গড়ে তুলছে। তবে মাটির বাড়ি নির্মাণকৌশল এখনো প্রায় অপরিবর্তিত। যুগ যুগ ধরে গ্রামীণ স্থাপত্যে স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য উপকরণ হিসেবে মাটি ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এসব স্থাপত্য নির্মাণে স্থপতিদের পেশাদার অবদান নেই বললেই চলে। সাধারণ মিস্ত্রি, রাজমিস্ত্রি ও কামলাদের মতো স্থানীয় নির্মাণকর্মীরাই বাড়ির লোকদের সহায়তায় স্থাপনা নির্মাণ করে থাকে। কাদামাটিতে তৈরি এসব স্থাপনায় গ্রামবাসীরা বাস করছেন যুগ যুগ ধরে। এসব মাটির ঘর নির্মিত হয় স্তরে স্তরে মাটি সাজিয়ে। কোনো কোনো এলাকায় দেয়াল তৈরিতে বড় বড় মাটির চাঁই ব্যবহৃত হয়। আর দেয়ালের সৌন্দর্যে কাদামাটির প্রলেপ দেওয়া হয়। বাঁশ বা কাঠের কাঠামোতেও মাটির প্রলেপ পদ্ধতি প্রচলিত। রক্ষণাবেক্ষণে কখনো কখনো মাটির সঙ্গে গোবর মেশানো হয়। বাঁশ, কাঠ, বেত, পাটখড়ি ইত্যাদি দিয়ে তৈরি হয় ঘরের মাচা ও চিলেকোঠা। ছাদ বা চাল নির্মাণে ব্যবহৃত হয় গোলপাতা, ছন, খড়, বুনোঘাস, নলখাগড়া, খেজুর পাতা বা টালি। ছিদ্রযুক্ত এসব প্রাকৃতিক উপাদান বাতাস চলাচল এবং তাপসহনশীল। তা ছাড়া মাটির বাড়ি অনেক বেশি আর্দ্রতা ধরে রাখতে সক্ষম। এ কারণে মাটির বাড়িতে শীতের সময় গরম থাকে আর গরমের সময় ঠান্ডা। আলোক ব্যবস্থাপনা, প্রাকৃতিক রং, হালকা নির্মাণ উপকরণ আর প্রচুর ছায়াযুক্ত এলাকায় বাড়ি নির্মিত হয় বলে প্রতিফলিত হয় প্রকৃতি আর স্বর্গীয় আবেশ। তা ছাড়া প্রচণ্ড ঝড় ও প্রবল বর্ষণেও এর টিকে থাকার ক্ষমতা অসাধারণ। কোনো অংশ ক্ষতি হলেও দ্রুত ও সহজে তা মেরামত করা সম্ভব।

মাটি অত্যন্ত শক্তিশালী প্রাকৃতিক উপাদান। সঠিকভাবে নির্মাণ করা গেলে অনায়াসে যুগ যুগ ধরে বসবাস করা যাবে মাটির এসব স্থাপনায়। প্রচলিত মাটি নির্মিত স্থাপনাগুলো নগরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কারণ, স্থানস্বল্পতা। গ্রামের বাড়িগুলোর জানালা থাকে ছোট ছোট, দেয়ালও তুলনামূলক মোটা, তাই আলোকস্বল্পতা ও স্যাঁতসেঁতে ভাব লক্ষণীয়। তা ছাড়া বৃষ্টির পানির প্রবাহে দেয়াল টেকসই হয় না। এসব ত্র“টি দূর করে রড, কংক্রিট, ইট ও মাটির সমন্বয়ে এবং প্রযুক্তি সন্নিবেশে স্থাপনা নির্মাণ করা গেলে আধুনিক ও বহুতল বাড়ি নির্মাণ সম্ভব। মাটি নমনীয় তাই যেকোনো নান্দনিক স্থাপনা নির্মাণ সম্ভব এ উপাদানে। তা ছাড়া পরিবেশবান্ধব, সহজলভ্য কাঁচামাল ও নির্মাণব্যয় কম হওয়াই অনেকের আগ্র্রহের নির্মাণ উপকরণ হতে পারে মাটি। দিনাজপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে দ্বিতল মাটির বাড়ির দেখা মেলে। কিন্তু উন্নত প্রযুক্তি ও উপাদানের সাহায্যে বহুতল ভবন নির্মাণেও মাটির ব্যবহার সম্ভব। দিনাজপুরের  রুদ্রপুরে অস্ট্রিয়ান স্থপতি আনা হেরিঙ্গা সম্পূর্ণ মাটি এবং বাঁশ দিয়ে তৈরি করেছেন দোতলা মাটির বাড়ি। ২০০৬ সালে ‘METI-Handmade School’ প্রকল্পের আওতায় সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের সৃজনশীলতা চর্চায় নির্মিত হয় এই স্কুল, যা সম্মানজনক আগা খান আন্তর্জাতিক অ্যাওয়ার্ড লাভ করে। অথচ বাংলাদেশের পেশাজীবী স্থপতিদের মাটি নিয়ে কাজ করতে খুব একটা দেখা যায় না। তবে অনেক স্থপতির মাটির কাজ করার আগ্রহ থাকলেও গ্রাহকের চাহিদা ও ইচ্ছা তেমনটা পরিলক্ষিত হয় না। এর পরও কতিপয় স্থপতি, এনজিও ও শিল্পবোধসম্পন্ন মানুষের আগ্রহে নির্মিত হচ্ছে নানা ধরনের মাটির স্থাপনা। এর মধ্যে স্কুল, কটেজ, সামার হাউস, রেস্ট হাউস, বাংলো, ক্যাফে, ভাস্কর্য উল্লেখযোগ্য। এ প্রজন্মের তরুণ স্থপতি ও ইন্টেরিয়র ডিজাইনার উজ্জীবিত হচ্ছেন স্থাপনার বিভিন্ন অংশে মাটির ব্যবহারে। নির্মাণ করছেন মাটির দেয়াল, ফলকচিত্র ও ভাস্কর্য। এমনই একজন মাটির কারিগর ত্রি-এর আব্দুন নাঈম।

‘ত্রি’ মানে তিন। গাছ, পানি আর মাটি। প্রকৃতির অত্যন্ত শক্তিশালী উপাদান। তাঁর স্থাপত্যকর্মের উপাদানও তিনটা। পরিবারের সদস্যও তিন। ছেলের নামও ‘ত্রি’। সব মিলে নিজ প্রতিষ্ঠানের নাম রেখেছেন ‘ত্রি’।

কীভাবে এই কাজের সঙ্গে যুক্ত হলেন? ভালো লাগাটাই বা কতটুকু?

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের শিক্ষক স্থপতি খন্দকার হাসিবুল কবির প্রথম দিনাজপুরের একটি স্কুল নির্মাণকাজে সম্পৃক্ত হওয়ার ব্যাপারে আমাকে উৎসাহিত করেন। স্থানীয় উপকরণ দিয়েই হবে প্রকল্পের কাজ। আমি একবাক্যে রাজি হই। সেখানে আমি স্থপতি কবিরসহ অস্ট্রিয়ান স্থপতি আনা হেরিঙ্গার সঙ্গে কাজের সুযোগ পাই। সম্পূর্ণ মাটি ও বাঁশের কাজ। কাজটি করতে গিয়ে আমার ভালো লেগে যায়। পরে যখন প্রকল্পটি স্থাপত্যের সেরা স্বীকৃতি ‘আগা খান অ্যাওয়ার্ড’ জয় করে তখন কাজটিকে আরও ভালোবেসে ফেলি। এরপর হাউসিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউটে অস্ট্রিয়ার দুজন স্থপতি আনা হেরিঙ্গা ও স্থপতি মার্টিন রোসের তত্ত্বাবধানে মাটির স্থাপনা নির্মাণবিষয়ক এক কর্মশালায় অংশ নিই। প্রকল্পটিতে ৬২ জন তরুণ স্থপতির মধ্যে ইউরোপে প্রশিক্ষণের জন্য নির্বাচিত হই আমি। স্থপতিদ্বয় দেশে ফিরে কিছুদিন পর আমাকে প্রস্তাব পাঠায় মাটির কাজের ওপর অস্ট্রিয়ার লিনজ ইউনিভার্সিটিতে একটা কোর্সে প্রশিক্ষণের জন্য। আমি তাঁদের জানাই, আমি স্থপতি বা স্থাপত্যের ছাত্র না। তাঁরা বলেন, এসব লাগবে না, তুমি চলে এসো। এভাবেই ইউরোপ যাওয়া এবং অসংখ্য মাটির স্থাপনা তৈরির প্রশিক্ষণ নেওয়া ও কাজ করা। এভাবেই আসলে মাটির কাজে জড়িয়ে পড়ি। এ ছাড়া এ দেশের খ্যাতিমান স্থপতি নাহাস আহমেদ খলিল স্যারের সঙ্গে অনেক কাজ করেছি। তিনি আমার গুরু। মাটির স্থাপনা নির্মাণে আমি তাঁকে এই দেশের একমাত্র আইডল মানি।

আমাদের দেশের মাটি কি স্থাপনা নির্মাণের উপযোগী?

অবশ্যই আমাদের দেশের মাটি স্থাপনা নির্মাণের জন্য দারুণ উপযোগী। এশিয়া ও ইউরোপের বেশ কিছু দেশে মাটি নিয়ে কাজ শিখেছি এবং করেছি সে অভিজ্ঞতা থেকেই বলতে পারি, মাটির এত রূপ-বৈচিত্র্য আমাদের দেশের মতো কোথাও নেই। সেখানে স্থাপত্যের স্থায়িত্বে মাটির সঙ্গে অনেক উপাদান যোগ করতে হয়। এ দেশের মাটি অত্যন্ত ভালো। সাধারণত বিভিন্ন দেশের মাটি ছয়রঙা। কিন্তু আমি এ দেশে এখনো পর্যন্ত ১৬ রঙের মাটি পেয়েছি। সিলেটের একটি পাহাড়ে পেয়েছি আট রঙের মাটি। এর মধ্যে অন্যতম হালকা সবুজ মাটি। আমি নিজেই বিস্মিত মাটির এমন রঙে। আমরা আসলে প্রাকৃতিকভাবে অনেক সমৃৃদ্ধশালী। পবিত্র কোরআন শরিফেই বর্ণিত আছে, পৃথিবীতে একটা ভূমি থাকবে, যেখানে যে বীজ ফেলা হোক, তা থেকেই গাছ হবে। আমাদের ভূমিটাও তেমনই আশীর্বাদপুষ্ট।

নির্মাণকাজে মাটি ব্যবহারের সুবিধা ও উপকারী দিকগুলো কী কী?

আবহমানকাল থেকেই গ্রাম-বাংলার মাটির ঘর প্রাকৃতিক ফিল্টার। কেউ যদি মাটির ঘরে বাস করে, তবে কিছু রোগ-ব্যাধি থেকেও রক্ষা পাবে। এসব রোগ-ব্যাধি নির্মাণ উপকরণে সৃষ্ট পরিবেশের কারণে হয়ে থাকে। তা ছাড়া মাটির দেয়াল হলে অতিরিক্ত তাপ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। স্থাপনার নির্মাণব্যয়ও অনেক কম লাগে। অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণ উপকরণের তুলনায় মাটি ব্যবহারে নির্মাণের ব্যয় দুই-তৃতীয়াংশ কম হয়। বর্তমানে প্রতি বর্গফুটে এলজিইডির স্থাপনা নির্মাণব্যয় এক হাজার ১৭০ টাকা বা তারও বেশি, সেখানে মাটির স্থাপনায় ব্যয় হয় মাত্র ৩৫০ থেকে ৩৭০ টাকা।

সম্প্রতি অনেকেই মাটির স্থাপনায় আগ্রহী হচ্ছে কেন?

আসলে মাটির কাজ অনেকের কাছেই নতুন মনে হলেও আসলে তা নয়। আধুনিকতার ছোঁয়ায় অনেকেই ভুলেছে এ দেশের ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার প্রধান উপাদানই মাটি। এ দেশে ভুল কৌশলটি অনুসরণ হয় বেশি ও ছড়ায় দ্রুত। যেমন এখন গ্রামেও কংক্রিটের ভবন হচ্ছে। ১০০ বছর পর ১০ তলা ভবনের মালিকের জন্য ওই বাড়ি সম্পদ নয়, অভিশাপে পরিণত হবে। কারণ, সে সময় তারা না পারবে ভাঙতে, না পারবে সেখানে থাকতে। অথচ মাটির বাড়ি প্রয়োজনে ভেঙে সেখানে আবারও চাষাবাদ করা যাবে। কারণ, প্রাকৃতিক মাটির বাড়ি তৈরিতে কোনো ধরনের রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করা হয় না। কিন্তু এই সুবিধা কংক্রিটে পাওয়া যাবে না। এসব কারণে অনেকেই মাটির স্থাপনা নির্মাণে আগ্রহী। অনেকেই তাই গোড়াতে ফিরে আসছেন। কারণ, প্রকৃতির সঙ্গে বৈরিতা করে টিকে থাকা যায় না। আমাদের জন্ম মাটি দিয়ে এবং মিশেও যাব মাটিতে। যেখানে শুরু শেষও হবে সেখানেই। 

একটি ভবনের স্থাপনায় কোন কোন স্থানে মাটি ব্যবহার করা যায়?

বেইজমেন্ট এবং ছাদ ছাড়া স্থাপনার প্রায় সব জায়গায় মাটি ব্যবহার করা যায়। ভবনের যেখানে মানুষের স্পর্শ থাকবে যেমন দেয়াল, জানালা, মেঝেÑ এগুলো সব মাটি দিয়ে তৈরি হতে পারে। টেরাকোটা ব্যবহার করে ভবনের নান্দনিকতা বাড়িয়ে শৈল্পিকভাবে উপস্থাপন করা যায়।

মাটির স্থাপনা দীর্ঘস্থায়ী করার উপায় কী?

মাটি দীর্ঘস্থায়ী করার অনেক উপায় আছে। আমাদের দেশের মানুষ এই উপায়গুলো জানে না বলেই দিনে দিনে মাটির ব্যবহার কমছে। গ্রামে মাটির বাড়িগুলোতে মাটির সঙ্গে গোবর মিশিয়ে লেপে দেয়। এটা পানি প্রতিরোধে অত্যন্ত কার্যকর পদ্ধতি। কিছু দেশীয় গাছ আছে, যেগুলোর পাতা, কাণ্ড ও ফলে আঠা পাওয়া যায়। এসব আঠা খুবই শক্তিশালী। এই আঠা পানিতে মিশিয়ে মাটি ভেজানো গেলে মাটির শুষ্কতা ও ফাটা ভাব দূর হয়। আরেকটা উপাদান পনির (চিজ), তবে তা ব্যয়বহুল। প্রথমে চিজকে শুকিয়ে পাউডার বানাতে হয়। এর পর নির্দিষ্ট অনুপাতের পাউডারের পরিমাণমতো পানি মিশিয়ে আগুনে তাপ দিয়ে এক ধরনের আঠা তৈরি করতে হয়। পরে আঠার সঙ্গে পানি মিশিয়ে মাটি কিউরিং করলে স্থাপনা অনেক স্থায়ী হবে, যা কংক্রিটের থেকে কোনো অংশে কম নয়। এই পদ্ধতিগুলো মানুষের জানা নেই বিধায় তারা মাটি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। তা ছাড়া আরও অনেক ধরনের পদ্ধতি আছে, যা নিয়ে গবেষণার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া উচিত।

গ্রামের মানুষ মাটির তৈরি বাড়িতে আগ্রহ হারাচ্ছে কেন? মাটিকে জনপ্রিয় করা যায় কীভাবে?

অনেকে মনে করেন আভিজাত্যের প্রতীক কংক্রিট। তবে এটা একদমই ভুল। মাটির তৈরি বাড়িই সবচেয়ে অভিজাত। আর আগেই বলেছি, মাটির সঠিক ব্যবহার তারা জানতে পারছে না। তাই মিডিয়াকে উদ্যোগ নিয়ে সবাইকে জানাতে এগিয়ে আসতে হবে। কারণ, মাটির বাড়ি গ্রিন বিল্ডিং ডিজাইন কোডের অন্যতম অনুষঙ্গ। মাটি যে কত সলিড মেটেরিয়ালস, তা উদাহরণ দিয়ে শেষ করা যাবে না। বিভিন্ন স্থাপনায় মাটির নান্দনিক উপস্থাপনার মাধ্যমেই একে জনপ্রিয় করা যায়। এ জন্য স্থপতিদের এ কাজে এগিয়ে আসা উচিত। 

আপনার প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে কিছু বলুন?

আমরা মানুষ, আমরা সবুজ, আমরা মাটি। এটাকে আমার প্রতিষ্ঠানে স্লোগান বলতে পারেন। ১৯৯৩ সাল থেকেই আমি গাছ নিয়ে কাজ করছি। ২০০৭ সাল থেকে শুরু করি মাটির কাজ এবং আমার জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত করে যেতে চাই। এ কাজে সহযোগিতার জন্য প্রায় ২০ জন দক্ষ শ্রমিককে প্রশিক্ষিত করেছি আমি। স্থাপনা নির্মাণে আমরা যা যা ব্যবহার করি তার সবটাই প্রাকৃতিক। এখানে এক বিন্দু ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ নেই। যেমন গাছ, পানি, মাটি, দুধ, পনির, খড় ইত্যাদি। তা ছাড়া সমাজের উচ্চবিত্তরাই শখ করে মাটির বাড়ি নির্মাণে আমার মতো প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্থ হয়। তারাই আমার ক্লায়েন্ট। কিন্তু প্রত্যন্ত গ্রামের সাধারণ মানুষও আমার সেবা গ্রাহক। তাদের জন্য আমি কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই কাজ করি।

বর্তমানে আপনার কী কী কাজ চলছে এবং নির্মিত প্রকল্পগুলো কী কী?

বর্তমানে আমি স্থপতি এহসান খানের সঙ্গে রাজধানীর গুলশান-২-এর হোটেল সিক্স সিজন-এর মাটির বাউন্ডারি ওয়ালের কাজ করছি। ঢাকায় এটাই প্রথম মাটির তৈরি বাউন্ডারি ওয়াল। এ ছাড়া দেশে-বিদেশে অসংখ্য বাণিজ্যিক, অবাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ভ্যাকেশন হাউস, বাংলো, স্কুল, রেস্টুরেন্ট, তারকা হোটেল ইত্যাদির কাজ সম্পন্ন করেছি। দেশের মধ্যেই এ পর্যন্ত ২৬টা প্রকল্প হস্তান্তর করেছি। এগুলোর মধ্যে ধানমন্ডি ৭/এ-তে একটি রেস্টুরেন্ট অজ, ৩ নম্বর রোডে একটি রেস্টুরেন্ট সিক্স থ্রি, হোটেল রেডিসন ব্লু, চট্টগ্রামের রিসিপশন ব্যাকড্রপ, রায়েরবাজার ও কালীগঞ্জে জাগো ফাউন্ডেশন স্কুল, ঢাকা মণিপুরীপাড়ায় ওয়েস্টার রেস্টুরেন্ট, কাপাশিয়াতে নদীর পাড়ে চরের মধ্যে একটি একটি রিসোর্টসহ আরও অনেক কাজ করছি। সম্প্রতি রাজেন্দ্রপুরের একটি ভ্যাকেশন হাউসের কাজ করেছি। তপন চৌধুরীর স্কয়ার নিয়ে, স্থপতি নাহাজ আহমেদ খলিলের একটি প্রকল্প এটি। তবে ঝিনাইদহের হাকিমপুরেপানি গ্রাম রিসোর্ট নামে একটি বৈদেশিক প্রকল্পের কাজ করেছি, যা আমার অন্যতম সেরা একটি কাজ।

আর কী কী কাজের পরিকল্পনা করছেন?

সব ধরনের স্থাপনায় কীভাবে মাটির ব্যবহার বাড়ানো যায় সে চেষ্টাই করছি। বাণিজ্যিক কাজের পাশাপাশি বছরের অর্ধেক সময় সেবামূলক কাজ করি আমি। গ্রামের লোকজনকে বেশি উৎসাহিত করতে চাই। একটাই কারণ, তারা জানুক টাকা ছাড়াই অনেক সুন্দর বাড়ি নির্মাণ করা যায়। শুধু ধনীদের বাড়িই যে নকশাপূর্ণ হবে তা কিন্তু নয়। একটু মনোযোগ দিয়ে দেখলেই কিন্তু যে কেউ এই কাজ শিখতে পারবে। তাই দেশব্যাপী আমার কাজের প্রসার ঘটাতে চাই। 

প্রকল্পের ব্যবহারসামগ্রীর ধরন কী এবং স্থায়িত্ব কেমন? এসব কাজের বিশেষত্ব কী?

স্থাপনা নির্মাণের প্রধান উপাদানই মাটি। এ ছাড়া ধানের তুষ, বাঁশের পাতা, পাটখড়ি, গাছের আঠা, রস ও কষ, দুধ, পনির, চুল, খড়সহ অনেক ধরনের প্রাকৃতিক উপাদান, যা সহজেই হাতের নাগালে পাওয়া যায়। এ ধরনের স্থাপত্যের স্থায়িত্ব অনেক বেশি। কয়েক শ বছরও বলা যায়। আগেকার প্রায় সব স্থাপনাই ছিল মাটির। ৪০০ বছর থেকে আরও পুরোনো স্থাপনায় এখনো মানুষ নামাজ পড়ে, পূজা করে। তা ছাড়া এ কাজের প্রধান বিশেষত্ব হলো শত ভাগ পরিবেশবান্ধব। শীতের সময় গরম আর গরমের সময় ঠান্ডা অনুভূত হয়।

কাজ করতে গিয়ে কখনো বাধার সম্মুখীন হয়েছেন কি?

অবশ্যই। বাধার সম্মুখীন এখনো হচ্ছি। আমার পরিবারের লোকেরাই আমাকে বলে, আমি নাকি না খেয়ে মারা যাব। কিন্তু ধারণাটা যে ভুল তা আমি একদিন প্রমাণ করব। তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা স্থপতিদের সঙ্গে এক ধরনের মানসিক দ্বন্দ¦ হয়। স্থপতি না হয়েও আমি এ কাজ করছি এটা অনেকেই সহজভাবে নিতে পারে না। কিন্তু আমি আসলে স্থপতি নই, হতেও চাই না। আমি শুধু চাই মাটির একজন ভালো কারিগর হতে। মাটির কারিগর পরিচয় দিতেই আমি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি।

দেশের জনগণ আপনার এই কাজে কেমনভাবে লাভবান হচ্ছে?

আমাদের দেশের সবচেয়ে সহজপ্রাপ্য ও স্বল্পমূল্যের নির্মাণ উপাদানই মাটি। তা ছাড়া মাটির স্থাপনা নির্মাণব্যয়ও অনেক কম। কম খরচে দীর্ঘস্থায়ী স্থাপনা মাটি ছাড়া অন্য কিছুতে মেলা ভার। তা ছাড়া এই স্থাপনা ব্যবহারে স্বাস্থ্য ও পরিবেশ উভয়ই ভালো থাকে। এভাবেই লাভবান হচ্ছে দেশ ও মানুষ।

এই কাজের স্বীকৃতি কতটা পেয়েছেন?

আমার কাছে মনে হয়, আমি মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি। প্রথম দিকে অনেক কষ্ট হয়েছে। আমার কাজ দেখে অনেকেই আমাকে পাগল বলত। কিন্তু বর্তমানে মাটির স্থাপনা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্বীকৃতি পাচ্ছে। তাই এখন আর আমার মনে হয় না যে আমি স্বীকৃতি পাইনি। মাটির স্থাপনা স্বীকৃতি পাওয়া মানেই আমার স্বীকৃতি।

মাটির কাজের নির্মাণশৈলী সম্প্রসারণে আপনার প্রত্যাশা?

অবশ্যই গণমাধ্যম খুব সহজে ও দ্রুত সময়ে কাজটি করতে পারে। কয়েকটি মাধ্যম কাজ করছে তবে তা যথেষ্ট নয়। দেশের স্থাপনা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে প্রত্যাশা একটাই, যদি এই কাজ দেশ ও পরিবেশের জন্য ভালো হয়, তাহলে অবশ্যই এ খাতে নজর দিতে হবে। তাদের কাছে একটাই দাবি, এই খাতে যদি কেউ কাজ করতে চায় তাহলে তাদের উৎসাহিত করতে হবে। তাহলে আমার মতো আরও অনেকেই এ কাজে সম্পৃক্ত হবে।

প্রকাশকাল: বন্ধন ৫৭তম সংখ্যা,

তথ্যসূত্র:

ড. আহমদ শরীফ ‘স্বদেশ অন্বেষা’

দেবাশীষ বন্দ্যোপাধ্যায়, ‘মৃৎ সংস্কৃতি’

মারুফ আহমেদ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top