হার না-মানা একজন

মো. সাইদুল ইসলাম। বাবা ফজলুল হক আর মা মোছা. জয়তুন্নেছার আট সন্তানের মধ্যে সপ্তম। ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া থানার চাঁদপুর গ্রামে জন্ম তাঁর। ছোটবেলা থেকেই সাইদুল কিছুটা উদাসীন। তাই পড়াশোনাও বেশি এগোয়নি। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্তই। অবশ্য এর পেছনে আরও একটি কারণ ছিল আর তা অর্থনৈতিক দীনতা। তখন থেকেই কৃষিকাজে বাবাকে সহায়তা করা। ভাগ্য সহায় হলো না, ছোটবেলায়ই বাবা মারা যান। বাবা মারা যাওয়ার পর বড় ভাইয়েরা তখন যাঁর যাঁর সংসার নিয়ে ব্যস্ত। উপায় না থাকায় বেঁচে থাকার তাগিদে নিজের কাঁধেই চেপে নিলেন সংসারের বোঝা।

সময়টা ২০০০ সাল। ছোট বয়সেই মাথায় এল কিছু একটা করতে হবে। নিজের উপার্জন বাড়াতে হবে। জাকির তাঁর আত্মীয়। ঢাকায় একজন দক্ষ রডমিস্ত্রি। তাঁর হাত ধরেই কাজের সন্ধানে রাজধানীতে আসা সাইদুলের। উঠলেন মতিঝিলের একটি মেসে। প্রথম দিনেই কাজ জুটে গেল।

মতিঝিল বিডিসি কোম্পানির কনস্ট্রাকশনের কাজে হেলপার হিসেবেই শুরু হলো প্রথম কর্মজীবন। দিনে হাজিরা মাত্র ৪৫ টাকা। প্রতিদিনকার থাকা ও খাওয়ার ব্যয় ১৫ টাকা। তা দিয়ে মোটামুটি ভালোই দিন কাটত। বছর খানেক পর হলেন সহযোগী মিস্ত্রি। আরও এক বছর পর হাফ মিস্ত্রি এবং পরে একজন দক্ষ রডমিস্ত্রি হিসেবে নিজেকে গড়ে তুললেন। এখন সাইদুলের দৈনিক হাজিরা ১১০ টাকা। ২০০৩ সালে যুক্ত হলেন মোহাম্মদপুরের জাপান গার্ডেন সিটির কাজে। এখানে তাঁর মেজো ভাই মঞ্জুরুল ইসলাম সাব-কন্ট্রাক্টে যাবতীয় রডের কাজ চুক্তি হিসেবে নিলেন। এখানেই ভাইয়ের সঙ্গে ২০০৬ সাল পর্যন্ত কাজ করলেন।

দিনকাল বেশ ভালোই চলত। এরই মাঝে মেজ ভাই আগারগাঁওয়ে নিউরোসাইন নামের একটি কোম্পানির কাজে যোগ দিলেন সাইদুলকে নিয়ে। উদ্যমী একটা মনোভাব সাইদুলের মধ্যে সব সময়ই কাজ করত। রাজধানীতে থাকার খরচ আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। তাই তিনি ভাবলেন এখন উপার্জন বাড়াতে হবে। সাত থেকে আট মাস নিউরোসাইনে কাজ করতে করতে সিদ্ধান্ত নিলেন দেশের বাইরে গিয়ে উপার্জন বাড়ানোর। ঠিক করলেন দুবাই যাবেন। যেমন সিদ্ধান্ত তেমন কাজ। পরিবারের অন্য ভাইদের সঙ্গে আলাপ করে নিজের কিছু জমানো অর্থ এবং ভাইদের থেকে কিছু আর্থিক সহায়তা নিয়ে দালালের মাধ্যমে ২০০৬ সালের আগস্টে দুবাই চলে গেলেন সাইদুল। ভাগ্য সব সময়ই সাইদুলের পক্ষেই কাজ করে। তাই সেখানে গিয়েই পেয়ে গেলেন কাজ।

সেখানে ট্রান্সগার্ড নামের একটি কোম্পানিতে কাজের সুযোগ পেয়ে ভাগ্য খুলতে শুরু করল। তিন বছর টানা কাজ করার পর বেশ কিছু অর্থ জমিয়ে ফেললেন সাইদুল। এখন চিন্তা করলেন দেশে গিয়ে একটু বিশ্রাম নেওয়ার। আর দেশের মায়াও পেয়ে বসল তাঁকে। সাড়ে তিন বছরের মাথায় দেশে ফিরে এলেন। তখনই সুমনা আক্তারকে বিয়ে করে নতুন জীবন শুরু করলেন।

পাঁচ মাসের মাথায় আবারও দুবাই চলে গেলেন। কিন্তু সেখানে গিয়ে সিদ্ধান্ত নিলেন আরও উপার্জনক্ষম হতে হবে তাঁকে। তাই সিদ্ধান্ত নিলেন ইউরোপের কোনো দেশে যাওয়ার। ওই সময় দুবাইয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোতে অবৈধ পথে শ্রমিক পাঠানোর রমরমা বাণিজ্য চলছিল। আর এই অবৈধ ব্যবস্থার সুযোগ সৃষ্টি করছিল স্থানীয় দালালরা। যদিও তা ছিল অবৈধ পথ, তার পরেও জেনে-শুনেই সেই পথেই পা বাড়ালেন সাইদুল। কিন্তু ভাগ্য এবার সহায় হলো না সাইদুলের। সেই সময় তিনি জীবনের বিরাট এক কঠিন সময় পার করেছেন। পীড়াদায়ক সেই মুহূর্তের কথা আজও ভোলেননি সাইদুল।

প্রথমে দালালের মাধ্যমে দুবাই থেকে গেলেন ওমান। সেখান থেকে আবার ইরান হয়ে তুরস্ক। তার পর গ্রিসের পথে পাড়ি জমালেন অবৈধভাবে। এই পথ পাড়ি দিলে প্রায় দুই মাসের বেশি সময় লেগে গেল। এমনও দিন সময় পার করেছেন যে তাঁকে টানা ১৫ দিনও না খেয়ে থাকতে হয়েছে। অবৈধভাবে গ্রিসে যাওয়ার জন্য তাঁরা প্রথমে ৩৬ জন সঙ্গী হয়েছিলেন। পরে শেষ পর্যন্ত ১৮ জন গ্রিসে পৌঁছাতে পেরেছিলেন। গ্রিসে পাড়ি দেওয়ার পথে তাঁদের কখনো বা পায়ে হেঁটে কখনো বা মাইলের পর মাইল ধানখেত মাড়িয়ে বিশাল পাহাড় পাড়ি দিয়ে পথ অতিক্রম করতে হয়েছে। পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে পথ পাড়ি দিতে গিয়ে পড়েছিলেন খাদ্যসংকটে। পেটের ক্ষুধা তখন মিটিয়েছেন চলতি পথে পাহাড়ি ঝরনার পানি পান করে। কিন্তু তাতে তো আর পেটের জ্বালা মেটে না। তখন তিনি ও তাঁর সঙ্গীরা গাছের লতা-পাতা খেয়ে জীবন বাঁচিয়েছেন। সাইদুল বলেন, সেই দিনগুলো যেন পার হতে অনেকটা সময় নিয়ে নিচ্ছিল। একেকটি দিনকে যেন একেকটি বছর মনে হতো। অবশেষে প্রায় মাস দুয়েক পর তুরস্ক গিয়ে পৌঁছালেন। সেখানে গিয়ে আরও এক বিপদের সম্মুখীন হলেন। সেখানে থাকা দালালের সঙ্গে সাক্ষাতের পর সে জানায়, গ্রিসে পৌঁছে দিতে তাঁকে আরও তিন লাখ টাকা দিতে হবে। এত পথ পাড়ি দিয়ে এসে তো আর ফেরত আসা যায় না। দালালের আরজি মেটাতে হবে। তাই বাড়িতে যোগাযোগ করে সাইদুল আরও তিন লাখ ২০ হাজার টাকা নিয়ে এলেন। এ নিয়ে গ্রিস যেতে তাঁর প্রায় ১২ লাখ টাকার মতো খরচ হয়ে গেল। সেখানে দালালকে তিন লাখ টাকা পরিশোধ করে বাকিটা নিজের খরচের জন্য রাখলেন। দালাল আশ্বাস দিয়েছিল এক দিনের মধ্যেই গ্রিস পৌঁছে দেবে। দালাল তার কথা রাখল। এক দিনের মধ্যেই। কিন্তু সেখানেই ঘটে গেল এক বিপত্তি। নদী পার হয়ে ওপারে পৌঁছাতেই সীমান্ত বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে গেলেন তিনি ও তাঁর সঙ্গীরা। সেখানে এক দিন থাকার পর তাঁদের এথেন্সে পাঠানো হলো। সেখান থেকে তাঁদের দেশে ফেরত পাঠাতে প্রায় এক মাস সময় লেগে গেল। তবে এত কিছু তাঁর জীবনে ঘটে গেলেও কোনোভাবেই ভেঙে পড়েননি সাইদুল। তিনি একজন শক্ত মনোবলের মানুষ হওয়ায় সেই গ্রিসে থাকা এক মাস গ্রিস শহরটা ঘুরে বেড়িয়েছেন। খুঁজে দেখেছেন কোথাও কোনো ঠাঁই মেলাতে পারেন কি না। তবে সুবিধামাফিক কোনো কাজ পেলেন না তিনি। 

সাইদুলের মতে, সেখানকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অত্যন্ত ভালো। তাঁদের সঙ্গে মেহমানের মতো আচরণ করেছে তারা। আটক হওয়া বাংলাদেশিদের প্রত্যেককে একটা করে এক মাস মেয়াদি রেড কার্ড করে দেওয়া হয়। সেই এক মাস বেশ স্বাচ্ছন্দ্যেই কেটেছে তাঁর। তবে খাবারদাবারের অসুবিধার জন্য এথেন্সের পথে এক বাংলাদেশির সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়ে যায়। তাঁর দেখানো পথ অনুসরণ করে স্থানীয় একটি বাংলাদেশিদের বাজারের হোটেলে ভালো খাবারের ব্যবস্থা হয়ে গেল। কিন্তু সেখানে বিনা মূল্যে খেতে পারলেন না। বাড়িতে ফোন করে হুন্ডির মাধ্যমে টাকা এনে সেখানে এক মাস ভালোমতোই খাবারের জোগান টানলেন।

এবার দেশে ফেরার পালা। এক মাস পর দেশে ফিরে আবারও উদ্যমী হয়ে কাজে নেমে পড়লেন। কয়েক বছরের মধ্যে সম্পূর্ণ দেনা পরিশোধ করলেন। বর্তমানে আবারও সুখ ফিরেছে সাইদুলের। এক মেয়ে সামিয়া আক্তারকে নিয়ে তিনজনের সংসার তাঁর। রডমিস্ত্রির কাজ করে বর্তমানে তিন কাঠা জায়গা কিনে সেখানে পাঁচতলা ফাউন্ডেশন করে একতলা বাড়ির কাজ সম্পন্ন করেছেন। এখন একটাই চিন্তা সাইদুলের, মেয়েকে ডাক্তার হিসেবে গড়ে তোলা। সাইদুল জানান, তাঁদের গ্রামে কোনো ডাক্তার নেই। তাই তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মেয়েকে ডাক্তার বানাবেন।

ডাক্তার হয়ে গ্রামে গরিবের সেবা করুক সামিয়া, ওর জন্য শুভকামনা…

প্রকাশকাল: বন্ধন ৫৭তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০১৫

Related Posts

ব্যবসার সাফল্যে চাই পরিকল্পনা

জীবন মানে যুদ্ধ; আর যুদ্ধে জেতার বড় উপায় কৌশল। তেমনি ব্যবসায় সাফল্য পেতেও হতে হয় কৌশলী; দিতে হয়…

ব্যবসায় সফলতায় চাই মনোবল

দেশের প্রাচীন জনপদ নওগাঁ। ছোট ছোট নদীবহুল বরেন্দ্র এ ভূমি প্রাচীনকাল থেকেই কৃষিকাজের জন্য প্রসিদ্ধ। কৃষিকাজের উপযোগী হওয়ায়…

সততায় যিনি আপসহীন

একজন সফল ব্যবসায়ী হিসেবে সকলে তাঁকে আদর্শ মানলেও ব্যবসায়িক জীবনের শুরুতে অনেক ব্যবসাতেই  হয়েছেন ব্যর্থ। ব্যক্তিজীবন ও সংসারেও…

ব্যবসায়ীকে হতে হবে সাহসী

রাজধানী ঢাকার উপকণ্ঠ কেরানীগঞ্জ। ঢাকার সঙ্গে সহজ ও দ্রুত যোগাযোগব্যবস্থার কারণে প্রতিনিয়তই ঘটছে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার; গড়ে উঠছে অসংখ্য…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *