বহুরূপী কোটিসারি আইল্যান্ড

ফিনল্যান্ডের রোভানিয়েমি ঐতিহাসিক এক লুম্বারজ্যাক টাউন (গাছের লগ কেনাবেচা হয় যে শহরে) বলেই খ্যাত। শহরটির পাশ দিয়েই বয়ে গেছে ওউনাস ও কেমি নদী। ১৮ শতকের শেষের দিক থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত এই নদী দুটি ব্যবহৃত হতো লগ পরিবহনের ভাসমান চ্যানেল হিসেবে। কিন্তু সড়ক যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে এই চ্যানেল দিনে দিনে হারায় তার গুরুত্ব। জায়গা করে নেয় বড় বড় ট্রাক; লরি। গাছ কাটায় বিধিনিষেধ আরোপসহ নানা কারণে রোভানিয়েমির লুম্বারজ্যাক শহরটি অনেকটাই জৌলুশ হারালেও এখনো এখানকার ঘরবাড়ি ও স্থাপনাগুলো বয়ে চলেছে কাঠুরেদের ইতিহাস-ঐতিহ্য। গাছের লগ জোড়া দিয়ে নির্মিত ছোট ছোট দ্বীপ; আর এ দ্বীপের ওপর বোটহাউস অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর। এমনই অনন্য এক দ্বীপ কোটিসারি আইল্যান্ড। ভাসমান লগের ওপর নির্মিত ছোট্ট এই দ্বীপটি সাধারণ মানের হলেও এর আবেদন ভিন্ন। চারটি ঋতুতে ফুটে ওঠে চার রকম রূপ; সৌন্দর্য।

কোটিসারি আইল্যান্ডের এমন ঋতুবৈচিত্র্য সম্পর্কে আগে খুব কম মানুষই জানত, এমনকি এই দ্বীপটির ব্যাপারেও। ফিনল্যান্ডের অন্যতম এই ক্ষুদ্র দ্বীপটি আসলে ছিল কাঠুরে ও কাঠ ব্যবসায়ীদের খণ্ডকালীন থাকার জায়গা। ১৯৮০ সাল পর্যন্তও এখানে দেশটির নানা প্রান্ত থেকে কাঠ ব্যবসায়ীরা আসতেন বাণিজ্যসংক্রান্ত চুক্তি ও আলোচনা করতে। ২০১৫ সালে স্থানীয় একজন আলোকচিত্রী জিনি ইলিনামপা দ্বীপটির একটি এরিয়াল ছবি ওঠান ড্রোন দিয়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে (ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম) ছবিটি প্রকাশ পেলে দ্বীপটি সম্পর্কে সবাই কৌতূহলী হয়ে ওঠে। এত চমৎকার একটি লগদ্বীপ এত দিন লোকচক্ষুর অন্তরালে ছিল তা জেনে অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করেন। সবাই পোস্টের কমেন্টে আলোকচিত্রীকে জানান আরও ছবি দিতে।

দাবি মেটাতে জিনিকে তাই বিভিন্ন ঋতুর অতিরিক্ত কিছু ছবি নিতে কয়েকবার সেখানে যেতে হয়। তিনি একইভাবে বাকি তিন ঋতুর ছবি নেন ড্রোনের মাধ্যমে। এরপর চার ঋতুর চারটি ছবি পাশাপাশি রেখে আবারও পোস্ট করেন তিনি। তাঁর ছবিতে ফুটে ওঠে দ্বীপটিতে চার ঋতুর চার রকম নৈসর্গিক রূপবৈচিত্র্য। গ্রীষ্মে কেমি নদীর নীল পানিতে ভেসে থাকা এক টুকরো সবুজ ভূখণ্ড, শরৎ-হেমন্তে কিছুটা ম্লান হয়ে আসা সবুজ প্রকৃতি আর হলুদ হয়ে ওঠা গাছপালা, শীতে তুষারাচ্ছন্ন জনহীন প্রান্তর, যাকে পৃথক কোনো দ্বীপ বলে মনেই হয় না এবং বসন্তের কিছুটা রুক্ষ তথা বাদামি হয়ে আসা ঘাস-লতাপাতা ও প্রকৃতি। ঋতুভেদে দ্বীপটি দেখতে ভিন্ন হলেও সৌন্দর্যের কোনো কমতি চোখে পড়ে না।

কোটিসারি আইল্যান্ডের এমন বদলানো ঋতুবৈচিত্র্য সৌন্দর্যপ্রেমীদের আগ্রহের অন্যতম ভ্রমণ স্থানে পরিণত হয়। জায়গাটি সবার কাছে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। প্রচুর মানুষ আসতে থাকে দ্বীপটিতে। এমনকি আলোকচিত্রী জিনি ইলিনামপাকে ফটোগ্রাফির পাশাপাশি একজন গাইডের দায়িত্বও পালন করতে হয়। শহরটির কর্তৃপক্ষ স্থানটির পর্যটন গুরুত্ব বুঝে দ্বীপের পুরোনো কুটিরগুলোকে কিছুটা নতুন করে সাজিয়ে গড়ে তোলে নান্দনিক এক পর্যটনকেন্দ্র।

ফেসবুক

এখন কোটিসারির জাদুকরি সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিবছর প্রায় ৫০০ পর্যটক এখানে বেড়াতে আসেন। দ্বীপে পৌঁছানোর উপায় কেমি নদীতে নৌকাযোগে। এ ছাড়া প্রতিদিন একটি ফেরি চলাচল করে পর্যটকদের দ্বীপ থেকে ঘুরিয়ে নিতে। শখের আলোকচিত্রীদের জন্য দ্বীপটি একটি আকর্ষণীয় স্থান। এখানকার উত্তর আকাশের নক্ষত্ররাজির ছবি অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর। দ্বীপটি একেবারেই অযান্ত্রিক; নেই কোনো বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা। কয়েকটি কুটির, একটি বড় পুকুর ও একটি ছোট্ট পুকুর রয়েছে সেখানে। তবে পুকুর না বলে নদীর কিছু অংশবিশেষই বলা ভালো। বেড়াতে এসে এই পুকুরে চাইলে স্নান সারতে পারেন। আর সাঁতার কাটতে পুকুর পছন্দ না হলে বিশাল নদী তো রয়েছেই।

দ্বীপে বেড়ানোর উত্তম সময় কোনটি অর্থাৎ কোন ঋতুতে দ্বীপটিকে সবচেয়ে আকর্ষণীয় লাগে এমন জিজ্ঞাসা অনেকেরই। সেক্ষেত্রে বলতে হয়, গ্রীষ্মের মেলে সবুজ-স্বিগ্ধ প্রকৃতি আর মেঘমুক্ত নীল আকাশ; শরতে আকাশে ভেসে বেড়ায় সাদা মেঘের ভেলা, নদীর পানিতেও ধরা দেয় সেই প্রতিচ্ছবি, যেন আকাশ-নদী মিলেমিশে একাকার; বসন্তে বিবর্ণ হয়ে আসা প্রকৃতি আর রং বদলানো বৃক্ষরাজি; শীতের তুষারে ঢেকে থাকা শরীর হিম করা এক প্রান্তর! তবে অন্য যেকোনো সময়ে দ্বীপটি ভ্রমণের জন্য আদর্শ হলেও শীতে তা খুবই কঠিন। আর্কটিক সার্কেল থেকে মাত্র ৪ মাইল দূরে এর অবস্থান হওয়ায় শীত মৌসুমে বেড়াতে গেলে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। এবার আপনিই সিদ্ধান্ত নিন কোন ঋতু আপনার ভালো লাগবে।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ১৩২তম সংখ্যা, আগস্ট ২০২১।

কাজী গোলাম মোর্শেদ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top