দুর্যোগ মোকাবিলায় আমাদের প্রস্তুতি

বিশ্বব্যাপী দুর্যোগের ঘনঘটা! ঘটছে জীবনহানি, বিনষ্ট হচ্ছে সম্পদ, সঙ্গে পরিবর্তিত হচ্ছে পরিবেশ। ভূমিকম্প, ঝড়, বন্যা, টর্নেডো, সাইক্লোন প্রভৃতি প্রকৃতির নিয়মঘেরা দুর্যোগ। কালে কালে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সুনামি, সিডর, আইলা, নার্গিস, মহাসেন, ক্যাটরিনাসহ আরও কত কী! ব্যাপক জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিই এর জন্য দায়ী। মোদ্দাকথা মানুষ বিভিন্ন পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ডে প্রকৃতিকে খেপিয়ে তুলছে। দুর্যোগ মানেই ধ্বংসলীলা; অবধারিত ক্ষতি! এসবের মধ্যেও পৃথিবীতে প্রাণিকুল বাঁচছে নিরন্তন সংগ্রামে। দুর্যোগপ্রবণ জনপদ আর দরিয়াপারের মানুষের জীবনসংগ্রাম প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার অনন্য উদাহরণ। অগ্নিকাণ্ড, বিস্ফোরণ, ভবনধস, নৌযানডুবি, সড়ক দুর্ঘটনার মতো দুর্যোগে প্রকৃতির কোনো হাত নেই। মানুষের অদক্ষতা, অসচেতনতা, লোভ, প্রকৌশলগত ত্র“টির কারণেই ঘটছে এসব। প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে বাঁচা গেলেও মানুষের সৃষ্ট ফাঁদ থেকে কোনোভাবেই মিলছে না মুক্তি। ফলে বিনষ্ট হচ্ছে যাপিত জীবনের মানসিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনধারা।

বিশ্ব জলবায়ুর ব্যাপক পরিবর্তনে ভারসাম্য হারাচ্ছে প্রকৃতি। কোনো দেশের আয়তনের অন্তত ২৫ শতাংশ বনভূমির প্রয়োজন থাকলেও এ দেশে যা রয়েছে ১৬ শতাংশেরও কম। বায়ুমণ্ডলের ক্ষতিকর কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাস ছাড়িয়েছে বিপজ্জনক মাত্রা তথা ৪০০ পিপিএম (পার্টস অব মিলিয়ন)। বায়ুর নিম্নচাপ, পরিবেশদূষণ, বৃক্ষনিধনে পর্যাপ্ত বনভূমি না থাকার কারণেই সৃষ্টি হচ্ছে নিত্যনতুন প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়। ২০০৪ সালে ভয়াবহ সুনামি, ২০০৭ সালে প্রলয়ংকরী সিডরের আঘাতে লাখ লাখ মানুষ, পশুপাখি, জলজ প্রাণী, বনজ সম্পদসহ বিস্তীর্ণ জনপদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। আইলার প্রভাবে উপকূলীয় এলাকার প্রায় দুই লাখ একর কৃষিজমি লোনা পানিতে তলিয়ে যায়। ‘দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইনের ধারা ২(৭)-এ বিদ্যমান ঝুঁকির সংজ্ঞা সংশোধনের সুপারিশে বলা হয়েছে, ঝুঁকির সংজ্ঞা বিস্তৃত ও সুনির্দিষ্ট করা প্রয়োজন। এতে অপর্যাপ্ত বনায়ন বা বন ধ্বংসের কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগের বৃদ্ধি; নদী বা জলাশয় ভরাটের ফলাফল; কোনো স্থাপনা নির্মাণে ত্র“টি বা যে উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি; স্থাপনা বা ভবন ব্যবহারের পর্যাপ্ত সুবিধাদি ও নিরাপত্তার ব্যবস্থার অভাবে ক্ষতিকর অবস্থা সৃষ্টি হওয়ার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত।’ এ ছাড়া আইনটিতে স্বাস্থ্যগত বিভিন্ন সমস্যাকেও দুর্যোগ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

অপরিকল্পিতভাবে ব্যাপক নগরায়ণ ও শিল্পায়নই মূলত জলবায়ু পরিবর্তনে দায়ী। এর ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছাড়াও জনজীবন হয়ে উঠছে দুর্যোগপূর্ণ। শব্দ ও বায়ুদূষণ, ক্ষতিকারক কার্বন ডাই-অক্সাইড, কার্বন মনো-অক্সাইড, হাইড্রোজেন সালফাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড, সালফার ডাই-অক্সাইড, হাইড্রোকার্বন প্রভৃতি গ্যাস, কলকারখানা, যানবাহন ও ইটভাটা থেকে নির্গত ধোঁয়া, ধুলাবালু ইত্যাদি কারণে স্বাস্থ্যব্যবস্থা অনেকটাই ভেঙে পড়েছে। সৃষ্টি হচ্ছে মাথাব্যথা, চোখ জ্বালা, শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, হৃদরোগ, রক্তস্বল্পতা ও চর্মরোগসহ বিভিন্ন রোগের। দেশের হাসপাতালগুলোতে রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এ দুর্যোগে শুধু মানুষই নয়, প্রাণী ও উদ্ভিদকুলও আক্রান্ত হচ্ছে চরমভাবে। পানিতে রাসায়নিক সার, কীটনাশক, শিল্পবর্জ্য, গৃহস্থালির বর্জ্য, জ্বালানি তেল, মলমূত্র, পয়োবর্জ্য ইত্যাদির কারণে ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক বাস্তুশৃঙ্খলা। বিশেষজ্ঞদের মতে, উদ্ভিদ-প্রাণিকুলের সহনশীল তাপমাত্রা ২৫-৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অথচ ইটভাটা থেকে ৫০০-৮০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস উত্তাপ ছড়ায়। এ ছাড়া এয়ার কন্ডিশনার, কল-কারখানার উত্তাপ, যানবাহনের উত্তাপ ইত্যাদি মিলিয়ে পরিবেশ যে কীভাবে দূষিত ও দুর্যোগকবলিত হচ্ছে, তা সহজেই অনুমেয়।

দুর্যোগের রকমফের

প্রকৌশলগত দুর্যোগ

প্রাকৃতিক দুর্যোগ হরহামেশা হলেও তা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা নেই মানুষের। কারণ, প্রাকৃতিক এ ধ্বংসযজ্ঞ রোধের কোনো উপায় নেই। তবে চেষ্টা করেছে সুষ্ঠু দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, বাঁধ, খাল, দুর্যোগ সহনীয় স্থাপনা নির্মাণের মাধ্যমে জীবনহানি ও সম্পদের ক্ষতি যতটা সম্ভব কমাতে। কিন্তু যখন মানুষ নিজেই কতিপয় দুর্যোগ সৃষ্টির জন্য দায়ী, তখন পরিস্থিতি হয় আরও ভয়াবহ। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশে। বিশ্বে ৯৫ শতাংশেরও অধিক মৃত্যু হয় এসব দেশেই। উন্নত দেশগুলোতে শ্রমিক মজুরি অনেকাংশে বেড়ে যাওয়ায় উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রতিনিয়তই গড়ে উঠছে পোশাক, ওষুধ, চামড়া, মোটরগাড়ি, জাহাজসহ বিভিন্ন শিল্পকারখানা। এসব কলকারখানায় কাজ করছে লাখ লাখ শ্রমজীবী মানুষ। ভুল ডিজাইন, নির্মাণ পরিকল্পনা, নিম্নমানের পণ্য ব্যবহার ইত্যাদির কারণে ঘটছে ভবনধস, অগ্নিকাণ্ড, স্বাস্থ্য সমস্যাসহ ভয়াবহ সব দুর্ঘটনা। এই দুর্ঘটনায় রূপ নিচ্ছে দুর্যোগে। তবে শিল্প-কারখানায় বিভিন্ন দুর্ঘটনা ঘটলেও এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড। শুধু শিল্প-কারখানাতেই নয়, প্রতিটি ভবনেই আগুনের এই ছোবল অত্যন্ত আগ্রাসী। রেডক্রসের তথ্যমতে, বিশ্বে প্রতিবছর ৭০ হাজার অগ্নিকাণ্ডের উৎস বসতবাড়ি। এ ছাড়া প্রকৌশল ত্র“টি ও অবহেলাজনিত কারণেও ঘটছে অসংখ্য দুর্ঘটনা। মানবসৃষ্ট এসব দুর্যোগ রোধে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন-২০১২ সংশোধনকৃত ১৩ সুপারিশে বলা হয়েছে, ‘২০০৩ সালে ডাকাতিয়া নদীতে লঞ্চডুবিতে শতাধিক মানুষের মৃত্যুসহ এ ধরনের নৌ-দুর্যোগে প্রাণহানি, স্পেকট্রাম ও ফিনিক্স গার্মেন্ট ভবনধস, নিমতলীতে ও তাজরীন ফ্যাশন গার্মেন্টসে অগ্নিকাণ্ড এবং সম্প্রতি সাভারের রানা প্লাজাধসে মানুষের প্রাণহানি ও পঙ্গুত্ববরণ মানবসৃষ্ট দুর্যোগ। এগুলো নিছক দুর্ঘটনা নয়। মানুষের লোভ, অবহেলা ও দায়িত্বহীনতার মর্মান্তিক ও অগ্রহণযোগ্য পরিণতি।’ একের পর এক মানবসৃষ্ট দুর্যোগ ঘটলেও নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না প্রাণহত্যার বিধ্বংসী এ মহোৎসব। এসব ঘটার অন্যতম কারণের মধ্যে রয়েছে-

ভবনধস

প্রায়ই ঘটছে ভবনধসের ঘটনা। তবে এসবের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ সাভারের রানা প্লাজাধস। এতে এক হাজার ২২৯ জন মানুষ প্রাণ হারায় আর হতাহত হয় আড়াই হাজারেরও বেশি। এ ট্র্যাজেডি নগর দুর্যোগের পূর্বাভাষের ইঙ্গিত। শহরে আগত মানুষের আবাসনের চাহিদা পূরণে নির্মিত হচ্ছে বহুতল ভবন। অপরিকল্পিত নগরায়ণ আর প্রকৌশলগত ত্র“টি থাকায় দেশের অসংখ্য স্থাপনা রয়েছে এ ধরনের ঝুঁকিতে। এসব বহুতল ভবনের অধিকাংশ সঠিক নিয়ম মেনে ও যথাযথ কর্তৃপক্ষের ছাড়পত্র ছাড়াই নির্মিত। নগর বিশেষজ্ঞ ও পরিকল্পনাবিদদের মতে, নগরকেন্দ্রিক দুর্যোগের বেশির ভাগের জন্যই দায়ী প্রকৌশলগত ত্র“টি। এ ছাড়া

  • পেশাদার ও অভিজ্ঞ স্থপতি বা প্রকৌশলী বাদ দিয়ে অনভিজ্ঞ প্রকৌশলীকে দিয়ে ভবনের নকশা প্রণয়ন ও নির্মাণ তদারকি
  • বিল্ডিং কোডসহ প্রচলিত ইমারত নির্মাণ আইন না মানা
  • ভেজাল ও নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রীর ব্যবহার
  • নির্মাণত্র“টি
  • নিচুজমি ভরাট করে ভবন নির্মাণ
  • দ্রুত নির্মাণের তোড়জোড়
  • সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথাযথ তদারকির অভাব
  • নির্মাণকাজে সমন্বয়হীনতা।

প্রায়ই ভবনধসের ঘটনা ঘটলেও দায়ী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয় না। ফলে এ জাতীয় দুর্ঘটনাও থামছে না। এসব দুর্ঘটনা রোধে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ-

  • ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র পাওয়ার পর ইমারত নির্মাণ বিধিমালার সর্বশেষ সংস্করণ অনুযায়ী নকশা করে কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অনুমতি নেওয়া
  • মাটি পরীক্ষা করা (জিওটেকনিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার বা মৃত্তিকা বিশেষজ্ঞ বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান কর্তৃক)
  • বাংলাদেশ স্থপতি ও প্রকৌশলী ইনস্টিটিউটের স্বীকৃত স্থপতি ও প্রকৌশলী দিয়ে ভবন ডিজাইন করা 
  • রাজধানীসহ দেশের বড় শহরের উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে শুধু পরিকল্পনা প্রণয়ন, বাস্তবায়ন, সমন্বয় ও নিয়ন্ত্রণের কাজে নিয়োজিত রাখা। নিজে কোনোরূপ প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে সরাসরি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত না হওয়া
  • বিদ্যমান বিধিসমূহের অসামঞ্জস্যতা চিহ্নিত করে তা দূর করা।

অগ্নিকাণ্ড

অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও যথাযথ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার অভাবেই ঘটে অগ্নিকাণ্ড। ভবনসমূহে অপ্রতুল অগ্নিনির্বাপক-ব্যবস্থার কারণে শুধু রাজধানীতেই কোটি মানুষ রয়েছে অগ্নিঝুঁকিতে। নিমতলী, তাজরীন ফ্যাশন, স্পেকট্রাম গার্মেন্টস, ফিনিক্স ভবন, বসুন্ধরা সিটি, জাপান গার্ডেন সিটি, বিএসইসি ভবনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড এরই উল্লেখযোগ্য কিছু দৃষ্টান্ত। পরপর এ ধরনের ঘটনা ঘটলেও নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ নেওয়া হলেও তা থামানো যাচ্ছে না, বিষয়টি যেন স্বাভাবিক নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ছাড়া নগরের বিভিন্ন বস্তিতে প্রায়ই লাগছে আগুন। উন্নত প্রযুক্তি, সুব্যবস্থাপনা ও যন্ত্রপাতির অভাবে আগুন থামানো যাচ্ছে না, ছড়িয়ে পড়ছে পুরো ভবনে। এ পরিস্থিতিতে আতঙ্কিত মানুষ জীবন বাঁচাতে হুড়োহুড়ি করে বেরোতে গিয়ে বা ওপর থেকে লাফ দিয়ে অনেকেই অকালে প্রাণ হারায়, কেউ হয় আহত। দমকল বাহিনী এসে পৌঁছানোর মধ্যে পুড়ে যায় অনেক কিছুই। রাজধানীতে অধিকাংশ বহুতল ভবনই যথাযথ নিয়ম মেনে অগ্নি প্রতিরোধী নয়। রাখা হয়নি জরুরি দুর্ঘটনা মোকাবিলার কোনো ব্যবস্থা। ফলে অগ্নিকাণ্ডসহ জরুরি দুর্ঘটনা মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ রাখতে পারছে সামান্যই অবদান। ফায়ার ফাইটিং সিস্টেমের ওপর হাউসিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিচার্স ইনস্টিটিউট (এইচবিআরআই) পরিচালিত এক সমীক্ষা মতে, অগ্নিনির্বাপণে রাজধানীর শতকরা ৮০ শতাংশ ভবনেই স্যান্ড টাব নেই। ৮২ থেকে ৯৫ শতাংশ সুউচ্চ ভবনে লাগানো হয়নি স্মোক ডিটেক্টর ও হিট ডিটেক্টর। ৬২ শতাংশেরও বেশি ভবনেই নেই ফায়ার অ্যালার্ম। শুধু তা-ই নয়, জরুরি পরিস্থিতিতে সুউচ্চ ভবনগুলোর আন্ডারগ্রাউন্ডে পর্যাপ্ত পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থাও রাখা হয়নি। তা ছাড়া অনেক জায়গাতেই জরুরিভাবে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি পৌঁছার মতো রাস্তাও হয়ে আছে বেদখল। ফলে তারা অনেক ক্ষেত্রেই অগ্নিকাণ্ডে ঘটনাস্থলে যথাসময়ে পৌঁছাতে পারে না। ফায়ার সার্ভিস সূত্রমতে, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা পর্যালোচনায় দেখা যায়, সর্বাধিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে বৈদ্যুতিক গোলযোগ বা শর্টসার্কিট থেকে। এ ছাড়া সিগারেটের আগুন, রান্নার চুলা, শিশুদের আগুন নিয়ে খেলা, যন্ত্রাংশের সংঘর্ষজনিত কারণেও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে অহরহ। অথচ বহু কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বাণিজ্যিক ভবন, মার্কেট, গার্মেন্টসে ন্যূনতম অগ্নিনির্বাপণ-ব্যবস্থা না থাকা, ঢাকার রাস্তাগুলোর অপ্রশস্ততা, ফায়ার সার্ভিসের নানা সংকট-সীমাবদ্ধতা; আর প্রচলিত আইনের প্রতি উপেক্ষাÑ এসবই অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে বহু গুণ। তাই অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে ও দ্রুত অগ্নিনির্বাপণে যা করণীয়।

  • ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র ছাড়া কোনো বহুতল বা বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের নকশা অনুমোদন বা সংশোধন না করা
  • বিল্ডিং কোড অনুযায়ী ভবনের অগ্নিনির্বাপণে ৫০ হাজার গ্যালন থেকে এক লাখ গ্যালন পর্যন্ত পানির মজুদ রাখা
  • ভবনে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপক, জরুরি নির্গমনব্যবস্থা, ফায়ার লিফট, ফায়ার অ্যালার্ম, দমকল বাহিনী প্রবেশে ভবনের পাশে যথেষ্ট পরিমাণে ফাঁকা জায়গা রাখা
  • ভবনে ধোঁয়া ও তাপ শনাক্তকারী ডিভাইস সংযোজন
  • বহুতল ভবনে নিয়মিত অগ্নি মহড়ার আয়োজন।

লঞ্চডুবি

নদীমাতৃক বাংলাদেশে লঞ্চডুবি অনেকটাই সড়ক দুর্ঘটনার আকার নিয়েছে। সম্প্রতি মুন্সিগঞ্জের মাওয়া-কাওড়াকান্দি নৌপথে পদ্মা নদীতে পিনাক-৬ লঞ্চ ডুবে যায়। অতিরিক্ত যাত্রী বহন ও প্রবল স্রোতেই ঘটে এ দুর্ঘটনাটি। এতে যাত্রী ধারণক্ষমতা ছিল সর্বোচ্চ ৮৫ জন। কিন্তু দুর্ঘটনার দিন দ্বিগুণেরও বেশি যাত্রী ওঠানো হয়। মাঝ নদী থেকে ডুবন্ত লঞ্চটিকে নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড, দমকল বাহিনী, পুলিশ, র‌্যাব, স্থানীয় জনগণের ব্যাপক তৎপরতা সত্ত্বেও কোনোভাবেই উদ্ধার করা যায়নি। বেশকিছু উদ্ধারকারী জাহাজ ও নানা প্রযুক্তি এমনকি সনাতন টোটকা ও কাপ্পা পদ্ধতিতেও লঞ্চটির কোনো হদিস বের করা যায়নি। সাধারণত এ ধরণের দুর্ঘটনা ঈদের আগে ও পরে বেশি হয়। এ ছাড়া মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ায় মেঘনা নদীতে এমভি মিরাজ-৪, সিরাজগঞ্জের যমুনায় নৌকাডুবি, কুষ্টিয়ার পদ্মা নদীতে নৌডুবিসহ অসংখ্য ঘটনা রয়েছে। ২০০০ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত দেশে লঞ্চ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে পাঁচ হাজারেরও বেশি মানুষ। সম্প্রতি সুন্দরবনের শ্যালা নদীতে জ্বালানি তেলবাহী জাহাজ ডুবে যায়। এতে সাড়ে তিন লাখ লিটারের বেশি ফার্নেস তেল সুন্দরবনে ছড়িয়ে পড়ে। নোঙর করা ওই জাহাজটিকে অন্য একটি পণ্যবাহী জাহাজ ধাক্কা দিলে এ দুর্ঘটনা ঘটে। এর আগে গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর ৬০০ মেট্রিক টন সিমেন্টের কাঁচামাল নিয়ে এম ভি নয়ন শ্রি-৩ নামে একটি জাহাজ পশুর চ্যানেলের জয়মনির ঘোল এলাকায় ডুবে যায়। একই মাসে পশুর চ্যানেলের হাড়বাড়িয়া এলাকায় প্রায় ৬৩০ মেট্রিক টন সিমেন্টের কাঁচামাল নিয়ে এম ভি হাজেরা-২ নামের আরও একটি মালবাহী জাহাজ ডুবে যায়।

বাংলাদেশ সোসাইটি অব মাস্টার মেরিনার্সের নৌ-দুর্ঘটনাবিষয়ক তদন্তে পাওয়া যায়, শতকরা ৩৪ ভাগ লঞ্চ দুর্ঘটনার কারণ অতিরিক্ত যাত্রী বহন। এ ছাড়া

  • ডিজাইন সমস্যা
  • নির্মাণত্র“টি
  • চালকের ভুল চালনা ও সতর্কতার অভাব
  • বিরূপ আবহাওয়া
  • ছাড়পত্র ও তদারকি প্রতিষ্ঠানের অবহেলা
  • ত্র“টি পাওয়া গেলেও তা মেরামত না করা
  • প্রশিক্ষিত জনবলের অভাব।  

বাংলাদেশের নদীগুলো অত্যন্ত খরস্রোতা। ডোবা নৌযান পলির আস্তরণের নিচে চলে যাওয়ায় প্রায়ই তা শনাক্ত করা যায় না। উন্নত প্রযুক্তি ও কার্যকর উদ্ধারকারী জাহাজেরও অভাব রয়েছে। বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ হলেও নৌ-সম্পদ ও প্রকৌশলকে ব্যবহার করে আমরা এগোতে পারছি না। একটু সচেতনতা, দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রকৌশলগত পুনঃডিজাইনের মাধ্যমে নৌপথকে আমরা সমৃৃদ্ধির পাথেয় করতে পারি। এ জন্য করণীয়-

  • দেশের নদ-নদী ও আবহাওয়ার প্রকৃতি বিবেচনায় নৌযান ডিজাইন
  • নৌযানের ডিজাইনের ত্র“টি দূর করা
  • চলাচলকারী নৌযানগুলোকে নিয়মিত পরীক্ষা করা
  • অতিরিক্ত যাত্রী না ওঠানো
  • আবহাওয়ার সংকেত মানা
  • প্রতিটি নৌযানে জীবন রক্ষাকারী যথাযথ উপকরণ নিশ্চিত করা
  • পর্যাপ্ত উদ্ধারকারী জাহাজ নির্মাণ
  • ডুবন্ত নৌযান শনাক্তে উন্নত প্রযুক্তি সংযোজন বা রেডিও সিস্টেম নিশ্চিত করা।

দেশব্যাপী বিদ্যুৎ বিপর্যয়

গত বছরের ১ নভেম্বর দেশব্যাপী ঘটে স্মরণকালের বিদ্যুৎ বিপর্যয়। ফলে হাসপাতালে চিকিৎসা, শিল্প উৎপাদন ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রভূত ক্ষতি হয়। জাতীয় গ্রিডে ক্রটির কারণেই বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো এমন ঘটনা ঘটে। যান্ত্রিক ক্রটির কারণে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ৯টি, নরসিংদীর ঘোড়াশাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ৬টি ইউনিটই বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে ভেড়ামারায় বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রের ত্র“টির কারণে সবকটি ইউনিটে একযোগে বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। এটা চরম প্রকৌশলগত ব্যর্থতা। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা যেন না ঘটে এ জন্য পর্যাপ্ত ব্যাকআপ সিস্টেম রাখা উচিত।

জিহাদ ট্র্যাজেডি

সম্প্রতি শাহজাহানপুর রেলওয়ে কলোনির পরিত্যক্ত একটি গভীর নলকূপের পাইপের ভেতরে পড়ে যায় শিশু জিহাদ। শুরু হয় উদ্ধার অভিযান। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা দড়ির সঙ্গে বস্তা বেঁধে ও অন্যান্য নানা প্রক্রিয়ায় উদ্ধারের সর্বাত্মক চেষ্টা করে। দেওয়া হয় অক্সিজেন, আনা হয় ক্রেন, পাঠানো হয় একাধিক ক্যামেরা। অথচ তাকে উদ্ধার তো দূরে থাক, শনাক্ত করতেও ব্যর্থ হয় তারা। ব্যর্থতার একপর্যায়ে কোনো উপায় না পেয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পরামর্শে বন্ধ হয় উদ্ধার কার্যক্রম। ঠিক এ সময়ে কয়েকজন উদ্যমী তরুণ নিজেদের উদ্ভাবিত ‘ক্যাচার’ নিয়ে উদ্ধারের শেষ চেষ্টা চালিয়ে সফল হয়।

কিন্তু প্রথম থেকেই এই উদ্ধার তৎপরতায় ছিল চরম সমন্বয়হীনতা ও সঠিক দিকনির্দেশনার অভাব। ফায়ার ব্রিগেডের কয়েকটি ইউনিট, পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দারা সাধ্যমতো চেষ্টা করেছিল শিশুটিকে বাঁচাতে। কিন্তু অভাব ছিল অভিজ্ঞতার। শিশুটি কোথায় আছে, কত নিচে আছে তার সঠিক অবস্থান নির্ণয় না করেই চলছিল উদ্ধার তৎপরতা। অনেকটা অন্ধকারে ঢিল ছোড়ার মতো! যে যার বুদ্ধি-কৌশলে কাজ করেছে! তা ছাড়া রেস্কিউ জোন হলেও ছিল না কোনো বিপৎসীমা। ফলে অগণিত মানুষের অতি উৎসাহ উদ্ধার অভিযানের পরিবেশই ব্যাহত করেছিল। এই হৃদয়বিদারক ঘটনায় কয়েকটি দিকের চরম অভাব লক্ষণীয়-

  • প্রকৌশলগত অবহেলা
  • উদ্ধারে সমন¦য়হীনতা
  • উদ্ধার পরিবেশ সৃষ্টির ব্যর্থতা
  • উপযুক্ত উদ্ধারকারী উপকরণের অভাব
  • সঠিক প্রযুক্তির অভাব।

নগরজুড়ে মৃত্যুফাঁদ

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় আমরা কতটা অসহায় তা বিগত কয়েকটি দুর্ঘটনা থেকে সহজেই অনুমেয়। রানা প্লাজাধস, লঞ্চডুবি, জিহাদ ট্র্যাজেডি সব একই সূত্রে গাঁথা। পাইপের ঢাকনা না থাকায় নির্মমভাবে প্রাণ গেল জিহাদের। এমন দুর্ঘটনার জাল বিছানো দেশব্যাপী। রাজধানীর প্রায় সব সড়কেই রয়েছে ঢাকনাবিহীন ম্যানহোল। প্রশাসনের দুর্বলতায় হরহামেশাই চুরি হয় লোহার ঢাকনা। কিন্তু নেই তা রোধে কোনো উপায় বা বিকল্প ঢাকনার ব্যবহার। এমনকি কর্তৃপক্ষ ন্যূনতম সতর্কতামূলক নির্দেশনার ব্যবস্থাও করে না। সচেতন কোনো নাগরিক হয়তো সেখানে গুঁজে দেয় কোনো গাছের ডাল বা লাঠি। তারপরও প্রতিনিয়তই ঘটছে দুর্ঘটনা। এমনকি এসব ম্যানহোলে পড়ে প্রাণ যেতে পারে জিহাদের মতো যে কারও স্কুলগামী সন্তানের! প্রায়ই ড্রেন ও ম্যানহোল পরিষ্কার করতে গিয়ে প্রাণ যায় পরিচ্ছন্নতাকর্মীর; বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে প্রাণ যায় পথচারীর; উড়ালসড়কের গার্ডার ভেঙে চাপা পড়ে নিচে থাকা মানুষ; ট্রেন দুর্ঘটনাসহ নানা প্রকৌশলগত ত্র“টিই মারছে হাজারো মানুষকে। যদিও এগুলো আলাদা আলাদা দুর্ঘটনামাত্র কিন্তু সবগুলোই সৃষ্টি করছে দুর্যোগ। মানুষ আতঙ্কিত! যেকোনো মুহূর্তে গ্যাসপাইপ ফেটে বা শর্টসার্কিট হয়ে ঘটতে পারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড অথবা পাহাড়, ভবন, গার্ডারধসে চাপা পড়তে পারে মানুষ অথবা হঠাৎ বন্যা, ঝড়, জলোচ্ছ্বাস যখন তখন হানা দিতে পারে কিংবা কোনো একটি ভাইরাসের আক্রমণে বিপুল মানুষের স্বাস্থ্যগত বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। এ ধরনের নানা দুর্যোগ মোকাবিলায় এবং পরবর্তী উদ্ধার তৎপরতায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সঠিক কর্মপদ্ধতি অতীব জরুরি।

নদীমাতৃক বাংলাদেশে লঞ্চডুবি অনেকটাই সড়ক দুর্ঘটনার আকার নিয়েছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বা জরুরি অবস্থা মোকাবিলায় দরকার সব ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলার পূর্বপ্রস্তুতি। জীবনহানি ও ক্ষয়ক্ষতি যতটা সম্ভব কমানো এবং দ্রুত উদ্ধারকার্য চালিয়ে স্বাভাবিক পরিস্থিতি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি পরিকল্পিত ও সমনি¦ত ব্যবস্থা গ্রহণ। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় পাঁচটি পদক্ষেপ অবশ্য করণীয়। এগুলো হচ্ছে- প্রতিরোধ (Prevention), উপশম (Mitigation), পূর্বপ্রস্তুতি (Preparedness), পদক্ষেপ (Response) এবং উদ্ধার (Recovery).

প্রতিরোধ

দূর্যোগ ব্যবস্থাপনার প্রধান ধাপই প্রতিরোধ। দুর্যোগের ধরন বিবেচনায় পরিকল্পিতভাবে তা প্রতিরোধ করা সম্ভব। যেমন-বৈদ্যুতিক তার ছিঁড়ে গেলে, বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ হলে, গ্যাসপাইপ ফুটো হলে তা সংস্কার বা কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা। প্রতিরোধে করণীয়-

  • প্রথমেই বিপদ ও ঝুঁকি চিহ্নিতকরণ
  • এ সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে অভিযোগ জানানো
  • ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামো সংস্কার।

উপশম

ব্যক্তিগত উপশম বা নিয়ন্ত্রণ দুর্যোগ মোকাবিলায় সবচেয়ে কার্যকর। নিজে ও পরিবারের সদস্যদের দুর্যোগবিষয়ক প্রশিক্ষণ গ্রহণের মাধ্যমে অনেক ঝুঁকিই এড়ানো সম্ভব। দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় এই প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা উচিত। এটা জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায়ও অবদান রাখবে। উল্লেখ্য, রেড ক্রিসেন্ট ও রেডক্রসের ওয়েবপেজে দুর্যোগ মোকবিলায় করণীয় বিষয়ে ট্রেনিং সাইট রয়েছে। স্থান সম্পর্কে সঠিক ধারণা, আবাসস্থলের ম্যাপ বা নকশা সংরক্ষণ, কোনো বিস্ফোরকদ্রব্য থাকলে সরিয়ে অথবা নিরাপদে রাখা, মই, দড়ি, ফায়ার সার্ভিস ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের জরুরি ফোন নম্বর সংগ্রহে রাখা প্রয়োজন।

প্রস্তুতি

অদ্যবধি সংগঠিত দুর্যোগ মোকাবিলায় শনাক্তকারী ও উদ্ধার সহায়ক যন্ত্রপাতি এবং দক্ষ প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারীর অভাব চূড়ান্তভাবে লক্ষণীয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় স্থানীয় জনতা উদ্ধার তৎপরতায় অংশ নেয়, যাদের নেই কোনো প্রশিক্ষণ, নেই কোনো কারিগরি জ্ঞান। আবেগের তাড়নায় ঝাঁপিয়ে পড়ে পরিস্থিতি আরও খারাপ করে। এ জন্য দুর্যোগ অবধারিত জেনে সঠিক প্রস্তুতি নিতে হবে। যেমন- বছরের মোটামুটি নির্দিষ্ট সময়ে বন্যা হয়। অন্যান্য দুর্যোগ বিবেচনায় নিয়ে স্বেচ্ছাসেবক দল ও উদ্ধার সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখতে হবে। প্রাথমিক অবস্থা সামাল দেওয়া গেলে পরবর্তী সময়ে বিশেষজ্ঞ দল এসে যোগ দেবে। প্রস্তুতির জন্য জরুরি- 

  • স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন
  • প্রাক-দুর্যোগ প্রশিক্ষণ ও মহড়া
  • জরুরি রক্তের জোগান নিশ্চিত করা
  • অ্যাম্বুলেন্স প্রস্তুত রাখা, সাইক্লোন শেল্টার, নৌকা, শুকনা খাবার, বিশুদ্ধ পানি, জরুরি ওষুধ ইত্যাদি প্রস্তুত রাখা।

পদক্ষেপ

দুর্যোগকালীন ও পরবর্তী সময়ে ক্ষতি নিরসনে নিতে হবে কতগুলো জরুরি পদক্ষেপ। এর মধ্যে অন্যতম নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ। এ সম্পর্কে সকল স্বেচ্ছাসেবক ও উদ্ধারকারী অন্যান্য সংস্থাকে বিষয়টি সম্পর্কে দ্রুত জানাতে হবে যেন তারা যথাসম্ভব উদ্ধারকাজে অংশ নিতে পারে। এ ছাড়া উদ্ধারকাজ পূর্বপরিকল্পনামাফিক করতে হবে। দুর্ঘটনা আক্রান্ত ব্যক্তিও যদি তার অবস্থান সম্পর্কে উদ্ধারকারীকে জানাতে সক্ষম হয় তাহলে উদ্ধারের সম্ভাবনা অনেকাংশে নিশ্চিত হবে।

জরুরি উদ্ধার

দুর্যোগ মানেই ধ্বংস; জীবনহানি; বাঁচার আকুতি। যত দ্রুত উদ্ধার তৎপরতা চালানো যায় ততই ক্ষতি কমানো সম্ভব। রানা প্লাজাধসে স্থানীয় অনেকেই উদ্ধারে অংশ নেওয়াই অনেক মানুষকে বাঁচানো সম্ভব হয়েছিল। এ জন্য জরুরি উদ্ধার তৎপরতার জন্য সর্বদা প্রস্তুত থাকতে হবে। কিন্তু রানা প্লাজায় উদ্ধারকারীদের প্রয়োজনীয় উদ্ধার সরঞ্জাম ছিল না। এমনকি ন্যূনতম নিরাপদ জুতা, চশমা, দস্তানা, হেলমেটও না। অথচ জরুরি উদ্ধারে প্রয়োজন উপযুক্ত যন্ত্রপাতি। যেমন-

ব্যক্তিগতসমন্বিত/দলগত
দড়িমই
টর্চলাইটতাঁবু
দেয়াশলাইবৈদ্যুতিক করাত
ফাস্ট এইড বক্সএয়ার কম্প্রেসার
দস্তানাতালা কাটার
হেলমেটতাপরোধী পোশাক
ছুরিখননযন্ত্র
বাঁশিকংক্রিট/স্ল্যাব কাটার মেশিন
কুঠারজেনারেটর
ডাস্ট মাস্কপোর্টঅ্যাবল পাম্প
হাতুড়িধোঁয়া নির্গমনকারী যন্ত্র
শাবলচেইন পুলি
কোদালগ্যাস ডিটেক্টর
গ্যাস মাস্কঅগ্নিপ্রতিরোধী পোশাক

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রেক্ষিত বাংলাদেশ

২০১২ সালের নভেম্বরে ‘দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন-২০১২’ অনুমোদন লাভের পর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে’ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর (ডিডিএম)’ প্রতিষ্ঠিত হয়। উদ্দেশ্য ঝুঁকি হ্রাস কর্মসূচির মাধ্যমে দুর্যোগের বিপদাপন্নতা হ্রাস, দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের সামর্থ্য বৃদ্ধির জন্য কার্যকর মানবিক সহায়তা কর্মসূচি গ্রহণ, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস এবং জরুরি সাড়াদানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা কর্তৃক গৃহীত বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্যে সমন্বয় সাধন। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, বৈজ্ঞানিক, কারিগরি, গবেষণা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগী, জাতিসংঘের এজেন্সিসমূহ, সরকারি-বেসরকারি সংস্থাসমূহ যারা দুর্যোগে ঝুঁকি হ্রাস এবং সাড়াদান ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে নেটওয়ার্কিং এবং সহযোগীরূপে কাজ করা। এ ধরনের বিষয়গুলো নীতিমালায় থাকলেও প্রধান সমস্যা সমন¦য়সাধন কোনোভাবেই নিশ্চিত হচ্ছে না। প্রকৌশল ও নগরকেন্দ্রিক দুর্যোগে ফায়ার ব্রিগেড একমাত্র ভরসা। কিন্তু দুর্যোগের ধরন এক নয়। একটি মাত্র সংস্থার পক্ষে সব দুর্যোগ মোকাবিলা সম্ভব নয়। এমনকি সাধারণ মানুষ বুঝতেও পারে না কোনো দুর্যোগ বা দুর্ঘটনায় কোথায় অভিযোগ বা আকুতি জানাতে হবে। এ জন্য উন্নত বিশ্বের মতো এ দেশেও একটি সমনি¦ত দুর্যোগ নিয়ন্ত্রণ সেন্টার প্রয়োজন। বাংলাদেশ অতিমাত্রায় দুর্যোগপ্রবণ হওয়াই এ আবেদন অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত। এই নিয়ন্ত্রণ সেন্টার সারা দেশের দুর্যোগ পরিস্থিতি বিচার-বিশ্লেষণ, গবেষণা, প্রচারণা এবং সমন¦য় সাধন করবে। যে কেউ এখান থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য ও নির্দেশনা পাবে এবং দুর্যোগ হলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে নির্দেশনা দেবে।  

রাষ্ট্রীয়ভাবে দুর্যোগ মোকাবিলার মডেল

পরিবর্তিত এ পৃথিবীতে দুর্যোগ মানুষের নিত্যসঙ্গী। দুর্যোগ থেকে বাঁচতে মানুষের যেমন রয়েছে সংগ্রামী মনোভাব তেমনি জীবন বাজি রেখে অন্যকে বাঁচানোর প্রাণান্ত চেষ্টা। প্রয়োজন প্রশিক্ষণ আর সহযোগিতার। দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম উদাহরণ হলেও পর্যাপ্ত উদ্ধার সরঞ্জাম ও সেগুলো পরিচালনায় দক্ষ জনবল সৃষ্টি সম্ভব হয়নি। দুর্যোগ মোকাবিলায় হতে হবে প্রস্তুত, নিশ্চিত করতে হবে পেশাদারত্ব। নগরকেন্দ্রিক দুর্যোগ যেন না হয় এ জন্য প্রকৌশলীদের হতে হবে কাজে আরও দায়িত্বশীল। এমনকি বিশেষ সফটওয়্যার, রোবট, ড্রোন, বিশেষ যান, ভিজুয়াল ক্যামেরা ইত্যাদি সংযোজনের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ ও পরিবর্তিত দুর্যোগ মোকাবিলায় হতে হবে সদা প্রস্তুত।

প্রকাশকাল: বন্ধন ৫৮তম সংখ্যা, ফেব্রুয়ারি ২০১৫

মারুফ আহমেদ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top