হরেক রকম রড

স্টিল বার বলতে কী বোঝায়?

স্থাপনা বা অবকাঠামো নির্মাণে আরসিসির কাজে রেইনফোর্সমেন্ট হিসেবে যে রড ব্যবহার করা হয়, তা-ই স্টিল বার। সিমেন্ট, বালু এবং পাথর বা খোয়ার মিশ্রণের মাধ্যমে তৈরি করা হয় কংক্রিট। আর এই কংক্রিটের ঢালাই ধরে রাখার জন্য প্রসারণযোগ্য শক্তি এবং স্থিতিস্থাপকতা বাড়ানোর জন্যই ব্যবহার করা স্টিল বার। স্টিল বারের রয়েছে বিশাল প্রসারণক্ষমতা ও নমনীয়তা। প্রাণিদেহের হাড়ের মতোই স্টিল স্থাপনার কাঠামো হিসেবে কাজ করে। স্থাপনার কলাম, বিম ও স্ল্যাব তৈরিতে বিভিন্ন মাপ ও গ্রেডের রড ব্যবহৃত হয়। 

স্টিল বার কত ধরনের হয়ে থাকে?

স্টিল বার সাধারণত দুই ধরনের। যথা-

১.     মাইল্ড স্টিল বার ও

২.    ডিফর্মড স্টিল বার।

তবে বিস্তারিত অর্থে স্টিল বারকে আরও কয়েকটি ভাগে ভাগ করা করা হয়। যেমন-

১.     প্লেইন বা স্ট্রেইট বার

২.    ডিফর্মড বার

৩.    টুইস্টেড বা টুইস্টিং বার

৪.    স্কয়ার বার।

প্লেইন বা স্ট্রেইট বার বলতে কী বোঝায়?

উৎপাদনের সময় যেসব রড বা স্টিলের পৃষ্ঠদেশ মসৃণ রাখা হয়, তাকে প্লেইন বা স্ট্রেইট বার বলা হয়। আগে এ ধরনের রডের ব্যবহার বেশি হলেও এখন ডিফর্মড বারের ব্যবহার বেড়েছে। বিম ও স্লাব তৈরিতে প্লেইন বার ব্যবহৃত হয়। এই রডের শক্তিমাত্রা কম। তা ছাড়া পৃষ্ঠদেশ মসৃণ হওয়ায় কংক্রিটের সঙ্গে বন্ডিংটা সুদৃঢ় হয় না। তবে এই রড সহজেই বেন্ড করা তথা বাঁকানো যায়।

ডিফর্মড বার কী?

উৎপাদনের সময় যেসব রড বা স্টিলের পৃষ্ঠদেশ অমসৃণ রাখা হয়, সে বারসমূহকে ডিফর্মড বার বলা হয়। এ ধরনের বারে প্রচুর খাঁজকাটা দাগ থাকে। ফলে এতে কংক্রিট দৃঢ়ভাবে আটকে থাকে এবং কংক্রিটে ফাটল সৃষ্টিতে বাধা দেয়। তা ছাড়া উন্নত প্রযুক্তিতে উৎপাদিত হয় বিধায় এই বারের শক্তিমাত্রা অনেক বেশি। নির্মাণকাজে রডের পরিমাণও লাগে কম। এ ধরনের স্টিল বারের সঙ্গে আংটা ব্যবহার করার প্রয়োজন হয় না।

টুইস্টেড বা টুইস্টিং বার কী?

টুইস্টেড বার ডিফর্মড বারের মতোই একধরনের রড। তবে এই রডের ম্যাকানিক্যাল লকিং সিস্টেম অনেক বেশি। ডিফর্মড বারের খাঁজের ওপর অতিরিক্ত প্যাঁচানো খাঁজ সৃষ্টি করা হয় এই রডে। ফলে স্টিল ও কংক্রিটের মধ্যে অধিক বন্ধন সৃষ্টি হয়। আমাদের দেশে এই রডের প্রচলন তেমন না থাকলেও বিশে^র বিভিন্ন দেশে উৎপাদিত হচ্ছে এই টুইস্টেড বার।

স্কয়ার বার কী?

স্টিল স্কয়ার বার একধরনের চারকোনা আকৃতির হট রোলড রিজিড বার। সাধারণত জানালা, রেলিং, সিঁড়ির গ্রিল, গেট ও সীমানাপ্রাচীর তৈরিতে এই বার ব্যবহার করা হয়।

কার্বনের ওপর ভিওি করে স্টিল কত প্রকার?

কার্বনের ওপর ভিওি করে স্টিল ২ প্রকার। তা হচ্ছে-

১.     মাইল্ড

২.    স্টেইনলেস স্টিল।

স্টিল বার রডের গায়ে ৪০ গ্রেড, ৬০ গ্রেড ও ৭২ গ্রেড এবং ৪০০ W, ৫০০ W বা ৫৫০ W লেখা থাকে কেন? 

স্থাপনার আয়তন ও ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে নির্মাণে বিভিন্ন মানের রড ব্যবহার করা হয়। এসব রডের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ৪০ গ্রেড, ৬০ গ্রেড ও ৭২ বা ৭২.৫ গ্রেড। রডের নমনীয় বিন্দুর সর্বোচ্চ শক্তিকে গ্রেড বলা হয়। বিস্তারিত অর্থে বলতে গেলে-

৪০ গ্রেডের রডের টান সহ্য করার ক্ষমতা ৪০,০০০ psi (Pound per Square Inches) এবং ৬০ গ্রেডের রডের টান সহ্য করার ক্ষমতা ৬০,০০০ ঢ়ংর. ৪০ গ্রেড রডের চেয়ে ৬০ গ্রেড রডের শক্তি বেশি। অর্থাৎ যে ইস্পাতের প্রসারণ ঘটাতে প্রতি বর্গইঞ্চিতে কমপক্ষে ৬০ হাজার পাউন্ডের সমপরিমাণ চাপ প্রয়োগ করতে হয়, তাকে গ্রেড ৬০ ইস্পাত বলে। এর বেশি লোড দিলে তা ভেঙে যেতে পারে।

৪০ গ্রেডের রড এখন খুব কম ব্যবহৃত হয়। ভবন তৈরিতে সাধারণত ৬০ গ্রেডের রডই বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। ৭২ গ্রেডের রড হচ্ছে এক্সট্রিম গ্রেড। বহুতল ভবন তৈরিতে এই গ্রেডের রডের ব্যবহার বেশি।

আর W অর্থ Weldable মানে এটি ওয়েল্ডিং করা যাবে। এখানে ড দ্বারা ডবষফ বোঝায়, যার ব্যবহারিক অর্থ ঝালাই। অর্থাৎ রডের কম্প্রেসিভ লোড বহনের শক্তি আর ৫০০ হলো মেগাপ্যাস্কেলে দেওয়া থাকে, যেটা পিএসআইয়ে নিতে হলে ১৪৫ দ্বারা গুণ করতে হয়। যেমন,

৫০০ x ১৪৫ = ৭২,৫০০ পিএসআই

১ মেগা প্যাস্কেল = ১৪৫ পাউন্ড/স্কয়ার ইঞ্চি

(১ কেজি = ২.২০৬ পাউন্ড)

অর্থাৎ রডের পীড়ন বহন করার শক্তি ৭২,৫০০ পিএসআই বা রডটি ৭২.৫ গ্রেডের এবং ৫০০ মেগাপ্যাস্কেল

সে ক্ষেত্রে, ৪০০ মেগা প্যাস্কেল x ১৪৫ পাউন্ড = ৫৮,০০০ পিএসআই বা ৬০ কেএসআই (ksi)

          ৫০০ মেগা প্যাস্কেল x ১৪৫ পাউন্ড = ৭২,৫০০ পিএসআই বা ৭২ কেএসআই

৫৮,০০০ না ধরে ৬০০০০ ধরে রডের শক্তি নির্ণয় করা হয়।

টিএমটি স্টিল বার কাকে বলে?    

টিএমটি এর পূর্ণ অর্থ থার্মো-মেকানিক্যালি ট্রিটেড। অর্থাৎ থার্মো-মেকানিক্যালি ট্রিটমেন্ট পদ্ধতির মাধ্যমে এই বার প্রস্তুত করা হয় বিধায় একে বলা হয় টিএমটি বার। অন্যান্য রডের তুলনায় এই বার উচ্চ শক্তিসম্পন্ন বা হাই-স্ট্রেন্থ রেইনফোর্সমেন্ট সম্পন্ন। এই রডের অন্যতম বৈশিষ্ট্য, বাইরে অত্যন্ত শক্ত কিন্তু ভেতরে কিছুটা নমনীয়। কারণ, উৎপাদনকালে হট রোলড স্টিল বারকে টেম্পকোর ওয়াটার কুলিং সিস্টেমের মধ্য দিয়ে প্রেরণ করানো হয়। তাপমাত্রার এমন হঠাৎ তারতম্যে রডের বাহ্যিক লেয়ার হয়ে ওঠে অত্যন্ত দৃঢ় ও শক্তিমানসম্পন্ন। আর ভেতরের লেয়ারের তাপমাত্রায় কম প্রভাব পড়ায় তা থাকে অপেক্ষাকৃত নমনীয়। ফলে এই বার অর্জন করে উচ্চশক্তি ও প্রসারণযোগ্য ক্ষমতা, যা ভূমিকম্পরোধী স্থাপনা নির্মাণে অধিক কার্যকরী। এই বারের গায়ে কোনো ধরনের ফাটল থাকে না। তা ছাড়া এই রড মরিচারোধী ও ওয়েল্ডঅ্যাবল ক্ষমতা থাকায় আরসিসি নির্মাণকাজে অধিক গ্রহণযোগ্য।

প্লেইন বার ও ডিফর্মড বারের মধ্যে পার্থক্যসমূহ কী কী?

প্লেইন বার ও ডিফর্মড বারের মধ্যে বেশ কিছু পার্থক্য রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে-

প্লেইন বারডিফর্মড বার
রড বা স্টিলের পৃষ্ঠদেশ মসৃণ হওয়ায় কংক্রিটের সঙ্গে বন্ডিং দৃঢ় হয় না।রড বা স্টিলের পৃষ্ঠদেশ অমসৃণ ও খাঁজকাটা হওয়ায় কংক্রিটের সঙ্গে অধিকতর বন্ডিং সৃষ্টি করে।
বন্ডিংয়ে জন্য হুক দিতে হয়।বন্ডিংয়ের জন্য হুক দিতে হয় না।
কম শক্তিশালী হওয়ায় রড বেশি লাগে।অধিক শক্তিশালী হওয়ায় তুলনামূলকভাবে রড কম লাগে।
ওভার ল্যাপিংয়ের দৈর্ঘ্য বেশি দিতে হয়।ওভার ল্যাপিংয়ের দৈর্ঘ্য কম দিতে হয়।
এই রড সহজেই বেন্ড করা বা বাঁকানো যায়।সহজেই বেন্ড করা বা বাঁকানো যায় না।

ভালো রড চেনার উপায় কী কী?

স্থাপনা বা অবকাঠামো নির্মাণে গুণগতমানের রডের কোনো বিকল্প নেই। ভালো রড ভূমিকম্প, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও প্রকৃতির বৈরী পরিবেশের ঝুঁকি কমিয়ে স্থাপনার স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে। বাজারে বিভিন্ন ধরনের রড পাওয়া যায়। তবে ভালো রড চেনার কিছু উপায় রয়েছে। ভালো রডের বিশেষত্ব হলো:

  • স্টিল বার বা রড হবে পরিষ্কার ও চকচকে
  • স্টিল বার বা রডের গায়ে কোনো প্রকারের ফাটল থাকবে না
  • রডে বাড়ি দিলে ঝুরঝুর শব্দ হবে না
  • স্টিল বার বা রডকে ৯০ থেকে ১৩৫ ডিগ্রি পর্যন্ত বেন্ড করা যাবে এবং পুনরায় সোজা করা যাবে, না হলে বুঝতে হবে এটি ভালো রড না
  • রিবেন্ড বা পুনরায় সোজা করার পর কোনো ক্র্যাক বা ফাটল দেখা যাবে না
  • প্রতিটি রডের সঙ্গেই থাকবে ট্রেডমার্ক।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ১১৬তম সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৯।

কাজী গোলাম মোর্শেদ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top