স্থাপত্যশৈলীর নান্দনিকতম নিদর্শন হিসেবে বিশ্বের মানচিত্রে যে কয়টি স্থাপনা স্বমহিমায় উজ্জ্বল, স্থাপত্যবিদ্যার নিপুণ সৃষ্টিতে যে স্থাপনাটির বিশেষত্ব কখনো কখনো বাস্তবতাকেও হার মানায়, তা যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব ডিফেন্সের সদর দপ্তর পেন্টাগন। প্যটোম্যাক নদীবিধৌত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অঙ্গরাজ্য ভার্জিনিয়ার আর্লিংটনে অবস্থিত পঞ্চভুজাকৃতির ভবন পেন্টাগন। সাড়ে ছয় মিলিয়ন বর্গফুট জায়গাজুড়ে অবস্থিত এ সামরিক অফিসটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় কিন্তু ছোট উচ্চতার ভবন।
এবার পেন্টাগন নির্মাণের ইতিহাস একটু ফিরে দেখা যাক। প্রখ্যাত আমেরিকান আর্কিটেক্ট জর্জ বার্গস্ট্রমের (১৮৭৬-১৯৫৫) নকশায় এবং জন ম্যাকশেইন এর ঠিকাদারিতে ১১ সেপ্টেম্বর ১৯৪১ সালে বিশাল এ ভবনের নির্মাণকাজ শুরু হয়। সময়টা তখন অস্থির। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোলে চিন্তিত আমেরিকা। তখন গ্রেগরি ভবনে চলত আমেরিকার ন্যাশনাল ডিফেন্সের কাজ। এ ছাড়া বিচ্ছিন্নভাবে আরও ১২টিরও বেশি ভবনে বিভিন্ন উইংয়ের কাজ চলত। কেননা আমেরিকাও হয়তো জড়িয়ে পড়তে পারে চলমান বিশ্বযুদ্ধে। বিশেষ করে জার্মানি কর্তৃক রাশিয়া আক্রমণের পর থেকে বিষয়টি আমেরিকান জেনারেলদের চিন্তিত করে তোলে। এরই ফলে মূল হেডকোয়ার্টার স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন জেনারেল ব্রেইন সমারভিল। তৎকালীন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্টকে সেনাবাহিনীর কাজের স্থান সংকুলানসহ সব উইংকে একত্র করে এক ছাদের নিচে হেডকোয়ার্টার স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে সক্ষম হন জেনারেল সমারভিল। ২ সেপ্টেম্বর ১৯৪০ প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট এর অনুমোদন দেন। ১৯৪০ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ভবনটি নির্মাণের ব্যাপারে ঠিকাদার জন ম্যাকশেইনের সঙ্গে ৩ দশমিক ১ কোটি ডলারের (বাংলাদেশি টাকায় ২৪৮ কোটি) চুক্তি সম্পাদিত হয়। পেন্টাগন নির্মাণের জন্য ইউএস সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে নিযুক্ত হন কর্নেল লেসলি গ্রোভস। তাঁর চাহিদা ছিল পেন্টাগনের এক বর্গফুট জায়গা যেন ১৫০ পাউন্ড ওজন বহনে সক্ষম হয়। এ ছাড়া যুদ্ধের কারণে তখন স্টিল প্রাপ্তির স্বল্পতাহেতু ভবনটিতে খুব কম স্টিল ব্যবহার করা হয়।
পেন্টাগন নির্মাণের আগের কথা
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে ইউএস সেনাবাহিনী চেয়েছিল যত দ্রুত সম্ভব ভবনটি নির্মাণ করতে। যার কারণে ভবন নির্মাণ এবং নকশা প্রণয়নের কাজ চলতে থাকে একই সঙ্গে। ভবনের এক একটি উইং নির্মাণের পর সেখানে সেনাবাহিনীর নিজস্ব কাজ শুরু হতো। ১ জুন, ১৯৪২ সালের মধ্যে বেশির ভাগ নকশার কাজ শেষ হয়। এরই মধ্যে ‘পার্ল হারবার’ আক্রান্ত হওয়ায় ভবনটির নির্মাণ দ্রুত শেষ করার তাগাদা দেওয়া হয়। অবশেষে ১৯৪৩ সালের ১৪ জানুয়ারি ভবনটি উদ্বোধনের আগে ১৩ হাজার শ্রমিকের ১৬ মাসের নিরলস শ্রমের বিনিময়ে নির্মিত হয় চমৎকার এ ভবনটি।
শুরুতে মূল জায়গাটি ছিল একটি জলাভূমি। ৫ দশমকি ৫ মিলিয়ন ঘনফুট মাটি ভরাট করে এবং ৪১ হাজার ৪৯২টি পিলার পুঁতে স্থাপনার মূল ভিত তৈরি করা হয়। প্যাটোম্যাক নদী হতে ৬ দশমিক ৮৯ লাখ টন বালু ও পাথর উত্তোলন করে ভবন নির্মাণের জন্য জলাভূমি ভরাট করা হয়। বিশালাকৃতির এ ভবন নির্মাণে তৎকালীন ৮৩ মিলিয়ন ডলার খরচ হয় যা কি না আজকের ১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারের সমমানের (বাংলাদেশি টাকায় প্রায় আট হাজার ৮০০ কোটি টাকা)। মাত্র ৭৭ ফুট উচ্চতার পাঁচতলাবিশিষ্ট ভবন এটি। মূল ভবন ছাড়াও এর রয়েছে সুবিশাল দ্বিতীড তলা বেসমেন্ট। পঞ্চভুজাকৃতির এ ভবনের প্রতিটি কোণ ৯২১ ফুট লম্বা, যা আমেরিকার ক্যাপিটল ভবনের সমান। ১৭ দশমিক ৫ মাইল আয়তনের করিডোরগুলো তিনটি অ্যাম্পায়ার স্টেট বিল্ডিংয়ের সমান। তবে মজার ব্যাপার হলো, ১৭ দশমিক ৫ মাইল আয়তনের করিডোরের এক কোণ থেকে বিপরীত কোণে যেতে সময় লাগে মাত্র সাত মিনিট। এ করিডোরগুলোকে বরা হয় ‘রিং করিডোর’, যা কি না একটি অপরটির সঙ্গে আংটির মতো সংযুক্ত। সম্পূর্ণ অফিসটি ৪১ একর জায়গাজুড়ে অবস্থিত। পার্কিংয়ের আয়তন অফিসের মোট আয়তনের বেশি, ৬৭ একর। ১৩১টি স্টেয়ারওয়েজ, ১৩টি এলিভেটর, ১৯টি এসকেলেটর, ২৮৪টি বিশ্রামাগার, ৬৯১টি ঝরনা, সাত হাজার ৭৫৪টি জানালা, ৩০০ জন বেসামরিক লোক এবং ২৩ হাজারজন অফিশিয়াল নিয়ে এ ভবনটি যেন নিজেই এক শহর। অফিসটিতে ব্যবহৃত টেলিফোনের কেব্লের দৈর্ঘ্য কত জানেন? মাত্র এক লাখ মাইল এবং প্রতিদিন মাত্র ১০ লাখ মেইল এ অফিস থেকে নানা স্থানে পাঠানো হয়।
পেন্টাগন তৈরির প্রথমদিকে সেখানকার কালো ও সাদা অফিশিয়ালদের জন্য আলাদা আলাদা বাথরুম ও টয়লেট তৈরি করা হয়। কালোদের জন্য খাবার ঘর তৈরি করা হয়েছিল বেজমেন্টে। এ কারণে প্রয়োজনের তুলনায় পেন্টাগনে টয়লেটের সংখ্যা ছিল দ্বিগুণ। জুন ১৯৪১ সালে প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট এ বর্ণবাদ প্রথা রোহিত করে আদেশ জারি করেন। তিনি কর্নেল লেসলি গ্রোভসকে টয়লেটের ওপরে ‘Only for white’ (শুধু সাদাদের জন্য) লেখা মুছে ফেলার নির্দেশ দেন। ১৯৬০ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে বর্ণবাদ প্রথার বিলুপ্তির পূর্ব পর্যন্ত একমাত্র পেন্টাগনই ছিল কালো-সাদার সমঅধিকারের একমাত্র নিদর্শন।
২০০৩ সালে চালু হওয়া পিৎজা হাট, কেএফসিসহ পেন্টাগনে রয়েছে ২০টিরও বেশি নিজস্ব ফাস্টফুড চেইন রেস্টুরেন্ট। রয়েছে পেন্টাগন অ্যাথলেটিক সেন্টার, যা কি না ৫৫ বছরের পুরোনো পেন্টাগন অফিসারস অ্যাথলেটিক ক্লাবের নতুন সংস্করণ। এ ছাড়া বেজমেন্টে রয়েছে মেডিটেশন ও প্রার্থনাকক্ষ। পেন্টাগন চত্বরে প্রতিবছর আয়োজন করা হয় ‘Marine Corps Marathon’ এবং ‘Army Ten-Miler’ দৌড়ের প্রতিযোগিতার, যা সবার কাছে পেন্টাগনের অন্যতম মূল আকর্ষণ।
‘মার্চ অন দ্য পেন্টাগন’ স্লোগান দিয়ে ২১ অক্টোবর, ১৯৬৭ সালে ৩৫ হাজার নারী-পুরুষ ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরোধিতা করে মিছিল করে। সে সময় ৩৫ হাজার মানুষের মিছিলে ২১ হাজার ফোর্স নিয়োজিত ছিল শুধু তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে।
আধুনিকীকরণের জন্য ‘পেন্টাগন রিনোভেশন প্রোগ্রাম’-এর আওতায় ১৯৯৮ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত বিভিন্নভাবে ভবনটির সংস্কার করা হয়। এ সংস্কারের আওতায় ছিল পেন্টাগনের ডিজাইন পরিবর্তন, নিরাপত্তা বৃদ্ধি, ভবনের পুরোনো অ্যাসবেস্টর তুলে ফেলা এবং ভবনের সাত হাজার ৭৫৪টি জানালার অধিকাংশ সিল করে দেওয়া। নিরাপত্তার কারণে শুধু ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানালা রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
আমেরিকার ডিফেন্স সিস্টেমের অত্যন্ত সুরক্ষিত ও গোপনীয় এ ভবনে প্রতিবছর ১ দশমিক শূন্য ৬ লাখ দর্শনার্থীকে পরিদর্শনের অনুমতি দেওয়া হয়। সেখানে দর্শনার্থীদের ভবনটির সম্পূর্ণ ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার পাশাপাশি সাদরে আপ্যায়নও করতে কার্পণ্য করে না পেন্টাগন কর্তৃপক্ষ।
প্রকাশকাল: বন্ধন ৫৬তম সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৪