প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে কী পরিমাণ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে কিংবা আগুনের কারণে প্রতিবছর কত মানুষের প্রাণহানি হয় সে সম্পর্কে কোনো ধারণা কি আছে আপনার? সংখ্যাটি প্রায় অবিশ্বাস্য। ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব ফায়ার অ্যান্ড রেস্কিউ সার্ভিসের ২০১৬ সালের পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৪ সালে প্রায় ২২ লাখ ৩০ হাজারটি অগ্নিসংযোগের ঘটনায় প্রাণহানি ঘটেছে প্রায় ২৬ হাজার ৩০০ জনের। গড়ে প্রতিদিন মানুষ মারা গেছেন ৭২ জন আর অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে ৬ হাজার ১১০টি। এ তথ্য শুধু জরিপকৃত অগ্নিকাণ্ডের। জরিপের বাইরে আরও কত শত ঘটনা রয়েছে, সেটি ধারণা বাইরে। বাংলাদেশে তৈরি পোশাক খাতসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় অগ্নিকাণ্ডে যে পরিমাণ প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, সেটা বলাই বাহুল্য। অথচ একটু সচেতনতা, সতর্ক পদক্ষেপ এ রকম ভয়াবহ ঘটনা থেকে অনেকাংশে রক্ষা করতে পারে। এ রকমই একটি সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হতে পারে স্মোক অ্যালার্মের ব্যবহার, যা আগুনের ভয়াবহতা, জীবন ও সম্পদহানি থেকে রক্ষা করতে পারে সহজেই।
স্মোক অ্যালার্ম একধরনের স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র, যার ভেতরে অগ্নি শনাক্তকরণ (যেমন স্মোক ডিটেক্টর) যন্ত্রাংশ থাকে। এটি আগুন বা ধোঁয়ার উপস্থিতি টের পেলেই সশব্দে জানান দেয় (অ্যালার্ম বেজে ওঠে)। স্মোক অ্যালার্ম আকারে খুব বেশি বড় নয়। হাতের তালুর মতো ছোট সাইজের এই যন্ত্রটি সহজেই সিলিংয়ের সঙ্গে লাগানো যায়। যন্ত্রটি যেকোনো অগ্নি দুর্ঘটনার একেবারে প্রাথমিক অবস্থাতেই সতর্ক-ঘণ্টা বাজিয়ে দেয়। ফলে আগুনের কারণে ঘটা অগ্নি দুর্ঘটনা মোকাবিলা সহজ হয়। শুরুতেই জানার ফলে আগুন নেভানোর কাজটি সহজ হয়, পাশাপাশি আগুনের সম্ভাব্য ক্ষতি কমিয়ে আনা যায়।
বাজারে প্রচলিত চার ধরনের স্মোক অ্যালার্ম পাওয়া যায়Ñ
- আয়োনাইজেশন
- অপটিক্যাল
- হিট
- ওপরের দুই বা তিন ধরনের সমন্বিত অ্যালার্ম।
আয়োনাইজেশন
সবচেয়ে সহজলভ্য ও দামে সস্তা। এর স্মোক ডিটেক্টর অংশটি খুবই স্পর্শকাতর, সামান্য পরিমাণ ধোঁয়ার উপস্থিতিও এটি শনাক্ত করতে সক্ষম। ধীরগতিতে বা ধিঁকিধিঁকি জ্বলে এমন আগুন যেখানে পুরোপুরি আগুন ধরার আগ পর্যন্ত তেমন ধোঁয়া উৎপন্ন করে না, সেক্ষেত্রে অবশ্য এটি একটু কম স্পর্শকাতর। আবার রান্নাঘরের পাশে এ ধরনের স্মোক অ্যালার্ম সহজেই বেজে ওঠায় এটি সত্যিকারের হুমকি নাও হতে পারে।
অপটিক্যাল
সবচেয়ে ব্যয়বহুল এটি কিন্তু প্রচলিত আয়োনাইজেশন স্মোক অ্যালার্মের থেকে বেশি কার্যকর। এটি ধীরে জ্বলা আগুনের সামান্য ধোঁয়া এমনকি ওভারহিটেট পিভিসি ওয়ারিংও শনাক্ত করতে সক্ষম। এটি খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়া আগুনের জন্য তুলনামূলক কম কার্যকরী। তবে রান্নাঘরের পাশে এটিকে সহজেই ব্যবহার করা যায়, কেননা আয়োনাইজেশন স্মোক অ্যালার্মের মতো রান্নার কড়াইতে ওঠা সামান্য ধোঁয়ায় এটি বন্ধ হয় না।
হিট অ্যালার্ম
এ ধরনের স্মোক অ্যালার্ম তাপমাত্রার তারতম্য থেকে সতর্ক-ঘণ্টা বাজায়। এটি কোনো প্রকার ধোঁয়া শনাক্ত করতে পারে না। তাই রান্নাঘরেও বসানো যায়। তবে এটি খুব কম জায়গাজুড়ে কার্যকরী। তাই বড় রুম বা জায়গায় একাধিক অ্যালার্ম বসানোর প্রয়োজন পড়ে।
অপটিক্যাল এবং হিট অ্যালার্মের কম্বিনেশন
এই দুই ধরনের অ্যালার্ম একসঙ্গে ব্যবহার করলে ফলস অ্যালার্মের হার অনেকটাই কমানো যায় আর এটি আগুন বা ধোঁয়ার উপস্থিতিও খুব দ্রুত জানান দেয়।
স্মোক এবং কার্বন মনোক্সাইড অ্যালার্ম
এ ধরনের অ্যালার্মে স্মোক ডিটেক্টশন এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড অ্যালার্ম প্রটেকশন উভয়ই একসঙ্গে একটি যন্ত্রে স্থাপন করা হয়। এতে খরচ অনেকখানি কমানো সম্ভব।
ওপরের সব ধরনের অ্যালার্মের কার্যকরণ পদ্ধতি প্রায় একই রকম। আর এতে ব্যাট্যারি বা মেইন ইলেকট্রিসিটি লাইন থেকে সংযোগ দেওয়ার ব্যবস্থা থাকে। কোনো কোনোটাতে দুই ধরনেরই ব্যবস্থা থাকে যেন একটি আরেকটির বিকল্প হিসেবে কাজ করতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে একটি ভবনের সব অ্যালার্ম আন্তঃসংযোগের মাধ্যমে যুক্ত থাকে, যেন কোনো একটি অ্যালার্ম ধোঁয়া বা আগুনের উপস্থিতি শনাক্ত করতে পারলে সবগুলো একসঙ্গে বেজে উঠে সতর্ক করতে পারে। এ ধরনের ব্যবস্থায় রেডিও-ইন্টারলিঙ্ক ব্যবহার করে খরচ কমানো যায়।
সাধারণত একটি স্ট্যান্ডার্ড স্মোক অ্যালার্মের ব্যাটারি বছরে একবার পালটাতে হয়। তবে আপনি চাইলে ১০ বছর পর্যন্ত স্থায়ী হয় এমন ব্যাটারিও লাগাতে পারেন, সে ক্ষেত্রে প্রতিবছর ব্যাটারি পাল্টানোর ঝামেলা থাকে না। ১০ বছর পর্যন্ত নিশ্চিত থাকতে পারবেন। এ ছাড়া মেইন ইলেকট্রিসিটির লাইন থেকেও স্মোক অ্যালার্মের সংযোগ দিতে পারেন। তবে বৈদ্যুতিক বিভ্রাটের কথা মাথায় রেখে একটা ব্যাকআপ ব্যাটারির সংযোগ রাখা ভালো।
এখন কথা হচ্ছে আপনি কোন ধরনের স্মোক অ্যালার্ম লাগাবেন? কোনটা আপনার জন্য বেশি উপযুক্ত? এ ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক ততটা কঠিন নয়। যেমন রান্নাঘর এবং গ্যারেজ এরিয়ার জন্য হিট অ্যালার্ম বেশি উপযোগী। আর বাড়ির অন্যান্য স্থানে, যেমন শোবার ঘর, বসার ঘর ইত্যাদি স্থানে আপনার পছন্দ এবং বাজেট অনুযায়ী আয়োনাইজেশন, অপটিক্যাল, হিট কিংবা কম্বাইন্ড যেকোনো ধরনের অ্যালার্ম লাগাতে পারেন।
একটা বাড়িতে কতগুলো অ্যালার্ম লাগাতে হবে সেটা আসলে বেশ কিছু বিষয়ের ওপরে নির্ভর করে। আগুন যেকোনো মুহূর্তে, যেকোনো স্থানে লাগতে পারে। তাই সর্বোচ্চ নিরাপদ থাকতে বাথরুম ছাড়া সব রুমেই একটি করে অ্যালার্ম লাগানো উচিত। এ ছাড়া বাড়ির ধরনের ওপরেও অ্যালার্মের সংখ্যার ভিন্নতা থাকতে পারে। সাধারণ নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একতলা একটি বাড়ির জন্য একটি অপটিক্যাল স্মোক অ্যালার্ম যথেষ্ট। আর আপনার বাড়িটি যদি বহুতল হয় তাহলে প্রতি তলার জন্য একটি করে অ্যালার্ম লাগাতে পারেন। সে ক্ষেত্রে অ্যালার্মগুলো ইন্টারকানেকটেড হলে ভালো হয়। এ ছাড়া আরেকটি বিষয় মনে রাখা ভালো, প্রতি ১০ বছরে একবার অন্তত অ্যালার্ম বদলে ফেলা উচিত। সব যন্ত্রেরই একটি নির্দিষ্ট মেয়াদকাল থাকে।
জেনে রাখা ভালো
- সর্বোচ্চ নিরাপত্তার জন্য বাড়ির প্রতি তলায়, প্রতিটি কক্ষে, এমনকি গ্যারেজ এরিয়াতেও স্মোক অ্যালার্ম লাগানো উচিত।
- একাধিক অ্যালার্ম থাকলে সেগুলো ইন্টারকানেকটেড হওয়া উত্তম। যেন কোনো একটি অ্যালার্ম সম্ভাব্য আগুনের ঝুঁকি শনাক্ত করতে পারলে বাকি সব অ্যালার্ম একসঙ্গে সতর্ক-ঘণ্টি বাজাতে পারে।
- আয়োনাইজেশন স্মোক অ্যালার্ম আগুন থেকে উৎপন্ন ধোঁয়া দ্রুতই শনাক্ত করতে পারে। কিন্তু ধীরগতিতে ছড়ানো আগুনের ক্ষেত্রে ফোটোইলেকট্রিক স্মোক অ্যালার্ম দ্রুত সাড়া দেয়। তাই সম্ভব হলে এই দুই ধরনের স্মোক ডিটেক্টর একসঙ্গে ব্যবহার করা ভালো।
- নিয়মিত অ্যালার্মের ব্যাটারি বদলাতে হবে। আর ১০ বছর অন্তর পুরো অ্যালার্মটিই বদলে ফেলা উচিত।
- যাঁরা কানে শুনতে পান না কিংবা চোখে দেখতে পান না তাঁদের সতর্ক করতে যে অ্যালার্মে শব্দের পাশাপাশি আলোর সংকেত এবং ভাইব্রেশনের ব্যবস্থা আছে তেমন স্মোক অ্যালার্ম ব্যবহার করা ভালো। বাজারের সব ধরনের ফিচারের স্মোক অ্যালার্ম পাওয়া যায়।
- ধুলা জমে স্মোক অ্যালার্ম বন্ধ হয়ে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে নরম কোনো ব্রাশ দিয়ে মাঝে মাঝে অ্যালার্মের বহির্দেশ পরিষ্কার করতে পারেন।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮৬তম সংখ্যা, জুন ২০১৭।