বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত, যার একদিকে পাহাড় অন্যদিকে সাগর। অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এ লীলাভূমির নাম কক্সবাজার। সমুদ্রসৈকতের অপরূপ সৌন্দর্য, সৈকতে আছড়ে পড়া ঢেউ, বিস্তীর্ণ বালুকাভূমি, ঝাউবনের সারি এবং সর্বোপরি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগে দেশ-বিদেশের পর্যটকেরা ভিড় করেন পর্যটন এই নগরীতে। এসব পর্যটকদের ভ্রমণ ও আবাসনকে আনন্দদায়ক ও উপভোগ্য করতে সাগরসৈকতের কাছেই গড়ে উঠেছে পাঁচ তারকা হোটেল দ্য কক্স টুডে। আন্তর্জাতিক মানের এ হোটেলটি নান্দনিক স্থাপত্যিক নকশা, আরামদায়ক আবাসন ও বিনোদন-সুবিধা নিয়ে সর্বদাই প্রস্তুত পর্যটকদের এ পর্যটন নগরীতে স্বাগত জানাতে।
‘ওয়ার্মথ অ্যান্ড কমফোর্ট অ্যাবাভ দ্য রেস্ট’ (উষ্ণ এবং আরামদায়ক অবকাশ যাপন) স্লোগান নিয়ে কক্সবাজারের কলাতলী হোটেল-মোটেল জোনে ২০১১ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে হোটেল দ্য কক্স টুডে। আধুনিক স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত এ হোটেলটির স্থপতি মাহমুদুল হাসান। অত্যাধুনিক ইন্টেরিয়র ও এক্সটেরিয়র ডিজাইন, অভিজাত আসবাব ও সাজসরঞ্জাম, সার্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং নান্দনিক পরিবেশ হোটেলটিকে করে তুলেছে পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। হোটেলে প্রবেশ করতেই সুপরিসর লবি সবার নজর কাড়ে। বিশেষ করে লবি প্রাঙ্গণে প্রাকৃতিক আলো। হোটেলকক্ষে বসেই সুমদ্র বা পাহাড় দর্শন অতিথিদের দেয় অন্য রকম ভালো লাগার ছোঁয়া। সুপরিসর সুইমিংপুলে সাঁতার, ঠিক তার পাশেই রাতে বার-বি-কিউ আয়োজন ভ্রমণের আনন্দে যোগ করে বাড়তি মাত্রা। হোটেলটির বিশালতা আর আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধায় অতিথিদের ভালো লাগার অনুভূতি ছুঁয়ে থাকে প্রতিক্ষণ।
পর্যটক আর আগত অতিথিদের সাধ ও সাধ্যের মধ্যে হোটেল দ্য কক্স টুডের রয়েছে আবাসনের চমৎকার সব ব্যবস্থা। প্রায় ৭০০ জন ধারণক্ষমতাসম্পন্ন ১১ টি ক্যাটাগরিতে হোটেলে মোট কক্ষ রয়েছে ২৭৬টি। এসব আবাসনব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে-
- প্রেসিডেন্টাল স্যুট
- প্রিমিয়ার স্যুট
- রয়েল স্যুট
- হানিমুন স্যুট
- এক্সিকিউটিভ স্যুট
- সুপার ডিলাক্স স্যুট
- কক্সডিলাক্স রুম
- স্ট্যান্ডার্ড রুম ও অন্যান্য।
প্রশান্তিদায়ক এসব আবাসিক সুবিধার পাশাপাশি হোটেল দ্য কক্স টুডে পর্যটক ও করপোরেট অতিথিদের সুবিধার্থে রেখেছে নানা ব্যবস্থা। হল অব স্টারস নামক বিশাল হলে আয়োজন করা যায় প্রায় ৯০০ জনের অনুষ্ঠান। অ্যান্ড্রোমিডা নামের হলটির অতিথি ধারণক্ষমতা প্রায় ৫০০। এ ছাড়া রয়েছে ব্যাংকুইট, কনফারেন্স হল এবং এক্সিকিউটিভ মিটিং রুম। রয়েছে সুপরিসর কার পার্কিং। অতিথিদের রসনা বিলাসে তিনটি রেস্টুরেন্ট ও বার-বি-কিউ জোন। চমৎকার সুইমিংপুল, সাওনা ও স্টিম বাথ, বিলিয়ার্ড, জিম অ্যান্ড ফিটনেস সেন্টার, রিলাক্স-স্পা অ্যান্ড থাই মাসাজসহ সব ধরনের রিক্রিয়েশন সুবিধা দেওয়ার জন্য হোটেল দ্য কক্স টুডের দরজা সবার জন্য সব সময় উন্মুক্ত।
অতিথিদের বিনোদনে হোটেলটির রয়েছে নানা আয়োজন। লবির এক কোণে বংশীবাদকের বাঁশির মধুর সুর শুনতে শুনতে কফির পেয়ালা হাতে অতিথিদের স্বপ্নালোকে হারিয়ে যাওয়া অথবা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে স্থানীয় নৃ-তাত্ত্বিক গোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী নাচ উপভোগ- এমন আয়োজন চলে নিয়মিত। এ ছাড়া প্রবারণা পূর্ণিমা, আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী পানি খেলা, ঘুড়ি উৎসব, বিচ ফুটবল, বিশেষ দিবসে কনসার্ট, মিউজিক্যাল শো আয়োজন করা হয়। অতিথি সেবায় এয়ারপোর্ট থেকে অতিথি আনা-নেওয়া, নিজস্ব গাড়িতে (প্যাকেজের আওতায়) হিমছড়ি, ইনানী, রামু প্রভৃতি দর্শনীয় স্থান পরিভ্রমণের ব্যবস্থাও রয়েছে।
আবাসন ও বিনোদনসুবিধার পাশাপাশি হোটেলটির রয়েছে সব ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থা। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেসিডেন্ট, বিভিন্ন দেশ থেকে আগত খেলোয়াড় দল, শিল্পী, দেশসেরা করপোরেট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা এমনকি সাধারণ জনগণ বিলাসবহুল এই হোটেলটির আতিথেয়তা গ্রহণ করছেন। তাই নিরাপদ ও আনন্দময় করতে আপনিও নিশ্চিন্তে হোটেল দ্য কক্স টুডের অভ্যর্থনা গ্রহণ করুন। আর ফিরে আসুন মধুর কিছু স্মৃতিকে সঙ্গী করে।
সাক্ষাৎকার
‘পানির সঙ্গে মানুষের আত্মিক সম্পর্ক! সমুদ্রপারে গেলেই সে উচ্ছ্বাসিত হয়; একধরনের পুলক অনুভব করে; বিনিময় করে মনের ভাব’
মহিউদ্দিন খান খোকন হোটেল কক্স টুডের বিক্রয় ও বিপনন বিভাগের পরিচালক এবং একজন একনিষ্ঠ পর্যটনকর্মী। দীর্ঘদিন ধরে তিনি দেশের পর্যটন উন্নয়নে নিবেদিতভাবে কাজ করছেন। বাংলাদেশে পর্যটন খাতের সমস্যা, সম্ভাবনা ও বর্তমান চালচিত্র নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন বন্ধন-এর সঙ্গে। গুণী এ পর্যটনব্যক্তিত্বের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মাহফুজ ফারুক
পর্যটনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হলেন কীভাবে?
দেশের মিডিয়া ও সংস্কৃতি অঙ্গনের সঙ্গে অনেক দিনের সম্পৃক্ততা আমার। সাংবাদিকতা, বিজ্ঞাপন ও তথ্যচিত্র নির্মাণ ও পরিচালনা, সামাজিক সচেতনতা ও সংস্কৃতি নিয়ে কাজ করেছি সুদীর্ঘ সময়। তবে হোটেল পরিচালনা বিষয়ে আমার এবং হোটেল কক্স টুডের অন্য পরিচালকদের তেমন কোনো পূর্বঅভিজ্ঞতা ছিল না। হোটেলটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্র সফরকালে হোটেল ব্যবসার আইডিয়া পান। তিনিই আসলে প্রস্তাব রাখেন কক্সবাজারে একটি বিলাসবহুল হোটেল নির্মাণের। আমরা যারা পরিচালক, তারা সবাই তখন হোটেল ব্যবসার সম্ভাবনা উপলব্ধি করতে পারি। সবার ঐক্যমতেই আসলে এই হোটেলটি আমরা গড়ে তুলি। উদ্বোধনের পর যখন এর সেবা কার্যক্রম শুরু হয়, আমাদের সবার মধ্যেই অন্য রকম ভালো লাগা কাজ করে! বলতে পারেন ভেতর থেকেই সাড়া দিয়েছে যে আমরা দেশের জন্য, দেশের পর্যটনের জন্য কিছু করছি! কিন্তু আমাদের দেশের অপার সম্ভাবনাময় এ পর্যটন খাতে নানা রকম অসংগতি ধীরে ধীরে আমাদের উপলব্ধিতে আসে। নিজেদের থেকেই একধরনের তাড়না বোধ করতাম কীভাবে দেশের পর্যটনকে সমৃদ্ধ করা যায়। এমন ভাবনা ও দেশের প্রতি দায়িত্ববোধ থেকেই জড়িয়ে পড়ি পর্যটন খাতের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে।
তাহলে বলা যায়, ব্যবসার উদ্দেশ্যে হোটেল নির্মাণ করলেও জড়িয়ে পড়েছেন দেশীয় পর্যটন তথা দেশের উন্নয়নে?
অত্যন্ত মূল্যবান কথা বলেছেন। বাংলাদেশের পর্যটনশিল্পে আমি অবদান রাখতে পারছি, এটাই আমার আত্মসন্তুষ্টি। আমরা পাঁচ তারকাবিশিষ্ট আন্তর্জাতিক মানের একটি হোটেল দিয়ে কক্সবাজার তথা দেশের পর্যটনকে সমৃদ্ধ করতে পেরেছি। দেশি-বিদেশি পর্যটকেরা বিশাল এই হোটেলে আতিথেয়তা গ্রহণ করছেন এবং বিশ্বের উন্নত হোটেলগুলোর যাবতীয় সুবিধা এখানে পাচ্ছেন। এভাবে দেশের পর্যটন খাতসমৃদ্ধ হচ্ছে। কক্সবাজারে যখন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক খেলাধুলা, উৎসব ও অন্যান্য অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয় তখন খেলোয়াড়, সাংস্কৃতিক কর্মী, নীতিনির্ধারকেরা এই হোটেলকেই বেছে নেন। এটা অনেক বড় প্রাপ্তি। আমিও যেন এসব আয়োজনের অংশীদার; মনে হয় দেশের জন্য কিছু করতে পারছি।
আগে পাঁচ তারকা মানের হোটেল বলতে সবাই বুঝতেন সোনারগাঁও বা শেরাটন হোটেলকে। সেখানে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার সহজ ছিল না। অথচ এখন হোটেল কক্স টুডে হোটেলের ধারণাই বদলে দিয়েছে। সাধারণ মধ্যবিত্তরা এখানে আতিথেয়তা নিতে পারছেন। পাঁচ তারকা মানের হোটেলে থাকার অভিজ্ঞতা তাঁরা সহজেই পাচ্ছেন। ফলে তাঁরা যদি কখনো বিদেশে যান, তাহলে সেসব দেশের হোটেলে থাকতেও স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবেন। মধ্যবিত্ত সাধারণ মানুষকে এমন অনুভূতি দিতে পেরে আমরা সত্যিই আনন্দিত।
অনেকেই অভিযোগ করেন নেপাল, ভুটান, থাইল্যাল্ড, মালয়েশিয়া, মালদ¦ীপসহ এশিয়ান অনেক দেশের হোটেল ব্যয়ের চেয়ে আমাদের দেশের হোটেল ব্যয় তুলনামূলক বেশি। এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য কী?
অভিযোগটা অনেকাংশে সঠিক। উল্লেখিত এশিয়ান দেশগুলো কিছুটা কমে রুম ভাড়া দিতে পারছে। কারণ, সেসব দেশে বছরজুড়েই পর্যটকদের পদচারণে মুখর থাকে। কিছুটা কম ভাড়া নিলেও ব্যবসায়িক দিক থেকে তারা লাভবান হয়। অথচ আমরা তা পারি না। কারণ, পর্যটকের অপ্রতুলতা। কক্সবাজারে রয়েছে অসংখ্য হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট, যেখানে রয়েছে ৫০ হাজার মানুষের আবাসনব্যবস্থা। অথচ বাস্তবতা হলো, এই ধারণক্ষমতার বিপরীতে আবাসন-সুবিধা নেয় মাত্র ৫ শতাংশ, যা সংখ্যার বিচারে ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার। শুধু ঈদ, নববর্ষ ও বিশেষ কিছু উৎসবকালীন পর্যটকদের সংখ্যা বাড়ে। বাকি সময়টা খালিই পড়ে থাকে, বিশেষ করে বর্ষাকালে। ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখলে এত বিশাল একটি হোটেল নির্মাণের সিদ্ধান্তটা আসলে ঠিক ছিল না। বিলাসবহুল এই হোটেলটির মাসিক সার্ভিস চার্জ, বিশাল কর্মী বাহিনীর বেতন, ট্যাক্স ও অন্যান্য খরচ অনুযায়ী আমরা আসলে পর্যটক পাই না। তারপরও তুলনামূলক কমেই অতিথি সেবা দিয়ে থাকি। প্রায় সারা বছরই প্রায় ৪০-৫০ শতাংশ ছাড়ে সেবা দিতে বাধ্য হই। শুনে অবাক হবেন আমাদের এই বিলাসবহুল হোটেলে একজন অতিথির পেছনে খাবার, ব্যবহার্য সামগ্রী ও অন্যান্য সেবা বাবদ তিন হাজারেরও বেশি খরচ হয়। সে হিসাবে আমরা আসলে খুব বেশি টাকা নিই না। আবার যখন করপোরেট প্রোগ্রাম হয় তখন কোনো নির্ধারিত ভাড়া থাকে না। আমরা তখন প্যাকেজ ডিলে চলে যায়। কক্সবাজারে প্রতিনিয়ত পর্যটক এলে আমরাও অনেক কমে আবাসন সেবা দিতে পারব।
কক্সবাজার দেশের সর্ববৃহৎ পর্যটনকেন্দ্র হওয়া সত্ত্বেও কেন পর্যাপ্ত পর্যটক আসছেন না? সীমাবদ্ধতা ও সমস্যাগুলো আসলে কী কী?
বাংলাদেশের সবাই স্বপ্ন দেখে অন্তত একবার হলেও কক্সবাজার যাবেন। কিন্তু যেতে পারছেন না বা গেলেও বারবার যাচ্ছেন না তার অন্যতম কারণ অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতা, বিরক্তিকর যোগাযোগব্যবস্থা আর নিরাপত্তাহীনতা। দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে একমাত্র বাস ছাড়া কক্সবাজার যাওয়ার ভালো কোনো যানবাহন নেই। বাসের সংখ্যাও অনেক কম কিন্তু ভাড়া বেশি। দূরত্ব বিবেচনায় ঢাকা থেকে যেতে সময়ও লাগে অনেক বেশি। পথের ঝক্কি-ঝামেলা তো রয়েছেই। বিমান যোগাযোগব্যবস্থা থাকলেও ঢাকা থেকে মাত্র কয়েকটি ফ্লাইট কক্সবাজার যায় এবং ভাড়াও সাধারণের নাগালের বাইরে। একমাত্র ট্রেনেই কম খরচে ভ্রমণ করা গেলেও কক্সবাজারে কোনো ট্রেন যোগাযোগ নেই। এ ছাড়া কক্সবাজারে ঘোরাঘুরির জন্য উপযোগী সড়ক ও যানবাহনের অভাব রয়েছে। প্রায়ই পর্যটকেরা অতিরিক্ত ভাড়ার পাশাপাশি হেনস্তার শিকার হন। এ ছাড়া সৈকতে কিছুটা নিরাপত্তারও অভাব রয়েছে। ২০১৪-১৫ সালে দেশে চলমান রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে কক্সবাজারে পর্যটক আগমন নেমে আসে শূন্যের কোটায়। এ ছাড়া সৈকতকেন্দ্রিক নানা বিনোদন-সুবিধা না থাকায় পর্যাপ্ত পর্যটক এখানে আসছেন না।
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে পর্যটকদের বিনোদন ও নিরাপত্তায় প্রতিবন্ধকতাগুলো কী কী আর এর আসলে সমাধানই–বা কী?
পৃথিবীর সব সমুদ্রসৈকত হচ্ছে আনন্দের জায়গা। পানির সঙ্গে মানুষের আত্ম্কি সম্পর্ক! সমুদ্রপারে গেলেই সে উচ্ছ্বাসিত হয়; একধরনের পুলক অনুভব করে; বিনিময় করে মনের বিশালতা ও ঔদার্য। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, কক্সবাজার সৈকতে তেমন পরিবেশ নেই। কেউ একান্ত নিজের করে সাগরের বিশালতা অনুভব করবে; একান্তে কাটাবে কিছু সময় তেমনটি করার সুযোগ কোথায়? বখাটে, হকার, বিচ ফটোগ্রাফার ও অন্যরা পর্যটকদের বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সাগরে গোসল করে হোটেলে বসে থাকা ছাড়া তেমন কোনো বিনোদনের ব্যবস্থাও নেই। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর। রাতে সৈকত মানেই অন্ধকার; নিরাপত্তার অভাব। তাহলে মানুষ কেন কক্সবাজারে যাবে? অথচ বিশ্বের পর্যটনসৈকতগুলো সারা রাত সরগম থাকে; একে ঘিরে চলে নানা রকম উৎসব ও বিনোদন আয়োজন।
পরিস্থিতির উন্নয়নে সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলে আমরা এসব সমস্যার সমাধানে বিভিন্ন সুপারিশ করেছি। এমনও প্রস্তাব দিয়েছি যদি তাদের সীমাবদ্ধতা থাকে তাহলে আমরা যারা সৈকতপারের হোটেল ব্যবস্থাপনায় আছি, তাদের অনুমতি দিলে সৈকতে আলোকসজ্জা, কফি শপ, স্টেজ করে সারা রাত শো, আনন্দ-বিনোদন অনুষ্ঠানের আমরাই করব। অথচ এই অনুমোদনটুকুও আমরা পাচ্ছি না।
সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও পর্যটক আকর্ষণে হোটেল কক্স টুডের পক্ষ থেকে আপনারা কী কী উদ্যোগ নিচ্ছেন?
পর্যটক আকর্ষণে আমরা নানা ধরনের কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছি। স্বল্পব্যয়ে বেশ কিছু আকর্ষণীয় প্যাকেজ দিচ্ছি, বিভিন্ন টিভি চ্যানেল, রেডিও, পত্রপত্রিকা, সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম, ওয়েবসাইট, এসএমএস, ই-মেইল, ক্যাম্পেইনিংয়ের মাধ্যমে আমরা প্রচারণা চালাচ্ছি। এ ছাড়া পর্যটনবিষয়ক শোভাযাত্রা, মেলাসহ সব আয়োজনে আমরা নিয়মিতভাবে অংশ নিচ্ছি। সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি আমাদের গ্রাহক সেবা সম্পর্কে। এতে সাড়াও মিলছে বেশ। সম্প্রতি আমরা করপোরেট ক্লায়েন্টের মতো শিক্ষার্থীদের জন্যও বিশেষ ছাড়ে থাকার সুযোগ দিচ্ছি। যেহেতু তাদের কোনো আয়ের উৎস নেই। এভাবেই মানুষকে আমরা ভ্রমণে ক্রমেই আগ্রহী করে তুলছি।
বাংলাদেশে পর্যটন খাতের সম্ভাবনা কতটুকু?
বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে যুগে যুগে ভ্রমণকারীরা মুগ্ধ হয়েছেন। যে দেশে কক্সবাজারের মতো দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত, সুন্দরবনের মতো সবচেয়ে বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন, সবুজ প্রকৃতি, অসংখ্য নদী-খাল-হাওর-বাঁওড় রয়েছে সে দেশের পর্যটন সম্ভাবনা অপরিসীম। এসব সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে পর্যটনে রোল মডেল হতে পারে। পর্যটনশিল্প হতে পারে রাজস্ব আদায়ের সম্ভাবনাময় খাত। নানা প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও পর্যটন খাতের অবদান জিডিপিতে ২ দশমিক ১ শতাংশ। পর্যটনশিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ। ঘনবসতিপূর্ণ এ দেশটির স্থানীয় পর্যটকেরা ভ্রমণ করলে বিদেশি ট্যুরিস্টও লাগবে না। যেমন চীন এত বিশাল বিশাল পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তুলেছে, যা মাস ধরে ঘুরেও শেষ করা যায় না। দেশীয় পর্যটকেরাই তাঁদের পর্যটনের চালিকাশক্তি। বাংলাদেশেও পর্যটন চাহিদা বাড়ছে। এখন বিভিন্ন উৎসব ও ছুটির দিনগুলোতে দেশের পর্যটনকেন্দ্রগুলো হয়ে ওঠে জমজমাট। এসবই আসলে পর্যটনের সম্ভাবনা।
কী ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করলে বাংলাদেশের পর্যটনশিল্প এগিয়ে যাবে বলে আপনি মনে করেন?
পর্যটনশিল্পের উন্নয়নে সরকারি-বেসরকারি যৌথভাবে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। দেশি ও বিদেশি পর্যটক আকর্ষণে ভিন্ন আঙ্গিকে ভাবতে হবে। বিদেশি পর্যটক আকর্ষণে আহামরি কিছু করার দরকার নেই। কিছুটা কৌশলী প্রচার ও সুবিধা দিলে অনেক বিদেশি আসবে। ধরুন, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, মালদ্বীপ, নেপালসহ এশিয়ান পর্যটনসমৃদ্ধ দেশেগুলোর বিমানবন্দরে নজরে পড়ার মতো হোল্ডিং লাগানো যায়, যাতে লেখা থাকবে ‘ইয়োর নেক্সট স্টেপ ইন বাংলাদেশ’ ধরনের স্লোগান এবং পরিচিতিমূলক কিছু বিবরণ ও ছবি থাকলে সহজেই তা পর্যটকদের নজরে পড়বে। এদের মধ্যে অন্তত কিছু মানুষ তো আসবে। ভিসাব্যবস্থা সহজ করা, অনলাইনে প্রচার বাড়ানোর মতো কাজগুলোর মাধ্যমে খুব কম খরচে এ ধরনের প্রচার-প্রচারণা সম্ভব। এ ধরনের প্রচার চালানোর ব্যাপারে আমি পর্যটন করপোরেশনের কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলেছি। পর্যটন খাতে অনেক অর্থ ব্যয় করে ঢাকঢোল পিটিয়ে লন্ডন-আমেরিকায় শোভাযাত্রা করেন, বিভিন্ন দেশে পর্যটন মেলা করেন কিন্তু তাতে তেমন সাড়া মেলে না। আসলে পর্যটন আকর্ষণে চাই পর্যটকদের নিরাপত্তা ও ঝামেলামুক্ত নির্মল বিনোদনব্যবস্থা। ব্যক্তিগত উদ্যোগে আমরা কিছু পদক্ষেপ নিয়েছি। যেমন, কলকাতা থেকে বেশ কিছু মানুষ বাংলাদেশে বেড়াতে বা অন্য কাজে আসেন। তাঁরা ঢাকা থেকে বেড়িয়ে চলে যান। তাঁদের কিছু সুবিধা দেওয়া গেলে হয়তো কক্সবাজারও ঘুরে যাবেন। আমরা চেষ্টা করছি তাঁদের কক্সবাজার ভ্রমণে আগ্রহী করতে।
দেশীয় পর্যটক আকর্ষণে পর্যটনকেন্দ্রের সঙ্গে দেশের সব স্থানের যোগাযোগ নিরবচ্ছিন্ন ও সহজ করা। এর সবচেয়ে সহজ সমাধান কক্সবাজার পর্যন্ত ট্রেন লাইন স্থাপন ও দ্রুতগামী ট্রেন চালু করা, যেন তিন-চার ঘণ্টার মধ্যে ঢাকা থেকে কক্সবাজার পৌঁছানো যায়। কক্সবাজারে যেহেতু একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর রয়েছে, এবার চার লেন সড়ক ও রেল যোগাযোগ চালু হলে পর্যটকদের সংখ্যা অনেক বাড়বে। শুধু কক্সবাজার নয় দেশের পর্যটনকে এগিয়ে নিতে হলে পর্যটনব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। চালু করতে হবে বহুমুখী পর্যটনব্যবস্থা, সাংস্কৃতিক পর্যটনকেন্দ্র, বাড়াতে হবে পর্যটন-বিষয়ক গবেষণা ও প্রশিক্ষণ, সার্বিক যোগাযোগব্যবস্থা এবং নিরাপত্তা। পর্যটন মন্ত্রণালয়ের যিনিই মন্ত্রীর দায়িত্বে এসেছেন, তাঁদের সবার কাছেই আমরা দাবি পেশ করেছি। শুধু আশ্বাসবাণী পেয়েছি কিন্তু তার বাস্তবায়ন তেমনটা হয়নি।
পর্যটন সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে আপনাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে কিছু বলুন?
পর্যটন একটি দেশের অন্যতম আয়ের উৎস, বিষয়টি দেরিতে হলেও সরকার বুঝতে পেরেছে। পর্যটনের উন্নয়নে তাই নেওয়া হচ্ছে নানা ধরনের পদক্ষেপ। এরই ধারাবাহিকতায় কক্সবাজার জোনকে বিশেষ পর্যটন জোন হিসেবে পরিকল্পনার আওতায় আনা হয়েছে। এরই মধ্যে কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ সৈকতঘেঁষা মেরিন ড্রাইভ সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। এই সড়কের শেষাংশে সমুদ্রসংলগ্ন সাবরংয়ে বিশাল এলাকা নিয়ে একটি বিশেষ পর্যটন জোন করছে সরকার। সেখানে আমরা সাত তারকা মানের একটি আধুনিক ও বিলাসবহুল হোটেল নির্মাণ করতে চাই। এটাই হবে বাংলাদেশের অন্যতম সাত তারকা হোটেল ও একটি ল্যান্ডমার্ক। আমরা ডিজাইনের কাজ শেষ করেছি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের খ্যাতনামা হোটেলগুলো থেকে পর্যটনসেবার ধারণা নিচ্ছি। এই হোটেলটির নির্মাণ সম্পন্ন হলে দেখার জন্য হলেও মানুষ এখানে আসবে। বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশও পাবে নতুন এক পরিচিতি।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮৮তম সংখ্যা, আগস্ট ২০১৭।