সড়ক হোক নিরাপদ, স্বস্তির

মুসলমানদের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব ঈদ। এই ঈদে আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব একত্রিত হওয়ার জন্য উদগ্র একটি বাসনা নিয়ে সারা বছর প্রতিক্ষার প্রহর গোনে সবাই। নিজের বাবা-মা আর আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে ঈদ উদ্যপানের জন্য সবাই ছুটে চলে শিকড়ের টানে। এ উপলক্ষে সরকারের পক্ষ থেকে উৎসব ভাতাসহ ছুটি প্রদান করা, যানবাহনের সুবিধা ও সংখ্যা বাড়ানো, আলোকসজ্জা এবং যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নকল্পে নানাবিধ কার্যক্রম নেওয়া হয়। তারই ধারাবাহিকতায় প্রতিবছর ঈদের আগে সড়ক ও জনপথ উন্নয়নে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা কর্তৃক তোড়জোড় লেগে যায় সড়ক সংস্কারে। সময়স্বল্পতার কারণে ঈদের আগে কাজ শেষ করা কিংবা কাজের গুণগত মান রক্ষা করা কোনোটাই সম্ভব হয় না। ফলে সড়কপথে চলাচলকারী ঘরমুখো মানুষজনকে ভোগান্তির চরম সীমায় পৌঁছাতে হয়। বিভ্রাট মানুষের জীবনে আসা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু যদি তা হয় মানব সৃষ্ট, তাহলে তা বড়ই বেদনাদায়ক। প্রসঙ্গত, সড়ক নির্মাণ কিংবা সংস্কারকাজের জন্য নির্দিষ্ট কিছু নিয়মনীতি আছে, যা যথাযথভাবে মেনে এতদ্সংশ্লিষ্ট সব কাজ সম্পন্ন করা, নির্মিত সড়কসমূহ নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা, সড়কপথে যাতায়াতব্যবস্থা নির্বিঘ্ন করার লক্ষ্যে ট্রাফিক চলাচলব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করার মতন বিষয়ের সুষ্ঠু বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে পারলে সড়কপথে চলাচলকারী মানুষের ভোগান্তি লাঘব হতো অনেকটাই। 

আমি আমার কর্মজীবনে দেশ-বিদেশ মিলিয়ে ৪১ বছর পার করেছি, বইপুস্তক পড়ে অর্জনকৃত জ্ঞানের পাশাপাশি এই সুদীর্ঘ সময়ে অর্জিত ইমারত ও সড়ক নির্মাণকাজের বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং এশিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকা মহাদেশভুক্ত ২০টি দেশের ১০০টির অধিক শহর ঘুরে যা দেখেছি, তাতে আমাদের দেশে নির্মাণ কিংবা সংস্কারসংক্রান্ত নিয়মনীতিগুলো যথাযথভাবে মেনে না চলা এবং ট্রাফিক চলাচল নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা সুষ্ঠুভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে না পারাই এই জনভোগান্তির প্রধান কারণ বলে আমার কাছে প্রতীয়মান হয়েছে। 

ফলে, আমার অভিজ্ঞতার আলোকে ‘সড়ক নির্মাণ ও সংস্কার এবং নির্মাণসামগ্রী ও কাজের গুণগত মান’ সম্পর্কিত বিষয়গুলো সবার জ্ঞাতার্থে তুলে ধরার লক্ষ্যে এবারের এই ধারাবাহিক প্রয়াস। প্রথমত, প্রাসঙ্গিক কাজগুলো সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন করার জন্য বাংলাদেশ সরকারের একটি অধিদপ্তর আছে। এই অধিদপ্তরে কর্তব্যরত ব্যক্তিবর্গেরই দায়িত্ব অত্র কাজগুলো যথাযথভাবে সম্পাদন করা। আর তাদের এই দায়িত্বসমূহ সঠিকভাবে পালন করার মাধ্যমেই ঘটে আমাদের সার্বিক শিক্ষা ও নীতি-নৈতিকার বহিঃপ্রকাশ। 

দ্বিতীয়ত, দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গের নিজ নিজ কর্তব্যগুলো সুষ্ঠুভাবে পালন করার জন্য সকল কর্মকর্তা ও কর্মচারীর দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও আত্মসচেতনতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। পাশাপাশি প্রয়োজন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সব কাজের নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে জবাবদিহির আওতায় আনা। কারণ, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে প্রশাসনিক শিথিলতা কিংবা যেকোনো ধরনের দুর্বলতা যদি একবার প্রকাশ পায় তাহলে কোনো কাজই সঠিকভাবে সম্পাদন করা সম্ভব নয়।

এ ছাড়া, একটি প্রকল্পের প্রতিটি কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট একটি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা অত্যাবশ্যক। তাই ‘ঈদ’ উপলক্ষে ঘরে ফেরার নিমিত্তে চিন্তিত মানুষগুলোর যাতায়াতব্যবস্থা নির্বিঘ্ন কিংবা সহজতর করণার্থে সড়ক সংস্কারের জন্য গৃহীত প্রকল্পসমূহ বাস্তবায়নকল্পে সুচিন্তিত একটি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা এবং তদ্নুযায়ী সব কাজ সম্পন্ন করা নিশ্চিত করতে পারলে ভুক্তভোগী মানুষকে এহেন ভোগান্তির হাত থেকে রেহাই দেওয়া যেতে পারে সহজেই।

তদুপরি, সুপরিকল্পিত একটি নিয়মনীতির মধ্য দিয়ে সংশ্লিষ্ট কাজগুলো বাস্তবায়ন করা হলে, স্বল্প সময়ে কিংবা অসময়ে তাড়াহুড়োর মাধ্যমে কাজ শেষ করতে গিয়ে কাজের গুণগত মান রক্ষা করতে না পারা কিংবা সময়মতো কাজ শেষ করতে ব্যর্থ হওয়ার কারণে মানুষকে ভোগান্তির মুখে ঠেলে দেওয়ার মতো বিষয়গুলো এড়িয়ে চলা সম্ভব হতে পারে। ফলে সংশ্লিষ্ট সকলের উচিত, যে কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নের আগেই সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করে নির্দিষ্ট পরিকল্পনামাফিক সব কাজ সম্পন্ন করণার্থে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

মনে রাখা দরকার, একটি দেশে প্রতিষ্ঠিত সার্বিক যোগাযোগব্যবস্থাই সে দেশের উন্নয়নের মাপকাঠি। অতএব, উন্নয়নশীল যে কোনো দেশের উন্নতি নিশ্চিত করণার্থে অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক সব ধরনের যোগাযোগব্যবস্থা সুপ্রতিষ্ঠিত করা এবং সুষ্ঠু রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা অপরিহার্য একটি বিষয়। এতদ্লক্ষ্যে, সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারকদের বিষয়ভিত্তিক অভিজ্ঞতা ও আত্মসচেতনতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। তাই, দেশ ও জাতির স্বার্থে সংশ্লিষ্ট সবারই উচিত, আত্মবিশ্লেষণ করে নিজ নিজ অবস্থানের উন্নয়ন সাধন করা।

এবার আসা যাক, আমাদের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ‘নির্মাণ ও সংস্কার এবং নির্মাণসামগ্রী ও কাজের গুণগত মান’ সম্পর্কিত মূল আলোচনায়। অত্র বিষয়ের ওপর বিস্তারিত আলোচনায় যাওয়ার আগেই একটি দেশের সার্বিক যোগাযোগব্যবস্থা সম্পর্কে মৌলিক কিছু ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করছি। 

পৃথিবীর প্রতিটি দেশেই মানুষের যাতায়াতব্যবস্থা নির্বিঘ্নে এবং সহজতর করার জন্য যোগাযোগের মাধ্যমগুলোকে সাধারণত তিনভাগে বিভক্ত করা হয়। 

যেমনঃ স্থলপথ,

         ১। স্থলপথ আবার দুইভাগে বিভক্ত- 

         ক. সড়ক ও জনপথ 

         খ. রেলপথ।

         ২। জলপথ আর 

         ৩। আকাশপথ। 

আগেই বলা হয়েছে, উপরোল্লেখিত প্রতিটি ব্যবস্থার সুষ্ঠু বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার ওপর একটি দেশের সামগ্রিক উন্নতি নির্ভর করে। তাই, এসব যোগাযোগব্যবস্থা প্রতিষ্ঠাকল্পে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোসমূহ নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সব দেশেই আলাদা আলাদাভাবে এক একটি অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠিত করা হয়। অত্র অধিদপ্তরসমূহ তাদের আওতাধীন এলাকায় নির্মাণ কিংবা সংস্কারসংক্রান্ত সব পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নকল্পে সব ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে।

যাই হোক, উল্লেখিত যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর মধ্য থেকে আমাদের আলোচ্য বিষয় স্থলপথের একটি অংশ ‘সড়ক ও জনপথ’। অত্র সড়ক ও জনপথ এর নির্মাণপ্রক্রিয়া এবং নির্মাণকাজে ব্যবহৃতব্য মালামালের প্রকারভেদ অনুসারে এদেরকে বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। 

যেমন:

  • কাঁচা সড়ক/রাস্তা
  • ওয়াটার বা উন্ডম্যাকাডম রোড (সড়ক)
  • সিমেন্ট কংক্রিট রোড (সড়ক)
  • আর.সি.সি. রোড (সড়ক)
  • অ্যাজফাল্ট রোড (সড়ক) প্রভৃতি। 

সড়ক ও রাস্তাসমূহের নির্মাণ কিংবা রক্ষণাবেক্ষণ (সংস্কার) কাজের জন্য গৃহীত প্রকল্পের কাজসমূহ সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন করার নিমিত্তে ধারাবাহিকভাবে যে কাজগুলো সম্পন্ন করা দরকার- 

যেমন;

১. নির্মাণ

  • স্থান পরিদর্শন করা এবং প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই করা,
  • ভৌতকাজের নকশা প্রণয়ন করা,
  • কাজ ও মালামালের স্পেসিফিকেশন তৈরি করা,
  • সম্ভাব্য ব্যয়ের প্রাক্কলন তৈরি করা,
  • প্রকল্প বাস্তবায়নে আর্থিক অনুমোদন নেওয়া,
  • প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি জোগাড় করা,
  • ভৌতকাজ বাস্তবায়ন করা প্রভৃতি। 

২. রক্ষণাবেক্ষণ (সংস্কার)

  • প্রকল্পের স্থান পরিদর্শন করা,
  • কাজ ও মালামালের স্পেসিফিকেশন তৈরি করা,
  • সম্ভাব্য ব্যয়ের প্রাক্কলন তৈরি করা,
  • প্রকল্প বাস্তবায়নে আর্থিক অনুমোদন নেওয়া,
  • প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি জোগাড় করা,
  • ভৌতকাজ বাস্তবায়ন করা ইত্যাদি। 

উপরোল্লিখিত কাজগুলো সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে একটি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা এবং তদ্নুসারে সব কাজ সম্পন্ন করা অত্যাবশ্যক। 

(চলবে)

ডিজিএম (কিউ) অ্যান্ড এম.আর.

দি স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার্স লি.

ওকে: এনামুল

সড়ক হোক নিরাপদ, স্বস্তির 

মঈন আহমেদ

দেশব্যাপী নিত্যদিনের আতঙ্কের অপর নাম সড়ক দুর্ঘটনা। বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা আশঙ্কাজনকহারে বাড়ছে। দেশজুড়ে প্রতিনিয়ত সড়ক দুর্ঘটনা ঘটলেও প্রতিকারে সড়ক পরিবহনব্যবস্থার উন্নয়নে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি লক্ষ করা যাচ্ছে না। সম্প্রতি ঢাকায় দুই বাসের প্রতিযোগিতায় এক শিক্ষার্থীর হাত কেটে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া কিংবা বিমানবন্দর সড়কে একদল শিক্ষার্থীর ওপর একটি বাস উঠে যাওয়ার ঘটনায় দেশজুড়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। শুরু হয় নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন। সড়ক পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নে, আইন সংস্কার ও তার যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে উঠে আসে নানা যৌক্তিক দাবি। এই দাবিগুলোর মূল প্রতিপাদ্যই হচ্ছে নিরাপদ সড়ক, যা দেশের প্রতিটি সচেতন নাগরিকের প্রাণের দাবি। 

সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে সড়ক দুর্ঘটনা 

জাতিসংঘে বাংলাদেশসহ সদস্য দেশগুলো অঙ্গীকার করেছিল ২০১১ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা অর্ধেকে নামিয়ে আনার। কিন্তু বাংলাদেশে দুর্ঘটনা ও হতাহতের সংখ্যা কমার বদলে বেড়েই চলেছে। সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি)-এর জরিপমতে, প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাচ্ছে ৬৪ জন। নিরাপদ সড়ক চাই সামাজিক সংগঠনের তথ্যানুসারে ২০১৭ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ঘটেছে ৫ হাজার ৬৪৫ জনের। সংস্থাটির হিসাবে, ২০১৬ সালের তুলনায় ২০১৭ সালে প্রাণহানি বেড়েছে দেড় হাজার। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির পরিসংখ্যান অনুসারে, সড়ক দুর্ঘটনায় ২০১৭ সালে বিগত বছরের চেয়ে প্রাণহানি বেড়েছে ২২ শতাংশ। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এআরআই) হিসাবমতে, সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিবছর বাংলাদেশের জিডিপির ২ শতাংশ ক্ষতি হয়। ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ হিসাব করলে তা দাঁড়ায় বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। এসব দুর্ঘটনার কারণে অর্থনৈতিক অগ্রগতি হচ্ছে বাধাগ্রস্ত। অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষণার ভিত্তিতে দেশে বিগত কয়েক বছরের দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান- 

বছরদুর্ঘটনার সংখ্যাপ্রাণহানির সংখ্যাআহতের সংখ্যাতথ্যসূত্র
২০১৩১৭৫৫১৭৮২৯২৮এআরআই ডেটাবেইস(পুলিশ তথ্যের ভিত্তিতে)
২০১৪১৫৮৪১৬২৯৮১৩এআরআই ডেটাবেইস (পুলিশ তথ্যের ভিত্তিতে)
২০১৫১৬৯২১৭২৮১২৪৪এআরআই ডেটাবেইস (পুলিশ তথ্যের ভিত্তিতে)
২০১৬১৩৩০ (মার্চ-ডিসেম্বর)১৯৩১৩৮১৯এআরআই ডেটাবেইস (সংবাদপত্রের তথ্যের ভিত্তিতে)
২০১৭২৯১৭৩৬৭২৭৪০০এআরআই ডেটাবেইস (সংবাদপত্রের তথ্যের ভিত্তিতে)

সড়ক দুর্ঘটনার কতিপয় কারণ

সড়ক দুর্ঘটনার কারণসমূহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় প্রতিটি দুর্ঘটনার পেছনে এক বা একাধিক কারণ বিদ্যমান। সাধারণত কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে তার দায় বর্তায় চালকের ওপর। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনার জন্য আরও কিছু সম্পূরক বিষয় জড়িত। পথচারী, যাত্রী, পরিবেশ, সড়ক এবং সড়কের পারিপার্শ্বিক অবস্থা মতন বিষয়ের ওপরই সড়ক দুর্ঘটনার প্রকৃতি নির্ভর করে। যেমন, ঢাকা মহানগরের রাস্তাঘাটে মূল সমস্যা অব্যবস্থাপনা। অনিয়মের সংস্কৃতি বিরাজ করায় এখানে গাড়ির চালক, যাত্রী, বা পথচারী কেউই নিয়ম মেনে চলতে চান না। রয়েছে উল্টো পথে যানবাহন চালানোর সংস্কৃতিও । এআরআইয়ের গবেষণায় দেখা যায় যে বাংলাদেশের ভারী যানবাহন চালকদের ৯০ শতাংশেরও বেশি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ নেই। সাধারণত এসব চালকেরা বিভিন্ন অনিয়মিক/অপ্রাতিষ্ঠানিক উপায়ে যেমন তথাকথিত ওস্তাদের নিকট থেকে কিছু প্রাথমিক ধারণা নিয়ে বছরের পর বছর ধরে গাড়ি চালায়, যা তার নিজের জীবনের জন্য যেমন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ তেমনি অন্যান্য সব সড়ক ব্যবহারকারীদের জন্যও সমান বিপজ্জনক। আবার বাংলাদেশে যানবাহনের পরিবহনব্যবস্থার নিম্নমানের জন্য হাঁটা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কিন্তু দেখা যায় পথচারীদের স্বাভাবিকভাবে চলাচলের জন্য তেমন উপযুক্ত কোনো ব্যবস্থা নেই। ফুটপাত থাকলেও তা হকার, দোকানপাট, নির্মাণসামগ্রীসহ নানানভাবে দখলে। ফলে পথচারীরা যানবাহন থেকে নিকটবর্তী দূরত্বে চলাফেরা করে। নগরীর সড়ক দুর্ঘটনায় যত মানুষের জীবনহানি ঘটে, তার ৬১ শতাংশেরও বেশি হচ্ছে পথচারী। তবে প্রায় সব ধরনের রিপোর্টে প্রকাশ পায়, দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যর ৪৯ শতাংশই পথচারী।  এ ছাড়া সাধারণত যে যে বিশেষ কারণে দুর্ঘটনা হয় সেগুলো হলো:

চালকের কারণে- 

  • ট্রাফিক আইন যথাযথভাবে অনুসরণ না করা
  • অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে গাড়ি চালানো
  • অতিদ্রæত বা বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো
  • গতিসীমা অনুসরণ না করা
  • মাত্রাতিরিক্ত যাত্রী বা মালামাল বহন করা
  • রোড সাইন, মার্কিং ও ট্রাফিক সিগন্যাল সম্পর্কে ধারণা না থাকা বা ধারণা থাকলেও তা মেনে না চলা
  • বিপজ্জনকভাবে ঝুঁকি নিয়ে ওভারটেক করা
  • প্রতিযোগিতা করা
  • সামনের গাড়ির সঙ্গে নিরাপদ দূরত্ব বজায় না রাখা
  • ত্রুটিপূর্ণ গাড়ি চালানো
  • চালকের পরিবর্তে হেলপার দিয়ে গাড়ি চালানো
  • যথাসময়ে যথোপযুক্ত সংকেত দানে ব্যর্থতা
  • যথাযথ লেনে গাড়ি না চালানো
  • প্রয়োজনীয় বিশ্রাম না নিয়ে অবসাদগ্রস্ত অবস্থায় একটানা গাড়ি চালানো
  • নেশাগ্রস্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো
  • দৈহিক অযোগ্যতা নিয়ে গাড়ি চালানো
  • শিক্ষার স্বল্পতা, অপর্যাপ্ত ট্রেনিং ও অনভিজ্ঞতা ইত্যাদি।

পথচারীর কারণে- 

  • অসতর্কভাবে ও অমনোযোগী হয়ে রাস্তায় চলা
  • ফুটপাত ব্যবহার না করে রাস্তা দিয়ে চলাচল করা
  • রাস্তা পারাপারে জেব্রা ক্রসিং/ওভারব্রিজ/আন্ডারপাস ব্যবহার না করা
  • রাস্তা পারাপারের সময় ডানে/বামে তাকিয়ে নিরাপদ অবস্থা না দেখে রাস্তা পার হওয়া
  • তড়িঘড়ি ও দৌড়ে রাস্তা পার হওয়া
  • ফুটপাতবিহীন রাস্তার ডান দিক দিয়ে না হেঁটে বাম দিক দিয়ে হাঁটা ইত্যাদি।

ত্রুটিপূর্ণ সড়কব্যবস্থা

  • সড়কের অপ্রশস্থতা
  • আঁকাবাঁকা ও সরু সড়ক
  • ডিভাইডার না থাকা
  • রোড সাইন ও মার্কিং না থাকা বা থাকলেও তা সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ না করা
  • ঝুঁকিপূর্ণ কালভার্ট/ব্রিজ
  • রাস্তার পাশের দোকানপাট, গাছপালা ও অন্যান্য প্রতিবন্ধকতা
  • মিশ্র যানবাহনের উপস্থিতি অর্থাৎ একই সড়কে দ্রæত ও ধীরগতির যানবাহন চলাচল করা
  • অবৈধ যানবাহনের উপস্থিতি
  • রাস্তার বিপজ্জনক পরিবেশ ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থানসমূহের অপর্যাপ্ত ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি।

ত্রুটিপূর্ণ যান

  • গাড়ির চাকা, ব্রেক, হর্ন, ইনডিকেটর লাইট, ওয়াইপার ইত্যাদি ঠিক না থাকা
  • ইঞ্জিনের ত্রুটি
  • গাড়ির আয়ুস্কাল অতিক্রান্ত হওয়ার পরও অতি পুরোনো গাড়ি মেরামত করে রাস্তায় চালানো।

লাইসেন্স প্রদানকারী কর্তৃপক্ষের ত্রুটি

  • ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদানের আগে চালকদের সঠিকভাবে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা না করা
  • লাইসেন্স প্রদানের সময় চালকদের সঠিকভাবে মূল্যায়ন না করা
  • লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দালালদের দৌরাত্ম্য ইত্যাদি।

আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কারণে

  • আইন প্রয়োগে শিথিলতা
  • ট্রাফিক আইন যথাযথভাবে প্রয়োগ না করা
  • ঝুঁকিপূর্ণ স্থানসমূহে আইন প্রয়োগকারী সদস্যের ব্যবস্থা না করা
  • ট্রাফিক আইনের যুগোপযোগী বাস্তবায়নের অভাব। মালিকপক্ষের ত্রুটি গাড়ি নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ না করা যোগ্য ও দক্ষ চালক নিয়োগ না দেওয়া এবং চালক ও কন্ডাক্টর নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রচলিত বিধি অনুসরণ না করা পরিবহন শ্রমিকদের ওপর মালিকের নিয়ন্ত্রণ না থাকা বেতনভিত্তিক চালক নিয়োগ না করা শ্রমিকদের কল্যাণসংক্রান্ত কর্মসূচি গ্রহণ না করা
  • শ্রমিকদের পেশাগত জ্ঞান বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা না করা যাত্রা আরম্ভ করার আগে চালককে গন্তব্য স্থান সম্পর্কে সঠিকভাবে অবহিত না করা সময়নিয়ন্ত্রিত গাড়ি পরিচালনা পদ্ধতি অনুসরণ করা
  • লাইসেন্স প্রদানে মালিকপক্ষের অযাচিত হস্তক্ষেপ ও প্রশাসনের ওপর চাপ প্রয়োগ।

এ ছাড়া রাস্তার সব দুর্ঘটনা ঘটে কোনো না কোনো আচমকা ঘটনা থেকে। আর আচমকা ঘটনা ঘটার প্রধান কারণসমূহ হচ্ছে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধকতা, অসাবধানতা/অসচেতনতা, দ্রæতগতি/অনিয়ন্ত্রিত গতি।

দুর্ঘটনা প্রতিরোধে করণীয়

দুর্ঘটনা প্রতিরোধে দুর্ঘটনা ঘটানোর জন্য দায়ী সবারই যেমন কিছু দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে, তেমনি সম্পূরক বিষয়গুলোও সমাধান করা জরুরি। দুর্ঘটনা প্রতিরোধে করণীয়সমূহ: 

মালিকের দায়িত্ব ও কর্তব্য

  • দুর্ঘটনা প্রতিরোধে এবং ব্যাপকতা কমাতে অন্যান্যের সঙ্গে যানবাহন মালিকদের যথেষ্ট দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে। নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করার লক্ষ্যে মালিকপক্ষের যেসব দায়িত্ব ও কর্তব্য বিশেষভাবে পালন করা উচিত তা হলো:
  • সঠিক লাইসেন্সধারী ড্রাইভার বেতনভিত্তিক নিয়োগ করা
  • নিয়োগের আগে ড্রাইভারদের যথাযথভাবে পরীক্ষা নেওয়া ও যাচাই-বাছাই করা
  • ড্রাইভারদের অতীত কর্মকাণ্ড ও চরিত্র সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া
  • প্রতিটি গাড়ির জন্য কমপক্ষে দুজন ড্রাইভার ও দুজন কন্ডাক্টর নিয়োগ দেওয়া
  • শ্রমিকদের ওপর মালিকদের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা
  • শ্রমিকদের কল্যাণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া
  • চালকদের গতিবিধি, চলাচল ইত্যাদি নজরে রেখে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া।

চালকের দায়িত্ব ও কর্তব্য

  • সড়ক ব্যবস্থাপনায় যানবাহনচালকেরা অন্যতম প্রধান নিয়ামক। সুতরাং সড়ক নিরাপত্তায় চালকদের ভূমিকা অত্যন্ত ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী। দুর্ঘটনারোধকল্পে তাঁদের সর্বদা বিশেষ কিছু দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করা উচিত। এ সম্পর্কিত বিশেষ কিছু নির্দেশনা:
  • নিজের ও যাত্রীদের নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন ও দায়িত্ববান হওয়া
  • সুস্থ দেহ ও সুস্থ মন নিয়ে গাড়ি চালানো
  • গাড়িতে ওঠার আগে পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রাম নেওয়া
  • অসুস্থ ও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত অবস্থায় গাড়ি না চালানো
  • গাড়ি চালানোর আগে ও গাড়ি চালানোর সময় নেশা না করা
  • বেপরোয়াভাবে গাড়ি না চালানো
  • ট্রাফিক আইন জানা ও তা মেনে চলা
  • ঝুঁকি নিয়ে ওভারটেকিং না করা
  • চালকের পেশাগত দক্ষতা ও মেকানিক্যাল জ্ঞান থাকা
  • রোড সাইন ও মার্কিং মেনে চলা
  • ড্রাইভারদের মোটরযান সম্বন্ধে জ্ঞান নেওয়া ও ইন-সার্ভিস ট্রেনিং নেওয়া
  • ধারণক্ষমতার বেশি যাত্রী/মালামাল বহন না করা। 

সড়ক নিরাপত্তার উন্নয়নে সুপারিশসমূহ  

একটি তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে সড়ক দুর্ঘটনা ও হতাহতের পরিমাণ ব্যাপকভাবে কমানোসহ কার্যকর নিরাপত্তামূলক কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা সম্ভব। অধিকতর নিরাপদ, উন্নত সড়ক, যানবাহনের নিরাপত্তার মান বাড়ানো, জনগণকে এ ব্যাপারে অবগত করানো, নিরাপত্তাবিষয়ক নানা কর্মসূচি গ্রহণ করে দুর্ঘটনা প্রতিরোধক ব্যাপারগুলোকে প্রাধান্য দিতে হবে। এ ছাড়া প্রতিটি সমস্যাকে পৃথকভাবে সমাধান করতে হবে। বিভিন্ন টেকনিক্যাল পরিবর্তনের মাধ্যমে সড়কগুলোকে আধুনিক রূপ দিতে হবে। যদিও সড়ক দুর্ঘটনাকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়, তবুও যে যে  পদক্ষেপগুলো কার্যকর করার মাধ্যমে তা ব্যাপকভাবে কমানো সম্ভব-

সড়ক এবং সড়কের পারিপার্শ্বিক অবস্থার প্রেক্ষিতে 

  • নিরাপত্তা সচেতনতামূলক পরিকল্পনা, ডিজাইন, নতুন সড়ক নির্মাণ পাশাপাশি বাধ্যতামূলক সড়ক নিরাপত্তা সমীক্ষা এবং সাময়িক নিরাপত্তা নিরীক্ষাব্যবস্থা সড়কগুলোতে সংযোজন করতে হবে।
  • প্রয়োজন অনুযায়ী সড়কের জ্যামিতিক পরিবর্তন করে এর অধিকতর উন্নয়ন করতে হবে। 
  • সড়ক ডিজাইনে নিরাপত্তাসংবলিত বিভিন্ন বিষয় সংযোজন করতে নানা পরিকল্পনা নিতে হবে।
  • সড়কগুলোর দুই পাশ সংস্কার করতে হবে (সড়কের প্রশস্ততা বাড়াতে হবে)।
  • শহর এবং গ্রামে সড়কের নিরাপদ সংযোগ এবং পায়ে চলা পথসহ পথচারীদের যাতায়াতের পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে।
  • বিশেষ কিছু সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করা, যেমন ইঞ্জিন ব্যতীত যানবাহনের জন্য এবং বাস, ট্রাকের মতো ভারী যানের জন্য পৃথক সড়ক ডিজাইন করতে হবে।
  • বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী দ্বারা সড়ক সংযোগ এবং ক্রসিং (সিগন্যাল বাতি, লেন, আইল্যান্ড) স্থাপন করতে হবে।
  • রাস্তার পাশের প্রতিবন্ধকতাকে দূর করে সড়ককে স্বাভাবিক করে তুলতে হবে।
  • সরু এবং ক্ষতিগ্রস্থ সেতু, কালভার্ট এগুলোর সংযোগস্থল এবং সড়কের উন্নয়ন ঘটাতে হবে।
  • যানবাহনের অতিরিক্ত গতি এবং বিপজ্জনকভাবে যান অতিক্রম নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
  • সড়কগুলোতে বিভিন্ন চিহ্ন, নিরাপত্তামূলক রেলিং, গাইড পোস্ট, পুলিশ ইত্যাদি সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।
  • প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ, ক্রস-সেকশন, দৃষ্টিসীমা, সারি বিন্যাস এবং রাত্রিকালীন আলোক-সুবিধা বাড়াতে হবে।
  • সাধারণত দ্বিমুখী সড়কের চেয়ে একমুখী সড়কগুলোতে দুর্ঘটনা বেশি ঘটে, এ জন্য সড়কে বিভক্তিকরণ ডিভাইডার দিতে হবে। 

যানবাহন এবং পরিবহনব্যবস্থার ভিত্তিতে 

  • আইন প্রয়োগের মাধ্যমে বাস, প্রাইভেট কারসহ সব ধরনের যানচালকদের জন্য নিরাপদ সিট বেল্ট এবং শিশুদের আটকে রাখার ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করতে হবে। 
  • পথচারী এবং সাইকেলচালকদের সুবিধার্থে সব মোটরযানের সম্মুখভাগে নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা করতে হবে।
  • সাধারণ যানবাহন, সাইকেল আরোহী এবং পথচারীদের জন্য পৃথক নজরদারির ব্যবস্থা করতে হবে।
  • নিয়মিতভাবে যানবাহনের ফিটনেস, মানসহ টেকনিক্যাল বিষয়গুলো পরীক্ষা করতে হবে।
  • মোটর সাইকেল এবং বাইসাইকেল চালকদের জন্য হেলমেট পরিধান বাধ্যতামূলক করতে হবে। উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা স্থাপন এবং অন্যান্য সংঘর্ষমুক্ত চালকদের সহায়ক আধুনিক সড়ক নির্মাণ করতে হবে।
  • জনগণের অধিক ব্যবহারের উপযোগী বাস এবং ট্রেন জাতীয় গণপরিবহন বাড়াতে হবে যা প্রাইভেট কার, মোটর সাইকেল এবং অন্যান্য যানবাহনের চেয়ে অধিক নিরাপদ।
  • আইনগত, ব্যবহারিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রে আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং অ্যালকোহল, মাদকসহ নেশাজাতীয় দ্রব্য থেকে চালকদের বিরত রাখা এবং নিরাপদ যান চালনার ব্যাপারে তাদেরকে প্রেরণা জোগাতে হবে। সড়কে যানবাহনগুলোর অতিরিক্ত ভার বহন নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। নিয়মিত চালকদের লাইসেন্স পরীক্ষা করতে হবে এবং তাদের দক্ষতা প্রমাণের জন্য পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনে যানচালনা সম্পর্কে দিকনির্দেশনা প্রদান করতে হবে।
  • সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক সচেতনতামূলক এবং প্রচারমূলক ক্যাম্পিং করতে হবে।
  • উন্নত এবং বাস্তবসম্মত যোগাযোগনির্ভর সড়ক নিরাপত্তা কর্মসূচি নিয়মিত আয়োজন করতে হবে।
  • যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং করা থেকে বিরত থাকতে হবে। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক জনসচেতনতা বাড়াতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। যান চালকদের দীর্ঘ ক্লান্তিকর এবং একটানা যান চালনা থেকে বিরত রাখার পরিকল্পনা নিতে হবে। পরিকল্পনাবিদ, অনুশীলনরত প্রকৌশলী, অন্যান্য পেশাজীবী এবং পলিসি মেকারদের সড়ক নিরাপত্তা সম্পর্কিত ট্রেনিং প্রদান করতে হবে।
  • জরুরি সহায়তা প্রদানে কার্যকরী ট্রমা কেয়ার ম্যানেজমেন্ট সেন্টার এবং এ বিষয়ক বিশেষজ্ঞ তৈরি করতে হবে। এ ছাড়া বিশেষ পুনর্বাসন কেন্দ্র গড়ে তোলা জরুরি। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে প্রকৌশলী, শিক্ষা বিভাগ, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, দুর্ঘটনা ব্যবস্থাপনা, মানবাধিকার সংস্থা, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ এবং সাধারণ জনগণকে নিয়ে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
  • বিভিন্ন বিমা কোম্পানি এবং অন্যান্য বেসরকারি সংস্থাকে সড়ক নিরাপত্তার সমস্যাগুলোকে চিহ্নিত করতে হবে এবং তা সমাধানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

জাতীয় সড়ক নিরাপত্তাব্যবস্থার ক্ষেত্রে

  • একটি উন্নত এবং নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে জাতীয় পর্যায়ে সড়ক নিরাপত্তাব্যবস্থাকে অধিকতর গুরুত্ব দিতে হবে।
  • এ বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহকে স্ব স্ব ভূমিকা, দায়িত্ব, কর্তব্য, প্রশিক্ষণ ইত্যাদি কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।
  • সরকারকে এ বিষয়ে একটি মৌলিক পদক্ষেপ নিতে হবে। স্বতন্ত্র একটি প্রতিষ্ঠানকে এ ব্যাপারে নিয়োগ দিতে হবে যাতে এ সম্পর্কিত বিভিন্ন দিকনির্দেশনা থাকবে। 
  • জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলকে (ঘজঝঈ) শক্তিশালী করতে হবে। এ ব্যাপারে সরকারের কর্তাব্যক্তিদের এগিয়ে আসতে হবে।

পরিশেষে

নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীরা তুলে ধরেছে যানবাহন ও সড়ক যোগাযোগব্যবস্থার গলদগুলো কোথায়; কীভাবেই বা সেসব দূর করা যায়। সড়কে তারা যানবাহনগুলোকে সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করে দারুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে আইন মানার প্রবণতাও তখন লক্ষণীয় ছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয়, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পরে সড়কের বিশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তাহীনতা আবারও আগের অবস্থায় ফিরে এসেছে। এ অবস্থায় সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সবাইকে ট্রাফিক আইন মেনে চলার সুঅভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। এ বিষয়ে বাড়াতে হবে দায়িত্ব ও সচেতনতাবোধ। সড়ক নিরাপদ হতে পারে সবার মিলিত প্রচেষ্টায়।

প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১০১তম সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০১৮

মঈন আহমেদ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top