বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষার মাধ্যমেই উন্নত দেশ গড়া সম্ভব

বাংলাদেশে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উচ্চতর শিক্ষার সংকট ও সম্ভাবনা সম্পর্কে জানতে চাই?

একটি পিছিয়ে পড়া জাতিকে এগিয়ে নিতে বিজ্ঞানমুখী শিক্ষা অপরিহার্য। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষার মাধ্যমেই কারিগরি জ্ঞান অর্জন ও উন্নত দেশ গঠন সম্ভব। সে উপলব্ধি থেকেই সরকার দেশে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষায় জোর দিচ্ছে; স্থাপন করছে বিশ্ববিদ্যালয়। এমনকি সরকার প্রতিটি জেলায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে আগ্রহী। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষা অবশ্যই গুরুত্ব পাবে। আমি মনে করি, দেশের উন্নয়নে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষাকে গুরুত্ব প্রদান সরকারের সুচেতনাবোধের বহিঃপ্রকাশ। পাশাপাশি সঠিক ও যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত। বিজ্ঞানমুখী শিক্ষার প্রসারে ইতিমধ্যেই দেশে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় নির্মিত হয়েছে। আমি চাই এ ধরনের প্রতিষ্ঠান আরও হোক! তাহলে নতুন প্রজন্মের জন্য হবে অত্যন্ত উৎসাহব্যঞ্জক এবং সৃষ্টি হবে উচ্চশিক্ষার দারুণ সুযোগ। ফলে কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন এই তরুণ প্রজন্ম দেশ বিনির্মাণে রাখবে অগ্রণী ভূমিকা।

দেশে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা নাকি যেগুলো রয়েছে তার বিরাজমান সমস্যাসমূহ সমাধান করা এবং সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে তা আদর্শ ও পূর্ণাঙ্গভাবে গড়ে তোলা কোনটা সমীচীন বলে মনে করেন?

একটা কথাই বলা যায়, একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে পূর্ণাঙ্গ করতে গেলে রাতারাতি সম্ভব নয়। ইটের পর ইট গেঁথে ভবন করতে হয়। প্রথমে একতলা তারপর দোতলা এরপর ১০ তলা-২০ তলা হয়। এভাবেই ভবনটি পূর্ণাঙ্গতা পায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিষয়টিও একই। প্রয়োজন সময়। কিন্তু দেশের অপ্রতুল বিশ্ববিদ্যালয় উচ্চশিক্ষার চাহিদা মেটাতে সক্ষম নয়। এগুলো নিয়ে বেশি অগ্রসরও হওয়া যাবে না। ওগুলোর আসন সীমিত বিধায় তুলনামূলক অনেক কম শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা লাভ করবে কিন্তু তা দেশের চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। তাই শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগদানে নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় গড়তে হবে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গেই তা পূর্ণাঙ্গতা পেয়ে এগিয়ে যাবে। আমরা যদি শুরু না করি তবে বুঝতে পারব না সমস্যাগুলো কী? আর্থিক, জনবল, শিক্ষক নাকি শিক্ষাপদ্ধতি। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ই একটি সময় পর কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছায়। কিন্তু নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত না হলে দেশের চাহিদা মিটবে না; উন্নয়নও হবে না। তবে কার্যকর যেসব বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে সেগুলোর সমস্যাসমূহ দূর করা এবং সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করা অবশ্যই জরুরি।

উচ্চতর শিক্ষায় গবেষণা একটি মুখ্য বিষয়। অথচ দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এখনো গবেষণার সুষ্ঠু পরিবেশ গড়ে ওঠেনি বিধায় অনেকেই পাড়ি জমাচ্ছেন বিশ্বের স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। দেশীয় শিক্ষাব্যবস্থায় অভ্যস্ত শিক্ষার্থীরা সে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারছে কি?

আমাদের যে পাঠ্যক্রম আছে সে অনুযায়ী শিক্ষার্থীরা বিদেশে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায়। এমনকি বিশ্বের সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠাগুলোতেও। লেখাপড়ার মান খারাপ হলে উন্নত দেশে তা গ্রহণযোগ্যতা হারায়। সুতরাং শিক্ষা ও গবেষণাপদ্ধতি তেমন সমস্যা নয়। সমস্যা হচ্ছে গবেষণায় ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি। কারণ, এ দেশে এখনো ম্যানুয়াল যন্ত্রপাতি বেশি ব্যবহার করা হয়। কিন্তু উন্নত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উচ্চ প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি দিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। আমাদের শিক্ষার্থীরা সেগুলোর সঙ্গে ততটা পরিচিত নয়। তবে সাময়িকভাবে এসব তাদের কাছে নতুন মনে হলেও এর ভালো দিকও রয়েছে। এ দেশে যখন কেউ জোড়াতালির যন্ত্রপাতি দিয়ে কাজ শিখে, বিদেশে যখন সংক্রিয় যন্ত্রপাতি পায়, তখন শুধু এটার অপারেশন জানার চেষ্টা করে। কারণ, ম্যানুয়াল ব্যাপারগুলো দেশ থেকে শিখে এসেছে। প্রত্যেক শিক্ষার্থী খুব কম সময়েই ওই পরিবেশে মানিয়ে নিতে পারে। এভাবে উন্নত দেশের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সমান তালে এগিয়ে যায় এ দেশের শিক্ষার্থীরা।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষাসংকট নিরসনে বিশেষ করে বরেন্দ্র অঞ্চলে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় কী ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন?

এই বিশ্ববিদ্যালয়টি স্থাপিত হওয়ায় এলাকার শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। অভিভাবক ও এলাকাবাসীর সাড়াও অত্যন্ত চমৎকার। এখন এই জনপদের শিক্ষার্থীরা স্বপ্ন দেখে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার। আগে হয়তো এতটা ছিল না। বিজ্ঞান ও কারিগরি বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের ইচ্ছা ও মেধা থাকা সত্ত্বেও ঢাকা বা অন্য বড় শহরে গিয়ে পড়ালেখার সুযোগ ছিল না অনেকেরই। কিন্তু এখন যাদের আর্থিক অবস্থা খারাপ, তারাও কম খরচে বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষা নিতে পারছে। এককথায় বলতে গেলে বিশ্ববিদ্যালয়টি গড়ে ওঠায় পাবনা এবং পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের ছেলেমেয়েরা ব্যাপকভাবে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেয়েছে। বলা যায়, পাবনাবাসীরাই সবচেয়ে উপকৃত হয়েছে। কারণ, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সিংহভাগ শিক্ষার্থীই পাবনার।

দেশে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে কিন্তু পর্যাপ্ত অর্থসংস্থান, ভবন, গবেষণাগার, আবাসন, শিক্ষকসংকটসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত ক্যাম্পাসগুলো। এতে শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ হচ্ছে ব্যাহত, এ ধরনের কোনো সমস্যা এ প্রতিষ্ঠানটির বেলায় রয়েছে কি?

হ্যাঁ, ঠিকই বলেছেন। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে যেসব সুযোগ-সুবিধা থাকলে সবাই সন্তুষ্ট হতো বা প্রয়োজনগুলো মেটানো যেত, তা হয়তো এই মুহূর্তে নেই। কিন্তু এটাও সত্য, ২০০৮ সালে যখন বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন এই ক্যাম্পাসটি ছিল জলাভূমিতে। ক্যাম্পাস প্রাঙ্গণেই পানি জমে থাকত। দিনে দিনে সেখানে মাটি ভরাট হয়েছে, বহুতল ভবন তৈরি হয়েছে। এভাবেই ক্রমান্বয়ে এগিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। আর্থিক অনটনের বিষয়টিও একই রকম। যে পরিমাণ অর্থ সরবরাহ হলে এই বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্বমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রূপদান সম্ভব, সেই পরিমাণ অর্থ হয়তো এই মুহূর্তে নেই। কিন্তু আস্তে আস্তে আমরা সরকার থেকে অর্থছাড় পাচ্ছি। সরকারও আন্তরিকভাবে চেষ্টা করছে নানা অভাব মেটাতে। তা ছাড়া অনেক ভবন ইতিমধ্যেই নির্মিত হয়েছে এবং বেশ কয়েকটি বহুতল ভবন নির্মাণাধীন। এগুলোর নির্মাণকাজ শেষ হলে আবাসন, গবেষণাগার, শ্রেণিকক্ষসহ সব চাহিদাই পূরণ হবে এবং অর্জিত হবে স্বয়ংসম্পূর্ণতা।

পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান এখন কোন পর্যায়ে বলে আপনি মনে করেন?

আমি মনে করি শিক্ষার মানের দিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয়টি অনেক ভালো অবস্থানে রয়েছে। আমাদের চারটি ডিপার্টমেন্টের শিক্ষার্থীরা পাস করে বেরিয়েছে। এর মধ্যে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ইলেকট্রিক্যাল ডিপার্টমেন্টের শিক্ষার্থীরা উত্তীর্ণ হওয়ার পরই চাকরি পেয়েছে!  খুব কমসংখ্যকই হয়তো বা বেকার রয়েছে। এখন তো চাকরি পেতে অনেক প্রতিদ্বন্দি¦তা করতে হয়। এটা সত্ত্বেও তারা চাকরি পাচ্ছে। তাই আমি মনে করি, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে যে পাঠদানপদ্ধতি এবং পাঠ্যক্রম আছে, তার মান ভালো। শিক্ষকেরাও অবশ্যই সঠিক শিক্ষা দিচ্ছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীরা কি মাঠপর্যায়ে (ফিল্ডওয়ার্ক) কাজ করার এবং জাতীয় ও আন্তর্জান্তিক পর্যায়ে অনুষ্ঠিত প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে? শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা যেন গবেষণার পূর্ণ সুযোগ পায়, সে লক্ষ্যে আপনার গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে বলবেন?

উচ্চশিক্ষায় মাঠপর্যায়ে কাজ বা ফিল্ডওয়ার্ক খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রয়োজনীয়। সে উপলব্ধি থেকেই আমরা বিষয়টিকে গুরুত্বসহকারে দেখছি। বিশেষ করে বিজ্ঞানের বিষয়গুলো। ইতিমধ্যে ফার্মেসি ডিপার্টমেন্টের গবেষণার সুযোগ দিতে স্থানীয় একটি দেশসেরা ফার্মাসিটিক্যালে ইন্টার্নশিপের ব্যাপারে আলোচনা হয়েছে। কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) ডিপার্টমেন্টের শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) একই ডিপার্টমেন্টের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ ও অভিজ্ঞতা বিনিময় করছে। এ ছাড়া কিছু মুঠোফোন নেটওয়ার্ক সেবাদানকারী কোম্পানি ও আইটি প্রতিষ্ঠানেও কাজের সুযোগ করে দিচ্ছি, যেন তারা বাস্তব জ্ঞান অর্জন করতে পারে। স্থাপত্য বিভাগে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষার্থীরা এসে তাদের অভিজ্ঞতা বিনিময় করছে। তারা বিভিন্ন প্রকল্প ডিজাইন করছে এবং উত্তরা গণভবনসহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক কিছু ভবনে শিক্ষাসফর করছে। অন্যান্য ডিপার্টমেন্টের শিক্ষার্থীরাও মাঠপর্যায়ে কাজের সুযোগ পাচ্ছে।  এ ছাড়া ডিপার্টমেন্টগুলো যদি গবেষণার জন্য কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করে, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় সাধ্যমতো সহযোগিতা করবে। হয়তো যতটুকু করলে ভালো হতো ততটা না হলেও সদিচ্ছার কমতি থাকবে না। এ ছাড়া শিক্ষার্থীরা দেশে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইভেন্টে ইতিমধ্যেই অংশ নিচ্ছে। তাদের তত্ত্বাবধানে শিক্ষকেরাও যাচ্ছেন। ফলে তাদের মধ্যে ওই চেতনার উন্মেষ ঘটছে। দেশে ভালো কিছু করতে পারলে বাইরেও করা যাবে। আমার বিশ্বাস খুব দ্রুতই তারা বিদেশে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইভেন্টে অংশ নিয়ে সাফল্য অর্জন করবে। এসবের মাধ্যমেই শিক্ষার্থীরা ছাত্রাবস্থাতেই পেশাগত জীবনের ধারণা পেয়ে যাবে।

একটি আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় সমধর্মী আন্তবিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সমন্বয় জরুরি। বাংলাদেশের অন্যান্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এ প্রতিষ্ঠানটির সমন¦য় কেমন?

হ্যাঁ, বিশ্বমানের হতে একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে এগিয়ে নিতে বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা বলি কোলাবরেশন। এটা প্রশাসনিক, শিক্ষা, গবেষণাসহ সব বিষয়ে। তো সে লক্ষ্যে আমরা একটি বিশেষ কমিটি করেছি। এই কমিটির দায়িত্ব দেশে যেসব বিশ্ববিদ্যালয় আছে, সেগুলোর বিভিন্ন একাডেমিক সুবিধা যেন আমরা ভোগ এবং বিনিময় করতে পারি। তাই নিয়েই একটি কোলাবরেশন হবে। একইভাবে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গেও একই রকম চুক্তির উদ্যোগ আমরা গ্রহণ করেছি। এতে শিক্ষার্থী যারা উচ্চতর ডিগ্রি নিতে চায়, তারা সেখানে যেতে পারবে। শিক্ষকেরা যাঁরা পিএইডি করেননি, তাঁরাও এই সুবিধা পাবেন। এটা বাস্তবায়ন হলে চুক্তিভুক্ত দেশের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে উঠবে। উন্নত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আধুনিক কী ধরনের গবেষণা হচ্ছে, সে ব্যাপারে দিকনির্দেশনা পাওয়া যাবে। বিষয়টিকে আমরা খুব গুরুত্বসহকারে নিয়েছি এবং কমিটিও কাজ করে যাচ্ছে।

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস প্রাঙ্গণ হবে খোলামেলা এবং বিস্তৃত কিন্তু পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভবন ও অবকাঠামো সংকীর্ণ কেন?

একটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস হবে খোলামেলা, নান্দনিক ও চোখ জুড়ানো। এটা সবার মতো আমারও প্রত্যাশা। কিন্তু পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সংকীর্ণ প্রাঙ্গণ আমাকে পীড়া দেয়। প্রতিষ্ঠানটি নির্মাণকালীন আমি দায়িত্বে ছিলাম না। দায়িত্বে থাকলে বা কিছু করার থাকলে হয়তো এভাবে হতে দিতাম না। যেহেতু অনেক কিছুই নির্মিত হয়েছে, তা তো আর ভেঙে নতুন করা যাবে না। বড়জোর রিইনোভেশন করা যেতে পারে। তবে আমরা একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছি, যা বাস্তবায়ন হলে প্রতিষ্ঠানটি একটি বিশ্বমানের একাডেমিক স্থান হবে। প্রতিটি ডিপার্টমেন্টের জন্য বিশাল ফ্লোর থাকবে। সেখানে আধুনিক শ্রেণিকক্ষ, গবেষণাগার, উন্নত প্রযুক্তিসম্পন্ন যন্ত্রপাতিসহ নানা সুবিধা থাকবে। এটা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। সরকারও এ ব্যাপারে অত্যন্ত সহযোগী। তা ছাড়া যেহেতু এখানে স্থাপত্য বিভাগ হয়েছে, আমার বিশ্বাস তারা এখানে মাটির স্থাপনাসহ নান্দনিক ও শৈল্পিক নানা স্থাপনা গড়ে তুলবে। এবং আমি স্বপ্নও দেখছি স্বল্প সময়ে তাদের যে অগ্রগতি এবং কর্মতৎপরতা, তাতে আমি বিস্মিত হয়েছি। এ ছাড়া ক্যাম্পাসের সৌন্দর্যবর্ধনে আমার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে বিরাজমান এ ধরনের সমস্যা সমাধানে এবং শিক্ষার মান উন্নয়নে সরকারের কাছে আপনার সুপারিশ ও দাবিসমূহ কী?

একটি অবকাঠামো যখন নির্মিত হয় তখন ইচ্ছে করলেই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। সরকারি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই যেতে হয়। একটি প্রতিষ্ঠান ডিজাইন ও বাস্তবায়ন হয় সাধারণত সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। নির্মাণ হওয়ার পর আমরা বুঝে নিই। তো স্বাভাবিকভাবেই সেখানে নান্দনিকতা, প্রয়োজন বা শৈল্পিকতার তেমন প্রয়োগ হয় না। কিন্তু অবকাঠামোটি যদি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিজেদের মতো নির্মাণ করে, তাহলে অনেক দ্রুত নির্মাণ সম্ভব। সেখানে প্রয়োজন, ইচ্ছা ও রুচিবোধের প্রয়োগ ঘটবে। আমার মনে হয়, এই বিষয়গুলো যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের চাহিদা ও ধরন অনুযায়ী উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের সম্মতি নিয়ে করা হয়, তাহলে তা হবে আকর্ষণীয় ও যুগোপযোগী।

এ ছাড়া অন্যান্য সমস্যার মধ্যে আর্থসংস্থান উল্লেখযোগ্য। এটা সমাধান জরুরি। শিক্ষার মান, পদ্ধতি ও পাঠ্যক্রম নিয়েও বলা যেতে পারে। এগুলো অনেক কিছুর ওপরই নির্ভর করে, যেমন প্রতিষ্ঠান কাঠামো, শ্রেণিকক্ষ, লাইব্রেরি, চেয়ার-টেবিল, শিক্ষকদের লেকচারপদ্ধতি, পাঠদান প্রভৃতি। এসব আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর হওয়া খুব জরুরি। আধুনিক বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সুযোগ-সুবিধা এখনো এ দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পায়নি। এগুলোর ব্যাপারে দৃষ্টি দেওয়া উচিত। পাঠ্যক্রম অনেকটাই ঠিক আছে এবং প্রতিবছর এর কিছু পরিমার্জনও করা হয়। তবে সেগুলোকে আরও আধুনিক করার উদ্যোগ নিতে হবে।

উন্নতমানের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় সরকারের কাছে আমাদের দাবির তো শেষ নেই; অনেক চাহিদাই রয়েছে। কিন্তু আমাদেরও বুঝতে হবে দেশের সম্পদ সীমিত। সরকারকে সবকিছু ব্যালেন্স করে চলতে হয়। আমাদের সামাজিক সমঝোতার মধ্যে আসতে হবে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব চাওয়ার অনেক কিছুই পূরণ হবে, তা মেনেই এগোতে হবে। কোনো সন্দেহ নেই শিক্ষা খাতে সরকার অনেক আন্তরিক। কিন্তু আমি মনে করি, আমাদের জনগোষ্ঠীকে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে এই খাতে  গুরুত্ব প্রদান জরুরি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, মর্যাদাকর ও দায়িত্বপূর্ণ একটি পদ। পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর হতে পেরে আপনার অনুভূতি?

নিঃসন্দেহে খুব ভালো! সুদীর্ঘ সময় শিক্ষকতার পর এমন একটি দায়িত্ব অত্যন্ত আনন্দের ও সুখকর। তবে আগে ছিলাম একজন শিক্ষক, শিক্ষার্থীদের গড়তাম। এখন শিক্ষকদের গড়ার দায়িত্বও আমার। তাঁদের বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দেওয়া, প্রশাসন পরিচালনা করা, বিশ্ববিদ্যালয়ের সব সমস্যা সমাধান, গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া খুবই জটিল। প্রায়ই চিন্তিত হয়ে পড়ি আমার ওপর অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারছি কি না। তবে এটা ভেবেও ভালো লাগে আমি একটি মহান ও গুরুদায়িত্ব পালন করছি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলকে নানা প্রতিবন্ধকতা, ব্যস্ততা ও চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে পথ চলতে হয়। আপনার বেলায় সেগুলো কেমন এবং কীভাবে তা মোকাবিলা করছেন?

প্রশাসনিক অনেক বিষয় অত্যন্ত চ্যালেঞ্জের সঙ্গে মোকাবিলা করতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারীদের দক্ষ ও কর্মোপযোগী করে তোলা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। যেহেতু এটি একটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয়, তাই প্রশাসনিক কাজ পরিচালনার অভিজ্ঞতা অনেকেরই নেই। নিজে হাতেই অনেক সময় করে শেখাতে হয়। তবে তাঁদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কম্পিউটারে বা দাপ্তরিক কাজে জড়িত ব্যক্তিদের বিভিন্ন প্রশিক্ষণের ব্যাপারে সহযোগিতা করা হচ্ছে। ব্যক্তিগতভাবে প্রশিক্ষণের ব্যাপারেও তাদের উৎসাহী করা হচ্ছে। বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টে প্রশিক্ষণ কর্মশালা আয়োজনের ব্যাপারে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শিক্ষকদের বিভিন্ন সেমিনারে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে। নতুন বিশ্ববিদ্যালয় বলে নির্বিঘ্ন কাজের পরিবেশ ও সংস্কৃতি এখানে সেভাবে গড়ে ওঠেনি। তবে এসব কিছুই দ্রুত সমাধানের চ্যালেঞ্জ নিয়েই আমরা এগোচ্ছি।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতি একটি বড় সমস্যা, যা অনেক সময় অত্যন্ত সহিংস হয়ে ওঠে, আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ে সে সমস্যা আছে কি? থাকলে বিষয়টিকে কীভাবে মোকাবিলা করেন?

ছাত্ররাজনীতিসহ যে সমস্যাই আসুক না কেন, তা তো মোকাবিলা করতেই হয়। শিক্ষার্থী বা কর্মচারী তাদের বিভিন্ন দাবি আদায় বা অন্যান্য কারণে আন্দোলন, অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করলে শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখতে তার সমাধান তো করতেই হয়। তাদের বুঝিয়ে ও অন্যান্য কৌশল অবলম্বন করে তা মোকাবিলা করতে হয়। আসলে ছাত্রজীবন থেকেই ছাত্ররাজনীতি দেখে আসছি। ফলে তা অভিজ্ঞতার আলোকেই মোকাবিলা করি। চেষ্টা করি সহিষ্ণু হয়ে বন্ধুত্বপূর্ণ স্নেহ-ভালোবাাসার একটি পরিবেশ তৈরি করতে। তা ছাড়া এই ক্যাম্পাসে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ক্লাব গড়ে উঠছে। তাদের এ প্রচেষ্টাকে আমরা সাধুবাদ জানাচ্ছি। কারণ, তারা যদি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে নিজেদের যুক্ত করে, তাহলে তাদের মধ্যে সামাজিক বোধ আসবে এবং তা থেকে মানবিক বোধের সৃষ্টি হবে। লেখাপড়ার পাশাপাশি এগুলোতে আমি পূর্ণ সমর্থন দিচ্ছি।

ভবিষ্যতে এ বিশ্ববিদ্যালয়টিকে একটি আধুনিক ও যুগোপযোগী বিশ্বমানের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নীত করতে আপনার গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে চাই…

পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের সেরা ক্যাম্পাসের একটি হোক আমি সেটাই চাই! সে স্বপ্ন নিয়েই আমি এখানে এসেছি। তা বাস্তবায়নে শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী, শিক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্ট সবার মধ্যে আমার চাওয়াটা ধারণ করাতে পারি তাহলে স্বপ্নটা অবশ্যই বাস্তবায়িত হবে। আমি নেতৃত্ব দেব, তারাও আমার সহযোগী হয়ে এগিয়ে নেবে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টি একটি আধুনিক গবেষণামূলক এবং জ্ঞানচর্চার প্রাণকেন্দ্র হোক, এটা আমি চাই এবং তা বাস্তবায়নে সব ধরনের কাজ করে যাচ্ছি। এটা হলে শিক্ষা এবং গবেষণার দিক থেকে প্রতিষ্ঠানটি একটি উচ্চমানের প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে। একইভাবে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাজে জড়িত শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর হাতকেও সবল করতে চাই যেন তারা বিশ্ববিদ্যালয়টিকে একটি আদর্শ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে বিনির্মাণে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারে।

আপনাকে ধন্যবাদ

তোমাকেসহ বন্ধন-এর সবাইকে ধন্যবাদ।

প্রকাশকাল: বন্ধন ৫৭তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০১৫

ড. আল-নকীব চৌধুরী
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top