ইমারত নির্মাণ ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণ (পর্ব-৩)

….পূর্ব প্রকাশের পর

একটি ইমারত নির্মাণ প্রকল্পের সম্পূর্ণ কাজ সম্পাদন করতে প্রয়োজনীয় মালামালের পরিমাণ ও খরচের আনুমানিক প্রাক্কলন তৈরি করা সম্ভব। এ লক্ষ্যে যেকোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন পূর্ব প্রণীত ডিজাইন ও ড্রয়িং অনুযায়ী প্রতিটি আইটেম কাজের জন্য প্রয়োজনীয় মালামালের পরিমাণ আলাদা আলাদাভাবে হিসাব করে বর্তমান বাজার দর অনুসারে মোট খরচের ওপর লেবার খরচ বাবদ আনুমানিক ৩০ শতাংশ (শতকরা ৩০ টাকা) অর্থ যোগ করলে প্রকল্প বাস্তবায়নে সর্বমোট খরচের সম্ভাব্য একটি প্রাক্কলন পাওয়া যাবে।

প্রাক্কলিত এই সম্ভাব্য খরচ নিয়ন্ত্রণকল্পে প্রয়োজনীয় মালামাল কেনা এবং ভৌত কাজ বাস্তবায়ন করার আগে প্রতিটি মালামালের এবং আইটেমের লেবার রেট যাচাই করে নেওয়া জরুরি। এ ছাড়া ব্যবহৃতব্য সব মালামাল ও জনবলসহ সব ধরনের অপচয় রোধ করার বিষয়টি বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া অত্যাবশ্যক। এ ছাড়া প্রাক্কলিত ব্যয়ের ওপর কম-বেশি ১০ শতাংশ তারতম্য হওয়ার বিষয়টিও মাথায় রাখা প্রয়োজন।

এখন যদি আমরা একটি প্রকল্পের পূর্ণ বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে আসি তাহলে, একটি ইমারত নির্মাণকাজের ধারাবাহিকতা অনুযায়ী ফাউন্ডেশনের জন্য পাইল ঢালাই করার পর আসে মাটি কাটার কাজ। মাটির কাজ সাধারণত ‘সিএফটি’ বা ‘ঘনফুটে’ নির্ণয় করা হয়। দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা গুণ করলে ঘনফুট পাওয়া যায়। তবে এই মাটি কাটা বিভিন্নভাবে হতে পারে। প্রতিটি কলামের জন্য যদি আলাদা আলাদা বেইজ তৈরি করা হয়, সে ক্ষেত্রে বেইজের মাপ অনুসারে আলাদা অলাদাভাবে মাটি কাটা হয়।

উল্লেখ্য, একটি ইমারতের ধরন, তলা ও মাটির ভারবহন ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে এর ভিত বা ফাউন্ডেশনের ডিজাইন। ফলে আলাদা কলাম ফুটিং কিংবা র‌্যাফট/ম্যাটসহ নানা ধরনের ফাউন্ডেশন হতে পারে। র‌্যাফট/ম্যাট ফাউন্ডেশনের জন্য মাটি কাটার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ এরিয়া ধরে নির্দিষ্ট গভীরতায় মাটি তুলতে হয়। আলাদা কলাম ফুটিং কিংবা র‌্যাফট/ম্যাট ফাউন্ডেশন যেটাই করা হোক না কেন, ড্রয়িং-ডিজাইন অনুযায়ী মাটি কাটার খরচের হিসাবের জন্য কর্তনকৃত মাটির মোট ঘনফুট হিসাব করে প্রতি ঘনফুট মাটি কাটার জন্য নির্ধারিত লেবার রেট দিয়ে গুণ করলে মাটি কাটার কাজ সম্পন্ন করতে সম্ভাব্য একটি খরচের হিসাব বেরিয়ে আসবে।

এরপর ফাউন্ডেশনের বেইজ (পাইল ক্যাপ/কলাম ফুটিং কিংবা র‌্যাফট/ম্যাট) ঢালাই করার জন্য প্রয়োজনীয় মালামালের পরিমাণ এবং খরচের হিসাব, পাইলের ঢালাই ও রডের হিসাব বের করার মতো এটিও একই পদ্ধতিতে বের করা সম্ভব। ধরা যাক, একটি ইমরতে ১২টি কলাম আছে এবং প্রতিটি কলাম বেইজের মাপ ১০’ x  ১০’, উচ্চতা ২’। কংক্রিটের অনুপাত ১ ঃ ২ ঃ ৪ (সিমেন্ট, বালু ও খোয়া) এবং উভয় দিকে ৫ ইঞ্চি পরপর ৩/৪ ইঞ্চি ব্যাসবিশিষ্ট রড ব্যবহার করা হবে। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় মালামালের হিসাব প্রণয়ন পদ্ধতি-

ক. কংক্রিটের পরিমাণ নিরূপণ

         একটি কলামের বেইজ বা পাইল ক্যাপের হিসাব;

  • ক্ষেত্রফল= ১০’ x ১০’ = ১০০ বর্গফুট।
  • আয়তন (ভলিউম) = ক্ষেত্রফল x উচ্চতা = ১০০ বর্গফুট x ২ ফুট = ২০০ ঘনফুট।

             (অর্থাৎ উল্লেখিত স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী একটি কলামের বেইজ বা পাইল ক্যাপ ঢালাই করতে মোট ২০০ ঘনফুট কংক্রিট প্রয়োজন)

এখন,

      ২০০ ঘনফুট কংক্রিটের জন্য প্রয়োজনীয় সিমেন্ট, বালু ও খোয়ার পরিমাণ নিরূপণ-

     (বিশ্লেষণ অনুযায়ী ১০০ ঘনফুট জমাটবাঁধা কংক্রিট তৈরি করার জন্য ১৫০ ঘনফুট শুকনো মালামালের প্রয়োজন হয়,

      অর্থাৎ জমাটবাঁধা কংক্রিটের পরিমাণ x ১.৫০ = শুকনো মালামালের পরিমাণ)

অতএব,

     ২০০ ঘনফুট কংক্রিট ঢালাই করার জন্য ১ ঃ ২ ঃ ৪ অনুপাতে যে পরিমাণ সিমেন্ট, বালু ও খোয়া প্রয়োজন হবে,

     তার বিশ্লেষণ এবং পরিমাণ নিরূপণ পদ্ধতি-

     ১. সিমেন্ট = (২০০ x ১.৫০ x ১) / (১ + ২ + ৪) = ৪২.৮৬ ঘনফুট = ৩৪.২৮ বস্তা (১ বস্তা = ১.২৫ ঘনফুট)।

     ২. বালু = (২০০ x ১.৫০ x ২) / (১ + ২ + ৪) = ৮৫.৭১ ঘনফুট।

     ৩. খোয়া = (২০০ x ১.৫০ x ৪) / (১ + ২ + ৪) = ১৭১.৪২ ঘনফুট।

 এখন,

      ১৭১.৪২ ঘনফুট খোয়া তৈরি করার জন্য প্রয়োজনীয় ইটের পরিমাণ নিরূপণ-

      (বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রতি ১০০ ঘনফুট খোয়া তৈরি করার জন্য ৮৫০টি ইট প্রয়োজন)

অতএব,

      ১৭১.৪২ ঘনফুট খোয়া তৈরি করার জন্য (১৭১.৪২ x ৮৫০)/১০০ = ১৪৫৭টি ইট প্রয়োজন হবে।

খ. রডের পরিমাণ নিরূপণ

৩/র্৪র্  (ইঞ্চি) ব্যাসবিশিষ্ট রড;

২ x ২৪টি x ৯.৫০ ফুট (লম্বা) = ৪৫৬ ফুট x ০.৬৮২ কেজি (এক ফুট রডের ওজন) = ৩১০.৯৯ কেজি।

(ফুটিংয়ের একটি রডের দৈর্ঘ্য নির্ণয় করতে কংক্রিটের সাইড কভারিংয়ের জন্য উভয় পাশে ৩” + ৩” = ৬”  বাদ দিতে হয়)

এই একটি কলামের বেইজ বা পাইল ক্যাপ ঢালাই করার জন্য হিসাবকৃত মালামাল অনুযায়ী সব কলামের বেইজ বা পাইল ক্যাপের জন্য প্রয়োজনীয় মালামালের হিসাব সহজেই নিরূপণ করা সম্ভব। সবশেষে, এসব হিসাবের সঙ্গে লেবার, মেশিনারিজ ও পরিবহন ব্যয় বাবদ আলাদা একটি খরচের হিসাব অবশ্যই যোগ করতে হবে। তাহলেই অত্র আইটেমের সম্পূর্ণ কাজের বিপরীতে সম্ভাব্য একটি খরচের প্রাক্কলন পাওয়া যাবে। 

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, প্রতিটি কলামের বেইজ বা পাইল ক্যাপ একই আকৃতির নাও হতে পারে এবং সেটাই স্বাভাবিক। কলামের ওপর পতিত লোড এবং মাটির বহন ক্ষমতা অনুসারে বিভিন্ন কলামের জন্য বিভিন্ন সাইজ এবং আকৃতির (যেমন- বর্গাকার, আয়তকার, ত্রিভুজ, বহুভুজ ইত্যাদি) বেইজ কিংবা পাইল ক্যাপের ডিজাইন করা হয়। এসব ডিজাইন ও ড্রয়িং অনুযায়ী শাটারিং করে কংক্রিট ঢালাই করতে হয়।

মনে রাখা দরকার, আরসিসি ঢালাইয়ের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় মালামাল ও অন্যান্য খরচের পাশাপাশি শাটারিংয়ের জন্য আলাদা একটি খরচ যোগ করতে হবে। নির্দিষ্ট আকৃতি বা সাইজ অনুযায়ী কংক্রিট ঢালাই করার জন্য শাটারিং করা অত্যাবশ্যক। এই শাটারিংয়ের কাজের জন্য ব্যবহৃতব্য প্রয়োজনীয় মালামাল (কাঠ-বাঁশ কিংবা স্টিল) নিজেরা কিনে অথবা তৈরি শাটার/শাটারিং মালামাল প্রতি ‘এসএফটি’ হিসাবে ভাড়া নিয়ে কাজটি সম্পন্ন করা যেতে পারে। শাটারিংয়ের মালামাল ভাড়া নেওয়ার ক্ষেত্রে সারফেস এরিয়া অনুযায়ী প্রতি এসএফটি দরে খরচের হিসাব নিরূপণ করা হয়।

অনুরূপভাবে সব আরসিসি কাজ যেমন- কলাম, গ্রেড বিম, রুফ বিম, ছাদ, ড্রপ ওয়াল, সান শেইড, রেইলিং, ফলস ছাদ ইত্যাদি মেম্বরগুলো আলাদা আলাদাভাবে ঢালাই করার জন্য পর্যায়ক্রমিকভাবে প্রয়োজনীয় মালামাল ও খরচের হিসাব একই নিয়মে বের করা হয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, একটি ইমারত নির্মাণ প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়নার্থে এ পর্যন্ত যা কিছু আলোচনা করা হলো তাতে শুধু একটি আরসিসি কাঠামো নির্মাণসংক্রান্ত বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে।

এরপর পর্যায়ক্রমিকভাবে পার্টিশন ওয়াল তৈরি করা, ইলেকট্রিক ও স্যানিটারি পাইপ স্থাপন করা, প্লাস্টার করা, ওয়ারিং করা, জানালা ও দরজার শাটার ও ফ্রেম তৈরি করা এবং লাগানো, গ্রিল তৈরি করা ও লাগানো, ফ্লোর ফিনিশিংয়ের কাজ করা, ইলেকট্রিক ও স্যানিটারি ফিটিংস-ফিক্সার্সসমূহ বসানো, পেইন্ট ও পলিশিংয়ের যাবতীয় কাজ একের পর এক সম্পাদন করা হয়। সর্বশেষ লিফট, জেনারেটর, ট্রান্সফরমার ইত্যাদি বসানো হয়। 

প্রথমেই আসা যাক পার্টিশন ওয়াল প্রসঙ্গে। পার্টিশন ওয়াল তৈরির করার জন্য ইট, কাঠ, বোর্ড, গ্লাস, অ্যালুমিনিয়াম ইত্যাদি নানা ধরনের মালামাল ব্যবহৃত হয়ে থাকে এবং একেকটির হিসাব নিরূপণের পদ্ধতি একেক ধরনের। যদি ইট দিয়ে পার্টিশন ওয়াল তৈরি করা হয় সে ক্ষেত্রে ওয়ালের পুরুত্ব বিভিন্ন রকম হতে পারে, যেমন- ৩ ইঞ্চি, ৫ ইঞ্চি, ১০ ইঞ্চি ইত্যাদি। ৩ ও ৫ ইঞ্চি পুরু ওয়ালের ক্ষেত্রে ‘এসএফটি’  (দৈর্ঘ x উচ্চতা) এবং ১০ ইঞ্চি পুরু ওয়ালের ক্ষেত্রে ‘সিএফটি’ (দৈর্ঘ x উচ্চতা x পুরুত্ব)-তে পরিমাপ নির্ণয় করা হয়।

প্রসঙ্গত

৩ ইঞ্চি পুরু ওয়ালের জন্য প্রতি ১০০ ‘এসএফটি’ কাজে ৩০০টি ইট প্রয়োজন,

৫ ইঞ্চি পুরু ওয়ালের জন্য প্রতি ১০০ ‘এসএফটি’ কাজে ৫০০টি ইট প্রয়োজন এবং

১০ ইঞ্চি পুরু ওয়ালের জন্য প্রতি ১০০ ‘সিএফটি’ কাজে ১১০০টি ইটের প্রয়োজন।

এ ছাড়া প্রয়োজন সিমেন্ট ও বালুর। ইটের গাঁথুনির জন্য সাধারণত মিডিয়াম (এফএম ১.৫) বালু ব্যবহার করা হয়ে থাকে। গাঁথুনির জন্য ৩ ও ৫ ইঞ্চি পুরু ওয়ালের ক্ষেত্রে ১ ঃ ৪ (সিমেন্ট ও বালু) এবং ১০ ইঞ্চি পুরু ওয়ালের ক্ষেত্রে ১ ঃ ৬ (সিমেন্ট ও বালু) অনুপাতে সিমেন্ট মর্টার ব্যবহার করা হয়।

অতএব,

ইটের তৈরি পার্টিশন ওয়ালের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন মালামালের সম্ভাব্য হিসাব:

* ৩ ইঞ্চি পুরু প্রতি ১০০ এসএফটি পার্টিশনওয়াল তৈরি করতে-  ৩০০টি ইট এবং ১ ঃ ৪ (সিমেন্ট ঃ বালু) অনুপাতে

  ১ বস্তা সিমেন্ট এবং ৫ সিএফটি বালু প্রয়োজন।

* ৫ ইঞ্চি পুরু প্রতি ১০০ এসএফটি পার্টিশনওয়াল তৈরি করতে-   ৫০০টি ইট এবং ১ ঃ ৪ (সিমেন্ট ঃ বালু) অনুপাতে

  ২ বস্তা সিমেন্ট এবং ১০ সিএফটি বালু প্রয়োজন।

* ১০ ইঞ্চি পুরু প্রতি ১০০ সিএফটি পার্টিশনওয়াল তৈরি করতে- ১১০০টি ইট এবং ১ ঃ ৬ (সিমেন্ট ঃ বালু) অনুপাতে

  ৪ বস্তা সিমেন্ট এবং ৩০ সিএফটি বালু প্রয়োজন।

উপরিউক্ত মালামালের দামের সঙ্গে ৩ ও ৫ ইঞ্চি পুরু ওয়ালের ক্ষেত্রে প্রতি ‘এসএফটি’ হিসাবে এবং ১০ ইঞ্চি পুরু ওয়ালের ক্ষেত্রে প্রতি ‘সিএফটি’ হিসাবে লেবার রেট যোগ করতে হবে। এ ছাড়া অন্যান্য মালামাল (যেমন-কাঠ, বোর্ড, গ্লাস, অ্যালুমিনিয়াম ইত্যাদি) ব্যবহারে পার্টিশন ওয়াল তৈরির ক্ষেত্রে মালামালের ধরন অনুসারে আলাদা আলাদাভাবে হিসাব নিরূপণ করা হয়। এসব ওয়াল সাধারণত ফ্রেমসহ কিংবা ফ্রেমবিহীন উভয়ভাবেই হতে পারে এবং উভয় ক্ষেত্রেই প্রতি এসএফটির দর হিসাবে মোট খরচ নির্ণয় করা হয়।

চলবে…

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮৩তম সংখ্যা, মার্চ ২০১৭।

প্রকৌশলী মো. হাফিজুর রহমান পিইঞ্জ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top