বিশে^ বহুল ব্যবহৃত নির্মাণ উপকরণ সিমেন্ট। সিমেন্ট, অ্যাগ্রিগেট, বালু ও পানির সমন্বয়ে সৃষ্টি হয় কংক্রিট, যা অত্যন্ত শক্তিশালী নির্মাণ উপকরণ। লাইমস্টোন, ক্লিংকার, জিপসাম, স্ল্যাগ, সিলিকাসহ নানা উপাদানে তৈরি হয় এই সিমেন্ট। সিমেন্ট শক্তিশালী হলেও তা অত্যন্ত পানিগ্রাহী ও স্পর্শকাতর অনুষঙ্গ। পানি ও জলীয় বাষ্পের সংস্পর্শে এটি খুব দ্রুত জমাট বাঁধে। এটা শুধু পানিই নয়, বাতাস থেকেও শুষে নেয় আর্দ্রতা। আর এই জমাটবাঁধা সিমেন্ট কখনোই কাক্সিক্ষত শক্তিমাত্রা দিতে পারে না। এ জন্য সিমেন্ট উৎপাদনে যেমন সতর্ক থাকতে হয়, তেমনি পরিবহন, সংরক্ষণ এমনকি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সাবধানতা জরুরি। বিশেষ করে বর্ষার কয়েকটি মাস সিমেন্ট বিষয়ে নিতে হয় বাড়তি সতর্কতা। প্রকৃতিতে এখন বর্ষাকাল। কখনো এক পশলা বৃষ্টি, কখনো বা দিনভর ভারী বর্ষায় ভিজে যায় চরাচর। তাই বলে তো আর থেমে থাকবে না নির্মাণকাজ। নির্মাণ প্রকল্পে সিমেন্ট থেকে কাক্সিক্ষত শক্তিমাত্রা পেতে পণ্যটি উৎপাদনের পরবর্তী সব ধাপে অর্থাৎ পরিবহন, সংরক্ষণ ও ব্যবহারের আগ পর্যন্ত করণীয় সম্পর্কিত দিকনির্দেশনা থাকছে এ আলোচনায়।
বিক্রয়কেন্দ্র ও গোডাউনে সিমেন্ট সংরক্ষণ করবেন যেভাবে
সিমেন্ট যত দ্রুত ব্যবহার করা যায় ততই ভালো। কিন্তু সব ক্ষেত্রে তো আর তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবহার সম্ভব নয়। এ জন্য বিক্রয়কেন্দ্র বা গোডাউনে সিমেন্ট সংরক্ষণ করতে হয়। সাধারণত গোডাউনে সিমেন্টের পরিমাণ থাকে অনেক বেশি। যদি কোনো কারণে বৃষ্টির পানি বা অন্য কোনোভাবে সিমেন্ট নষ্ট হয়, তাহলে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ হয় অনেক বেশি। এ জন্য সংরক্ষণে নিতে হয় বাড়তি যত্ন। মনে রাখা জরুরি, শুধু বৃষ্টিই নয়, সরাসরি সূর্যের আলোতে, ময়লা-আবর্জনাময় স্থানে ও স্যাঁতসেঁতে স্থানে কোনোভাবেই সিমেন্ট রাখা উচিত নয়। সিমেন্ট সংরক্ষণের কতিপয় কৌশল-
- সিমেন্ট ব্যাগ রাখতে হবে কাঠের পাটাতন বা প্লাস্টিক প্যালেটের ওপর।
- মেঝে থেকে ১৫০ মিমি (১৫ সে.মি) থেকে ২০০ মিমি (২০ সে.মি) ওপরে সিমেন্ট রাখতে হবে।
- সিমেন্টের ব্যাগ সাজানোর ক্ষেত্রেও নিতে হবে বাড়তি সতর্কতা।
- ব্যাগ একটি অন্যটির সঙ্গে নিবিড়ভাবে রাখতে হবে যেন ব্যাগগুলোর মধ্য দিয়ে বাতাস যেতে না পারে।
- প্যালেট বা বেড ও নিচের সারির সিমেন্টের ব্যাগে বাড়তি চাপ এড়াতে একটি পাটাতনের ওপর ১০ ব্যাগের বেশি সিমেন্ট সাজানো ঠিক নয়। তবে পাটাতন মজবুত হলে এবং সংরক্ষণ পরিসর বড় হলে সর্বোচ্চ ১৫ ব্যাগ রাখা যেতে পারে।
- একই ভাবে প্রস্থে ৪ ব্যাগ বা ৩ মিটারের বেশি রাখাও উচিত নয়। প্রয়োজনে কিছুটা জায়গা খালি রেখে অন্য কলাম করা যেতে পারে।
- কলামে ৮ ব্যাগের অধিক উচ্চতা হলে সিমেন্টের ব্যাগ সাজানোর ক্ষেত্রে দৈর্ঘ্যভিত্তিক-প্রস্থভিত্তিক বা লম্বালম্বি-আড়াআড়ি সিরিয়ালে সাজানো উচিত। এতে সিমেন্টের ব্যাগ পড়ার ঝুঁকি থাকে কম।
- সিমেন্ট স্তর সিলিং বা ছাদ থেকে অন্তত ১ ফুট নিচে রাখতে হবে।
- সিমেন্টের ব্যাগ দেয়াল থেকে অন্তত ৬০০ মিমি (৬০ সে.মি) দূরে রাখতে হবে। দেয়ালে কোনো ছিদ্র থাকলে বা পানি চুইয়ে পড়ার সুযোগ থাকলে এই দূরত্ব আরও বাড়ানো যেতে পারে।
- কয়েক সারিতে সিমেন্ট রাখলে, এসব সারির মধ্যে পর্যাপ্ত খালি জায়গা রাখতে হবে যেন সহজেই সিমেন্ট সংগ্রহ করা যায়।
সিমেন্ট সংরক্ষণাগার যেমন হবে
- গোডউন বা শো-রুমের ফ্লোর বা মেঝে মাটির হওয়া চলবে না, অবশ্যই পাকা হতে হবে।
- বৃষ্টির ঝাপটা, এমনকি দু-এক ফোঁটা পানিও যেন না ঢুকতে পারে এমন জায়গায় সিমেন্ট রাখতে হবে।
- সংরক্ষণ স্থানটি অবশ্যই শুষ্ক হতে হবে। স্যাঁতসেঁতে বা আর্দ্র স্থানে কোনোভাবেই সিমেন্ট রাখা উচিত নয়।
- গোডাউন বা বিক্রয়কেন্দ্রে জানালা বা খোলা জায়গা থাকলে তা বন্ধ রাখতে হবে। তবে স্থানটি আর্দ্রতাপূর্ণ এলাকায় হলে কিছুটা ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে।
সাইটে সংরক্ষণ যেভাবে করবেন
সাধারণত বড় ধরনের স্থাপনা নির্মাণে বা দীর্ঘস্থায়ী প্রকল্প নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রয়োজন হয় প্রচুর পরিমাণে সিমেন্ট। এ জন্য নির্মাণস্থলেই অস্থায়ীভাবে সিমেন্ট সংরক্ষণের প্রয়োজন হয়। ফলে সেখানে একটি অস্থায়ী গুদাম বানানো বাঞ্ছনীয় হয়ে পড়ে। সে ক্ষেত্রে যা করণীয়-
- অস্থায়ী গুদাম বানাতে উঁচু স্থান নির্বাচন করা উচিত; যেন বৃষ্টি, বন্যা বা নির্মাণকাজের পানি আসতে না পারে।
- এই সংরক্ষণাগারটির মেঝে পাকা ও ওপরে টিনশেড দেওয়া যেতে পারে।
- অস্থায়ী গুদামের চারপাশে ড্রেনেজ ব্যবস্থা রাখতে হবে এবং নিয়মিত দেখভাল করতে হবে যেন পানির প্রবাহ কোনোভাবে বাধাগ্রস্ত না হয়।
- এ ছাড়া স্থানটিতে কিছুটা স্লোপ রাখলে ভালো, যেন বৃষ্টির পানি দ্রুত নেমে যেতে পারে।
- ভবনের কাঠামো নির্মিত হওয়ার পর সেখানেও একটি ঘর বানিয়ে সিমেন্ট রাখা যেতে পারে। তবে বেইজমেন্টের কোনো ফ্লোরে না রেখে গ্রাউন্ড বা অন্য কোনো ফ্লোরে রাখলে ভালো।
সতর্কতা
- সিমেন্টের ব্যাগ দেয়ালের সঙ্গে ঠেস দেওয়া যাবে না।
- কোনো কারণে ব্যাগ ভিজে গেলে তা সেখান থেকে সরিয়ে ফেলতে হবে।
- বন্যার আশঙ্কা রয়েছে এমন জায়গায় সংরক্ষণ করা যাবে না।
- মাটিতে কোনোভাবেই সিমেন্ট রাখা ঠিক নয়। সিমেন্ট মাটি থেকে আর্দ্রতা শোষণ করে।
- সিমেন্টের ব্যাগ ১-২ শতাংশ আর্দ্রতা শোষণ করলে তেমন ক্ষতি না হলেও তা ৫ শতাংশের বেশি হলেই নষ্ট হয় সিমেন্টের গুণাগুণ।
- পানির ঝাপটা বা বৃষ্টির পানি পড়ার আশঙ্কা থাকলে ত্রিপোল বা পলিথিন দিয়ে সিমেন্ট ঢেকে রাখতে হবে।
- কোনোভাবে পানি চুইয়ে দেয়াল বেয়ে আসার আশঙ্কা থাকলে যথাযথ ড্রেনেজ ব্যবস্থা রাখতে হবে।
- সিমেন্ট সংরক্ষণকালে পুরোনো ও নতুন সিমেন্টের চালান আলাদা আলাদা রাখতে হবে।
- যত দ্রুত সম্ভব সিমেন্ট ব্যবহার করা উচিত। এ জন্য সংরক্ষণকালে প্রতিটি ব্যাগে তারিখ লিখে ট্যাগ লাগানো গেলে সহজেই মেয়াদ অনুমান করা যায়।
- সিমেন্ট ব্যবহারের ক্ষেত্রে আগে আসা চালানগুলোই ব্যবহার করা উচিত।
- সিমেন্টের ব্যাগ স্থানান্তরের ক্ষেত্রে বা বহনকালে কোনোভাবেই হুক ব্যবহার করা উচিত নয়।
সিমেন্ট সংরক্ষণ বেড বা কাঠামো তৈরি করবেন যেভাবে
স্থান নির্বাচনের পর সেখানে প্রয়োজনীয় কাঠামো তৈরি করতে হবে। কাঠামো বা বেড তৈরিতে যা যা প্রয়োজন-
- কাঠ বা প্লাস্টিকের প্যালেট বা পাটাতন
- বাঁশের চাটাই
- করোগেটেড শিট বা পুরোনো কার্টন
- ত্রিপোল
- পুরু পলিথিন
- কাঠের ভুসি
- বালু।
সিমেন্ট রাখার বেড তৈরির পদ্ধতি
- যেহেতু কাঠের ফ্রেম সিমেন্ট রাখার বেড হিসেবে সবচেয়ে কার্যকরী, সে জন্য গুদামের আয়তন অনুযায়ী নির্ধারিত মাপে কাঠের ফ্রেম বানিয়ে নিতে হবে।
- ফ্রেম তৈরির কাঠ অবশ্যই ভালো মানের হতে হবে।
- কাঠের ফ্রেমের পাটাতন বানাতে কাঠের তক্তা, সুপারিগাছ বা বাঁশ ব্যবহার করা যেতে পারে।
- এরপর পাটাতনের ওপর চাটাই, করোগেটেড শিট বা পুরোনো কার্টন এবং মোটা পলিথিন বিছিয়ে কয়েক স্তরবিশিষ্ট বেড তৈরি করতে হবে।
- মেঝেতে কাঠের ভুসি বিছিয়ে তার ওপর বাঁশের চাটাই ও পলিথিন বিছিয়েও তাতে সিমেন্ট রাখা যেতে পারে।
- অস্থায়ীভাবে সিমেন্ট সংরক্ষণের জন্য মেঝেতে ইট বিছিয়ে তার ওপর ৬ ইঞ্চি (১৫ সে.মি) পুরু শুকনো বালুর স্তর বিছিয়ে বেড তৈরি করতে হবে। এরপর কাঠের পাটাতনের ওপর চাটাই, করোগেটেড শিটের কার্টুন এবং মোটা পলিথিন বিছিয়ে কয়েক স্তরবিশিষ্ট বেড তৈরি করে তাতে সিমেন্ট রাখতে হবে।
- সম্প্রতি বাজারে প্লাস্টিকের প্যালেট পাওয়া যায়, যাতে কোনো ঝামেলা ছাড়াই সিমেন্ট রাখা যায়।
সিমেন্ট উৎপাদনের পর বিভিন্নভাবে তা ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। সংরক্ষণ ত্রুটি ছাড়াও পরিবহনকালীন বৃষ্টির কবলে পড়ে নষ্ট হয়ে যেতে পারে সিমেন্ট। এ জন্য ত্রিপোল বা পুরু পলিথিন দিয়ে ঢেকে সিমেন্ট আনা-নেওয়া করা উচিত। তবে সবচেয়ে ভালো হয় বৃষ্টিপাতের সময়ে সিমেন্ট বহন করা থেকে বিরত থাকা। সিমেন্ট পরিবহন ও সংরক্ষণে ওপরে আলোচিত পদ্ধতিগুলো গ্রহণ করলে বর্ষা মৌসুমেও সিমেন্টে জমাট বাঁধার আশঙ্কা থাকে না। এতে সিমেন্ট থাকে সতেজ ও গুণগতমান স্থায়ী হয় দীর্ঘক্ষণ।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ১১১তম সংখ্যা, জুলাই ২০১৯।