কল্পনা করুন তো, বরফজমা হিমশীতল পরিবেশ, আপনি শুয়ে আছেন একটি তুলতুলে নরম উষ্ণ আরামদায়ক বিছানায়, মাথার ওপর খোলা আকাশ, ঝিরঝির করে ঝরছে শুভ্র তুষারকণা আর অরোরার (মেরু অঞ্চলের আকাশে প্রাকৃতিক আলো) স্নিগ্ধ আলোয় আকাশে মায়াবী আলোর ফোয়ারা! জঙ্গলের ধারে ছড়ানো-ছিটানো কাচের লগ কেবিন, চিকমিক করা শুভ্র তুষারে মোড়া পাইনগাছের সারি। লগ কেবিনে পা দিয়েই পেয়ে গেলেন ফায়ারপ্লেসে গনগনে আগুনে কাঠপোড়ার ঘ্রাণ আর আগুনের তাপে মড়মড় কাঠ ফাটার আওয়াজ। দিনের বেলা স্লেজ সাফারি শেষে কেবিনে ফিরে নিজস্ব স’নাতে স্টিম বাথ উপভোগ। রাতের খাবার শেষে এবার বল্গা হরিণ সাফারি। বল্গা হরিণ সাফারিতে বেশ ধীরগতিতে এগোবেন যেন আপনি জঙ্গলের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় কম্বল মুড়িয়ে আরামে জাঁকিয়ে বসে রাতের আকাশে অরোরার অসম্ভব সুন্দর জাদুকরী প্রদর্শনী তারিয়ে তারিয়ে দেখতে পারেন। আর রাত ফুরোলেই পরের দিন জঙ্গলের মধ্যে স্নোমোবাইল সাফারি। কে জানে এবার হয়তো মেরু খরগোশ আর হরিণের দেখাও পেয়ে যেতে পারেন। হতে পারে এই দিনটি আপনার জীবনের বিশেষ দিন, নিজের বা প্রিয় কারও জন্মদিন, মধুচন্দ্রিমা কিংবা নিছকই আরেকটা ছুটির দিন। সেই দিনটি এমনভাবে উদ্যাপন করতেই পারেন, তাই না? এমন একটি দৃশ্যকল্প কিন্তু বাস্তব। আপনি চাইলেই এই কল্পনাকে সত্যি করতে পারেন আর তার জন্য ঘুরে আসতে হবে স্ন্যাকেন্ডেনেভিনিয়ান দেশ ফিনল্যান্ডের কাকস্লটনেন (kakslauttanen) ইগলু ভিলেজ থেকে।
কাকস্লটনেন ইগলু ভিলেজ গড়ে ওঠার পেছনের কাহিনিটি বেশ চমকপ্রদ। ১৯৭৩ সালের কোনো একদিন, ফিনল্যান্ডের সবচেয়ে উত্তরের এক গ্রাম উতসজকি। সেখানে মাছ ধরতে গিয়েছিলেন ইগলু ভিলেজের প্রতিষ্ঠাতা জুসি। মাছ ধরা শেষে সেন্ট্রাল ফিনল্যান্ডে পৌঁছানোর পথে তাঁর গাড়ির তেল যায় ফুরিয়ে। নিরুপায় হয়ে সেখানে বনের ধারে অচেনা গ্রামে ক্যাম্প করতে হলো তাঁকে। জুসি যেখানে ক্যাম্প করেছিলেন সেই জায়গাটিই কাকস্লটনেন গ্রাম। কোনো এক অজ্ঞাত কারণে জুসির মনে হয়েছিল তিনি যেন নিজের বাড়িতে ফিরে এসেছেন। এরপর সেখানে আবার ফিরে গেলেন। গ্রীষ্মকালটা জুসি কাকস্লটনেনে তাঁবু টানিয়ে থেকে গেলেন। তারপরের বছর সেখানে একটা ছোট্ট কুটির গড়ে উঠল, আর জুসি উত্তরমেরুতে ঘুরতে যাওয়া যাত্রীদের জন্য ক্যাফে চালানো শুরু করলেন। সেই ক্যাফে দিয়ে শুরু। ধীরে ধীরে সেটা এখন আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসংবলিত ইগলু ভিলেজে পরিণত হয়েছে। এই আর্ক্টিক রিসোর্টটি এখনো পর্যন্ত জুসিই দেখভাল করেন।
কাকস্লটনেনের আর্ক্টিক রিসোর্টটি আসলে দুই ভাগে বিভক্ত। প্রথমটি পূর্ব (পুরোনো) ইগলু ভিলেজ আর দ্বিতীয়টি পশ্চিম (নতুন) ইগলু ভিলেজ। দুটি ভিলেজেই নিজেদের আলাদা আলাদা গ্লাস ইগলু, কাঠের কেবিন, রেস্তোরাঁ, রিসেপশন এবং নিজস্ব কর্মপদ্ধতি রয়েছে। কাচের ছাদ দেওয়া ইগলুতে রাত্রিযাপন যেন অনেকটা নক্ষত্রখচিত ঝলমলে খোলা আকাশের নিচে কাটানোর মতো। আর সেই সঙ্গে বাড়তি পাওনা-নর্দান লাইট বা অরোরা দেখার বিরল সৌভাগ্য। ইগলু ভিলেজ উত্তরমেরুর স্বল্প দূরত্বে হলেও অরোরা দেখার সৌভাগ্য কিন্তু একেবারে নিশ্চিত কোনো বিষয় নয়। তবে গ্লাস ইগলুতে রাত্রিযাপন অরোরা দেখার এই সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ।
এখানে ভ্রমণসঙ্গীর সংখ্যানুযায়ী নিজের চাহিদামাফিক সাইজের ইগলু ভাড়া নেওয়ার সুবিধাও রয়েছে। সাধারণত গ্লাস ইগলুগুলো দুই এবং চারজনের থাকার উপযোগী। তবে আপনি চাইলে সবসময়ই বাড়তি একটা বিছানার ব্যবস্থা কর্তৃপক্ষ করে দেবে। প্রতিটি ইগলুতে আলাদা টয়লেট আর শাওয়ারের ব্যবস্থা আছে। প্রতিটি ইগলুতেই যথাযথ উষ্ণ আর আরামদায়ক তাপমাত্রার ব্যবস্থা রাখা আছে, যেন সবচেয়ে ঠান্ডা আবহাওয়ায়ও এর অতিথিদের কোনো প্রকার অসুবিধা না হয়। অন্যান্য আর সব হোটেলের মতোই এর তাপমাত্রা সহনীয় মাত্রায় রাখা হয়। ইগলুর কাচের ছাদ বৈদ্যুতিকভাবে গরম করার সুবিধা দিয়ে তৈরি। এর ফলে ছাদের কাচ বাইরের আবহাওয়ার কারণে ঠান্ডা হয় না। এটি বরং সব জায়গায় সমভাবে তাপমাত্রা বজায় রাখে আর এর ওপরে ঝরে পড়া বরফ গলিয়ে সরিয়ে দেয়। তাই সব সময়ই আকাশের একটা চমৎকার ভিউ পাওয়া যায়। এ ছাড়া ইগলুগুলোতে মেঝের নিচেও হিটিং সিস্টেম আছে। ইগলু কেবিনের বেডগুলোতেও মোটর বসানো রয়েছে। তাই আপনি ঘুমানো বা ছাদের ওপরে আকাশ দেখা যেকোনো সময়েই ইচ্ছেমতো এটির পজিশন ঠিক করে নিতে পারবেন।
ইগলুর প্রতিটিতে আরও কিছু অনুষঙ্গ রয়েছে যেমনÑ রেফ্রিজারেটর, ইলেকট্রিক কেটলি, হেয়ার ড্রায়ার প্রভৃতি। ফাইভ স্টার হোটেলগুলোর মতোই ইগলুতে বিভিন্ন সুবিধা মেলে। আপনি চাইলে ইগলু ভিলেজের মেইন বিল্ডিং লুমিকার্তানোতে চমৎকার সুস্বাদু বুফেতে সকালের নাশতা সেরে নিতে পারেন অথবা নিজের ইগলুতে বসেই আয়েশে নাশতাটা সারতে পারেন। সেক্ষেত্রে অবশ্য আপনাকে রিসেপশনে আগের দিন রাত আটটার আগেই জানিয়ে রাখতে হবে। তাহলে ইগলু কর্তৃপক্ষ আপনার ইগলুর রেফ্রিজারেটরে সকালের নাশতা সাজিয়ে রেখে যাবে, যেন সকালে যখন ইচ্ছে নাশতাটি তৈরি অবস্থায় পেয়ে যান।
চলুন, পাঠক ঘুরে আসি কাকস্লটনেনের ইগলু ভিলেজ
ফিনল্যান্ডের রাজধানী হেলসেঙ্কি থেকে আইভালতে বিমানপথে যাত্রা, আইভাল থেকে মাত্র ২৫ মিনিটেই পৌঁছে যাবেন ইগলু ভিলেজে। এবার লগ কেবিনের প্রাইভেট স’নাতে স্টিম বাথে পথের ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলুন। পাইনগাছের বনের ধারে লগ কেবিনের ফায়ারপ্লেসে উষ্ণ হোন। আপনার সুন্দর ভ্রমণ শুরু হলো। রাতে স্থানীয় উপাদানে তৈরি সুস্বাদু রাতের খাবার খেয়ে শুয়ে পড়ুন, পরের দিন একটি সুন্দর সকালের আশায়।
সকালের নাশতা সেরে এবার বেরিয়ে পড়ূন মর্নিং হাস্কি স্লেজ সাফারির উদ্দেশে। এখানে আপনি নিজেই আপনার স্লেজ চালাতে পারবেন। কিছু দূর যাওয়ার পরেই খোঁয়াড়ে রাখা স্লেজ টানার কুকুরগুলো দেখতে পাবেন। এদের হাঁকাহাঁকিতে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আপনি যখনই এগুলোকে জোড়ায় জোড়ায় স্লেজে জুড়ে দিয়ে পাইনের সারির মধ্যে দিয়ে স্লেজটি চালিয়ে নিয়ে যাবেন, অমনি এগুলো নিজে থেকেই ভারী লক্ষ¥ী হয়ে যাবে। তখন স্লেজের তলায় বরফ ভাঙা আর স্লেজটানা কুকুরগুলোর মৃদু শ্বাস পড়ার আওয়াজ ছাড়া আর কোনো শব্দই পাবেন না। এই সাফারিতে মেরু অঞ্চলের বন্যপ্রাণীর সঙ্গে আপনার কিছুটা পরিচয় হয়ে যেতে পারে যেমন- টারমিগান (একধরনের বুনোহাঁস)। মাঝপথে, চাইলে আপনার স্লেজের চালক পরিবর্তন করে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
এরপরে নর্দান লাইট রেইনডিয়ার (ল্যাপ্ল্যান্ড অঞ্চলের বিশেষ বল্গা হরিণ) সাফারি। ল্যাপ্ল্যান্ডের স্থানীয় অধিবাসীরা এখনো বল্গা হরিণকে সেই আদিকালের নিয়মেই ব্যবহার করে। এই সুন্দর আর বলশালী প্রাণীটি আপনাকে অবশ্যই মুগ্ধ করবে। বল্গা হরিণের স্লেজে চেপে কম্বলের নিচে জাঁকিয়ে বসুন। বনের মধ্য দিয়ে ধীরলয়ে এটি আপনাকে ভ্রমণে নিয়ে যাবে। আপনি যদি ভাগ্যবানদের দলে থাকেন, তবে এবার আকাশে অরোরার দেখা পেয়ে যেতেই পারেন। রাতে ফিরে খাওয়াদাওয়া আর ইগলুতে বিশ্রাম।
সকালের নাশতার পর আপনার ভ্রমণের তৃতীয় দিনটি শুরু করতে পারেন স্নোমোবাইল এক্সপেডিশন দিয়ে। এই অভিযানের আগে আপনাকে একটা সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এটি আপনার নিজস্ব নিরাপত্তার স্বার্থে। আপনার সঙ্গে একজন গাইড থাকবে। বরফের লেক, নদী, খোলা মাঠ আর বনের ভেতরে ঘোরাÑ এই সব মিলেই আপনার স্নোমোবাইল অভিযান। যাত্রাপথে ইন্টারেস্টিং কিছু দেখলে গাইড আপনাকে সেটি উপভোগ করার ব্যবস্থা করে দেবে। বরফের লেকে বা নদীতে মাছ ধরার কৌশলটাও চাইলে শিখে নিতে পারেন।
দিনভর অভিযান শেষে ইগলুতে ফিরে আসা, রাতের খাবার আর বিশ্রাম। আপনার ভাগ্য যদি ভালো হয়ে থাকে তাহলে নিজ বিছানায় শুয়ে রাতের আকাশে অরোরার অপার্থিব সৌন্দর্য দেখার অভিজ্ঞতাটি হবে অসাধারণ। আর এমন অভিজ্ঞতা জীবনভর মনে রাখার মতো একটি ঘটনা। ভ্রমণ শেষে এবার নিজ ডেরায় ফেরার পালা।
কাকস্লটনেনের ইগলু ভিলেজগুলো বছরে দুটি বিশেষ প্যাকেজ দিয়ে থাকে। শরৎকালীন (সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবর) প্যাকেজ: এই সময়টি অরোরা দেখার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। আর একটি হচ্ছে গ্রীষ্মকালীন (জুন-আগস্ট) প্যাকেজ: এই সময় হচ্ছে মধ্যরাতের সূর্য দেখা, হাইকিং আর মৎস্য শিকারের জন্য ভালো। বছরের অন্য সময়েও ইগলু ভিলেজ ঘুরে আসতে পারেন। সেক্ষেত্রে কাকস্লটনেনের ভয়ংকর ঠান্ডার কথা মাথায় রাখলেই চলবে।
ইগলু ভিলেজে ঘুরতে যাওয়ার আগে যে বিষয় জেনে রাখা ভালো
- এখানে ফোন বা ওয়াই-ফাই নেটওয়ার্ক-সুবিধা নেই। ইমার্জেন্সির সময়েও না।
- কাস্টমার সার্ভিস তেমন সন্তোষজনক নয়।
- রিসেপশন থেকে নিজের ইগলু কেবিন পর্যন্ত লাগেজ নিজেই টেনে নিতে হবে।
- চাইলে দর্শনীয় স্থান ঘোরার জন্য রিসোর্ট বা বাইরের কোম্পানির সাহায্য নিতে পারেন। (স্লেজ সাফারি, স্নোমোবাইল এক্সপেডিশন ইত্যাদির জন্য)।
- নিকটবর্তী সুপার মার্কেট এবং এটিএম বুথ ১০ কি.মি. দূরের শহরে অবস্থিত। তাই প্রয়োজনীয় অর্থ এবং জিনিস একবারে সঙ্গে নিয়ে যাওয়াই ভালো
- ইগলুগুলো যেহেতু কাচনির্মিত, তাই প্রাইভেসি একটা বড় বিষয়। একেবারে খোলামেলা পরিবেশে ঘুমানোর অভ্যেস না থাকলে এটি বেশ অস্বস্তিকর।
কাকস্লটনেন, স্যারিসেল্কা থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। আর ল্যাপল্যান্ডের (Lapland) সেন্ট্রাল হাব রোভানিয়েমি থেকে প্রায় তিন ঘণ্টার রাস্তা। কাকস্লটনেন বনভূমি এলাকায় অবস্থিত হলেও যোগাযোগব্যবস্থা নেহাত মন্দ নয়। আকাশপথে বা সড়কপথে উভয়ভাবেই এখানে যাওয়ার চমৎকার সুব্যবস্থা রয়েছে। কাকস্লটনেন যাওয়ার পথে চাইলে হেলসেঙ্কি শহরেও যাত্রাবিরতি নেওয়া যায়। কেননা ল্যাপ্ল্যান্ডে যাওয়ার সবগুলো ফ্লাইটই হেলসেঙ্কি-বান্তা বিমানবন্দর থেকে ছেড়ে যায়। কাকস্লটনেনের সবচেয়ে নিকটবর্তী বিমানবন্দরটি হলো আইভালো বিমানবন্দর। আইভালো থেকে শাটল বাসে মাত্র ৩০ মিনিটের যাত্রার পরেই কাকস্লটনেন। কাকস্লটনেনে থাকার বুকিং দেওয়ার সময়েই এয়ারপোর্ট ট্রান্সফারের জন্য বুকিং দিয়ে রাখতে পারেন। আইভালতে বর্তমানে ফিনএয়ার ও নরওয়েগান সেবা দিয়ে থাকে।
এ ছাড়া ল্যাপ্ল্যান্ডের আশপাশে যেকোনো জায়গা থেকে যেকোনো সময়ে বাস সার্ভিস পাওয়া যায়। রোভানিয়েমি থেকে সব বাসেরই কাকস্লটনেনে স্টপেজ রয়েছে। আর এসব বাসে ড্রাইভারের কাছ থেকেই টিকিট সংগ্রহ করা সম্ভব। বাসের সময়সূচি জানার জন্য ফিনিশীয় কোম্পানি ম্যাটকাহোলত (www.matkahuolto.fi/en)-এর ওয়েবসাইটে ঢুঁ মারতে পারেন।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮১তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০১৭।