বাড়ি! অনেকের জন্য এটা শুধু একটি আশ্রয় নয় বরং তার রুচি, আভিজাত্য আর সংস্কৃতির বহিঃপ্রকাশও। মানুষ তাই নিজের বাড়িটিকে সাধ্যের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর আর আরামদায়ক করে সাজাতে চায়। বাড়ির দরজা-জানালা থেকে শুরু করে দেয়ালের রং, অন্দরমহলের সাজসজ্জা সবকিছু সেভাবেই করতে চায়। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে এখন আর কেউ গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্য ধরে রেখে দোচালা, চৌচালা, আটচালা ঘর তৈরিতে উৎসাহী নন। কংক্রিটের বসতবাড়ি এখন তাই শুধু শহুরে আবাসন নয়, গ্রামের আনাচকানাচেও এখন এর সদর্প উপস্থিতি।
কিন্তু আমাদের দেশে কজন মানুষ আবহাওয়া বা জলবায়ুর কথা ভেবে তার শখের কিংবা প্রয়োজনের বাড়িটির নকশা করে? বাংলাদেশের মতো উষ্ণ আর আর্দ্র জলবায়ুর দেশে সর্বোচ্চ আরামদায়ক বসতবাড়ি নির্মাণে কিছু বিষয় বিবেচনায় নেওয়া আবশ্যক। গ্রীষ্মকালে বাংলাদেশের গড় তাপমাত্রা ৩০০-৪০০ সে. আর বাতাসে থাকে প্রায় ৮০-১০০% আর্দ্রতা। বর্ষার মৌসুমে আর শীতকালে এর তাপমাত্রা আর আর্দ্রতা পরিবর্তিত হয় উল্লেখযোগ্য হারে। গরমে যে বাতাসে আপনি আরামবোধ করেন, শীতে সেটিই আবার বেশ কষ্টদায়ক। বর্ষাতে দেয়ালে নোনা ধরা, মেঝে ডাম্প হওয়া খুব সাধারণ ঘটনা।
আবাসন কতটা আরামপ্রদ হবে, সেটা যদি প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভর করে তাহলে সে ধরনের আবাসন খুব চিন্তাভাবনা করে নির্মাণ করতে হয়। বাড়ির অবস্থান, সম্মুখ, আশপাশে গাছগাছালির অবস্থান সব কিছুই বিবেচনা নিতে হয়। এমনি বাড়ির গঠনের ওপর নির্ভর করে এর ভেতরে কতটা সূর্যের আলো প্রবেশ করবে, খোলা হাওয়া চলাচল করতে পারবে ইত্যাদি।
আমাদের মত উষ্ণ মৌসুমি জলবায়ুর দেশে যে যে বিষয় বিবেচনায় নিয়ে বাড়ি তৈরি করলে সর্বোচ্চ আরামপ্রদ করে গড়ে তোলা যায় কৃত্রিম কোনো ব্যবস্থাপনা ছাড়াই-
ভেন্টিলেশন
- বাড়িটি ভূমি থেকে একটু উঁচু করে অর্থাৎ ভিটা বা পোঁতা উঁচু করা এবং ২০০-৪০০ ডিগ্রি কৌণিক করে নির্মাণ করা, যাতে প্রয়োজনীয় বাতাসের চলাচল নিশ্চিত করা যায়।
- প্রতিটা কক্ষে একাধিক জানালা এবং ভেন্টসহ দুটি দেয়াল বাইরের দিকে হওয়া বাঞ্ছনীয়। ভেতরের দিকের দেয়াল থেকে বাইরের দিকের সিঁড়ি বা বারান্দা বাতাস চলাচলে কম বাধা দেয়।
- বাড়ির বাইরের দিকটা এমন হওয়া উচিত যেন গরমকালে সর্বোচ্চ বাতাস প্রবেশের ব্যবস্থা থাকে এবং শীতে কম বাতাস প্রবেশ করতে পারে। আমাদের দেশে সাধারণত শীতের সময় উত্তর-পূর্ব দিক থেকে এবং গরমের সময় দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে বাতাস প্রবাহিত হয়। কালবৈশাখীসহ অন্যান্য ঝড় সাধারণত ঈশান কোণ থেকে ধেয়ে আসে।
- প্রয়োজনে জানালা এবং ভেন্টিলেশনে মশানিরোধক জালি ব্যবহার করা যেতে পারে। জানালার ভেতরের দিকে বা বাইরের দিকে অথবা উভয় দিকেই এ রকম শেডিং ব্যবহারের ফলে ঘরের ভেতর ঠান্ডা বাতাস কম প্রবেশ করতে পারে। শীতের দিনে যেটা বেশ উপকারী।
শেডিং
- সরাসরি সূর্যের আলো থেকে বাড়ির দেয়াল বাঁচিয়ে রাখার জন্য বাড়ির খোলা দিকটা (যেদিকে জানালা বেশি) দক্ষিণমুখী করা। এর ফলে দুপুরের তীব্র রোদ থেকে দেয়াল তথা ঘর গরম হওয়া থেকে রক্ষা পাবে। অপর দিকে বিকেলের আলো ঘরে সহজেই প্রবেশ করতে পারবে। ফলে ঘর অন্ধকার বা গুমোট লাগবে না।
- পশ্চিম এবং পূর্ব দিকের শেডিং (চালা দেওয়া ঘরের ক্ষেত্রে) অপেক্ষাকৃত ছোট আকার রাখা ভালো। এর ফলে সকাল এবং বিকেলের আলো ঘরে প্রবেশ করতে পারে। আমাদের দেশে সাধারণত গরমকালে সূর্যের উত্তরায়ন এবং শীতকালে দক্ষিণায়ন শুরু হয়। তাই উত্তর দিকের শেডিং অপেক্ষাকৃত দীর্ঘ হলে ভালো হয়। তীব্র গরম হয়ে যাওয়া থেকে ঘর রক্ষা পায়।
- উঁচু সিলিংয়ের ব্যবহার ঘরের নিচের অংশকে অপেক্ষাকৃত কম উষ্ণ হতে দেয়। ফলে ঘরের ভেতরে অবস্থানকারীর অপেক্ষাকৃত কম গরম অনুভূত হয়।
- পূর্ব এবং পশ্চিম দিকের দেয়ালে কম জানালা ব্যবহার করা এবং জানালায় সানশেডের ব্যবহার করা।
- প্রতিটি জানালা, বাইরের দিকে বারান্দা এবং দরজার ওপরে শেডিং ব্যবহার করা যেন ঘরের ভেতরে সহজে বৃষ্টির ছাঁট প্রবেশ করতে না পারে।
- বাইরের দিকের দেয়ালে সাদা বা হালকা কোনো রং ব্যবহার করা, যাতে সেটি সহজে গরম হয়ে উঠতে না পারে।
ইনস্যুলেশন
- বহুতল ভবনের ক্ষেত্রে ওপর তলার ছাদ সহজেই গরম হয়ে যায় এবং ওপরের তলায় অন্যান্য তলা থেকে অপেক্ষাকৃত বেশি গরম অনুভূত হয়। এ ক্ষেত্রে ছাদের ওপর আলাদা প্রলেপ (জলছাদ) দিলে ছাদ অনেকটাই ঠান্ডা থাকে। প্রলেপ হিসেবে এমন কিছু ব্যবহার করা উচিত যেগুলো বাতাস থেকে কোনো রকম আর্দ্রতা গ্রহণ করে না।
- দেয়াল তৈরির সময় ইনস্যুলেশন ব্যবহার করলে বাইরের তাপে দেয়াল সহজে গরম হয় না। এ ছাড়া এ ধরনের দেয়াল টেকেও বেশি দিন, কেননা ভিতের নিচ থেকে মাটির আর্দ্রতাও দেয়ালকে সহজে সংকুচিত/ প্রসারিত তথা ড্যাম্প করতে পারে না।
বৃক্ষরোপণ
- উঁচু গাছ ছাদ এবং ভবনকে বাইরের অতিরিক্ত তাপ থেকে রক্ষা করে। এ ছাড়া বাতাসের আর্দ্রতা থেকেও এটি ভবনকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। সম্ভব হলে বাড়ির পাশে যেসব গাছ উঁচু হয়ে বেড়ে ওঠে (যেমন: পাম, সুপারি ইত্যাদি) সে ধরনের গাছ লাগানো যেতে পারে।
- গাছ এমনভাবে লাগানো উচিত নয় যে সেটি সকাল এবং বিকেলের রোদ আটকে দেয় অথচ দুপুরের রোদে কোনো ছায়া দেয় না। আমাদের দেশে সাধারণত শীতের সময় এবং গরমের সময় সূর্যের অবস্থান কিছুটা ভিন্ন হয়। সূর্যের এই অবস্থান বিবেচনা করে গাছ লাগানো উচিত।
- দেয়ালের আচ্ছাদন হিসেবেও গুল্মজাতীয় গাছ লাগানো যেতে পারে। এটি দেয়ালের সৌন্দর্যবৃদ্ধির পাশাপাশি ভালো ইনস্যুলেশনের কাজও করে। ঘরকে রাখে ঠান্ডা।
আমাদের দেশের মতো উষ্ণ এবং অতি আর্দ্র জলবায়ুর ক্ষেত্রে আবহাওয়াবান্ধব ভবন নির্মাণ সত্যিই কঠিন। বৈদ্যুতিক পাখা বা এয়ারকন্ডিশনের ব্যবহার ভালোর থেকে খারাপই বেশি করে। বিদ্যুতের অপচয় এবং পরিবেশ দূষণ দুটির জন্যেই এটি সমভাবে দায়ী। আবার সেটি সবার সাধ্যের মধ্যেও থাকে না। এর থেকে প্রাকৃতিক আলো বাতাসের সর্বোচ্চ ব্যবহার করে যদি বাড়ির নকশা প্রণয়ন করা যায় ও সেভাবে বাড়ি তৈরি করা যায়, তাহলে সেটি বরং খরচ ও পরিবেশ দুটোই রক্ষা করে। আর কম খরচে নিশ্চিত করে সব থেকে আরামদায়ক আবাসও।
এ ধরনের আবহাওয়ায় বাড়ির দেয়ালের থেকে ছাদ নির্মাণে বেশি কৌশলী হতে হয়। ছাদের ঝুল কার্নিশ, জানালার ওপরে শেডিংয়ের ব্যবহার, ভেন্টিলেটর ইত্যাদি বাতাসের উন্মুক্ত চলাচল এবং অতিরিক্ত রোদ ও বৃষ্টির ছাঁট থেকে বাঁচায়। কোনো নির্দিষ্ট ডিজাইনের বাড়ি সব ধরনের সুবিধা দিতে পারবে এমনটা ভাবা আসলে বাস্তবসম্মত নয়। তবে বাতাসের চলাচল সত্যিই খুব গুরুত্বপূর্ণ। তাই বাতাস প্রবাহের দিক হিসাব করে বাড়ি করলে সর্বোচ্চ সুবিধা নেওয়া সম্ভব বলে ধরে নেওয়া হয়। এ ছাড়া গাছগাছালির উপস্থিতি, পুকুর বা জলাশয় ইত্যাদিও প্রাকৃতিকভাবে অনেক উপকারী। তাই যথাসম্ভব এগুলোর সংরক্ষণ করা উচিত।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৯৮তম সংখ্যা, জুন ২০১৮।