শাওয়ার ফোসেট-বৃত্তান্ত

কর্মব্যস্ত জীবনে ক্লান্তি দূর করতে গোসলের বিকল্প নেই। ফ্রেশ হতে ঝরনার মতো পানির চনমনে ধারা পেতে দরকার উন্নতমানের শাওয়ার সেট ও ফোসিট। বাথরুমের এই ফিটিংসগুলো নিরবচ্ছিন্ন পানি প্রবাহ নিশ্চিতের পাশাপাশি শাওয়ার সেট স্নানঘরের এবং ফোসিট বেসিন, কিচেন সিঙ্ক ও স্নানঘরের দেয়ালের সৌন্দর্য বাড়িয়ে তোলে বহুগুণ। এখন বাজারে পাওয়া যাচ্ছে দেশি-বিদেশি মডেল, ফিচার ও দামভেদে চমৎকার সব শাওয়ার সেট ও ফোসিট।

শাওয়ার সেটের যত অনুষঙ্গ

শাওয়ার সেট একসঙ্গে প্যাকেজ আকারে পাওয়া গেলেও কতগুলো ভিন্ন ভিন্ন উপকরণ মিলেই পূর্ণাঙ্গ শাওয়ার সেট। এই সেট একসঙ্গে প্যাকেজ আকারে বিক্রি হয়। তবে আলাদা আলাদাভাবেও কিনতে পাওয়া যায় প্রয়োজনীয় এসব ফিটিংসসামগ্রী। শাওয়ার সেটের অনুষঙ্গসমূহ-

  • শাওয়ার হেড (Shower Head)
  • শাওয়ার বার (Shower Bar)
  • স্ট্রেইট টিউব (Straight Tube)
  • শাওয়ার হোল্ডার (Shower Holder)
  • শাওয়ার আর্ম (Shower Arm)
  • শাওয়ার হোজ (Shower Hose)
  • শাওয়ার ভাল্ব (Shower valve)
  • ডাইভারটার (Diverter)
  • শাওয়ার ফোসিট বডি (Shower Faucet Body)

শাওয়ার ফিটিংসের রকমফের

  • ওয়াল বারস
  • হ্যান্ডশাওয়ার/হ্যান্ডস্প্রে
  • হ্যান্ডশাওয়ার প্লাস ওয়াল বারস
  • স্ট্যান্ডিং শাওয়ার সেট।

ওয়ালবারস

এই শাওয়ার সেট সরাসরি স্নানঘরের দেয়ালে স্থাপন করা যায়। সহজে স্থাপনযোগ্য, দীর্ঘস্থায়ী, সাবলীল পানির ধারা এবং সহজে পরিষ্কার করা যায় বলে এ ধরনের শাওয়ার সেটের জনপ্রিয়তা সবচেয়ে বেশি। এই সেট পছন্দমতো উচ্চতায় স্থাপন করা যায়। বৈচিত্র্যময় ডিজাইনের ওয়ালবারসের শাওয়ারহেড স্কয়ার, রাউন্ড, ওভাল, রাউন্ডেড স্কয়ার, রেক্টেঙ্গুলার এবং ডিশেপ আকৃতির। স্নানঘরের আভিজাত্য আনতে ওয়ালবারসের জুড়িমেলা ভার। ব্র্যান্ড, মান ও ডিজাইনভেদে হ্যান্ডশাওয়ার সেটের দাম পড়বে ১ হাজার ৫০০ থেকে ৩০ হাজার টাকার মধ্যে।

হ্যান্ডশাওয়ার বা হ্যান্ডস্প্রে

হ্যান্ডশাওয়ার সেট স্নানঘরের দেয়ালে স্থাপন করলেও তা হাতে নিয়ে সুবিধাজনক স্থানে ব্যবহার করা যায়। এর লম্বা হোজ পাইপের জন্য কিছুটা দূরে অথবা বাথটাবে স্নান উপভোগ করা যায়। এর বিশেষ সুবিধা হচ্ছে হাতলে সুইস থাকায় পানির অপচয় রোধ করা যায়। শাওয়ার হেড সাধারণত রাউন্ড, ওভাল ও রেক্টেঙ্গুলার শেপের হয়ে থাকে। ব্র্যান্ড, মান ও ডিজাইনভেদে হ্যান্ডশাওয়ার সেটের দাম পড়বে ১ হাজার ৫০০ থেকে ২০ হাজার টাকার মধ্যে।

হ্যান্ডশাওয়ার প্লাস ওয়ালবারস

এই শাওয়ার সেট স্নানঘরের দেয়ালে স্থাপন করা থাকলেও বৈশিষ্ট্যে এটি কিছুটা ভিন্ন। এই ধরনের সেট ওয়ালবারসের মতো নির্দিষ্ট শাওয়ার হেড যেমন থাকে, একই সঙ্গে মূল শাওয়ারবারের বা বডির সঙ্গে হ্যান্ডশাওয়ার ফিটিংসও থাকে। ফলে উভয়ভাবেই শাওয়ার উপভোগ করা যায়। এই সেটের দাম পড়বে ১ হাজার ৫০০ থেকে ৩০ হাজার টাকার মধ্যে।

স্টান্ডিং শাওয়ার সেট

স্টান্ডিং শাওয়ার সেট স্থানঘরের মেঝেতে প্রয়োজনীয় স্থানে রাখা যায়। এই শাওয়ার ফিটিংস শাওয়ার স্ট্যান্ড হোল্ডারের সঙ্গে হোসযুক্ত হ্যান্ডশাওয়ারসংবলিত। স্বাভাবিক স্থান ছাড়াও বাথটাবে ব্যবহারের জন্য এই সেট বিশেষভাবে ব্যবহৃত হয়। ভাড়া বাসার জন্য এই ধরনের শাওয়ার সেট দারুণ উপযোগী। এ সেটের দাম পড়বে ৩ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকার মধ্যে।

বৈচিত্র্যময় ডিজাইন

বৈচিত্র্যময় ডিজাইন, রং ও আকারের বাহারি সব শাওয়ার সেটের বিশেষত্ব হলো এগুলোর পানির প্রবাহ অত্যন্ত মসৃণ ও সাবলীল। ফিটিংসে সাধারণত মরিচা ও দাগ পড়ে না। শাওয়ার মিক্সার-সুবিধাও মিলবে এসব ফিটিংসে। এগুলোর নামেও রয়েছে ভিন্নতা। যেমন-

  • ওয়াটার ইন্সপায়ারেশন
  • রেইনড্যান্স
  • ক্রোমা
  • এলিগ্যান্ট
  • মাল্টিকালার লাইট
  • ডেল্টা প্রভৃতি।

হরেক রঙের শাওয়ার

  • স্টিল
  • গোল্ডেন
  • কপার
  • ব্রোঞ্জ
  • ক্রোম (ম্যাট, ব্রাশড বা পলিশড)
  • মাল্টি কালার
  • এলইডি লাইটিং শাওয়ার হেড।

অটোমেটেড শাওয়ার সেট

প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় বদলে যাচ্ছে শাওয়ার সেটের ধরন। বর্তমানে এতে যুক্ত হচ্ছে সেন্সর প্রযুক্তি, যা শরীরের নাগালে এলেই পানি বের হতে শুরু করে। এগুলোর কয়েকটিতে ইলেকট্রনিক থার্মাল সিস্টেম জুড়ে দেওয়া আছে, যাতে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে পানির তাপমাত্রা। ইকো স্মার্ট প্রযুক্তিসম্পন্ন এ ধরনের স্বয়ংক্রিয় শাওয়ার ফিটিংস ২৫-৬০ শতাংশ পর্যন্ত পানি সাশ্রয়ে সক্ষম। ব্র্যান্ড ও মানভেদে এগুলোর দাম পড়বে ৭ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকার মধ্যে। শাওয়ার সেটের অন্যতম ফিচারসমূহ-

  • ইলেকট্রনিক রোটারি টেম্পারেচার সিলেক্টর
  • ইন্টিগ্রেটেড ওয়াটার ফিল্টার
  • তাপমাত্রা ডিসপ্লে
  • এন্টি লইম স্কেল শাওয়ার হেড
  • লো প্রেশার অপারেশন
  • ইকো ইন্ডিকেশন

ফোসিট (Faucet)

ফোসিট এমন একটি ডিভাইস, যা ভবনের প্লাম্বিং সিস্টেম থেকে পানি সরবরাহ করে। সভ্যতার শুরু থেকেই পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে আবিষ্কৃত হয় প্লাম্বিং সিস্টেম। এ ব্যবস্থার মাধ্যমে বিভিন্ন স্থানে পানির সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলেও পানির ধারা আটকে রাখাটাই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ফোসিট আবিষ্কারের মাধ্যমে পানির ধারাকে ইচ্ছেমতো নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। যুক্তরাষ্ট্রে এ ফিটিংসটি ফোসিট নামে পরিচিত হলেও ইউরোপে ট্যাপ নামেই প্রচলিত। প্লাস্টিক, লোহা, তামা ও স্টেলনেইস স্টিলের ফোসিট বাজারে পাওয়া যায়। সম্প্রতি এই ফিটিংসে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। ক্রেতার রুচি, চাহিদা মেটাতে ও অন্দরের আভিজাত্য ফুটিয়ে বাজারে পাওয়া যাচ্ছে বাহারি ডিজাইন, রং, ফিচার ও প্রযুক্তিসম্পন্ন দেশি-বিদেশি ব্র্যান্ডের দারুণ সব ফোসিট। 

ফোসিট যার সমন্বয়ে

  • ভাল্ব
  • স্পাউট
  • হ্যান্ডেল
  • লিফট রড
  • কার্টিজ
  • ফ্লাঙ্গেস
  • স্প্রিং সেট
  • মিক্সিং চেম্বার
  • ওয়াটার ইনলেটস।

রকমফের

  • বল ফোসিট
  • ডিস্ক ফোসিট
  • কার্টিজ ফোসিট
  • ওয়াইড স্প্রেড ফোসিট
  • পুশ-বাটন ফোসিট
  • কম্প্রেশন ওয়াশার ফোসিট
  • অটোমেটেড ফোসিট।

ব্যবহার হয় যেখানে

  • বাথটাব মিক্সার
  • বেসিন মিক্সার
  • হাই বেসিন মিক্সার
  • কিচেন মিক্সার
  • ওয়াল মাউট।

বাহারি রং

  • স্টিল
  • গোল্ডেন
  • কপার
  • ব্রোঞ্জ
  • ক্রোম (ম্যাট, ব্রাশড বা পলিশড)
  • এনামেল (কোটেড কালার)
  • ব্রাশ নিকেল
  • পলিশ নিকেল
  • এন্টিক
  • পিউটার
  • প্লাটিনাম।

ফোসিট এ সময়ে

সিঙ্গেল ও ডাবল উভয় ধরনের ফোসিট বাজারে পাওয়া গেলেও এ সময়ের ফোসিট বেশ স্লিম ও বাহারি ডিজাইনের। তা ছাড়া পানির ধারাও সাবলীল, যা চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে না। এসব ফোসিটে সিরামিক ডিস্ক, কার্টিজ, গরম ও ঠান্ডা পানির ভিন্ন ভিন্ন চেম্বার যুক্ত থাকে। বৈদ্যুতিক বা সেন্সরযুক্ত ফোসিটে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং কলের নিচে হাত রাখলেই পাওয়া যায় পানির ধারা। একে ইনফ্রারেড ফোসিটও বলা হয়। রান্নাঘর, বেসিন, পাবলিক ওয়াশরুম, এয়ারপোর্ট, হোটেল পানির অপচয় রোধে খুবই কার্যকর।

আধুনিক ফোসিটের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে উৎপাদনে ব্যবহৃত হয় উন্নতমানের কাঁচামাল ও কার্টিজ। এর বাইরের আবরণের ঔজ্জ্বল্য ধরে রাখার জন্য প্রথমে নিকেল এবং পরে জিংক ক্রোমিয়ামের পাতলা প্রলেপ দিয়ে কোটিং করা হয়। মরিচা প্রতিরোধের জন্য লাগানো হয় এলয় কপার ও জিংকের প্রলেপ। এ ছাড়া সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় কম্পিউটারাইজড মেশিনে ও রোবট দিয়ে সম্পন্ন হয় এর তৈরির প্রক্রিয়া। ফলে ফিটিংসের ডাইমেনশন ও নজেল ছিদ্র হয় নিখুঁত। আমাদের দেশে চীন, মালয়েশিয়া, ভারত ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে উৎপাদিত ফোসিট পাওয়া যায়। ব্র্যান্ড, মান, ডিজাইন ও বিক্রয়োত্তর সেবাভেদে ফোসিটের দাম পড়বে ৭ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকার মধ্যে।

টিপস

  • পানি জীবাণুর উপস্থিতির কারণে কিছুদিন পরপর শাওয়ার হেড ও ফোসিট পরিষ্কার করা উচিত। শাওয়ার নেওয়ার আগে কিছু সময় শাওয়ার ছেড়ে রাখা দরকার।
  • সস্তা ও নন-ব্র্যান্ডের শাওয়ার সেট ও ফোসিট না কেনাই উত্তম। কারণ, কিছুদিনের মধ্যেই এসব ফিটিংসের রং ও মান নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
  • বাজারে প্রাপ্ত শাওয়ার সেট ও ফোসিটে বিভিন্ন মেয়াদের গ্যারান্টি অথবা ওয়ারেন্টি দেয়। পণ্য কেনার আগে বিক্রয়োত্তর সেবার বিষয়টি ভালোমতো জেনে নেওয়া ভালো।
  • ভালো ও দীর্ঘস্থায়ী সেবা পেতে প্লাম্বিং-ব্যবস্থা ও উপকরণগুলো গুণগতমানের ও দক্ষ মিস্ত্রি দিয়েই কাজটি করানোই উত্তম।

যেখানে পাবেন

রাজধানীতে বাথরুম ফিটিংস পণ্যের সবচেয়ে বড় বাজার হাতিরপুল, বাংলামোটর ও গ্রিন রোড (গ্রিন সুপার মার্কেট)। এ ছাড়া নবাবপুর, বনানী, মিরপুর, উত্তরা, কুড়িল, যাত্রাবাড়ী, বাড্ডা ছাড়াও দেশব্যাপী স্যানিটারিসামগ্রী বিক্রির দোকানে মিলবে শাওয়ার সেট ও ফোসিট। এ ছাড়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান অনলাইনেও এ পণ্য দুটি বিক্রয় ও সরবরাহ করে থাকে।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৯৮তম সংখ্যা, জুন ২০১৮।

কাজী গোলাম মোর্শেদ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top