বাঁচতে যেমন খেতে হয়, তেমনি সম্পন্ন করতে হয় প্রাকৃতিক কর্মও। সুস্থ থাকতে আবার শুধু খাবার খেলেই চলে না, প্রয়োজন বিশুদ্ধ ও সুষম খাবার। একইভাবে প্রাকৃতিক কাজ সম্পন্ন করতে স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট ব্যবস্থা অত্যন্ত জরুরি। সুস্বাস্থ্যের জন্য টয়লেটের এই গুরুত্ব উপলব্ধি করে মানুষ গড়ে তুলেছে আধুনিক টয়লেট-ব্যবস্থা। শুধু তা-ই নয়, বাড়ির টয়লেট থেকেই কর্তার রুচি জানা যায়। এ জন্য ঝকঝকে সুন্দর ইন্টেরিয়রে বাথরুম ডেকোরেশনও ক্রমেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বাথরুম বা টয়লেটের শোভা বাড়াতে জুড়ি নেই বৈচিত্র্যময় সিরামিকস কমোডের। দৃষ্টিনন্দন এসব কমোড অন্দরের সৌন্দর্যবর্ধক অনুষঙ্গ হিসেবে বেছে নিচ্ছে শৌখিন ও সৌন্দর্যপ্রিয় অনেকেই। সিরামিকস কমোডের কদর যে দিন দিন বাড়ছে তা কিন্তু নয় বরং আজকাল এটি পরিণত হয়েছে ফ্যাশনেও।
বাসাবাড়ি, অফিস বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে এখন যে চমৎকার সব টয়লেট ও কমোড-ব্যবস্থা দেখা যায়, তা হাজার হাজার বছরের ক্রমোন্নতির ফল। প্রাচীনকালে মানুষ খোলা জায়গায় প্রাকৃতিক কর্ম সারলেও ধীরে ধীরে টয়লেট-ব্যবস্থা উন্নয়নে সক্ষম হয়। মূলত বিভিন্ন সভ্যতা গড়ে ওঠার ফলেই টয়লেটের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় তিন হাজার বছর আগে টয়লেট আর পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থার প্রমাণ মেলে। মহেঞ্জোদারোতে খ্রিষ্টপূর্ব ২৮০০ সালে বাড়ির মধ্যেই টয়লেট-ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। সিন্ধু সভ্যতায় প্রায় প্রতিটি শহরেই টয়লেট-ব্যবস্থার অস্তিত্ব মেলে। স্কটল্যান্ড, মিশর ও ইরানেও আধুনিক টয়লেটের প্রমাণ রয়েছে। তবে রোমান সভ্যতার টয়লেটগুলো বাকি সব টয়লেট-ব্যবস্থা থেকে একবারেই ভিন্ন। সেখানে দীর্ঘ স্ল্যাবে একাধিক টয়লেট-ব্যবস্থা ছিল, যেখানে থাকত পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা। রোমান এবং গ্রিকরা এক ধরনের চেম্বার পট ব্যবহার করত মলমূত্র ত্যাগে। সমকালীন স্বল্পবিত্তরা একধরনের বালতি টয়লেট ব্যবহার করত, যার পরিচিতি ‘বাকেট টয়লেট’ নামে। এটা অনেকটাই কমোডের মতো।
বর্তমানে কমোড বলতে আমরা যা বুঝি, উৎপত্তিগতভাবে এর অর্থ সম্পূর্ণ ভিন্ন। আসলে কমোড বলতে বোঝায় কয়েক টুকরো আসবাব। এটি প্রায় ১৭০০ সালে ফ্রেঞ্জ শব্দ কমোডি (Commode) থেকে, যা ল্যাটিন বিশেষ্য কমোডাসের (Commodus) সঙ্গেও মিলে যায়। তখন কমোড বলতে নিচু কেবিনেট তথা একধরনের ড্রয়ার বোঝাত, যেখানে সহজে বসা যায়। যার উচ্চতা থেকে প্রশস্ততা বেশি। এই কমোড তৈরি হতো কাঠে এবং গায়ে থাকত চমৎকার ডিজাইন। পরে ওপরে বসানো হতো মার্বেল স্ল্যাব। ১৮০০ সালের দিকে কাঠমিস্ত্রিরা কমোডব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটান। ১৯০০ সালে এর আকার আরও ছোট হয়ে আসে, যা কাঠের ঘেরা ঠুলের মতো বোল আকৃতির অবয়ব পায়।
পরবর্তী সময়ে উদ্ভাবিত হয় ফ্ল্যাশযুক্ত কমোডও। তবে এই ফ্ল্যাশ টয়লেট সিস্টেম ডিজাইন করা হয় ১৫৯৬ সালে। ফ্ল্যাশ টয়লেট ‘ওয়াটার ক্লোসেটস’ নামেও পরিচিত। আমেরিকায় চেইন টানা টয়লেটের প্রচলন হয় ১৮৯০ সালে। এ সময়ে প্লাম্বিং সিস্টেমের ব্যাপক উন্নয়ন হয়। কমে আসে দুর্গন্ধও। মূলত ১৯০০ সালে শিল্পবিপ্লবের পর বিভিন্ন ডিজাইনের কমোডের উদ্ভব ঘটে। তবে ধারণা করা হয়, হাসপাতালে রোগীদের শৌচকাজের সুবিধার্থে চেয়ারবিশিষ্ট কমোড উদ্ভাবিত হয়। চেয়ার কমোড বলতে চেয়ারের সঙ্গে চাকাযুক্ত ভ্রাম্যমাণ টয়লেটকে বোঝায়। যারা টয়লেটে যেতে অক্ষম, এমন রোগী বা অসুস্থ ব্যক্তিরা এটা ব্যবহার করে। এ ছাড়া বিমান ও ট্রেনে উদ্ভাবিত হয় ‘ভ্যাকুয়াম টয়লেট’ নামে একধরনের ফ্ল্যাশ টয়লেট, যা হালকা ফ্ল্যাশ পানি ও ভ্যাকুয়াম সুয়্যারেজ সিস্টেমে যুক্ত। এরপর আবিষ্কৃত হয় পোর্টেবল টয়লেটও।
যেসব উপকরণে তৈরি হয় কমোড
- সিরামিক
- পোরসেলিন
- প্লাস্টিক
- কংক্রিট
- পাথর
- কাঠ
- স্টিল
- লোহা
- পিতল
- তরল সোনা ও অন্যান্য।
আগে লো-কমোডের চল থাকলেও এখন হাই-কমোডও সমান জনপ্রিয়। প্রতিনিয়তই কমোডে যুক্ত হচ্ছে আধুনিক সব ফিচার। ধরনেও থাকছে বৈচিত্র্য।
কমোডের ধরন
সাধারণত কমোড দুই ধরনের-
- ক্ল্যাসিক্যাল
- মডার্ন।
মডার্ন কমোডের মধ্যে রয়েছেÑ
- ইউরোপিয়ান বা ওয়েস্টার্ন ক্লোসেট
- ফ্লোর মাউন্টস
- ওয়াল হ্যাংগ
- রিমলেস
- টর্নেডো।
কমোড বোল
বাজারে প্রচলিত কমোড বোল বিভিন্ন ধরনের-
- রাউন্ড বোল
- স্কয়ার বোল
- ইলংগেটেড বোল
- রেক্টেঙ্গুলার বোল।
কমোড বৈচিত্র্য
বাথরুমের কমোড যে কতটা বৈচিত্র্যময় হতে পারে তা ভাবাই যায় না। সিরামিকস ও পোরসেলিন কমোডই বিশ্বে সর্বাধিক ব্যবহৃত। তবে সোনা দিয়েও কমোড তৈরি হয়েছে, যা সংরক্ষিত আছে নিউইয়র্কের গুগেইনহেম মিউজিয়ামে। নাম ‘আমেরিকা’। দর্শনার্থীরা সোনার কমোডটি ব্যবহার করতে পারেন, তবে গুনতে হয় অনেক টাকা। কমোড উৎপাদক ও গবেষকেরা কমোডে উচ্চ প্রযুক্তি সংযোজনে বেশ আগ্রহী। জাপানের টো টো কোম্পানি স্বয়ংক্রিয় পরিষ্কার যন্ত্রসহ কমোড উদ্ভাবন করেছে, যা থেকে দুর্গন্ধরোধী পদার্থ নিঃসরিত হয়ে বের হয় সুগন্ধি। যাতে ওয়াশ বাটন চাপলে পশ্চাৎদেশও ধুয়ে দেয়। এরপর ভেজা অংশ শুকিয়ে দেয় গরম হাওয়া। সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে ফ্লাশ করার পর ইলেকট্রোলাইট কমোড সব ধরনের ব্যাকটেরিয়া ও অতিবেগুনি রশ্মিজনিত জীবাণসমূহকে মেরে ফেলে।
এ ছাড়া কিছু প্রতিষ্ঠান জলপ্রপাত, সমুদ্রের ঢেউ, পাখির ডাকসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক শব্দ সংযোজন করেছে, যা ফ্লাশ বাটন চাপলেই বেজে ওঠে। এ ছাড়া জাপানের উন্নত হাসপাতালের কমোডে ব্লুটুথ সংযোগ দেওয়া হয়েছে, যা থেকে অ্যাপসের সাহায্যে মল-মূত্রের প্রকৃতি সম্পর্কে জানা যাবে প্রয়োজনীয় তথ্য। স্বয়ংক্রিয় সেন্সর প্রযুক্তি ব্যবহার করে কমোডকে আরও আধুনিক করে তোলার চেষ্টা চলছে। গবেষকেরা চাইছেন এমন একটি কমোড উদ্ভাবন করতে, যা মল-মূত্র থেকে জৈব সার উৎপাদনে সক্ষম!
কমোডের দরদাম
আধুনিক কমোডগুলো যেমন বৈচিত্র্যময় তেমনি কেনার খরচটাও নেহাত কম নয়। কয়েক লাখ টাকার কমোডও রয়েছে বাজারে। দেশি বাজারে আমদানি করা কমোডের দাম ৩০ হাজার থেকে ৩ লাখ টাকার মধ্যে। তবে ২ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকার মধ্যে দেশি-বিদেশি কমোড কিনতে পাওয়া যায়।
যত্নআত্তি ও দরকারি টিপস
- স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কমোড সব সময় পরিষ্কার রাখা উচিত।
- প্রতিবার টয়লেটের পরই কমোডে পর্যাপ্ত পানি ঢালা উচিত, যেন নোংরা না হয়।
- কমোড শুষ্ক রাখা উচিত, যাতে ময়লা বা গাদ জমতে না পারে। ফলে কমোড থাকে চকচকে।
- কয়েক দিন পর পর কমোডে হালকা গরম পানি ঢাললে তা পরিষ্কার থাকে, জীবাণু কম ছড়ায় এবং পোকামাকড়ের উৎপাতও থাকে না।
- কমোড স্থাপনে সব সময় অভিজ্ঞ ও দক্ষ স্যানিটারি মিস্ত্রির সাহায্য নেওয়া উচিত। এতে কমোড ও ফিটিংসগুলো মাপমতো বসানোর পাশাপাশি নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়।
- দাম বেশি হলেও উন্নতমানের কমোড কেনা উচিত, এতে দীর্ঘস্থায়িত্বের নিশ্চয়তা পাওয়া যায়।
- কেনার সময় পণ্যের গুণগতমান সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হবে।
পাওয়া যাবে যেখানে
সাধারণত স্যানিটারি সামগ্রীর দোকানগুলোতেই পাওয়া যাবে কমোড ও ফিটিংস। কমোড ঢাকার গ্রিন রোড, হাতিরপুল, বাংলামোটর, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, উত্তরা, যাত্রাবাড়ী, গুলশানসহ সারা দেশের স্যানিটারি সামগ্রীর দোকানগুলোতেই পাওয়া যায়। আমদানি করা সিরামিকস ফিটিংসের একটি বড় বাজার রাজধানীর গ্রিন রোডের গ্রিন সুপার মার্কেট। এ ছাড়া অনলাইনভিত্তিক কিছু প্রতিষ্ঠান দেশি ও আমদানিকৃত কমোড বিক্রি ও সরবরাহ করে থাকে।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৯৭তম সংখ্যা, মে ২০১৮।