বর্ণিল ডিজাইনের জুতার তাক

সকালে ঘুম থেকে উঠার পর প্রথম কাজই ফ্রেশ হওয়া। এরপর সুন্দর পোশাক পরে নাশতা সেরে কাজে বেরিয়ে যাবার পালা। তবে কেতাদুরন্ত ভাবটা তখনই ফুটে ওঠে যখন সুন্দর জুতাজোড়া পায়ে পরে নেওয়া হয়। আবার সারা দিনের কর্মব্যস্ততা সেরে বাসায় ফিরে এ পর্যায়ের প্রথম কাজটাই কিন্তু জুতা খুলে অন্দরে প্রবেশ করা। অনেকেই জুতা খুলে দরজার বাইরে বা ভেতরে দরজার পাশেই এলোমেলো করে রেখে দেয়। বাড়ির সদস্য যদি বেশি হয় তাহলে কি পরিস্থিতি দাঁড়ায় একবার ভাবুন তো! এলোমেলো জুতাগুলো অন্দরের সৌন্দর্য ম্লান করতেই যথেষ্ট। অথচ এই জুতাজোড়া যদি সুন্দর করে গুছিয়ে পরিপাটিভাবে সাজিয়ে রাখা যায়, তাহলে অন্দরটাকেও দেখায় দৃষ্টিনন্দন। আর সে ক্ষেত্রে জুতা বা স্যান্ডেল পরিপাটিভাবে সাজিয়ে রাখতে চাই উপযুক্ত বাহারি জুতার তাক।

পোশাকের মতোই পরিচ্ছদের অন্যতম অনুষঙ্গ জুতা বা স্যান্ডেল। আবার জুতা সংগ্রহ অনেকেরই শখ। জগিং, অফিস, পার্টি বা ঘুরতে গেলে প্রয়োজন হয় ভিন্ন ভিন্ন জুতার। অনেকে আবার পোশাকের সঙ্গে ম্যাচিং করেও জুতা পরেন। সব মিলিয়ে একটি বাড়িতে জুতার সংখ্যাও নেহাত কম নয়। বিপুলসংখ্যক জুতার সংস্থানে ইন্টেরিয়র ডিজাইনার, ফার্নিচার কোম্পানি ও আসবাব প্রস্তুতকারকেরা বের করেছেন কার্যকরী নানা পন্থা, যেগুলোর কোনোটা জুতাগুলোকে রাখে সবার দৃষ্টির আড়ালে আবার কোনোটা উন্মুক্ত রেখেই তুলে ধরে নান্দনিক লুক। যেহেতু ফ্ল্যাটবাড়িতে স্থানসংকুলান করাটা বড় বিষয়, সেহেতু অন্দরের পরিসরের ওপর ভিত্তি করেই জুতা রাখার বিষয়টি ব্যবস্থাপনা করতে হবে। আগে রট আয়রন বা লোহার তাকের প্রচলন বেশি থাকলেও অন্দরসজ্জায় নতুনত্ব আনার জন্য এখন উদ্ভাবিত হচ্ছে বাহারি ডিজাইনের নিত্যনতুন সব জুতার তাক ও বক্স। এর মধ্যে অন্যতম-

  • ডাবলডোর শু-বক্স
  • ডিভান শু-র‌্যাক
  • স্টেয়ার শু-র‌্যাক
  • ঝুলন্ত তাক
  • দরজাসংলগ্ন তাক
  • আন্ডার বেড শু-র‌্যাক
  • প্লাস্টিক শু-র‌্যাক।

ডাবলডোর শু-বক্স

জুতার তাকের মধ্যে অধুনা সবচেয়ে জনপ্রিয় ডাবলডোর বক্স। জুতার এই তাক ক্যাবিনেট বক্সের আদলে তৈরি। সাধারণত দুই পাল্লাবিশিষ্ট শু-বক্সগুলোর অধিক প্রচলন থাকলেও এর কম বা বেশি পাল্লার বক্সও অনেকে তৈরি করে থাকেন। অনেকটা ছোট আকারের আলমারির আদলে জুতার তাকটি ডিজাইন হওয়ায় বাইরে থেকে জুতাগুলো দেখা যায় না। সাধারণত আড়াই থেকে সাড়ে চার ফুট প্রশস্ত এবং তিন থেকে সাড়ে চার ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট কাঠ ও পার্টিকেল বোর্ড শু-বক্স বাজারে পাওয়া যায়। বাক্সে জুতা রাখার জন্য পাঁচ থেকে সাতটি তাক এবং ওপরে জুতার ব্রাশ, পলিশ কালি ও শাইনার রাখার জন্য ড্রয়ার থাকে। তবে অন্দরের আয়তনের ওপর ভিত্তি করে উপযোগী আকৃতির শু-র‌্যাকটি আসবাব তৈরির দোকানগুলোতে ফরমাশ দিয়ে বানিয়েও নিতে পারেন।

ডিভান শু-র‌্যাক

ড্রয়িংরুমের বসার জন্য যে ডিভানটি ব্যবহার করা হয় তা একটু ভিন্নভাবে তৈরি করলেই হয়ে ওঠে সুদৃশ্য শু-র‌্যাক। একই আসবাবের বহুমুখী ব্যবহার সুবিধায় বর্তমানে এই ডিভান র‌্যাকটি বেশ জনপ্রিয়। কাঠের তৈরি র‌্যাকটির ওপরে ফোম বসিয়ে দিলে এবং তা কারুকাজ করা পাল্লা দিয়ে ঢেকে দিলে কেউ বুঝতেই পারবে না সেখানে জুতার র‌্যাক রয়েছে। তবে আসবাবের দোকানগুলোতে সচরাচর এ ধরনের র‌্যাক পাওয়া যায় না। এ জন্য বাড়ির ইন্টেরিয়র করার সময় ডিজাইনারকে দিয়ে অথবা কাঠের দোকানে ফরমাশ দিয়েও ডিভান শু-র‌্যাকটি বানিয়ে নিতে পারেন।

স্টেয়ার শু-র‌্যাক

অন্দরের সিঁড়ির নিচে আলাদাভাবে অথবা সিঁড়ির অংশ হিসেবে স্থাপন করা হয় এই শু-র‌্যাক। সিঁড়ির ধাপের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই বানানো হয় জুতার এই তাক। ড্রয়ার এবং কেবিনেট এই দুভাবে এ ধরনের র‌্যাক বানানো হয়। তবে পাল্লা ছাড়াও সাধারণ র‌্যাক বানিয়েও জুতার তাক বানানো যায়। এ ছাড়া সিঁড়ির আদলে কয়েক ধাপবিশিষ্ট র‌্যাক বানিয়ে ওপরে বিভিন্ন শো-পিস রাখা যায়।

ঝুলন্ত তাক

জুতা রাখার সহজ সমাধান হিসেবে ঝুলন্ত তাক বেশ কার্যকরী। একটু মোটা কাপড় দিয়ে কয়েকটি পকেটবিশিষ্ট ঝুলন্ত তাক সহজেই তৈরি করা যায়। একরঙা কাপড় অথবা পাটের চটের ওপর সুতার কাজ বা নকশিকাঁথার মতো ডিজাইন করে তাকে আবার শৈল্পিক রূপও দেওয়া যায়। পুরোনো জিনস প্যান্ট কেটে পকেট বানিয়েও জুতা রাখা যায়। কাপড় র‌্যাকটিতে মেটাল হুক সংযোজন করে দেয়ালে ঝুলিয়ে দিলেই তৈরি হয়ে যায় ঝুলন্ত তাক। এই তাক দরজার পেছনে বা সুবিধামতো স্থানে সংযোজন করা যায়। সাধারণত বাজারে এ ধরনের তাক পাওয়া যায় না বলে নিজের বুদ্ধি খাটিয়ে বানিয়ে নিতে হয় পছন্দানুযায়ী ঝুলন্ত তাক।

দরজাসংলগ্ন তাক

দরজার সঙ্গে তারের জালি বা চিকন রডের ফ্রেমবিশিষ্ট জালি সংযোজন করে তাতে জুতা ঝুলিয়ে রাখা যায়। ঝুলন্ত জুতাগুলো থাকে উন্মুক্তই। তবে তা যদি দেখতে দৃষ্টিকটু লাগে তাহলে একটি পর্দা টানিয়ে দিতে পারেন। খুব অল্প খরচেই বানানো যায় এমন তাক। সাধারণত বাজারে এ ধরনের জালিতাক সচরাচর পাওয়া যায় না বিধায় ওয়েল্ডিং শপে ফরমায়েশ দিয়েই তৈরি করে নিতে হয়।

আন্ডার বেড শু-র‌্যাক

বক্স খাটের নিচে ড্রয়ারে সাধারণত কম্বল, কাঁথা, বালিশ ও অন্যান্য কাপড় রাখা হলেও অনেকে তাতে জুতাও রাখছেন। তবে বক্স খাটের জুতা রাখার ড্রয়ারটা কিছুটা ভিন্নভাবে তৈরি করে নিতে হয়। এ ছাড়া সাধারণ খাটের নিচে মাত্র এক ফুট উচ্চতার কয়েক তাকবিশিষ্ট বক্স বানিয়ে নিলেই তাতে জুতা সাজিয়ে রাখা যায়।

প্লøাস্টিক শু-র‌্যাক

প্লøাস্টিক শু-র‌্যাক লোহার র‌্যাকের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। সম্প্রতি বাজারে বৈচিত্র্যময় রং ও ডিজাইনের প্লাস্টিক শু-র‌্যাক পাওয়া যাচ্ছে। হালকা, মজবুত, ঘুণে ধরে না এবং তুলনামূলক দাম কম হওয়ায় এই র‌্যাকের জনপ্রিয়তা বাড়ছে দিনকে দিন। তা ছাড়া এই র‌্যাকের জোড়াগুলো খুলে আলাদা করা যায়, যা সহজেই বহনযোগ্য। স্লিমফিট হওয়ায় অন্দরের সুবিধামতো স্থানে সহজেই এই শু-র‌্যাক স্থাপন করা যায়।

টিপস

  • বাইরে থেকে ঘরে ফিরে সঙ্গে সঙ্গে জুতা পরিষ্কার করা উচিত। কারণ, জুতার সঙ্গে ধুলা-ময়লা ও রোগ-জীবাণু ঘরে প্রবেশ করে। আর তাই জুতা ব্রাশ দিয়ে ঝেড়ে তাকে উঠিয়ে রাখুন।
  • যেসব জুতা কম ব্যবহৃত হয় বা বিশেষ অকেশনে ব্যবহার করা হয়, সে জুতাগুলো কাপড়ের ব্যাগে ভরে রাখা ভালো। এতে জুতার টেম্পার ভালো থাকবে।
  • জুতা পরিষ্কার করা হলে তা ভালোমতো শুকিয়ে তাকে রাখা উচিত। তাতে ফাঙ্গাস থেকে মুক্ত রাখা যায়।
  • দুর্গন্ধযুক্ত জুতা ও মোজা কেবিনেটে রাখা যাবে না। তাতে পুরো তাকের জুতাগুলোতে প্রভাব পড়বে।
  • দুর্গন্ধ দূর করতে কিছুটা ট্যালকম পাউডার জুতার মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে।
  • অনেকেই অব্যবহৃত ও পুরোনো জুতা দীর্ঘদিন ধরে রেখে দেন। অনেক সময় সেগুলো জমতে জমতে নতুন জুতা রাখার আর সুযোগ থাকে না। সেটি না করে তা সরিয়ে ফেলাই ভালো।
  • যে জুতাগুলো খুব একটা পায়ে দেওয়া হয় না কিন্তু একেবারে পুরোনোও নয়, সেগুলো জুতার বাক্সে ভরে স্টোর রুমে তুলে রাখতে পারেন।

দরদাম

ডিজাইন, মান, আকার ও ব্র্যান্ডভেদে জুতার তাকের দাম ভিন্ন হয়ে থাকে। জুতার ডাবলডোর বক্স বা ক্যাবিনেটের বাজার দর, কাঠের ৮ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা এবং পার্টিকেল বোর্ডেও তৈরি ৩ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকার মধ্যে। তবে হাতিল, নাভানা, পারটেক্স, অটবি, রিগ্যাল, আখতারসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের তাকের দাম পড়বে ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা। স্টেয়ার শু-র‌্যাক তৈরিতে খরচ হবে ৮ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা। রট আয়রনের হালকা ডিজাইনের জুতার তাক কিনতে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকায়। প্লাস্টিকের তাকের দাম পড়বে ৩০০ থেকে ২ হাজার টাকা। এ ছাড়া ক্রাফট শপে বাঁশ, কাঠ, পাটের শৈল্পিক তাক পেতে পারেন। ইন্টেরিয়র ডিজাইনারের সহযোগিতায় অথবা কাঠমিস্ত্রিকে দিয়ে ডিজাইন দেখিয়ে তৈরি করে নিতে পারেন, তবে খরচ নির্ভর করবে এর ডিজাইন ও কাঠের ধরনের ওপর। তবে তাক কিনুন বা তৈরি করুন না কেন, একটু দাম দিয়ে ভালোমানের টেকসই তাক বেছে নিন।

প্রাপ্তিস্থান

বাজারে বিভিন্ন ফার্নিচার দোকানে কাঠ, পার্টিকেল বোর্ড, স্টিল ও লোহার জুতার তাক পাওয়া যায়। রাজধানীর রোকেয়া সরণি, পান্থপথ, বাড্ডা, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, আজিমপুরসহ বিভিন্ন স্থানে থেকে সংগ্রহ করতে পারেন আপনার পছন্দের জুতার তাকটি।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮৮তম সংখ্যা, আগস্ট ২০১৭।

কাজী গোলাম মোর্শেদ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top