সভ্যতার শুরুর দিকে মানুষ যখন ঘরবাড়ি বানানো শুরু করে, তখন পানীয় জল ও বর্জ্য নিষ্কাশনের প্রয়োজন দেখা দেয়। পাথর, গাছ, বাঁশ প্রভৃতির সাহায্যে পাইপ বানিয়ে প্রথম দিকে প্রয়োজনটি মেটানো হতো। তবে আপাতদৃষ্টে কাজটি চললেও দীর্ঘ মেয়াদে তা ছিল অকার্যকর। পরবর্তী সময়ে বিশেষ করে প্রস্তর যুগের পর ব্রোঞ্জ যুগে শুরু হয় ধাতুর ব্যবহার। ধাতব বস্তু দিয়ে তৈরি হয় নানা উপকরণ। আবিষ্কারের ক্রমবিকাশের ধারায় উদ্ভাবিত হয় ধাতব পাইপও। কিন্তু সমস্যা তবুও পিছু ছাড়ে না। ধাতব পাইপগুলো মরিচার মতো প্রকৃতির নানা ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলা করে টিকে থাকতে ব্যর্থ হয়। কিন্তু ধাতব পাইপগুলো তরল নির্গমনসহ নানা কাজে বেশ কার্যকর ভূমিকা রাখে। এর মাঝে পেরিয়ে যায় অনেকটা সময়। লোহার পাইপগুলোতে লাগে আধুনিকতা ও প্রযুক্তির ছোঁয়া। উদ্ভাবিত হয় জিআই (গ্যালভানাইড আয়রন) পাইপ। নির্মাণকাজসহ নানা প্রয়োজনে ধীরে ধীরে এই পাইপ হয়ে ওঠে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যা এখন ব্যবহৃত হচ্ছে ব্যাপক হারে।
লোহা বাতাসের জলীয় বাষ্প আর অক্সিজেনের সংস্পর্শেই এলেই মরিচা ধরায়। এ ছাড়া অন্যান্য ক্ষতিকর প্রভাব তো আছেই। এ জন্য বিশেষ তাপমাত্রায় লোহার সঙ্গে জিঙ্ক বা দস্তা মেশালে তাতে মরিচা ধরে না। এ পদ্ধতিকেই বলা হয় গ্যালভানাইজেশন বা গ্যালভানাইজিং। জিআই পাইপ আসলে গ্যালভানাইজড আয়রনের সংক্ষিপ্ত রূপ। গ্যালভানাইজেশন বা গ্যালভানাইজিং এমন এক প্রক্রিয়া, যেখানে স্টিল বা লোহায় জিংক কোটিং দেওয়া হয় স্টিলে করোশন ও রাস্ট প্রতিরোধের জন্য। গ্যালভানাইজেশন শব্দটি এসেছে ইতালিয়ান বিজ্ঞানী লুইজি গ্যালভানি-এর নাম থেকে। তিনি এই পন্থাটি উদ্ভাবনের পথিকৃৎ। বিংশ শতাব্দীতে কাস্ট আয়রনের পরিবর্তে জিআই পাইপের ব্যবহার বাড়ে। দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের পর থেকে তা ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। বিশেষত ঠান্ডা খাবার পানি সরবরাহের পাইপ লাইনে।
গ্যালভানাইজিং প্রক্রিয়া
গ্যালভানাইজিং প্রক্রিয়াটি কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হট-ডিপ ও ড্রাই গ্যালভানাইজিং পদ্ধতি। হট-ডিপ পদ্ধতিতে মোল্ট জিংকে লৌহ উপাদানগুলোকে ডুবানো হয়। এতে জিংকের হালকা আবরণ স্টিল ও লোহার গায়ে লেগে যায়। ড্রাই পদ্ধতিতে লৌহ উপাদানসমূহকে একটি ঘূর্ণায়মান ড্রামের মধ্যে জিংক পাউডার ও বালুর মতো কিছু ফিলার দিয়ে গ্যালভানাইজ করা হয়। ড্রামে এ সময় তাপমাত্রা পৌঁছে প্রায় ৫০ সে., যা ৩০০ সে. জিংক বাষ্পে পরিণত হয়। এই জলীয়বাষ্পই লৌহ উপাদানের সঙ্গে মিশে কোটিং সৃষ্টি করে। কোটিংয়ের পুরুত্বে ও গুণগত মানের ওপরই জিআই লৌহসামগ্রীর স্থায়িত্ব নির্ভর করে। কোটিংয়ের মাত্রা জি৪০ থেকে জি২১০ পর্যন্ত হয়ে থাকে। সম্প্রতি গ্যালভানাইজিং পদ্ধতিতে অনেক পরিবর্তন এসেছে, লেগেছে আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া। অটোমোবাইলসহ বিভিন্ন উপকরণে এখন ইলেকট্রো গ্যালভানাইজেশন প্রক্রিয়ায় কোটিং দেওয়া হচ্ছে।
জিআই পাইপের বহুমুখী ব্যবহার
জিআই পাইপ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পানি সরবরাহের কাজে ব্যবহৃত হয়। তবে তা ইউপিভিসি পাইপের তুলনায় টেকসই, মজবুত ও অধিক কার্যকরী হওয়ায় নির্মাণ কাজসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহার হয়ে আসছে। যেমন-
- গ্যাস সরবরাহ
- গরম পানি সরবরাহ লাইনে
- গভীর নলকূপে
- টেলিযোগাযোগ টাওয়ারে
- বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পে
- বায়ু নির্গমন
- কাঠামোগত ব্যবহারে
- শিল্পকারখানায়।
জিআই পাইপের যত সুবিধা
জিংক কোটিং প্রয়োগের ফলে জিআই পাইপ মরিচা, অ্যাসিড, অ্যাসিড বৃষ্টি ও প্রকৃতির বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় সক্ষমতা অর্জন করে; হয়ে ওঠে টেকসই ও দীর্ঘস্থায়ী। তার অনন্য উদাহরণ বিশ্বব্যাপী বিশাল বিশাল লোহা ও স্টিলের তৈরি স্থাপনা ও সেতুগুলো যা টিকে আছে শত শত বছর ধরে। বিশেষ করে সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকায় এই পাইপ দারুণ কার্যকর। তা ছাড়া প্লাস্টিক পাইপের চেয়ে এতে পানির গুণাগুণ থাকে ভালো। লোহার পাইপের থেকে জিআই পাইপের বিদ্যুৎরোধী ক্ষমতা বেশি।
বিশ্বজুড়ে ব্যাপকহারে ব্যবহৃত হওয়ায় উন্নত দেশের মতো বাংলাদেশেও উৎপাদিত হচ্ছে বিশ্বমানের জিআই পাইপ। চাহিদা মেটাতে আগে বিদেশ থেকে আমদানি করা হলেও বর্তমানে দেশের বেশ কটি প্রতিষ্ঠান জিআই পাইপ উৎপাদন করায় আমদানি-নির্ভরতা অনেকটাই কমেছে। বাজারে বিভিন্ন ধরনের জিআই পাইপ পাওয়া যায়। এসব পাইপের সাইজ ৩/৪ ইঞ্চি থেকে ৮ ইঞ্চি পর্যন্ত হয়ে থাকে। ইলেকট্রিক ওয়ারিংয়ে সাধারণ মানের প্লাস্টিকের ইউপিভিসি পাইপ ব্যবহার করা হলেও ছাদের ওয়ারিংয়ে জিআই পাইপ ব্যবহৃত হয়। বিভিন্ন সাইজের জিআই পাইপ প্রতি ফুট ২৫-৩০ থেকে থেকে শুরু করে ৪০০-৪৫০ টাকায় বিক্রি হয়। বাজারে ফ্যালকন, এশিয়া, যমুনা, বসুন্ধরা, ন্যাশনাল টিউবস, হাতিমসহ বিভিন্ন কোম্পানির জিআই পাইপ পাওয়া যায়।
৩/৪ থেকে সর্বোচ্চ ৮ ইঞ্চি পর্যন্ত জিআই পাইপ ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশের বিভিন্ন গ্রামাঞ্চল, মফস্বল ও শহরে সর্বাধিক ব্যবহৃত হয় ৩/৪ ইঞ্চি জিআই পাইপ। সাধারণত ভবন নির্মাণ ও অন্যান্য প্রয়োজনে ৩/৪, ১ ও ১/২ ইঞ্চি- এ তিন ধরনের জিআই পাইপই বেশি ব্যবহৃত হয়। তবে বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্টে ১.৫ ও ২ ইঞ্চির জিআই পাইপ ও শিল্পকারখানায় ২-এর অধিক ইঞ্চির জিআই পাইপ ব্যবহৃত হয়। ক্রেতাদের চাহিদাভেদে ১৫ মিমি থেকে ১০০ মিমি পর্যন্ত জিআই পাইপ সরবরাহ করা হয়। ব্যবহারের ভিত্তিতে বাজারে দুই ধরনের জিআই পাইপ পাওয়া যায়। একটি হলো গোল্ড আর অন্যটি লাইট। গোল্ড জিআই পাইপকে বলা হয় হেভি জিআই পাইপ আর লাইট জিআই পাইপকে বলা হয় নরমাল জিআই পাইপ।
জিআই পাইপের রকমফের
আকারভেদে জিআই পাইপের বিভিন্ন ধরনের। যার মধ্যে রয়েছে-
কোম্পানি ও আকারভেদে জিআই পাইপের দরদাম
বাজারে বিভিন্ন ধরনের জিআই পাইপ পাওয়া যায়। তবে এশিয়া, ফ্যালকন, যমুনা ও বসুন্ধরা পাইপের চাহিদা বেশি। কোম্পানিভেদে পাইপের দরদাম-
জিআই পাইপ ফিটিংস
জিআই পাইপ ছাড়াও বিভিন্ন কাজের সুবিধার্থে জিআই পাইপ ফিটিংস ও ফিকচারসও পাওয়া যায় বাজারে। এর মধ্যে রয়েছে-
পাবেন যেখানে
বাজারের অধিকাংশ হার্ডওয়্যার ও নির্মাণসামগ্রীর দোকানেই জিআই পাইপ পাওয়া যায়। তবে দেশের সবচেয়ে বড় জিআই পাইপের পাইকারি বাজার পুরান ঢাকার নবাবপুর ও বংশালে। এ ছাড়া রাজধানীর হাতিরপুল, বাংলামোটর, বনানী, উত্তরা, বাড্ডা, মোহাম্মদপুর, মিরপুরসহ বিভিন্ন স্থানে মিলবে নির্মাণের প্রয়োজনীয় এই পণ্যটি। বর্তমানে অনলাইনেও (www.othoba.com) অর্ডার দিয়ে সহজেই পেতে পারেন কাঙ্ক্ষিত ব্র্যান্ড ও সাইজের পাইপ।
প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১০৫তম সংখ্যা, জানুয়ারী ২০১৯