ডিজিটাল মিডিয়া স্থাপনের ক্ষেত্রে পরিবেশসচেতনতা কিংবা সৌন্দর্যের প্রতি আকর্ষণ কোনোটা নিয়েই এই পর্যন্ত চীনের সুনাম শোনা যায়নি। জিচুই এন্টারটেইনমেন্ট কমপ্লেক্স (Xicui Entertainment Complex) চীনের এই দুর্নাম ঘোচাতে সম্ভবত অগ্রণী ভূমিকায়। ‘গ্রিনপিক্স’- জিরো এনার্জি মিডিয়া ওয়াল- জিচুই এন্টারটেইনমেন্ট কমপ্লেক্সের ডিজিটাল মিডিয়া স্ক্রিন। বেইজিং শহরস্থ এই কমপ্লেক্সে ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত অলিম্পিক সাইটের সন্নিকটে এই স্ক্রিনটি স্থাপন করা হয়। গ্রিনপিক্সের নকশা প্রণয়নে ছিলেন সাইমন জিওস্ত্রা (Simone Giostra) ও তাঁর সহকারী স্থপতিবৃন্দ। আর গ্রিনপিক্সের ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিসের দায়িত্ব পালন করে বিখ্যাত ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠান অরূপ (Arup)।
গ্রিনপিক্স হচ্ছে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ রঙিন এলইডি (LED) পর্দা এবং এটি চীনের প্রথম কাচের দেয়ালে ওপরের নির্মিত ফোটোভোলটাইক সিস্টেম। গ্রিনপিক্স ডিসপ্লেটি তাই একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ অর্গানিক সিস্টেম। এটি দিনের বেলা সূর্যের আলো থেকে সৌরশক্তি সঞ্চয় করে এবং রাতে প্রদর্শনীর সময় এই সৌরশক্তি গ্রিনপিক্সের এলইডি পর্দার শক্তির উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সাইমন জিওস্ত্রার মতে, ‘এই মিডিয়া ওয়ালটি বেইজিং শহরকে ডিজিটাল মিডিয়া আর্ট উপহার দিয়েছে, সেই সঙ্গে এটি পুরো ভবনজুড়ে সৃষ্টি করেছে টেকসই প্রযুক্তির অনন্য এক উদাহরণ।’ চীনের বিখ্যাত সব শিল্পীর পারফরম্যান্স লাইভ সম্প্রচারের মাধ্যমে ২০০৮ সালের জুনে এই পর্দা উন্মোচন করা হয়।
গ্রিনপিক্সের এই প্রকল্পটি আসলে চীনের অনিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক প্রগতি, যা কিনা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পরিবেশের ভারসাম্য বিনষ্ট করে অর্জিত অর্জনের বিপরীতে এক অসাধারন উদাহরণ। গ্রিনপিক্স একই সঙ্গে সর্বাধুনিক টেকসই প্রযুক্তির ব্যবহার করেছে সেই সঙ্গে এটি সম্পূর্ণরূপে পরিবেশবান্ধবও।
জিচুই কমিশন চেয়েছিল এমন একটি বিনোদনকেন্দ্র বানাতে, যেটি তাদের বক্স আকৃতির কমপ্লেক্স ভবনের চারপাশে অবস্থিত হবে এবং পরিবেশের ভারসাম্যের কোনো ক্ষতি করবে না। সাইমন জিওস্ত্রা এই ধারণাটি মাথায় রেখেই গ্রিনপিক্সের নকশা প্রণয়ন করেন। জিওস্ত্রা এই ডিসপ্লেটিকে প্রাকৃতিক আলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করেও বানাতে চেয়েছিলেন। তিনি এই কাজের জন্য অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন প্রকৃতি থেকেই। সমুদ্রের ঢেউয়ের ওপরে আলোর প্রতিফলন দেখে মুগ্ধ হওয়া জিওস্ত্রা নিজের নকশাকৃত গ্রিনপিক্সের পর্দায়ও সেই মুগ্ধতা ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন। তিনি ও তাঁর দল তাই এখনকার বিমূর্ত চিত্রশিল্পের মতো কম রেজুলেশনের ডিজিটাল পর্দা তৈরির জন্য আগ্রহী ছিলেন। আর এই জন্যই তাঁরা শিল্পী গেহার্ড রিচার (Gerhard Richter) এবং জিম ক্যাম্পবেল (Jim Campbell)-এর সঙ্গে এ বিষয়ে পরামর্শও করেন। জিওস্ত্রা কম রেজুলেশনের এই পর্দা নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন যেন তা একই সঙ্গে এনার্জি সেভিং হয়, সেই সঙ্গে উচ্চ রেজুলেশনের বাণিজ্যিক পর্দার সঙ্গেও সমানতালে প্রতিযোগিতাও করতে পারে। জিওস্ত্রা এবং তাঁর ক্লায়েন্ট জিচুই এন্টারটেইনমেন্ট কমপ্লেক্স সবাই বুঝেছিলেন বেইজিংয়ের মতো আধুনিক নগরীতে এই ধরনের উচ্চাকাঙ্খী ডিজিটাল আর্ট প্রকল্প কতটা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এই পর্যন্ত গ্রিনপিক্সের পর্দায় জু ওয়েঙ্কায় (Xu Wenkai), মাইকেল বেল স্মিথ (Michael Bell Smith), তাকেসি মুরাতা (Takeshi Murata) ও বারবারা শাবরোবা (Varvara Shavrova)-এর শিল্পকর্ম প্রদর্শিত হয়েছে। কিউরেটর এবং প্রডিউসার লুইসা গুই আর্ট ইনস্টিটিউট, মিডিয়া স্কুল, গ্যালারি, করপোরেশন, কালেক্টর এবং বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে মিলিতভাবে এখানে সাইট স্পেসিফিক ভিডিও, বিভিন্ন অনুষ্ঠানও সরাসরি সম্প্রচার করে থাকে।
জার্মানির অন্যতম উৎপাদক স্কুয়েসো ও সানওয়েস (Schueco and SunWays) জিওস্ত্রা এবং অরুপের সঙ্গে একসঙ্গে মিলে নতুন এক প্রযুক্তির উদ্ভাবন করেছেন। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে কাচের দেয়ালের ভেতরে ফটোভল্টাইক সেল লেমিনেটিং করা সম্ভব। তাঁদের তত্ত্বাবধায়নেই চায়নিজ উৎপাদক সানটেক (SunTech) তাদের প্রথম কাচের সোলার প্যানেলটি নির্মাণ করেছে। ভবনের বাইরের পুরো দেয়ালজুড়ে কাচের ভেতরে পলিক্রিস্টালাইন ফটোভল্টাইক সেলগুলো লেমিনেটিং করে পরিবর্তনশীল ঘনত্বের সঙ্গে এটি স্থাপন করা হয়েছে। এই ঘনত্বের তারতম্য বিল্ডিংটির জন্য বিশেষ কিছু সুবিধা এনে দিয়েছে। যেমন- এর কারণে ভবনের ভেতরে যখন যে রকম প্রয়োজন, সেভাবে এটি প্রাকৃতিক আলো সরবরাহ করে, ভেতরের অতিরিক্ত তাপ বের করে দেয় এবং অতিরিক্ত সৌরতাপ থেকে শক্তি উৎপাদন করে মিডিয়া ওয়ালে সরবরাহ করে।
গ্রিনপিক্সের নতুন প্রযুক্তির এই ২৪ হাজার বর্গফুটের পরিবর্তনশীল ডিজিটাল পর্দাটিতে ২ হাজার ২৯২টি রঙিন এলইডি লাইট পয়েন্ট আছে। এর বৃহদায়তন এবং তুলনামূলক কম রেজুলেশনের বৈশিষ্ট্য ভিজুয়াল কোয়ালিটিকে করেছে বেশ উন্নত। প্রচলিত উচ্চ রেজুলেশনের বাণিজ্যিক পর্দার থেকে এটি শৈল্পিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে বেশ ভালো কাজ করে। জিচুই কমপ্লেক্সের বক্সের মতো ভবনটি যেন নিজেই যোগাযোগের একটি মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। এর ‘বুদ্ধিদীপ্ত পর্দা’ কাস্টম-ডিজাইন্ড সফটওয়্যারের সাহায্যে বাইরের পরিবেশের সঙ্গে মিল রেখে প্রয়োজনমত সাড়া দিয়ে ভেতর ও বাইরের জগতের মিলন ঘটিয়েছে। স্থাপত্যশিল্পের সঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তির এই মেলবন্ধন শহুরে জীবনের সঙ্গে যেন পুরোপুরি মানানসই। এর সুবিশাল পর্দা, একবারে আনকোরা প্রযুক্তির ব্যবহারে ব্যস্ত বেইজিং শহরের নাগরিকের দৃষ্টি আকর্ষণে বেশ সফল। গ্রিনপিক্স যেন নতুন নতুন উদ্ভাবন নগর হিসেবে বেইজিংকে বিশ্ববাসীর কাছে আরেকবার পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। ২০০৮-এর অলিম্পিক ইভেন্টের সরাসরি প্রচারণার এই নতুন এবং উদ্ভাবনী পরিবেশবান্ধব মাধ্যম হিসেবে গ্রিনপিক্স বেইজিংকে পৌঁছে দিয়েছেন এক অন্য মাত্রায়। এককথায়, প্রথম ডিজিটাল পাবলিক আর্ট স্পেস হিসেবে গ্রিনপিক্স বেইজংয়ের বুকে আর্কিটেক্ট, ইঞ্জিনিয়ার, প্রোগ্রামার, শিল্পী আর কিউরেটরদের একই সঙ্গে কাজ করা এবং তাঁদের অসামান্য প্রতিভার উৎকৃষ্ট বিকাশ ঘটিয়েছে।
নতুন প্রজন্মের জন্য এই উন্মুক্ত অডিও-ভিডিওয়ের প্রদর্শনী চত্বর শুধু বেইজিং শহরেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এটি তাদের জন্য এনে দিয়েছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। চীনের সীমানা পেরিয়ে সারা বিশ্বের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ, প্রযুক্তি আর শিল্পের মেলবন্ধনে গ্রিনপিক্স সবিশেষ ভূমিকা রাখবে বলেই প্রতীয়মান হয়।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮০তম সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৬।